ভগবান বুদ্ধ রাজগৃহে অবস্থানকালে অসংখ্য প্রেতকে উদ্দেশ্য করে এই ধর্মদেশনা প্রদান করেছিলেন।
ফুস্স বুদ্ধের আবির্ভাব..
আমাদের এই ভদ্রকল্প থেকে পিছনের দিকে গণনা করলে ৯২ কল্প পূর্বে কাশী নামে এক বিশাল রাজ্য ছিল। সেখানে জয়সেন নামে এক রাজা রাজত্ব করতেন। তাঁর রাণীর নাম ছিল সিরিমা। সেই রাণীর গর্ভে ফুস্স বোধিসত্ত্ব অবস্থান করছিলেন। পরবর্তীতে সেই ফুস্স বোধিসত্ত্ব জন্মগ্রহণ করেন এবং চার আর্য সত্য গভীরভাবে উপলব্ধি করে সর্বজ্ঞ বুদ্ধত্ব লাভ করেন।
রাজা জয়সেন ভাবলেন, "আমার পুত্র গৃহত্যাগ করে বুদ্ধ হয়েছেন। বুদ্ধও আমার, ধর্মও আমার, সংঘও আমার।" এই বলে তিনি সর্বদা অত্যন্ত ভক্তিভরে নিজেই বুদ্ধের সেবা-যত্ন করতেন। তিনি অন্য কাউকেই এই সেবা করার সুযোগ দিতেন না।
রাজপুত্রদের ভক্তি ও দান.....
ফুস্স বুদ্ধের তিন সৎভাই (একই পিতা, ভিন্ন মাতা) ছিলেন। তাঁরাও অত্যন্ত শ্রদ্ধাশীল হয়ে বুদ্ধকে সেবা করার সুযোগ পেতে চাইছিলেন। তাই তাঁরা একটি পরিকল্পনা করলেন। তাঁরা রাজ্যের সীমান্তে বিদ্রোহ শুরু হয়েছে বলে গুজব ছড়িয়ে দিলেন। এই খবর শুনে রাজা তাঁর তিন পুত্রকে বিদ্রোহ দমনের জন্য পাঠালেন। তাঁরা গিয়ে রাজ্যের সীমানায় বিদ্রোহ দমনের মিথ্যা খবর নিয়ে রাজপ্রাসাদে ফিরে এলেন।
রাজা এই বিষয়ে অত্যন্ত সন্তুষ্ট হয়ে তিন পুত্রকে বললেন, "তোমাদের যা ইচ্ছা চাইতে পারো। আমি দেব।" তখন তিন রাজপুত্র বললেন যে তাদের অন্য কিছুই চাই না, শুধু বুদ্ধকে সাত বছরের জন্য সেবা করার অনুমতি দিন। রাজা অনুমতি দিলেন না। এভাবে ছয় বছর, পাঁচ বছর, চার, তিন, দুই, এক বছর, সাত মাস, ছয় মাস, পাঁচ, চার মাস পর্যন্ত চাইতে চাইতে রাজা যখন রাজি হচ্ছিলেন না, অবশেষে তিন মাস সেবা করার অনুমতি চাইলে রাজা অনুমতি দিলেন।
রাজপুত্ররা অত্যন্ত আনন্দিত হয়ে বুদ্ধের কাছে গিয়ে তাঁকে আমন্ত্রণ জানালেন। বুদ্ধ নীরব থেকে সম্মতি প্রদান করলেন। রাজপুত্ররা বর্ষাবাসের তিন মাস জুড়ে যাতে কোনো কিছুর অভাব না হয়, সে জন্য কঠোর পরিশ্রম করতে লাগলেন এবং ভগবান বুদ্ধসহ সকল ভিক্ষু সংঘকে মহা সমারোহে দান-দাক্ষিণ্য প্রদান করতে থাকলেন।
পাপকর্ম ও তার পরিণতি.......
রাজপুত্রদের কোষাধ্যক্ষের পুত্রও অত্যন্ত শ্রদ্ধাশীল ছিলেন, তাই তিনি তাঁর স্ত্রীর সাথে মিলে অত্যন্ত ভক্তি সহকারে দানকার্যে অংশ নিয়েছিলেন। কিন্তু এত মানুষের মাঝে কিছু মানুষ এই দানে সন্তুষ্ট হতে পারল না। তাদের মনে ধ্বংসাত্মক প্রবৃত্তি থাকায় তারা সংঘকে দান করার উদ্দেশ্যে রাখা অন্ন খেয়ে ফেলতে লাগল এবং ভোজনশালাগুলোতে গোপনে আগুন লাগিয়ে দিতে লাগল।
এভাবে তিন মাস পূর্ণ হওয়ার পর রাজপুত্ররা এই সমস্ত দানকর্মের দায়িত্ব রাজার হাতে ফিরিয়ে দিলেন।
পরবর্তীতে ভগবান বুদ্ধ পরিনির্বাণ লাভ করার পর রাজা এবং তাঁর তিন পুত্র মৃত্যুবরণ করেন। রাজপুত্ররা এবং কোষাধ্যক্ষ সকলে মৃত্যুর পর নিজেদের অনুচরদের সাথে দেবলোকে উৎপন্ন হলেন। কিন্তু যারা ধ্বংসাত্মক কাজ করেছিল তারা নরকে পতিত হলো। তারা বিরানব্বই কল্প ধরে এক নরক থেকে অন্য নরকে যন্ত্রণায় ঘুরে বেড়াতে লাগল।
কস্সপ বুদ্ধের ভবিষ্যদ্বাণী.......
অবশেষে আমাদের এই ভদ্রকল্পে কস্সপ বুদ্ধের সময়ে তারা প্রেতযোনিতে উৎপন্ন হলো। সেখানে তারা অন্য প্রেতদের সাথে অবস্থান করছিল। তারা দেখল যে, অন্যান্য প্রেতদের আত্মীয়-স্বজনরা দান-দাক্ষিণ্য করে পুণ্যদান করলে তারা 'সাধু' বলে অনুমোদন করার মাধ্যমে বিপুল সুখ লাভ করছে। তাই তারাও 'সাধু' বলার ইচ্ছায় কস্সপ বুদ্ধের কাছে গিয়ে প্রার্থনা জানাল (যে তারা পুণ্যদান গ্রহণ করতে পারছে না)।
তখন কস্সপ বুদ্ধ বললেন, "এখন আমার শাসনকালে তোমরা এটি লাভ করতে পারবে না। ভবিষ্যতে গৌতম নামে এক বুদ্ধ আবির্ভূত হবেন। তাঁর শাসনকালে বিম্বিসার নামে এক রাজা থাকবেন। সেই রাজা বিরানব্বই কল্প পূর্বে তোমাদের আত্মীয় ছিলেন। সেই রাজা বুদ্ধকে দান দিয়ে তোমাদের উদ্দেশ্যে পুণ্যদান করলে তখনই তোমরা সুখ-সমৃদ্ধি লাভ করবে।"
এই কথা শুনে প্রেতরা অত্যন্ত আনন্দিত হলো। তাদের কাছে এক বুদ্ধ থেকে অন্য বুদ্ধের মধ্যবর্তী সময়কে আজকের দিন থেকে আগামীকালের মত মনে হয়েছিল।
গৌতম বুদ্ধের যুগে বিম্বিসারের পুণ্যদান.......
অবশেষে আমাদের গৌতম বুদ্ধ আবির্ভূত হওয়ার পর একদিন রাজা বিম্বিসার এক মহাদানের আয়োজন করলেন।
কিন্তু সেই দানে রাজা বিম্বিসার কেবল বুদ্ধের প্রতিই পূর্ণ মনোযোগ নিবদ্ধ রাখায় পুণ্যদান করতে ভুলে গেলেন। প্রেতরা রাজার পুণ্যদানের অপেক্ষায় ছিল, কিন্তু রাজা পুণ্যদান না করায় তারা অত্যন্ত দুঃখে কান্নাকাটি করতে লাগল। তাই প্রেতরা গভীর রাতে রাজা বিম্বিসারের বাগানে ভয়ঙ্কর শব্দ করে রাজাকে ভয় দেখাল।
রাজা সেই শব্দ শুনে সকালে বুদ্ধের কাছে গিয়ে বিষয়টি জানালেন। এর কী ভালো-মন্দ পরিণাম আছে তা জানতে চাইলে বুদ্ধ বললেন, "মহারাজ, ভয় পাবেন না। এগুলো আপনার পূর্বজন্মের আত্মীয়দের শব্দ, যারা এখন প্রেত হয়ে আছে।" শব্দ করার কারণটি ব্যাখ্যা করে বুদ্ধ বললেন। তখন রাজা বললেন যে তিনি আবার দান করতে ইচ্ছুক। বুদ্ধ নীরব থেকে সম্মতি জানালেন।
.jpg)

0 Comments