বুদ্ধের দন্ত ধাতু প্রথমে কলিঙ্গের (উড়িষ্যা) পুরী জগন্নাথ মন্দিরে ছিল এবং সেখান হতে শ্রীলঙ্কা নেওয়া হয়েছিল। প্রাচীন উৎস দন্ত-ধাতুকে কলিঙ্গের দন্তপুরে (Dantapura) ছিল বলে উল্লিখিত হয়েছে। দন্তপুরের পরিচয় হল আধুনিক পুরী। দন্ত যখন শ্রীলঙ্কায় নিয়ে গিয়েছিল, তখন দন্ত বাদ দিয়ে কেবল পুরী শব্দই অবশিষ্ট থেকেছে।
বুদ্ধের দন্তধাতু : কলিঙ্গ হতে শ্রীলঙ্কা যাত্রা
————————————
১) কুশীনগরে বুদ্ধের মহাপরিনির্বাণ:
—————————-
বৌদ্ধ পরম্পরা অনুসারে বুদ্ধের মহাপরিনির্বাণের পরে তাঁর শরীরের অন্তিম সংস্কার সম্পন্ন হয়েছিল কুশীনগরে। পরম্পরায় বলা হয়েছে যে, বুদ্ধের দাঁত ছিল চল্লিশটি। তন্মধ্যে দাহ সংস্কারের পর চারটি দন্ত অবশিষ্ট ছিল। সেগুলির মধ্যে হল বাম দিকের দন্তধাতু, (Left canine Tooth Relic) যা এখনও শ্রীলঙ্কায় সুরক্ষিতভাবে রাখা হয়েছে।
২) দন্ত ধাতুর কলিঙ্গ গমণ
———————————-
পালি সাহিত্যের প্রসিদ্ধ ‘দাঠাবংস’ (Dathavamsa) গ্রন্থের পরম্পরা অনুসারে ভিক্ষু ক্ষেম (Kema Thero) কর্তৃক দন্ত ধাতু লাভ করা হয়েছিল, যা তিনি কলিঙ্গরাজ ব্রহ্মদত্তকে প্রদান করেছিলেন। রাজা ইহাকে স্বীয় রাজধানী দন্তপুরের চৈত্যে স্থাপিত করে পূজা করেছিলেন। পরে তাঁর উত্তরাধিকারীগণও ইহার পূজা জারী রেখেছিলেন।
দন্তপুরের অর্থই প্রায় ‘দন্তের নগর’ বলে জানা যায়। কিন্তু দন্তপুর বাস্তবে কোথায় ছিল, এর উপর বিদ্বানদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। তবে অধিকাংশ বিদ্বানেরা মনে করেন যে, বর্তমান পুরীই হল প্রাচীন দন্তপুর।
৩) দন্ত ধাতু কি পুরীর জগন্নাথ মন্দিরে ছিল?
—————————————-
এখানেই সবচেয়ে অধিক সাবধানতার প্রয়োজন রয়েছে। কিছু পুরাতন বিদ্বান এরূপ সম্ভাবনা ব্যক্ত করেছেন যে, আজকের পুরী জগন্নাথ মন্দিরের স্থান উক্ত প্রাচীন স্থলের সাথে সম্বন্ধিত হতে পারে, যেখানে বুদ্ধের দন্ত ধাতুর পূজা হতো। স্কটিশ ইতিহাসবিদ James Fergusson (১৮০৮-১৮৮৬) নিজেও এরূপ সম্ভাবনার কথা লিখেছেন।
কিন্তু আধুনিক ঐতিহাসিক অধ্যয়নে এ বিষয়টি নির্ণায়করূপে সিদ্ধ হয়না। ২০২৩ সালের (Utkal Historical Research Journal) উৎকল ইতিহাস গবেষণা জার্নালেও এ মতের উল্লেখ করা হয়েছে যে, দন্ত ধাতুর কথাকে জগন্নাথের কথার সাথে সরাসরি যুক্ত করায় সমস্যাগ্রস্ত হতে হয়।
এজন্য সঠিক বাক্য হবে-‘বুদ্ধের দন্ত-ধাতু কলিঙ্গের দন্তপুরে সুরক্ষিত ছিল। দন্তপুরের পুরীর সাথে সম্পৃক্ত করা হল এক ঐতিহাসিক পরিকল্পনা। এতে সর্ব সম্মত তথ্য নাই।
৪) রাজা গুহসীবের সময় সঙ্কট
———————————-
অনেক প্রজন্ম পরে রাজা গুহসীবের (Guhasiva) নিকট রক্ষিত ছিল এ দন্তধাতু। দাঠাবংসের বর্ণনা অনুসারে ধাতুকে নিয়ে রাজনৈতিক সংঘর্ষ উৎপন্ন হয়েছিল। বিরোধী শক্তি সমূহ ইহাকে নিজেদের অধিকারে নিতে চাইতেন। গুহসীবের ভয় হয়েছিল যে, যুদ্ধে দন্ত-ধাতু নষ্ট বা অপমানিত হতে পারে।
৫) হেমমালা এবং দন্ত কুমারকে দায়িত্ব প্রদান
———————————
গুহসীব স্বীয় কন্যা রাজকুমারী হেমমালা (Hemamala) এবং তাঁর পতি দন্তকুমারকে (Danta Kumara) ধাতু সুরক্ষিত স্থানে রাখার জন্য শ্রীলঙ্কা নিয়ে যেতে নির্দেশ দিয়েছিলেন।
বৌদ্ধ পরম্পরা অনুসারে হেমমালা পবিত্র দন্ত ধাতুকে স্বীয় চুলের মধ্যে লুকিয়ে যাত্রা করেছিলেন, যাতে শত্রুরা কেহ খুঁজে না পায়।
৬) সমুদ্র পার করে শ্রীলঙ্কা অবতরণ
————————————
পুস্তক পরম্পরায় তাঁরা ভারত হতে সমুদ্র পার করে শ্রীলঙ্কা পৌঁছেছিলেন এরূপ বলা হয়েছে। কিছু ঐতিহাসিক বিবরণ যাত্রাকে তাম্রলিপ্তির (Tamralipta) বন্দরের সাথে যুক্ত করে থাকেন, কিন্তু এরূপ যাত্রার প্রত্যেক স্তরকে স্বতন্ত্র পুরাতাত্বিক প্রমাণের সাথে সিদ্ধ করা একটি কঠিন কাজ।
৭) শ্রীলঙ্কায় রাজা কিথসিরী মেঘবর্ণ কর্তৃক ধাতু গ্রহণ
—————————————
প্রায় চতুর্থ শতাব্দী, রাজা কিথসিরি মেঘবর্ণের (Kithsiri Meghavanna/ Sirimeghavanna) (301-328) শাসনকালে দন্ত ধাতু শ্রীলঙ্কা পৌঁছেছিল বলে মান্য করা হয়। শ্রীলঙ্কার সরকারী পর্যটন এবং পুরাতত্ব সম্বন্ধিত সামগ্রীও পরম্পরাকে মান্যতা প্রদান করে থাকে।
শুরুতে ইহাকে অনুরাধাপুরের মেঘগিরি বিহারে (যা বর্তমানে ইসুরুমুনিয়া ক্ষেত্র) রাখা হয়েছে বলে জানা যায়।
৮) এরপর দন্তধাতু কেবল ধাম্মিক অবশেষ রূপে থাকেনি, তা শ্রীলঙ্কার রাজ ক্ষমতার বৈধতার প্রমুখ প্রতীক রূপে স্থাপিত হয়েছিল। যে রাজার সংরক্ষণে দন্ত-ধাতু থাকতো, তাঁর শাসনকে ধাম্মিক বৈধতার সাথে সম্পৃক্ত করা হতো। এ কারণে শ্রীলঙ্কার রাজধানী সমূহ পরিবর্তন হলে ধাতুও নতুন রাজধানীতে নিয়ে যাওয়ার পরম্পরা চালু ছিল।
৯) অনুরাধাপুর> পোলোন্নারূওয়া>দম্বদেনিয়া> যাপহুওয়া প্রভৃতি
————————————-
শতাব্দীর পর শতাব্দীতে ধাতুকে রাজনীতি এবং সৈন্য পরিস্থিতি সমূহের কারণে বিভিন্ন রাজধানীতে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। উদাহরণের জন্য দম্বদেনিয়ায় এর জন্য বিশেষ মন্দির ছিল এবং পরে য়াপহুওয়াতেও ইহার গুরুত্বপূর্ণ সংরক্ষণ স্থল তৈরী হয়েছিল।
১০) অবশেষে কেণ্ডি
—————————-
ষোড়শ শতাব্দীর অন্তে দন্ত-ধাতু কেণ্ডী পৌঁছেছিল। বর্তমানের শ্রী দলদা মালিগাওয়া (Temple of the Holy tooth Relic) হল এ পরম্পরার সবচেয়ে প্রসিদ্ধ কেন্দ্র। শ্রীলঙ্কার Central Cultural Fund -এর অনুসারে বর্তমান মন্দির পরিসর মুখ্যত: কেণ্ডিয়ান কালে বিকশিত হয়েছে এবং আজ সেখানে ধাতু সাত স্বর্ণ-মণ্ডিত সিন্দুকের ভিতর সুরক্ষিত রাখা হয়েছে।
0 Comments