Hot Posts

6/recent/ticker-posts

Ad Code

মাটির নীচে বুদ্ধমূর্তি ও বৌদ্ধ ধ্বংসাবশেষ কেনো? ড. বরসম্বোধি ভিক্ষু

 ড. বরসম্বোধি ভিক্ষু



অখণ্ড ভারতের সর্বত্র মাটির নীচে বুদ্ধ মূর্তি, বোধিসত্ব মূর্তি এবং বৌদ্ধ ধ্বংসাবশেষ কেনো? যেখানেই খনন করা হয় সেখানে যে বুদ্ধ মূর্তি মাটি ভেদ করে উঠে আসে, তাতে কোনো যাদুর রহস্য নাই, বরং এর পেছনে জড়িত রয়েছে এক গভীর হিংসাত্মক ঐতিহাসিক ষড়যন্ত্রের সত্যতা। ভারত বর্ষের সমস্ত যাদুঘরে ভর্তি রয়েছে বৌদ্ধ প্রত্নতত্ব সামগ্রী (Buddhist Archeological Finds). ভারতবর্ষের স্বর্ণালী ইতিহাসের অনেক অধ্যায় যে মাটি চাপা দিয়ে বিলুপ্ত করা হয়েছিল, সেগুলিই এখন খোদাই করলে যত্রতত্র পাওয়া যাচ্ছে।
বৌদ্ধ সম্রাট অসোক, মিলিন্দ, কনিষ্ক, হর্ষবর্ধন, ধর্মপাল প্রমুখ শাসকেরা ভারতবর্ষে এবং ভারতবর্ষের বাহিরেও বৌদ্ধ ধম্মের প্রচার-প্রসার করেছিলেন এবং বৌদ্ধ ধম্মকে সংরক্ষণের জন্য অনেক সঙ্ঘারাম, বুদ্ধ মূর্তি, বোধিসত্ব মূর্তি এবং বিশ্ববিদ্যালয় সমূহ স্থাপন করেছিলেন। বৌদ্ধ ভারতের সময়ে ইতিহাস খ্যাত সুপ্রসিদ্ধ গান্ধারা ও মথুরা শিল্পকলার উদ্ভব হয়েছিল। বৌদ্ধ রাজাদের প্রচেষ্টায় গড়ে উঠেছিল জগদ্বিখ্যাত তক্ষশীলা, নালন্দা, বিক্রমশীলা, তিলাধক, ওদন্তপুরী, জগদ্দল, অমরাবতী, সিরপুর, বল্লভী, সোমপুর, মোগলমারী, আলেক্সজান্দ্রিয়া প্রভৃতি বিশ্ববিদ্যালয় সমূহ, যেখানে দেশ-দেশান্তর হতে বিদ্যার্থীরা এসে জ্ঞান আহরণ করতেন এবং তাঁরাই বুদ্ধ ও বুদ্ধজ্ঞানের মাধ্যমে ভারতবর্ষের সাথে তাঁদের বহির্বিশ্বের সংযোগ সেতু রচনা করেছিলেন।
খৃষ্টপূর্ব দ্বিতীয় অব্দে বৌদ্ধদের বিরুদ্ধে হিংসাত্মক প্রথম তীব্র আক্রমণ চালিয়েছিলেন কট্টর ব্রাহ্মণ্য শাসক পুষ্যমিত্র শুঙ্গ। তিনি মৌর্য বংশকে বিনাশ করে পাটলীপুত্র হতে শিয়ালকোট পর্যন্ত প্রায় সব বৌদ্ধ সঙ্ঘারাম সমূহকে ধ্বংস করতে এবং নিরস্ত্র-নিরীহ বৌদ্ধ ভিক্ষুদেরকে গলা কেটে নির্মমভাবে হত্যা করতে নির্দেশ দিয়েছিলেন। কেবল তা নয়, বৌদ্ধ ভিক্ষুদেরকে হত্যা করে ছিন্ন মস্তক এনে দিতে পারলে পুরস্কার স্বরূপ স্বর্ণমুদ্রাও প্রদান করতেন।
স্বর্ণালী বিকশিত বৌদ্ধ ভারতকে বিনাশ করতে যুগে যুগে ব্রাহ্মণ্য শাসক ও ব্রাহ্মণ্য প্রতিক্রান্তিকারীদের মধ্যে যাঁরা ভয়ানক আক্রমণাত্মক ধ্বংস যজ্ঞের আশ্রয় নিয়েছিলেন তাঁদের অন্যতম ছিলেন গৌড়রাজ শশাঙ্ক, শঙ্করাচার্য, কুমারিল ভট্ট, সেন শাসক প্রমুখের নাম সবিশেষ উল্লেখযোগ্য। ষষ্ট শতাব্দীতে শশাঙ্ক অনেক বৌদ্ধ বিহারকে এমনকি বুদ্ধগয়া স্থিত মহাবোধি বৃক্ষকেও বিনষ্ট করতে আগুন লাগিয়ে দিয়েছিলেন।
অনুরূপভাবে সপ্তম শতাব্দীতে আদি শঙ্করাচার্য ও তাঁর হিংস্র বাহিনী অনেক বৌদ্ধ বিহারকে দখল করে শিব মন্দিরে এবং অনেক বুদ্ধ মূর্তিকে শিব মূর্তিতে এবং বৌদ্ধ মানতী স্তূপ সমূহকে শিব লিঙ্গে পরিণত করেছিলেন। বুদ্ধের অনেক মূর্তিকে তাঁরা নষ্ট করেছিলেন এবং অনেক মূর্তির চিহ্ন মুছে দিতে মাটি চাপা দিয়েছিলেন। তিনি যে চারধাম রচনা করেছিলেন সেগুলি করেছিলেন প্রাচীন বুদ্ধ বিহারকে আত্মসাৎ করে। স্বামী বিবেকানন্দের (১৮৬৩-১৯০২) লেখাতেও এর জোর সমর্থন পাওয়া যায়।
বৈষ্ণব মতাদর্শী স্বামী রামানুজ (১০১৭-১১৩৭) তো বুদ্ধকেই সম্পূর্ণরূপে আত্মসাৎ করতে তাঁকে বিষ্ণুর নবম অবতার বলেই ঘোষণা করেছেন। এ সম্বন্ধে উড়িষ্যার কবি জয়দেব (দ্বাদশ শতাব্দী) ‘গীতগোবিন্দ’ কাব্য লিখে বুদ্ধ সম্পর্কে প্রথম অবতার বন্দনা বা স্তোত্র লিখেছিলেন।
ভারতবর্ষের সর্বত্র সম্রাট অসোক একাই চুরাশি হাজার সঙ্ঘারাম, চৈত্য, গুহা, বুদ্ধপাদ, ধম্মচক্র, সিংহমুখ বিশিষ্ট স্তম্ভ প্রভৃতি নির্মাণ করেছিলেন। তাঁর পরে কুষাণ সম্রাট কনিষ্ক এবং তাঁরও পরে বর্ধন ও গুপ্ত সম্রাটেরা অসংখ্য বুদ্ধ বিহার ও বুদ্ধ মূর্তি স্থাপন করেছিলেন। বৌদ্ধ শাসকেরা যে সমস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপন করেছিলেন সেগুলিতে প্রচুর বুদ্ধ মূর্তি স্থাপিত হয়েছিল। ব্রাহ্মণ্য প্রতিক্রান্তির সময়ে তাঁরা এতই হিংস্র ও আক্রমণাত্মক হয়ে উঠেছিলেন যে, বুদ্ধের স্মৃতিচিহ্ন যেখানে যা পেয়েছিলেন সেগুলিকে হয়তো নষ্ট করে মাটি চাপা দিয়েছেন বা আগুনে পুড়েছেন অথবা দখল করে রূপ পরিবর্তনের মাধ্যমে নিজেরা দখল করেছেন।
নালন্দা, বিক্রমশীলা প্রভৃতি বিশ্ববিদ্যালয় সমূহ ব্রাহ্মণ্য সেন বংশের শাসকেরা আগুনে পুড়ে ধ্বংস করে ইতিহাস বিকৃতির মাধ্যমে নিজেরা প্রচার করেছেন সেগুলি বক্তিয়ার খিলজী (১১৫০-১২০৬) কর্তৃক ধ্বংস করা হয়েছে।
মধ্যযুগে মুসলিম শাসকদেরকে বৌদ্ধ বিহার সমূহকে আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু বানাতে ব্রাহ্মণ্যবাদীরাই সর্বাত্মক সহযোগিতা করেছেন। তাঁদের সময়েই বৌদ্ধদেরকে আরও বেশী করে শুদ্রের মধ্যে নানা জাতিতে বিভক্তির মাধ্যমে অত্যাচার করলে অনেকে নির্যাতন এড়াতে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছিল। বিদেশী মুসলিম শাসকদের সময়েও অনেক বৌদ্ধ স্থাপত্যকে মাটির নীচে দাবিয়ে রাখা হয়েছিল। সে সময়ে রামায়ণ, মহাভারত ও পুরাণাদি গ্রন্থ সমূহ লিখে বুদ্ধের সম্বন্ধে জনমনে ঘৃণা-বিদ্বেষ ছড়ানো হয়েছে। পুরাণ সমূহ কিভাবে বুদ্ধ বিদ্বেষ প্রচার করা হয়েছে তার একটি জ্বলন্ত উদাহরণ এখানে সবার অবগতির জন্য উপস্থাপন করছি।
ব্রাহ্মণ্য গ্রন্থ ১৮টি পুরাণের মধ্যে অন্যতম হল ‘ব্রহ্মাণ্ড পুরাণ।’ বাংলা সংস্করণের ব্রহ্মাণ্ড পুরাণের ৪৯ পষ্টায় যা লিখা হয়েছে, তাহাই বুদ্ধগয়া মহাবোধি মহাবিহারের মামলায় ১৮৯৫ সালে প্রমাণ স্বরূপ কোর্টে উপস্থাপন করা হয়েছিল। সেখানে লিখা হয়েছে-
‘যদি কোনো দ্বিজ ব্রাহ্মণ বোধগয়া মহাবিহারে বা মন্দিরে জ্ঞাতসারে বা অজ্ঞাতসারে গিয়ে থাকে এবং ভুলেও যদি সেখানে গেলে, তাহলে একশত বার প্রায়শ্চিত্ত করার পরও সে পাপমুক্ত হতে পারবেনা। বৌদ্ধেরা হল প্রতারক ও ভণ্ড। কেননা তারা হল বেদ বিরোধী। এজন্য দ্বিজ ব্রাহ্মণ কেবলমাত্র বেদের উপরই প্রেম করে থাকে। ব্রাহ্মণদের কখনও বৌদ্ধদের দিকে তাকাতে নেই। জানা-অজানা বশতঃ বা কোন কারণ বশতঃ কোন ব্রাহ্মণ ব্যক্তি যদি কোনো বুদ্ধ বিহারে প্রবেশ করে থাকে, তাহলে সেখানে যাওয়ার পাপ হতে সে কখনও মুক্ত হতে পারবেনা। ইহাই হল শাস্ত্রের বাণী।’
এভাবে ব্রাহ্মণেরা কেবল শস্ত্রের মাধ্যমে নয়, শাস্ত্র ও মুখের মাধ্যমেও যুগের পর যুগ নিরন্তর ঘৃণা প্রচারের ফলশ্রুতিতে বুদ্ধের প্রতি জনমনে এক প্রকার তাচ্ছিল্যের ভাব জাগিয়ে তুলেছিল। এহেন চরম ঘৃণ্য মানসিকতা প্রকাশিত হলে যত্রতত্র সেগুলি অযত্ন-অবহেলায় ফেলে দিলে অনেক বুদ্ধ মূর্তি মাটির মোটা আবরণে ঢাকা পড়েছে। যেগুলি এখন খনন করলেই বেড়িয়ে আসছে। সম্প্রতি ভারতের উত্তরাখণ্ড রাজ্যের ঋষিকেশেও মাটি খনন কালে কিছু বুদ্ধমূর্তি পাওয়া গিয়েছে।
ভারতবর্ষে ইংরেজ আসার পর বৃটিশ পুরাতত্ববিদ Sir Alexander Cunningham (1814-1893) কর্তৃক Archeological Survey of India, (ASI) নামক সংস্থানটি প্রতিষ্ঠা করা হলে তিনি এবং তাঁর দল তৃতীয় হতে সপ্তম শতাব্দীতে চীন হতে ভারতে আসা ফা-হিয়েন (৩৩৭-৪২২), হিউয়েন সাং (৬০২-৬৬৪), ইৎ-সিং (৬৩৫-৭১৩) প্রমুখ বিদেশী পর্যটকদের রেকর্ডের ভিত্তিতে মাটি খনন করে করে বৌদ্ধ পুরাকীর্তি সমূহ ভূ-তল হতে উপরে তুলে আনেন এবং সেগুলির অনেকাংশ বর্তমানে আমরা বিভিন্ন ভারতীয় যাদুঘরে এবং পৃথিবীর বিখ্যাত যাদুঘর সমূহেও দেখতে পাচ্ছি। উৎখননে বুদ্ধ মূর্তি পাওয়ার নিরন্তরতা এখনও চলমান রয়েছে।
ইদানীং কালে অনেক প্রমুখ মূর্তি বিভিন্ন স্থানে পাওয়া গিয়েছে। কুশীনগর, কপিলবাস্তু, লুম্বিনী ও সারনাথে খনন করে বুদ্ধের মহাপরিনির্বাণ শয্যা মুদ্রায় এবং ধম্মচক্র প্রবর্তন মুদ্রা সহ বুদ্ধ ও বোধিসত্বের অনেক অদ্ভুত মূর্তি পাওয়া গিয়েছে।
ভারতের বর্তমান বিহার রাজ্যের সর্বত্রই ছিল বুদ্ধ বিহার। এজন্য রাজ্যের নামও ‘বিহার’ হয়ে গিয়েছে। সেখানে গুরুআ, লক্ষ্মীসরাই, নবাদা, নালন্দার মতো স্থানে এখনও গ্রাম্য এলাকার ক্ষেতের জমিনে পর্যন্ত বুদ্ধ মূর্তি পাওয়া যাচ্ছে। কোনো নির্মাণ কার্যের জন্য সামান্য মাটি খনন করলেই বের হয়ে আসে বুদ্ধ মূর্তির খনি। বুদ্ধগয়ার আশে-পাশের গ্রাম গুলোতেও পাল কালীন পাথরের অসংখ্য বুদ্ধ মূর্তি পাওয়া যায়।
এগুলি কি আশ্চর্যের বিষয়? বৈজ্ঞানিক এবং ঐতিহাসিক দৃষ্টিতে ইহা হল বৌদ্ধ পুণর্জাগরণেরই চক্র। যে মূর্তি সমূহ আজ পাওয়া যাচ্ছে, সেগুলি হল ভারতবর্ষের গৌরবশালী ইতিহাস ও শিল্প সভ্যতারই অংশ, যেগুলি শতাব্দীর পর শতাব্দী পর্যন্ত অন্ধকারের গহ্বরে নিমজ্জিত রাখা হয়েছিল। এ সমস্ত হিংস্রতার ইতিহাস তুলে ধরলেই এখন এক শ্রেণীর হিন্দুরা তাদের প্রকৃত বর্বর-অসভ্যরূপ প্রকাশ করে সমস্বরে গালাগাল করতে থাকে।

Post a Comment

0 Comments

Ad Code

Responsive Advertisement