১৯৫৬ সালে বৌদ্ধ ধম্মের আড়াই হাজার বছর অতিক্রম হয়েছে। সে বছর ভারতবর্ষ সহ বিশ্বব্যাপী আড়াই হাজার তম বুদ্ধ জয়ন্তী উৎসব সগৌরবে পালন করা হয়েছে। ইহাকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য মায়ানমারে (বার্মা) ১৯৫৪-১৯৫৬ পর্যন্ত ষষ্ট বৌদ্ধ মহাসঙ্গীতির আয়োজন করা হয়েছিল।
বার্মাতে একটি কথা প্রচলিত আছে যে, আড়াই হাজার বছর পরে বৌদ্ধ ধম্মের বিকাশ যেমন হবে, তেমনি সঙ্ঘ ও অনুসারীদের মধ্যে দুঃশীলতার প্রকোপও বৃদ্ধি পাবে। উপরে যদিও তাঁরা সুশীলতা, ধম্মজ্ঞ এবং নীতি-নৈতিকতার দোহাই দেখাতে থাকবেন, কিন্তু ভিতরে সেগুলির লেশ মাত্রও দেখা যাবেনা। বাহিরের রূপ এবং ভিতরের রূপের মধ্যে কোনো সাদৃশ্যতা থাকবেনা।
পালি সাহিত্য ত্রিপিটকের সুত্র পিটকান্তর্গত খুদ্দক নিকায়ের জাতক গ্রন্থের ৭৭ নাম্বার মহাসুপিন জাতকে বর্ণিত হয়েছে যে, একবার মহাপ্রতাপী কোশল রাজ প্রসেনজিৎ রাত্রে ১৬টি অদ্ভুত স্বপ্ন দর্শন করে সারা রাত্রি ভয়, আতঙ্ক ও অমঙ্গল আশঙ্কায় সুখে ঘুমাতে পারেননি। পরে ব্রাহ্মণদের কাছে এরূপ অকল্পনীয় স্বপ্ন দর্শনের তাৎপর্য জানতে চাইলে তাঁরা মহারাজের মনে আরও ভয় ডুকিয়ে দিয়েছিলেন। তাঁরা মহারাজাকে অন্তরায় ও বিপদমুক্ত হতে অনেক পশু হত্যা করে যজ্ঞ করার বিধান দিয়েছিলেন।
কিন্তু আতঙ্কিত কোশল নরেশ স্বপ্ন বিষয়ে জানার জন্য সর্বদর্শী ও ত্রিকালজ্ঞ ভগবান সম্যক সম্বুদ্ধের কাছেও গিয়ে স্বপ্নের বিবরণ জানিছিলেন। সর্বজ্ঞ বুদ্ধ রাজাকে অভয় প্রদান করেছিলেন এবং জানিয়েছিলেন যে- ‘মহারাজ! এতে ভয়ের কোনো কারণ নেই। আমার কিংবা আপনার জীবদ্দশায় স্বপ্নের প্রতিফলন আমরা দেখবোনা। দূর ভবিষ্যতে যেগুলি ঘটবে, তার পূর্বাভাস স্বরূপ আপনি এরূপ বিকট স্বপ্ন সমূহ দেখেছেন।’
ষোলটি স্বপ্নের ষষ্ট স্বপ্ন ছিল-‘লোকদের উৎসাহে শৃগাল স্বর্ণের পাত্রে প্রস্রাব করছে।’
এর তাৎপর্য হল অদূর ভবিষ্যতে সত্যিকার শীলবান, পণ্ডিত, গুণীজনেরা সম্মান শ্রদ্ধা ও প্রশংসার পাত্র হবেননা। তাঁদের সুনাম সুখ্যাতিও প্রসারিত হবেনা। তাঁরা অবহেলিত থাকবেন। অপরদিকে ছদ্মবেশী ও লোক দেখানো ধাম্মিকেরাই অধিকতর শ্রদ্ধা, সম্মানের আসনে অধিষ্ঠিত থাকবেন। ছদ্মবেশীরা সুন্দর সুন্দর ধম্মের বাণী বলে থাকলেও বক্তা এবং শ্রোতা কেহই সেগুলি অনুশীলনে যত্নবান হবেননা। লোকেরাও কৃত্রিমতার দিকেই অধিক ঝুঁকে পড়বেন। ইহাই হল লোকের উৎসাহে শৃগাল স্বর্ণপাত্রে প্রস্রাব করার তাৎপর্য। অর্থাৎ অসৎ ও অধম্মবাদীদের দ্বারা অমূল্য ও দুর্লভ সদ্ধম্ম অনাদর-অবহেলার পাত্র হবে।
বার্মিজদের মতানুসারে, ২৫০০ বছর অর্থাৎ ১৯৫৬ সালের পর হল কোশলরাজ প্রসেনজিতের স্বপ্ন প্রতিফলনের সময়, যা ভগবান বুদ্ধ তখন ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন।
আমাদের সমাজে চতুর্দিকে বর্তমানে গুরুবাদের প্রাবল্যতা এতই বৃদ্ধি পেয়েছে যে, অনুসারীরা তাঁদের গুরু কিংবা গুরুর শিষ্যদের প্রতি ঘোরতর অন্ধ। তাঁরা যা কিছু করেন, সবকিছুকেই তাঁরা শুদ্ধ বলে মনে করেন। বাকীরা অশুদ্ধ। অনেকে অরণ্য, শ্মশান ইত্যাদি দখল করে বসে রয়েছেন এবং সে সমস্ত স্থানে গড়ে তুলতে ব্যস্ত অট্টালিকা এবং গাড়ি-প্রাসাদ, ইন্টারনেট প্রভৃতি আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত বিলাসবহুল জীবন-যাপনের নানা পদ্ধতি। এসমস্ত করলেও তাঁরা নিজেদেরকে ধূতাঙ্গ, অরহত, আর্যপুরুষ ইত্যাদির লেবেল লাগিয়ে চলছে। লোকেরাও পঙ্গপালের মতো ছুটে চলেছেন তাঁদের পেছনে অন্ধের মতো।
এখন কিছু ভিক্ষুদের মধ্যে প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে, বর্ষাবাস যাপন না করার। তাঁরা বর্ষাবাসের সময় দেশ-বিদেশে ভ্রমণরত থেকে তাঁদের শ্রেণীরই লোকদের কাছ থেকে খেতাব ও অভিনন্দন নিচ্ছেন আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন, মানবতাবাদী, উদারপন্থী বলে। বুদ্ধ প্রজ্ঞাপ্ত বর্ষাবাস তাঁদের কাছে গুরুত্বহীন হতে যাচ্ছে। তাঁরা আবার বর্ষাবাস যাপনকারী ভিক্ষুদেরকে অলস, অকর্মণ্য, সেকেলে বলে ব্যঙ্গ করছেন। দুঃশীলদের উৎপাতে প্রিয়শীলীগণ এখন অনেকটা কোণঠাসা, যেমনটা হয়েছিল সম্রাট প্রিয়দর্শী অসোকের সময়ে।
আবার অনেক দায়ক-দায়িকা রাষ্ট্রীয় আইন ও করকে ফাঁকি দিয়ে অবৈধভাবে রাষ্টীয় সীমা অতিক্রম করিয়ে গুরুবাদ প্রতিষ্ঠার কাজে রত থাকা ভিক্ষুদেরকে বিদেশে নিয়ে আসার সহযোগিতায় লিপ্ত রয়েছেন। ইহা ধম্ম-বিনয় এবং নৈতিক অবক্ষয়ের একটি গুরুতর সূচনা। রাষ্ট্রীয় আইন ফাঁকি দিয়ে বর্ডার অতিক্রম করলে ভিক্ষুত্বের কি পরিহানি হয়, তা চিন্তাশীল অনেক ধম্মপ্রেমীই আজ জানতে চাচ্ছেন। আমরা বর্তমানে কাদেরকে মহাস্থবির বা মহাথের অভিধায় বিভূষিত করছি এবং এগুলির পেছনে লোকদের কষ্টার্জিত ও ঘাম ঝড়ানো লক্ষ লক্ষ টাকা ব্যয় করছি, তা ভাববার সময় এসেছে। এগুলি তো বুদ্ধ কর্তৃক সংজ্ঞায়িত ‘থের’, ‘মহাথের’ অভিধাকেই হাঁস্যকর করে তোলা। এ অভিধা সমূহ বুদ্ধ কাদের জন্য ব্যবহার করেছেন ভাবছেন কি? বাহ্যিক আবরণ এবং মুখের বুলির সাথে আচরণ ও চিন্তা-চেতনার অসদৃশ্যতা তথা অসামঞ্জস্যতা কি শৃগালের সুবর্ণ পাত্রে প্রস্রাব করার মতো নয়?
0 Comments