Hot Posts

6/recent/ticker-posts

Ad Code

ভিক্ষুদের রাজ অন্তপুরে গমণের দোষ . ড. বরসম্বোধি ভিক্ষু

 


ড. বরসম্বোধি ভিক্ষু

আমাদেরকে প্রথমেই জানতে হবে যে, তথাগত বুদ্ধের জীবনাদর্শ অন্যান্য ধর্মগুরু বা ধর্ম প্রবর্তকদের মতো নয়। অন্যান্য ধর্ম গুরুরা যেমন স্ত্রী-পুত্র-কন্যাদের নিয়ে ঘর-সংসার করেছেন, অবাধ কামভোগ করেছেন, যুদ্ধ-বিগ্রহ করেছেন, নরসংহার ও পশুবধ করেছেন এবং করতে নির্দেশ দিয়েছেন, নিজেদের দিকে সমর্থক আকর্ষণের জন্য স্বর্গে অফুরন্ত হুর/অপ্সরা ভোগ ও মদ্যপানাদির প্রলোভন দিয়েছেন, বুদ্ধের জীবনাদর্শ কিন্তু সেরকম নয়, তা হল এদের সম্পূর্ণ বিপরীত। তিনি কাম, ক্রোধ, মোহ, মাৎসর্য ইত্যাদির ঊর্ধ্বে উঠে নিষ্পাপ, নিষ্কলুষ ও পবিত্র জীবন-যাপন করে সাধারণ মানব স্তর অতিক্রম করে অতিমানব স্তরে আরোহন করেছেন। তাঁর কায়, বাক্য, মন শুদ্ধ ও ইন্দ্রিয় সুনিয়ন্ত্রিত। তিনি বিদ্বান এবং আচরণ সম্পন্ন। তাঁর অনুপম চরিত্র মাধুর্য, অপরিমিত মৈত্রী ও অপার করুণা প্রভাবে বিনা যুদ্ধে, বিনা অস্ত্রে, বিনা রক্তপাতে অসাধ্যকে সাধন করেছেন, ক্রুদ্ধকে শান্ত করেছেন, হিংস্রকে অহিংস করেছেন, অদম্যকে দমন করেছেন, অসাধুকে সাধু বানিয়েছেন এবং অবোধকে সুবোধ করেছেন। কেবল তিনিই সেরকম ছিলেননা, তাঁর মতো আদর্শকে ধারণ করতে তিনি তাঁর শিষ্যদেরকেও উপদেশ দিয়েছেন। তাঁর শিষ্য সঙ্ঘে বিন্দু মাত্র কাম-ক্রোধের স্থান নাই।
তাঁর শিষ্যসঙ্ঘে সমাজের বিভিন্ন স্তর ও শ্রেণী হতে এসে যোগদান করেছিলেন। তাঁরা উচ্চতর রাজ পরিবার হতে শুরু করে সাধারণ হত দরিদ্র ও অস্পৃশ্য ও নিষ্পেষিত সমাজের লোকেরাও সঙ্ঘে যোগদান করে নিজেদের জীবনকে ধন্য করার সাথে সাথে অন্যদের জীবনেও মার্গ দর্শকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন।
আজকাল আমরা কোনো কোনো ভিক্ষুকে গৃহস্থ পরিবারের শয়ন কক্ষে পর্যন্ত গিয়ে বসে আড্ডা পেতে এবং নানা পারিবারিক ও সাংসারিক গৃহস্থ সুলভ আলাপ চারিতা করতেও দেখে থাকি। কিছু কিছু নারী-পুরুষ এ জাতীয় আচরণকারী ভিক্ষুদেরকে নিজেদের খুবই আপন বলে মনে করে প্রশ্রয় দিয়ে থাকেন। এ জাতীয় আচরণ যে ব্রহ্মচর্য জীবনের অন্তরায় এবং ভিক্ষুত্বের জন্য গর্হিত কর্ম তাঁরা তা উপলব্দি করতে পারেননা। এ প্রসঙ্গে ভগবান বুদ্ধ পালি সাহিত্যের ত্রিপিটকের সূত্রপিটকান্তর্গত অঙ্গুত্তর নিকায়ের ‘রাজন্তে পুরপ্পবেসন সূত্ত’ দেশনায় যা উপদেশ প্রদান করেছেন, তা অতীব প্রণিধান যোগ্য।
ভগবান তথাগত বুদ্ধ ভিক্ষুদেরকে সম্বোধন করে বলেছেন-‘ভিক্ষুগণ! রাজ মহলের রাণীর শয়নাবাসে অর্থাৎ অন্তপুরে যাওয়ার দশবিধ দুষ্পরিণাম রয়েছে। সে দশ প্রকার দোষ কি কি?
১) ভিক্ষুগণ! রাজা রাণীর সাথে অন্তপুরে বসা অবস্থায় রয়েছেন। তখন ভিক্ষু তথায় প্রবেশ করতে দেখে রাণী হাঁসতে পারেন অথবা ভিক্ষু রাণীকে দেখে হাঁসতে পারেন। তখন রাজার মনে এরকম ভাব উদয় হতে পারে যে, হয়তো তাঁরা দুষ্কর্ম করেছেন অথবা করবেন। এরকম সন্দেহ উৎপন্ন হতে পারে। ভিক্ষুগণ! ইহা হল রাজঅন্তপুরে গমণের প্রথম দোষ।
২) ভিক্ষুগণ! রাজা অনেক কাজ-কর্মে ব্যস্ত থাকেন। অনেক সময় ইহা তাঁর স্মরণ থাকেনা যে, তিনি অমুক স্ত্রীর নিকট গিয়েছিলেন। সে স্ত্রী রাজার দ্বারা গর্ভবতী হয়েছেন। তখন তাঁর মনে আসতে পারে যে, এখানে প্রব্রজ্যিত ব্যতীত অন্য কেহ আসা-যাওয়া করেননা। ইহা হয়তো প্রব্রজ্যিত দ্বারাই এরূপ কৃত্য করা হয়েছে। ভিক্ষুগণ! রাজ অন্তপুরে আসা-যাওয়া করার ইহা হল দ্বিতীয় দোষ।
৩) ভিক্ষুগণ! রাজার নিবাসে কোনো কিছু চুরি হয়ে থাকে।সেখানে রাজার মনে এরূপ ধারণা আসতে পারে যে, প্রব্রজ্যিত ব্যতীত অন্য কেহ এখানে গমণ করেননি। হয়তো ইহা প্রব্রজ্যিতই করেছেন। ভিক্ষুগণ! রাজ অন্তপুরে গমণের ইহা তৃতীয় দোষ।
৪) ভিক্ষুগণ! রাজার অন্তপুরের কোনো গোপনীয় বিষয় বাহিরে প্রচারিত হয়। তখন রাজার মনে এরূপ ধারণা আসতে পারে যে, এখানে প্রব্রজ্যিত ব্যতীত অন্য কেহ আসা-যাওয়া করেননি। ইহা হয়তো তাঁর কৃত্যই হতে পারে। ভিক্ষুগণ! রাজ অন্তপুরে গমণের ইহা হল চতুর্থ দোষ।
৫) ভিক্ষুগণ! রাজার অন্তপুরে হয়তো পিতা পুত্রকে মারার কামনা করে থাকে অথবা পুত্র পিতাকে মারার কামনা করে থাকেন। এ অবস্থায় রাজার মনে আসতে পারে যে, এখানে প্রব্রজ্যিত ব্যতীত অন্য কারো আসা-যাওয়া নাই। হত্যার ধারণা হয়তো প্রব্রজ্যিতের কৃত্যই হতে পারে। ভিক্ষুগণ! রাজ অন্তপুরে গমণের ইহা হল পঞ্চম দোষ।
৬) ভিক্ষুগণ! রাজার অধীনস্থ পদে আসীন ব্যক্তি উঁচু পদে আসীন হয়ে প্রভাব বিস্তার করতে থাকে। যা রাজার ভাল লাগেনা। তখন তাঁর মনে এরূপ ধারণা আসতে পারে যে, এখানে ভিক্ষু ব্যতীত অন্য কারো আসা-যাওয়া নাই। ইহার ইন্ধনদাতা হয়তো ভিক্ষুই হতে পারেন। ভিক্ষুগণ! রাজ অন্তপুরে গমণের ইহা হল ষষ্ট দোষ।
৭) ভিক্ষুগণ! রাজার উঁচু পদে আসীন ব্যক্তিকে অধীনস্থ আসীন ব্যক্তি অপদস্থ করে থাকে। এ অবস্থায় রাজার মনে আসতে পারে যে, এখানে প্রব্রজ্যিত ব্যতীত অন্য কারো আসা-যাওয়া নাই। ইহার ইন্ধনদাতা হয়তো ভিক্ষুই হতে পারেন। ভিক্ষুগণ! রাজ অন্তপুরে গমণের ইহা হল সপ্তম দোষ।
৮) ভিক্ষুগণ! রাজাকে অসময়ে সেনা নিয়ে লড়াইয়ের প্রস্তুতি গ্রহণের প্রয়োজন হতে পারে। যা হল রাজার ইচ্ছার বিপরীত। এ অবস্থায় রাজার মনে আসতে পারে যে, এখানে প্রব্রজ্যিত ব্যতীত অন্য কারো আসা-যাওয়া নাই। এরূপ পরিস্থিতি সৃষ্টির মূলে হয়তো প্রব্রজ্যিতই হতে পারেন। ভিক্ষুগণ! রাজ অন্তপুরে গমণের ইহা হল অষ্টম দোষ।
৯) ভিক্ষুগণ! রাজা অসময়ে সেনা নিয়ে লড়াই করতে গিয়ে মার্গ হতে ফেরত আসার পরিস্থিতি হতে পারে। ইহা তাঁর ভাল লাগেনা। এ অবস্থায় রাজার মনে আসতে পারে যে, এখানে প্রব্রজ্যিত ব্যতীত অন্য কারো আসা-যাওয়া নাই। ইহা হয়তো তাঁর কৃত্যই হতে পারে। ভিক্ষুগণ! রাজ অন্তপুরে গমণের ইহা হল নবম দোষ।
১০) ভিক্ষুগণ! রাজার অন্তপুরে হাতীর খেলা, ঘোড়ার খেলা, রথের খেলা তথা চিত্ত আকর্ষণকারী রূপ, শব্দ, গন্ধ, রস, স্পর্শ প্রভৃতি বিদ্যমান থাকে। সেগুলি প্রব্রজ্যিতদের জন্য অহিতকর হয়ে থাকে। ভিক্ষুগণ! রাজ অন্তপুরে গমণের ইহা হল দশম দোষ।
এ সমস্ত দোষযুক্ত হওয়ার কারণে ভিক্ষুদের পক্ষে গৃহস্থ কিংবা রাজ অন্তপুরে যাওয়ার দোষ রয়েছে। এজন্য বিজ্ঞজন নিন্দিত দোষযুক্ত আচরণ করা কখনও উচিত নয়।

Post a Comment

0 Comments

Ad Code

Responsive Advertisement