Hot Posts

6/recent/ticker-posts

Ad Code

বৌদ্ধ ভিক্ষুরা পরলোকগতদের উদ্দেশ্যে দান দিতে বলাটা কি ব‍্যবসা ?




বৌদ্ধ ধর্মে ভিক্ষুদের পরলোকগত বা মৃত ব্যক্তিদের উদ্দেশ্যে দান (উৎসর্গ) করতে বলাকে মূলত একটি আধ্যাত্মিক এবং মনস্তাত্ত্বিক অনুশীলন হিসেবে দেখা হয়, এটিকে ব্যবসা বলা চলে না। তবে বর্তমান যুগে কিছু ক্ষেত্রে এর প্রাতিষ্ঠানিক বা বাহ্যিক রূপ দেখে সাধারণ মানুষের মনে এমন প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক।

বিষয়টিকে বৌদ্ধ দর্শনের মূল ভিত্তি এবং সামাজিক প্রেক্ষাপট থেকে এভাবে বোঝা যেতে পারে:
১. ‘পরলোকগতদের উদ্দেশ্যে দান’ বা সংঘদানের মূল দর্শন
বৌদ্ধ শাস্ত্র (যেমন: তিরোকুড্ড সুত্ত) অনুযায়ী, মৃত আত্মীয়-স্বজনদের উদ্দেশ্যে যখন সংঘ বা ভিক্ষুদের অন্ন, বস্ত্র বা প্রয়োজনীয় জিনিস দান করা হয়, তখন সেই পুণ্যফল মৃত ব্যক্তিদের উদ্দেশ্যে উৎসর্গ (পত্তিদান) করা হয়।
পুণ্যের আদান-প্রদান: বৌদ্ধ বিশ্বাস মতে, পরলোকে থাকা প্রিয়জনেরা সরাসরি পার্থিব খাবার বা জিনিস গ্রহণ করতে পারেন না। কিন্তু জীবিতদের করা সৎকর্মের পুণ্য অনুমোদন করে তারা সুখী হতে পারেন।
শোক কাটানোর মাধ্যম: প্রিয়জনকে হারানোর পর মানুষের মন যে হাহাকার ও শূন্যতা তৈরি হয়, দানোৎসবের মাধ্যমে অন্যকে সাহায্য করে সেই শোককে ইতিবাচক পুণ্যকর্মে রূপান্তর করা হয়।
২. ভিক্ষু ও গৃহীদের পারস্পরিক সম্পর্ক
বৌদ্ধ ভিক্ষু সমাজ (সংঘ) সম্পূর্ণভাবে গৃহীদের দানের ওপর নির্ভরশীল। ভিক্ষুদের নিজস্ব কোনো উপার্জন বা ব্যবসা করার নিয়ম বিনয়ে (বৌদ্ধ ভিক্ষুদের নিয়মাবলী) কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।
নির্ভরশীলতার চক্র: গৃহীরা ভিক্ষুদের অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থান ও ওষুধ (চারি প্রত্যয়) দান করে তাদের বাঁচিয়ে রাখেন এবং সাধনার সুযোগ করে দেন। বিনিময়ে ভিক্ষুরা গৃহীদের ধর্মদেশনা দেন এবং আধ্যাত্মিক পথ দেখান।
পরলোকগতদের উদ্দেশ্যে দান করার আহ্বান মূলত গৃহীদের পুণ্য অর্জনের একটি সুযোগ করে দেওয়া, কোনো পণ্য বিক্রি করা নয়।
এটি কখন ‘ব্যবসা’ মনে হতে পারে? (বাস্তব প্রেক্ষাপট)
যেকোনো ধর্মীয় রীতিনীতিতেই মানুষের সরল বিশ্বাসকে পুঁজি করে কিছু বিকৃতি ঘটতে পারে। বৌদ্ধ সমাজেও কখনো কখনো এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়:
বাণিজ্যিক মনোভাব: যদি কোনো ভিক্ষু বা বিহার কর্তৃপক্ষ নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা বা দামি উপহারের জন্য জোর জবরদস্তি করেন, অথবা "বেশি টাকা দিলে বেশি পুণ্য হবে" এমন ধারণা প্রচার করেন, তবে তা বৌদ্ধ বিনয় বা দর্শনের পরিপন্থী।
সামাজিক প্রতিযোগিতা: অনেক সময় গৃহী সমাজ নিজেই মৃত ব্যক্তির শ্রাদ্ধ বা সংঘদানকে লোকদেখানো বা সামাজিক স্ট্যাটাস প্রমাণের প্রতিযোগিতায় রূপান্তর করে ফেলেন, যা আধ্যাত্মিক চেতনাকে ম্লান করে দেয়।
সংক্ষেপে:
বৌদ্ধ ধর্মের মূল শিক্ষা অনুযায়ী ভিক্ষুদের এই আহ্বান কোনো ব্যবসা নয়, বরং এটি জীবিত ও মৃত—উভয়ের মঙ্গলের জন্য পুণ্য সঞ্চয়ের একটি পথ। তবে দাতার মন যদি নিঃস্বার্থ না হয় এবং গ্রহীতার (ভিক্ষুর) মনে যদি লোভ থাকে, তবেই কেবল সেই পবিত্র অনুশীলনটি বাণিজ্যে রূপ নেওয়ার ঝুঁকি থাকে। বৌদ্ধ দর্শনে দানের ক্ষেত্রে মূল গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে 'চেতনা' বা নিয়তের ওপর, কোনো আনুষ্ঠানিকতার ওপর নয়।

Post a Comment

0 Comments

Ad Code

Responsive Advertisement