বার্মায় রক্ষণশীল মুসলিম পরিবারে জন্ম নেওয়া শ্রদ্ধেয় ছেয়াদ উ. জ্যোতিকার জীবন ও দর্শন গভীর ও অনুপ্রেরণাদায়ক। নিচে তাঁর জীবন ও কর্মের বিস্তারিত তুলে ধরা হলো
শৈশব, শিক্ষা ও আধ্যাত্মিক সন্ধান

জন্ম ও পারিবারিক পটভূমি: ১৯৪৭ সালের ৫ আগস্ট, মিয়ানমারের (তৎকালীন বার্মা) মৌলমেইনে এক মুসলিম পরিবারে তাঁর জন্ম। পিতা উ সাত্তার ও মাতা দাউ তিন।

প্রাথমিক শিক্ষা: রোমান ক্যাথলিক মিশনারি স্কুলে প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হলেও, তিনি গভীরভাবে অধ্যয়ন করেন বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, জৈন, হিন্দু, ইসলাম, পাশ্চাত্য দর্শন ও মনোবিজ্ঞান, এবং পাশ্চাত্য বস্তুবাদ।

ইঞ্জিনিয়ারিং শিক্ষা: ১৯৭৩ সালে রেঙ্গুন ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি থেকে ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ডিগ্রি অর্জন করেন।

জীবনের গভীর উপলব্ধি: ইঞ্জিনিয়ারিং শেষে বৌদ্ধ ধ্যানের প্রতি আগ্রহ জন্মে এবং তিনি বুঝতে পারেন, মানুষ অর্থ, কামসুখ, খ্যাতি ও ক্ষমতার পেছনে ছোটে, অথচ প্রকৃত জীবন তৃপ্তিহীন। এই উপলব্ধি থেকেই ২৬ বছর বয়সে সংসার ত্যাগ করে “সামনেরা” (নবশ্রামণের) জীবন গ্রহণ করেন।

প্রব্রজ্যা ও ধ্যানচর্চা
উপসম্পদা ও প্রাথমিক ধ্যানচর্চা: ১৯৭৪ সালে মেইকতিলার তাউং পু লু তাওয়ায় ভেন. তাউং পু লু সায়াদাওকে উপাধ্যায় করে ভিক্ষু হিসেবে দীক্ষা নেন। পরবর্তী তিন বছর তাঁর কাছেই কঠোর ধ্যানসাধনা করেন।

দীর্ঘ সাধনাকাল: প্রথম গুরুর পর প্রায় ১৫ বছর ভেন. হন্তাবিন তাওয়া সায়াদাওর কাছ থেকে ধ্যানের পথপ্রদর্শন নেন।

সরল ও গভীর জীবনযাপন: নিজের কথা বলতে গিয়ে তিনি লিখেছেন, "I'm a man who keeps himself upset all the time... Being a bhikkhu and living in the forest is the best way of life for me; it suits my temperament."

প্রচার ও আন্তর্জাতিক প্রভাব
বিভিন্ন দেশে ধর্মপ্রচার: ১৯৭৭ ও ১৯৯৮ সালে মেলবোর্ন, ১৯৮৩-৮৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সান্তা ক্রুজ, নিউ ইয়র্ক, বোস্টন ও ওয়াশিংটনে, এবং সিঙ্গাপুরে একাধিকবার ধর্মীয় আলোচনা সভা পরিচালনা করেন।

প্রচুর চাহিদাসম্পন্ন বাণী ও গ্রন্থ: তাঁর ধর্মীয় আলোচনা ও বই মিয়ানমার ও প্রবাসী বর্মিদের কাছে অত্যন্ত সমাদৃত। তিনি প্রায় ১৩টিরও বেশি গ্রন্থ রচনা করেছেন।

উল্লেখযোগ্য গ্রন্থসমূহ
1. Snow in the Summer: পাশ্চাত্য ছাত্র-বন্ধুদের সাথে দশ-পনেরো বছরের চিঠিপত্রের সংকলন, যা চিত্ত, স্মৃতি ও ধ্যান নিয়ে গভীর দিকনির্দেশনা দেয়।
2. A Map of the Journey: অস্ট্রেলিয়ায় একটি ধ্যানরিট্রিটের আগে দেওয়া এগারোটি প্রস্তুতিমূলক আলোচনার প্রতিলিপি।
3. Dhamma Lived I
4. Dealing with Negativity & Aggravation AND Forgiveness
5. The Law of Karma : Dhamma Practice (Volume 6)"
6. What are we living for?"

বর্তমান বাসস্থান ও বিহার: ইয়াঙ্গুনের ৫০ মাইল উত্তরে, পাগো শহরের কাছে এক বিশাল হ্রদের তীরে গ্রামীণ পরিবেশে একটি বিহার প্রতিষ্ঠা করেছেন (যা ‘মাহা মিয়াইং ফরেস্ট মনাস্ট্রি’ নামেও পরিচিত)。

বর্তমান অবস্থা: সর্বশেষ উপলব্ধ তথ্য অনুযায়ী, সায়াদাও উ জোতিকা ২০২৬ সালেও জীবিত আছেন এবং তাঁর রচিত নতুন বই ২০২৪ সালে প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর জন্ম ও বেড়ে ওঠা মিয়ানমারে হলেও, প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য উভয় সংস্কৃতির গভীর জ্ঞান তাঁকে অনন্য করে তুলেছে।
ছেয়াদ উ জোতিকা তাঁর বইগুলোতে নিজের অন্তর্জীবন, সংসার ত্যাগের কারণ ও অনুভূতি খোলামেলা ভাবে ব্যক্ত করেছেন। তাঁর লেখা থেকে বাছাই করা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ নিচে তুলে ধরা হলো:

“Snow in the Summer” গ্রন্থে আত্মকথা:

শৈশবের নিঃসঙ্গতা ও বিচিত্র চিন্তা: “শৈশব থেকে আমি নিজেকে একা অনুভব করতাম, এখনও করি। আমি এমন কিছু জানি ও ইঙ্গিত করি যা অন্যরা জানে না এবং জানতেও চায় না。” তিনি নিজেকে ‘চিরকালের অন্বেষণকারী’ এবং ‘কাউকে অনুসরণ করেন না, নেতৃত্বও দিতে চান না’—বরং একজন ‘বন্ধু’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
· আধ্যাত্মিক সন্ধান ও সংসার ত্যাগ: উনিশ বছর বয়স থেকেই ভিক্ষু হওয়ার চিন্তা ছিল তার। প্রকৌশলী হয়েও পড়াশোনা ‘অতৃপ্তিকর’ বলে মনে হয়েছে। তিনি দেখেছেন, অধিকাংশ মানুষ ‘পদ, অর্থ ও বিলাসের পেছনে ছোটে’, তাই তিনি কন্যাদের গভীর ভালোবেসেও প্রতিযোগিতামূলক সমাজে নিজের জায়গা খুঁজে না পেয়ে ‘সংসার ত্যাগ করেছিলেন’।

ব্যক্তিত্ব ও বর্তমান জীবনধারা: তিনি নিজেকে ‘সব সময় অস্থির থাকা মানুষ’ বলে দাবি করে বলেন, “একজন ভিক্ষু হয়ে বনে বসবাস করাই আমার জন্য সর্বোত্তম জীবনপদ্ধতি; এটি আমার স্বভাবের সাথে খাপসই”। ‘অরণ্যে নির্জন কুটিরে টিকটিকি ও ঘুঘু ডাকে তার জীবন পরিপূর্ণ’। ‘জ্ঞানী ভিক্ষুর খ্যাতি তাকে ক্লান্ত করে, তাই ‘কেউ না থাকলে খুব ভাল লাগে’।

পরিবারের প্রতি অনুভূতি: পারিবারিক সম্পর্ক কখনোই ভাল ছিল না। বাবা-মায়ের সাথে সম্পর্ক ছিল ‘ভালোবাসা-ঘৃণার’ এবং তিনি পরিবারের ‘অচেনা মানুষের মতো’ ছিলেন। বোনই ছিলেন একমাত্র ব্যক্তি যাকে তিনি ভালোবাসতেন।

"Solitude" (একাকীত্ব) অধ্যায়ে ব্যক্তিগত প্রতিফলন:
একাকীত্ব সম্পর্কে তিনি বলেন, “একাকীত্বের ফল হল প্রজ্ঞা”। তিনি গ্রাম্য সরল পরিবেশে থাকতে পছন্দ করেন, কারণ ‘বড় শহর ও বড় গুরুত্বপূর্ণ মানুষগুলো খুব বিরক্তিকর’।
·
নিজের অবস্থান সম্পর্কে তিনি লেখেন, “আমি পৃথিবী বা কাউকে বদলাতে পারি না, এমনকি নিজেকেও না, তবে আমি দেখতে পারি। পৃথিবীকে কাঁধে নিয়ে বেড়ানোর মতো কে আমি? ”।
·তার ইচ্ছা প্রকাশ করে বলেন, “মাঝে মাঝে ইচ্ছে করে এমন একজন বন্ধু থাকত যার সাথে আমি সত্যিই কথা বলতে পারি”, কারণ ‘তাঁর কাছে অনেক মানুষ এলে বিভ্রান্তি তৈরি হয়’।

ধর্মীয় আলোচনায় আত্ম-উপলব্ধি:
· “I make my mind my friend” (মনের সাথে বন্ধুত্ব) শীর্ষক আলোচনায় তিনি বলেন, নিজের জীবনকে একবার ‘অর্থহীন’ মনে হলেও এখন তিনি মনে করেন তার জীবন ‘একটি কবিতার মতো’, যেখানে সব অভিজ্ঞতা সার্থক।
“Be yourself, your own reliance” (নিজের উপর নির্ভরশীল হও) আলোচনায় তিনি বলেছেন, ‘নিজের উপর নির্ভর করাই প্রকৃত স্বাধীনতা’।
সাধু সাধু সাধু!
লিখেছেন: ধর্মাদীপো ভিক্ষু।
0 Comments