Hot Posts

6/recent/ticker-posts

বৌদ্ধরা কেন তাঁর পূজা করে না, আর কেনই বা বৌদ্ধ বিহারের মূল বেদীতে ব্রহ্মার মূর্তি থাকে না?"


 চলুন, আজ থেকে আড়াই হাজার বছর আগে সুদূর অতীতের এক অলৌকিক মহাজাগতিক ঘটনায় ফিরে যাই, যা ত্রিপিটকের মজ্ঝিম নিকায়ের 'ব্রহ্ম-নিমন্তনিক সূত্রে' অবিকল লিপিবদ্ধ আছে।

একদা রূপ-ব্রহ্মলোকের অধিপতি 'বকা ব্রহ্মা' নামক এক অত্যন্ত শক্তিশালী সত্তার মনে এক বিশাল অহংকার জন্ম নিল। তিনি কোটি কোটি বছর ধরে পরম শান্তিতে সেই আলোকময় লোকে বাস করছিলেন। দীর্ঘ আয়ু আর অলৌকিক ক্ষমতার কারণে তিনি এক মহা ভ্রমে পতিত হলেন। তিনি ভাবতে লাগলেন:
"এই ব্রহ্মলোকই চিরস্থায়ী, এটাই স্থায়ী, এটাই ধ্রুব। এর ওপরে আর কোনো সত্য বা উচ্চতর স্থান নেই। আমিই আদি, আমিই অন্ত, আমিই অবিনশ্বর!"
ভগবান বুদ্ধ পৃথিবীতে বসে তাঁর দিব্যজ্ঞানে বকা ব্রহ্মার এই অহংকার ও অজ্ঞতার কথা জানতে পারলেন। বুদ্ধ বুঝলেন, ব্রহ্মার এই ভুল ধারণা জগতের অন্যান্য জীবদেরও ভ্রান্ত পথে পরিচালিত করবে।
মুহূর্তের মধ্যে বুদ্ধ তাঁর অসীম ঋদ্ধিবল (Psychic Power) প্রয়োগ করলেন এবং চোখের পলকে পৃথিবী থেকে সোজা ব্রহ্মলোকে গিয়ে হাজির হলেন। বুদ্ধকে দেখে বকা ব্রহ্মা সগর্বে বললেন, "আসুন মহামতি গৌতম, আমার এই নিত্য ও অবিনশ্বর লোকে আপনাকে স্বাগত!"
বুদ্ধ শান্ত স্বরে বললেন, "হে ব্রহ্মা! আপনি চরম অজ্ঞতার মধ্যে ডুবে আছেন। আপনি যা কিছুকে স্থায়ী এবং নিত্য ভাবছেন, তা আসলে অনিত্য এবং ক্ষণস্থায়ী।"
ব্রহ্মা তখন বুদ্ধকে নিজের ক্ষমতা দেখানোর জন্য অলৌকিকভাবে অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলেন। কিন্তু বুদ্ধের প্রজ্ঞার আলোর সামনে ব্রহ্মার সমস্ত ঋদ্ধি স্তব্ধ হয়ে গেল; ব্রহ্মা শত চেষ্টা করেও বুদ্ধের দৃষ্টি থেকে অদৃশ্য হতে পারলেন না। এবার বুদ্ধ বললেন, "হে ব্রহ্মা, এবার দেখুন তথাগতের ক্ষমতা!"
বুদ্ধ ধ্যানে মগ্ন হলেন এবং মুহূর্তের মধ্যে এক পরম জ্যোতিতে পরিণত হয়ে ব্রহ্মার দৃষ্টি থেকে সম্পূর্ণ অদৃশ্য হয়ে গেলেন। কিন্তু অদৃশ্য অবস্থা থেকেই বুদ্ধের গম্ভীর ও মধুর কণ্ঠস্বর সমগ্র ব্রহ্মলোকে প্রতিধ্বনিত হতে লাগল।
বুদ্ধ ব্রহ্মাকে তাঁর পূর্বজন্মের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বললেন, "হে ব্রহ্মা, আপনি আপনার অতীত কর্মের কথা ভুলে গেছেন। পূর্বজন্মে তীব্র ধ্যানের পুণ্যফলে আপনি আজ এই ব্রহ্মলোকে জন্ম নিয়েছেন।
আপনার এই আয়ু অত্যন্ত দীর্ঘ হলেও তা অনন্ত নয়। পুণ্য শেষ হলে আপনাকেও একদিন এই লোক থেকে চ্যুত হয়ে (মারা গিয়ে) নিজের কর্ম অনুযায়ী আবার নিচে পুনর্জন্ম নিতে হবে।"
বুদ্ধের এই অসীম জ্ঞান ও ক্ষমতার সামনে বকা ব্রহ্মার অহংকার ধূলিসাৎ হয়ে গেল। তিনি করজোড়ে বুদ্ধের শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকার করলেন এবং বুঝলেন যে ব্রহ্মলোকের চেয়েও উচ্চতর এবং একমাত্র পরম সত্য অবস্থা হলো—'নির্বাণ'।
🔎 ব্রহ্মা কি বুদ্ধের চেয়ে বড়...?
না, ব্রহ্মা কোনোভাবেই বুদ্ধের চেয়ে বড় নন; বরং বুদ্ধ হলেন ব্রহ্মারও শিক্ষক।
বৌদ্ধ বন্দনায় আমরা প্রতিদিন একটি গাথা পাঠ করি—"সত্থা দেবমনুস্সানং" । এর অর্থ হলো,তথাগত বুদ্ধ হলেন কেবল মানুষের নন, বরং সমস্ত দেবতা এবং ব্রহ্মাদেরও পরম শিক্ষক বা জগৎগুরু।
বৌদ্ধ বিশ্বতত্ত্বের (Cosmology) ৩১টি স্তরের মধ্যে ব্রহ্মার অবস্থান ২০টি ব্রহ্মলোকে (১৬টি রূপ ও ৪টি অরূপ লোক)। এই স্তরগুলো জাগতিক দিক থেকে অনেক উঁচুতে হলেও এগুলো সবই 'সংসার চক্র' বা জন্ম-মৃত্যুর অধীন।
ব্রহ্মা হলেন একজন অত্যন্ত পুণ্যবান 'জীব', যিনি তাঁর পূর্বের ভালো কর্মের (Kamma) ফলে সেখানে দেবতা হিসেবে জন্মেছেন। কিন্তু তিনি বুদ্ধের মতো 'লোকোত্তর' (Transcendent) বা সম্পূর্ণ মুক্ত নন। বুদ্ধ সংসারের সমস্ত বন্ধন ছিন্ন করে পরম 'নির্বাণ' লাভ করেছেন, যা ৩১টি স্তরেরও ঊর্ধ্বে। তাই আধ্যাত্মিক প্রজ্ঞার দিক থেকে বুদ্ধের স্থান ব্রহ্মার অনেক ওপরে।
❌ কেন বৌদ্ধরা ব্রহ্মার পূজা করে না এবং বিহারে তাঁর মূর্তি থাকে না...?
১. ব্রহ্মা মুক্তিদাতা নন :
বৌদ্ধ ধর্মের মূল লক্ষ্য হলো দুঃখ মুক্তি বা নির্বাণ লাভ করা। ব্রহ্মা অত্যন্ত শক্তিশালী হলেও তিনি নিজে নির্বাণপ্রাপ্ত নন। যিনি নিজেই জন্ম-মৃত্যুর নিয়মের অধীন, তিনি অন্য কোনো জীবকে কীভাবে মুক্তি দেবেন? বৌদ্ধধর্মে ভাগ্য পরিবর্তন বা মুক্তির জন্য কোনো দেব-দেবীর কৃপার ওপর নির্ভর করা হয় না, বরং নিজের কর্মকে শুদ্ধ করার শিক্ষা দেওয়া হয়।
২. সৃষ্টিকর্তার ধারণা প্রত্যাখ্যান :
দীর্ঘ নিকায়ের 'ব্রহ্মজাল সূত্রে' বুদ্ধ স্পষ্ট ব্যাখ্যা করেছেন যে, মহাবিশ্বে কোনো একক আদি সৃষ্টিকর্তা নেই। জগৎ কোনো ঈশ্বরের ইচ্ছায় চলে না, বরং এটি 'প্রতীত্যসমুৎপাদ' বা কার্যকারণ নিয়মে আবর্তিত হয়। যেহেতু বৌদ্ধধর্মে ব্রহ্মাকে সৃষ্টিকর্তা মনে করা হয় না, তাই তাঁর পূজারও কোনো স্থান নেই।
৩. বিহারে কেবল লোকোত্তর সত্তাদের স্থান:
বৌদ্ধ বিহারের মূল উপাসনা কক্ষ বা বেদী হলো পরম প্রজ্ঞা এবং সম্পূর্ণ মুক্তির প্রতীক। সেখানে কেবল সম্যক সম্বুদ্ধ (যিনি সম্পূর্ণ মুক্ত) অথবা অর্হৎগণের (যাঁরা নির্বাণ লাভ করেছেন) মূর্তি বা প্রতীক রাখা হয়। ব্রহ্মা যেহেতু সংসারের ভেতরের একটি সত্তা, তাই বিহারের মূল বেদীতে তাঁর মূর্তি রাখার কোনো শাস্ত্রীয় বিধান বা নিয়ম নেই।
💡বৌদ্ধদের এখান থেকে কী শেখার আছে...?
এই শিক্ষাগুলো প্রতিটি বৌদ্ধের অন্তরে ধারণ করা উচিত:
অন্ধবিশ্বাস নয়, প্রজ্ঞার অনুশীলন:
বুদ্ধ আমাদের শিখিয়েছেন কোনো অদৃশ্য অলৌকিক শক্তির কাছে মাথা নত না করে নিজের মনকে জয় করতে। বাহ্যিক কোনো দেবতাকে পূজা করার চেয়ে নিজের কর্মকে (Karma) পরিশুদ্ধ করাই আসল ধর্ম।
অহংকার মুক্তি:
ব্রহ্মার মতো কোটি কোটি বছরের আয়ু এবং অসীম ক্ষমতা পেয়েও যেখানে অহংকারের কারণে ভ্রমে পড়তে হয়, সেখানে আমাদের এই ক্ষণস্থায়ী মানবজীবনের ক্ষমতা বা ধন-সম্পদ নিয়ে অহংকার করা চরম মূর্খতা।
ব্রহ্মবিহারের চর্চা:
বৌদ্ধ ধর্মে ব্রহ্মার মূর্তি পূজা করতে নিষেধ করা হলেও, ব্রহ্মার চারটি পরম গুণকে নিজের মনের ভেতর জাগিয়ে তুলতে বলা হয়েছে। এই চার গুণকে একত্রে বলা হয় 'ব্রহ্মবিহার' (মৈত্রী, করুণা, মুদিতা, উপেক্ষা)। প্রতিদিন ধ্যানের মাধ্যমে এই গুণগুলো চর্চা করাই হলো প্রকৃত ব্রহ্ম-ভাবনা।
উপসংহার:
বৌদ্ধধর্ম আমাদের কোনো কাল্পনিক স্বর্গের দেবতার দাস হতে শেখায় না, বরং আমাদের নিজেদের মনের অন্ধকার দূর করে বুদ্ধের মতো পরম আলোকবর্তিকা বা 'জগৎজ্যোতি' হতে শেখায়।
অনেক সময় সাধারণ মানুষ তো বটেই, এমনকি অনেক বৌদ্ধদের মনেও এই প্রশ্নটি জাগে—"কিছু ধর্মে যেখানে ব্রহ্মাকে পরম সৃষ্টিকর্তা এবং সর্বোচ্চ ঈশ্বর মনে করা হয়, সেখানে বৌদ্ধধর্মে তাঁর অবস্থান কোথায়? বৌদ্ধরা কেন তাঁর পূজা করে না, আর কেনই বা বৌদ্ধ বিহারের মূল বেদীতে ব্রহ্মার মূর্তি থাকে না?"
কপি পেস্ট

Post a Comment

0 Comments

Ad Code

Responsive Advertisement