
ড. বরসম্বোধি ভিক্ষু
রোমান সম্রাজ্যের প্রথম সম্রাট Augustus Caesar (আগষ্টাস সিজার খৃষ্টপূর্ব ৬৩-১৪ অব্দ) খৃষ্টপূর্ব ২৭ হতে ১৪ অব্দ পর্যন্ত শাসন করেছিলেন। তিনি ছিলেন Julius Saesar (খৃষ্টপূর্ব ১০০-৪৪ অব্দ) এর ভ্রাতুষ্পুত্র এবং তাঁর হত্যার পরে তিনি ক্ষমতায় এসেছিলেন। স্বীয় শাসনকালে তিনি সকল রাজনৈতিক বিরোধীদেরকে সমাপ্ত করে নিজের জন্য ‘আগষ্টাস’ অর্থাৎ ‘পবিত্র’ এ উপাধি গ্রহণ করেছিলেন।
এ রোমান সম্রাজ্যের দরবারে প্রায় দু’ হাজার বছর পূর্বে ভারতের গুজরাত স্থিত ভরুচ (প্রাচীন ভৃগুকচ্ছ/ Bargosa) হতে একজন বৌদ্ধ ভিক্ষু পৌঁছেছিলেন। এ ঘটনাকে ইতিহাসের অত্যন্ত আশ্চর্যজনক ঘটনা সমূহের মধ্যে অন্যতম মনে করা হয়।
সেসময় Strabo (খৃষ্টপূর্ব ৬৪- খৃষ্টাব্দ ২৪) নামক ভূগোলবেত্তা, ইতিহাসকার এবং দার্শনিক কর্তৃক এ ঘটনার উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি এ তথ্য Nicolaus of Damascus হতে জানতে পেরেছিলেন, যিনি আগষ্টাস সিজারের দরবারের সাথে যুক্ত হয়েছিলেন।
কাহিনী সমূহের মতে, ‘পোরস’ অর্থাৎ পুরু রাজা (তিনিই ভারতীয় রাজা যাঁর সাথে আলেক্সজান্ডার মহানের (Alexander the Great) যুদ্ধ হয়েছিল) কর্তৃক রোমের দরবারে একজন রাজদূতকে পাঠানো হয়েছিল। তাঁর সম্রাজ্য ছিল বর্তমান পাকিস্তানের ঝেলম নদী হতে পাঞ্জাবের চিনাব নদী পর্যন্ত প্রসারিত। এ রাজদূত সমুদ্র মার্গের মাধ্যমে ভরুচ পৌঁছেছিলেন এবং সেখান হতে নিজের সাথে একজন বৌদ্ধ ভিক্ষুকে সাথে নিয়ে পশ্চিমের দিকে যাত্রায় বের হয়েছিলেন।
ভরুচ সেসময় ভারতের অত্যন্ত সমৃদ্ধশালী একটি সমুদ্র বন্দর ছিল। সেখানকার লোকেরা গেরুয়া চীবর পরিহিত সে ভারতীয় ভিক্ষুকে দেখে অতীব আশ্চর্যান্বিত হয়েছিলেন।
যখন এ ভিক্ষু রোমান সম্রাট আগষ্টাস সীজারের দরবারে পৌঁছেছিলেন তখন সম্রাট এবং তথাকার বিদ্বানেরা তাঁর কাছ হতে ভগবান বুদ্ধ এবং তাঁর উপদেশ সম্পর্কে অনেক প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করেছিলেন। তখন সে ভিক্ষু প্রবর বুদ্ধের মৈত্রী, করুণা, অহিংসা এবং ধম্মের সিদ্ধান্ত সমূহের বর্ণনা করেছিলেন।
কিছু সময় পরে উল্লেখ পাওয়া যায় যে, সে বৌদ্ধ ভিক্ষু এথেন্সে আত্মদাহ করে মারা গিয়েছিলেন। এরপর আগষ্টাস সীজার সেখানে তাঁর সমাধি স্থল নির্মাণ করেছিলেন। সে সমাধিস্থলে নিম্নের বাক্য লিখা হয়েছিল-
‘The Shramana Master, an Indian, a native of Bargosa, having immortalised himself according to the custom of his country, lies here.’
অর্থাৎ এখানে একজন ভারতীয় শ্রমণ আচার্য বিশ্রাম করছেন। যিনি ভরুচের (Bargosa) নিবাসী ছিলেন এবং যিনি স্বীয় দেশের পরম্পরা অনুসারে নিজেকে অমর করে নিয়েছেন।’
ইহা ছিল সে সময় যখন যীশু খৃষ্টের (Jesus Christ) জন্মও হয়নি। অর্থাৎ যিশু খৃষ্টের আবির্ভাবের পূর্বেই বৌদ্ধ ভিক্ষু রোমান সম্রাজ্য পর্যন্ত পৌঁছেছিলেন।
প্রসিদ্ধ আমেরিকান ইতিহাসবিদ ও দার্শনিক Will Durant (১৮৮৫-১৯৪১) ১৯৩০ সালে লিখেছিলেন যে, সম্রাট অসোক ধম্ম প্রচারের জন্য কেবল ভারত নয়, বরং সিরিয়া, মিশর এবং গ্রীক পর্যন্ত বৌদ্ধ ভিক্ষুদেরকে প্রেরণ করেছেন। তাঁর লিখানুসারে পরবর্তী সময়ে খৃষ্টীয় শিক্ষা সমূহের মধ্যেও বৌদ্ধ শিক্ষার ছায়া দৃশ্যমান হয়েছে।
নিম্নোল্লিখিত নৈতিক সিদ্ধান্ত সমূহ বিশেষভাবে নিহিত রয়েছে-
হিংসা ত্যাগ করা, অন্যদের প্রতি করুণা প্রদর্শন, দান এবং সেবার উপর জোর দেওয়া, পাপ স্বীকার করা এবং সদাচারপূর্ণ জীবন-যাপন করা ইত্যাদি।
প্রখ্যাত ভূগোলবেত্তা Strabo’র ঐতিহাসিক নথি হতে ইহা স্পষ্ট হয় যে, বৌদ্ধ ভিক্ষু ভারত হতে বের হয়ে পাশ্চাত্য জগত এবং রোমান সম্রাজ্য পর্যন্ত পৌঁছেছিলেন। প্রসিদ্ধ লেখক M. S. More তাঁর পুস্তকেও এ ঘটনার উল্লেখ করেছেন। তবে তিনি পোরস রাজার স্থানে খৃষ্টপূর্ব দ্বিতীয় অব্দের ইন্দো-গ্রীক রাজা মিনান্দারের (মিলিন্দ) নাম বলেছেন। মিলিন্দ দ্বারা কর্তৃক রাজদূত প্রেরণের উল্লেখ করা হয়েছে।


0 Comments