.jfif)
দীর্ঘদিন ধরে বাপ-দাদাদের নিয়ম নীতি পালন করে আসা অনেকেই মনে করে গরুর মাংস খাওয়া বৌদ্ধধর্মে নিষেধ। আর দীর্ঘদিন চলে আসা এ রীতিকে ভিত্তি করে অনেকেই মুখরোচক গল্প সমাজে প্রচার করে। যেমনঃ- কেউ কেউ বলে গোখাদককে সম্যক দেবতাগণ অপছন্দ করেন এবং অপদেবতারা ক্ষতি করে| কেউ বলে গরু হচ্ছে মায়ের মত তাই মায়ের মাংস কি কখনো খাওয়া যায়? ……ইত্যাদি, ইত্যাদি। কেউ গরুর মাংস খাবে কি খাবে না তা নিতান্তই ব্যক্তিগত ব্যাপার। আর যেহেতু হিন্দুদের সংস্পর্শে থাকতে থাকতে বৌদ্ধরাও গরুর মাংস খাওয়াকে অপছন্দ করে তাই গরুর মাংস খেতে কাউকে আমি উদ্বুদ্ধও করবনা। কিন্তু যখন ধর্মের দোহাই দিয়ে এটাকে কেউ কেউ বন্ধ করতে চান, দেবতার নাম দিয়ে যখন অপ-প্রচার চালায় তখন কিছু বলতে বাধ্য হই। যাই হোক এবার আসল কথায় আসি। তথাগত বুদ্ধ ভিক্ষুসংঘদের সুশৃঙ্খলভাবে চলার পথনির্দেশক হিসেবে বিনয়ের প্রবর্তন করেছেন। পক্ষান্তরে গৃহীদের চলার জন্য সরাসরি কোন গৃহী বিনয় প্রবর্তন করেননি, শুধুমাত্র পঞ্চশীল প্রতিপালনের কথাই বলেছেন। তবে সুত্ত পিটকে গৃহীদের নিয়ে বেশ কিছু আলোচনা পাওয়া যায় যেখানে গৃহীদের জন্য কোনটি মঙ্গল কোনটি অমঙ্গল, কোনটি করা উচিত কোনটি করা অনুচিত এসবের বর্ণনা রয়েছে। আর এ বিষয়গুলোকেই আমরা গৃহী বিনয় হিসেবে ধরে নেই। উদাহরণস্বরুপ বলা যায়- মঙ্গল সূত্রে বুদ্ধ বলেছেন মাতাপিতার সেবা করা উত্তম মঙ্গল। অর্থ্যাৎ মাতাপিতাকে সেবা করার উপদেশ-ই এখানে দেওয়া হয়েছে। আবার পরাভব সূত্রে দেখা যায় রাগী ব্যক্তির পরাজয় ঘটে এক কথায় রাগকে বর্জন করতেই এখানে উপদেশ দেওয়া হয়েছে। এভাবেই গৃহী বিনয়গুলো আমরা ধারণ করার চেষ্টা করি।
এবার আসি মাংসের বিষয়ে। বিনয়ের অন্তর্গত মহাবর্গে ১০ প্রকার মাংস খাওয়াকে বুদ্ধ ভিক্ষুদের জন্য নিষেধ বলে প্রজ্ঞাপ্ত করেছেন। যেমন: সিংহ, বাঘ, চিতাবাঘ, ভালুক, নেকড়ে বাঘ ইত্যাদি। নিষিদ্ধ ঘোষিত দশ প্রকার মাংসের মধ্যে গরুর মাংস নেই। এখানে বলে রাখা প্রয়োজন বুদ্ধ প্রাণীহত্যা থেকেই বিরত থাকার জন্য বারবার বলেছেন তবে মাংসের বিরুদ্ধে তেমন কোন নিষেধাজ্ঞা নেই আবার অবাধে খাবার বিধানও বলা নেই। এমনকি দেবদত্ত এক সময় বুদ্ধের কাছে প্রার্থনাও করেছিলেন বুদ্ধের শিষ্যরা যেন নিরামিষভোজী হয়। বুদ্ধ উপমা দিয়ে তাকে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন যে মাংসের সাথে তার কোন বিরোধ নেই, বিরোধ মূলত হত্যার বিরুদ্ধেই। তবে এই দশ প্রকার মাংস নিষিদ্ধ করার একটা কারণ ছিল আর তা হচ্ছে এই দশ প্রকার মাংস যারা খায় তাদের শরীর দিয়ে ঐ প্রাণীর গন্ধ যায়। যেহেতু তৎকালীন সময়ে বেশ কিছু ভিক্ষু অরণ্যে অবস্থান করতেন তাই তারা এই মাংসগুলো খেলে এবং শরীর থেকে গন্ধ বের হলে অরণ্যের সেই সব জীবিত প্রাণী দ্বারা আক্রান্ত হতে পারে এই কারণেই কেবলমাত্র ঐ দশপ্রকার মাংসকেই নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছেন। এছাড়া মাংস খাওয়ার আগে বুদ্ধ ত্রিকুটী পরিশুদ্ধের কথা বলেছেন। সেগুলি হচ্ছে কোন ভিক্ষু যদি দেখেন, শুনেন কিংবা তাঁর মনে সন্দেহ উৎপন্ন হয় যে তাকে দান দেওয়ার উদ্দেশ্যেই প্রাণী হত্যা করা হয়েছে তবে সেই মাংস খেতে নিষেধ করেছেন। যাই হোক এখান থেকে এটা স্পষ্ট যে, ত্রিকুটী পরিশুদ্ধ থাকলে ভিক্ষুসংঘের গরুর মাংস খেতে কোন বাধা নিষেধ নেই।
কেউ যদি বলে স্বয়ং বুদ্ধ গরুর মাংস খেয়েছিলেন তবে সেটাকেও কিন্তু পুরোপুরি মিথ্যা বলা যাবে না। বিনয় পিটকের পারাজিকাতে পাওয়া যায়, বুদ্ধের ভিক্ষুণীদের মধ্যে ঋদ্ধিশ্রেষ্ঠ অর্হৎ উৎপলবর্ণা বুদ্ধকে তার তৎকালীন সেবক উদায়ীর মাধ্যমে একটি গাভীর মাংস দান করেছিলেন। কলেবর বৃদ্ধির ভয়ে সংক্ষেপে বলছি কাহিনীটি- উৎপলবর্ণা একসময় এক অন্ধবনে ধ্যান করছিলেন। এক চোর একটি গাভীকে হত্যা করে তার মাংস নিয়ে ঐ অন্ধবনে প্রবেশ করেন এবং সেখানে উৎপলবর্ণাকে দেখতে পেয়ে ভাবলেন এই সন্ন্যাসিনী যদি আমার চুরির বিষয়টি গ্রামে বলে দেন তবে আমার মহাক্ষতি হবে এই ভেবে কিছু উৎকৃষ্ট মাংস সেখানে রেখে যান। এবং বড় করে বলে যান যে- কোন সন্ন্যাসী/সন্ন্যাসীনী চাইলে এই মাংস নিতে পারে। উৎপলবর্ণা সেই চোরের ফেলে যাওয়া মাংসগুলোকে খাওয়ার উপযোগী করে বুদ্ধকে দান দেওয়ার উদ্দেশ্যে আকাশপথে বেনুবনে যান। সেসময় বুদ্ধ পিন্ডাচরনে বের হয়ে যাওয়ায় উদায়ীকেই বুদ্ধের উদ্দেশ্যে গরুর মাংস দিয়ে আসেন।বুদ্ধ খেয়েছেন কিনা এটা স্পষ্ট উল্লেখ না থাকলেও যেহেতু উৎপলবর্ণা ঋদ্ধিশ্রেষ্ঠ অর্হৎ ছিলেন তাই ধরে নেওয়া যায় বুদ্ধের অভোগ্য কিছু তিনি বুদ্ধের জন্য দান দিতে নিয়ে যাননি । আর এই যুক্তিতে বুদ্ধ গরুর মাংস খেয়েছেন বললেও মিথ্যা ভাষণ হয়না তবে কোথাও পরিস্কার করে কিছুই উল্লেখ নেই ।এখানে উল্লেখ করতে হয় উৎপলবর্ণার মাংস দান দেওয়ার সময় উদায়ী তাকে চীবর দানে বাধ্য করেন এই বিষয়ে উদায়ীকে নিন্দা করে বুদ্ধ বিনয় প্রজ্ঞাপ্ত করেন। কিন্তু গরুর মাংস না খাওয়ার জন্য কোন বিনয় প্রজ্ঞাপ্ত করেননি।
এবার সুত্তনিপাত এর ব্রাহ্মণধম্মিক সুত্রের কথা আলোচনা করা যাক, এখানে জনৈক ব্রাহ্মণের অনুরোধে পুর্বেকার ব্রাহ্মণেরা কি কি করতেন না তা বুদ্ধ বর্ণনা করেছেন- পূর্বেকার ব্রাহ্মণেরা প্রাণীবধ করিতেন না (শুধু গরু নয় কোন প্রাণীই না), ভা্র্যা ক্রয় করিতেন না, তাদের মধ্যে যিনি শ্রেষ্ঠ তিনি কোন অবস্থাতেই মৈথুন সেবন করিতেন না ….ইত্যাদি। গরুকে আমাদের মাতা, পিতা, ভাই বা অন্যান্য আত্মীয়ের ন্যায় মনে করিয়া যজ্ঞে গো হত্যা করিতেন না। কিন্তু বর্তমান ব্রাহ্মণেরা(বুদ্ধের সময়কালীন)যখন গো হত্যা করেন তখন দেবতারা অসন্তুষ্ট হয়ে যান।এখন এ বিষয়ে বলতে হয় শুধু গরু নয় যেকোন প্রাণী হত্যা করলেই দেবতারা অসন্তুষ্ট হন। এজন্যই প্রাণীহত্যা থেকে বিরত থাকার কথা প্রথম শীলে রয়েছে। ফেসবুকে অনেকে যুক্তি উপস্থাপন করেছেন যেহেতু গরুকে মাতা পিতার সাথে তুলনা করা হয়েছে সেহেতু গরুর মাংস খাওয়া কি উচিত? তাদের বলতে হয় গরুর সাথে মাতা পিতার তুলনা হয়েছে এটা যদি বলেন তবে বলতে হয় এই একই সুত্রে গরুকে ছাগলের ন্যায় বলা হয়েছে। সেক্ষেত্রে ছাগলকেও মাতা পিতার সাথে তুলনা করতে হবে। আবার করণীয় সুত্রে বলা হচ্ছে মাতা যেমন একমাত্র পুত্রকে ভালবাসেন সেভাবে অন্যান্য প্রাণীর কথা ভাবতে বলা হয়েছে। তাহলে প্রত্যেক প্রাণীই তো আপনার পুত্রসম হয়ে যায় সেক্ষেত্রে তাদের যুক্তি অনুসারে নিজের সন্তানের মাংস তো কেউ খেতে পারে না। এসব আসলে যুক্তির জন্য যুক্তি দেওয়া। বুদ্ধ যদি আসলেই গরুকে মা বাবা মনে করতেন তবে গরু শুধু
গৃহীদের মা বাবা নয় ভিক্ষুদেরও তো মা বাবা হয়। সেক্ষেত্রে ভিক্ষুসংঘরা কিভাবে মা-বাবার মাংস খাবেন?কারণ তাদের তো গরু মাংস খেতে বারণ করেননি। আসলে যুক্তি আর বাস্তবতা সব সময় এক হয়না। আসল কথা হচ্ছে বুদ্ধ সবসময় সর্বজীবের প্রতি মৈত্রী পোষণ করেছেন। তাই শুধু গরু নয় কোন প্রাণীকেই হত্যার ব্যাপারে তিনি উৎসাহিত করেননি। এখানে হত্যা আর মাংস কে এক করে ফেলতেছি তাই সমস্যাটা হচ্ছে। আবার অনেকে নিজের মতকে শ্রেষ্ঠ প্রমাণ করতে গিয়ে নানা যু্ক্তি দিয়ে বেরায়। কিন্তু উপরোল্লিখিত আলোচনা থেকে এটা স্পষ্ট যে, বৌদ্ধদের জন্য গরুর মাংস খাওয়াতে কোন বাধা নিষেধ নাই। বাধা নিষেধ হচ্ছে গরু/প্রাণী হত্যায়।
পরিশেষে, এটাই বলতে চাই, যে সমাজে যে বিষয়টা বেশীরভাগ মানুষ পছন্দ করেন না সেটা না করাই ভাল। আপনার সমাজ যদি গরুর মাংস খাওয়াটাকে অপছন্দ করে, সহজভাবে না নেয় তবে সামাজিক জীব হিসেবে সেটা এড়িয়ে যাওয়াই ভালো। কিন্তু ধর্মের দোহাই দিয়ে কোন কিছু বারন করা মানতে পারিনা বলেই উপরোল্লিখিত আলোচনা। আমার কোন ত্রুটি পরিলক্ষিত হলে গঠনমূলক সমালোচনাই করবেন এই আশাবাদ ব্যক্ত করে শেষ করছি।
0 Comments