Hot Posts

6/recent/ticker-posts

বুদ্ধের দর্শন: দুঃখ মুক্তির অনুসন্ধান

প্রায় ২৫০০ বছর পূর্বে একজন এরকম মহামানব যিনি মানব জীবনের সবচেয়ে সাধারণ কিন্তু সবচেয়ে কঠিন সমস্যাকে স্বীয় দার্শনিক প্রশ্ন বানিয়েছিলেন-

মনুষ্য কেনো দুঃখ ভোগ করে? রাজকুমার সিদ্ধার্থের নিকট ছিল ধন-ঐশ্বর্য্য, সুযোগ-সুবিধা এবং সামাজিক প্রতিষ্ঠা। তারপরেও তিনি জীবনের সে পক্ষের সম্মুখীন হয়েছিলেন, যেগুলির দ্বারা সুখের কোনো ব্যবস্থাই সম্পূর্ণরূপে সমাপ্ত করা যায়না, যেমন-বৃদ্ধত্ব, রোগ এবং মৃত্যু।
কিন্তু বুদ্ধের দর্শন কেবল দুঃখের তথ্য হতে শুরু হয় নাই, বরং তিনি এর আরও গভীরে গিয়ে এ দুঃখের কারণ, নিরোধ এবং সমাপ্তির বিষয়েও অনুসন্ধান করেছেন।
তাঁর প্রকৃত প্রশ্ন হল-দুঃখের মূল কোথায়? এবং যদি কোনো মূলের অস্তিত্ব থাকে, তাহলে তা কি সমাপ্ত করা যায়না?
সেখান হতে বুদ্ধের ভাবনা অসাধারণ রূপে ব্যবহারিক হয়ে যায়। ভগবান তথাগত স্বীয় দর্শনকে চার আর্য সত্যরূপে ব্যবস্থিত করেছেন, যাকে ইংরেজীতে বলা হয় ‘Four Noble Truths.’
সেগুলির প্রথম হল দুঃখ। জীবনে কেবল শারীরিক পীড়াই নয়, বরং অসন্তোষ, অস্থিরতা, মনোবেদনা, বিচ্ছেদ এবং স্বীয় ইচ্ছানুসারে না পাওয়াও হল দুঃখেরই অংশ।
দ্বিতীয় হল দুঃখের কারণ আছে। বুদ্ধ তথাগত ইহার মূলকে অফুরন্ত চাহিদা বা তৃষ্ণার (Craving) সাথে যুক্ত করেছেন। নিরন্তর কিছু পাওয়ার, সে নিরন্তরতা বজায় রাখা অথবা পরিবর্তন করে করে পাওয়ার ইচ্ছা। আমরা কেবল বস্তু সমূহকেই চাই এমন নয়, বরং আমরা যেরকম চাই, লোকেরাও আমাদেরকে সেরকম দেখুক তাও কামনা করি। আমরা চাই যে, পরিস্থিতি সমূহ আমাদের ইচ্ছানুযায়ী হোক। আমরা আরও চাই যে, সুখ সর্বদা বজায় থাকুক এবং দুঃখ দূর হোক। কিন্তু পৃথিবীর সবকিছু হল পরিবর্তনশীল। তাহাই সংঘর্ষ উৎপন্ন করে থাকে।
তৃতীয় হল দুঃখকে অন্ত করা। তা মানুষের দ্বারা করা সম্ভব। আমরা যদি তৃষ্ণা এবং তৃষ্ণার সাথে যুক্ত মানসিক আসক্তির প্রবৃত্তিকে হ্রাস বা সমাপ্ত করতে পারি, তাহলে দুঃখ হতে মুক্তি লাভ আর অধরা থাকেনা।
বুদ্ধের জন্য মুক্তি কোনো বাহ্যিক পুরস্কারের নাম ছিলনা। তা হল মনে সে অবস্থা দিকে সঙ্কেত করে থাকে, যদ্বারা আসক্তি, ভ্রম এবং অনাবশ্যক কামনা-বাসনা সমাপ্ত হয়ে যায়।
চতুর্থ হল দুঃখ হতে মুক্তির মার্গ। ইহাই হল বুদ্ধের আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ, যাকে বলা হয় মধ্যম পথ (Noble Eightfold Path)।
মধ্যম মার্গ (Midle Way)
——————————
তথাগত বুদ্ধ দু’টি অতিকে (চরম) প্রত্যাখ্যান করেছেন এবং অন্যকেও প্রত্যাখ্যান করতে উপদেশ দিয়েছেন। সেগুলি হল-অতি ইন্দ্রিয়াসক্তিতে সম্পূর্ণরূপে ডুবে থাকা এবং অন্যটি হল অতি আত্ম কৃচ্ছ্রতা অর্থাৎ শরীরকে কঠোর যন্ত্রণা দেওয়া। তিনি উক্ত উভয়ের মধ্যবর্তী মধ্যম মার্গের কথা বলেছেন। কিন্তু মধ্যম মার্গের অর্থ কেবল সব কিছু অল্প-অল্প নয়।
ইহা এরকম একটি জীবন পদ্ধতি, যাতে দৃষ্টি, বিচার, বাণী, কর্ম, আজীবিকা, প্রয়াস, সজাগতা এবং ধ্যানকে সম্যকভাবে অনুশাসিত করে। অর্থাৎ মুক্তি কেবল কোনো এক বিচারকে মেনে নিলে আসেনা, বরং মনুষ্যকে নিজেকে দেখতে এবং জীবন-যাপনের পদ্ধতিকে পরিবর্তনও করতে হয়।
অনিত্য
———-
সংসারে কিছুই স্থায়ী, শাশ্বত ও অবিনশ্বর নয়। বুদ্ধের দর্শনের একটি কেন্দ্রীয় বিচার হল অনিত্যতা (Impermanence)। যা কিছু উৎপন্ন হয়, তার স্বভাবই হল পরিবর্তন হওয়া। শরীর পরিবর্তন হয়। ভাবনা সমূহ পরিবর্তন হয়। বিচার পরিবর্তন হয়। সম্বন্ধ পরিবর্তন হয়। পরিস্থিতি পরিবর্তন হয়। তারপরেও মানুষ সবসময় অস্থায়ী বিষয় দ্বারা স্থায়ী সুখ ও সুরক্ষা কামনা করে থাকে।
আমরা পরিবর্তিত হওয়া সংসার হতে স্থিরতা কামনা থাকি এবং যখন বাস্তবতা আমাদের ইচ্ছা অনুসারে থাকেনা, তখন ক্ষোভ, অশান্তি, সংঘর্ষ ও ক্রোধ উৎপন্ন হয়ে থাকে।
বুদ্ধের দর্শন অনুসারে সমস্যা কেবল পরিবর্তনে নয়। আমরা পরিবর্তনের বিষয় সমূহকে স্থায়ীরূপে পাওয়ার ইচ্ছার মধ্যেই বরং সমস্যা নিহিত রয়েছে।
অনাত্ম
———-
‘আমি’ও হল পরীক্ষা-নিরীক্ষার বিষয়। বুদ্ধের এক গম্ভীর বিচার হল অনাত্ম (Non Self)।
আমরা সাধারণত: মনে করি যে, আমাদের ভিতর একটি স্থায়ী, নিত্য এবং অপরিবর্তনীয় ‘আমি’র অস্তিত্ব রয়েছে। কিন্তু বুদ্ধ তথাগত শরীর, ভাবনা, ধ্যান-ধারণা, মানসিক প্রবৃত্তি এবং চেতনা সমূহকে গভীর নিরীক্ষণ করতে গিয়ে জিজ্ঞাসা করেছেন-
এগুলির মধ্যে কোন বিষয়টি স্থায়ী রয়েছে? যদি সব কিছুর পরিবর্তন চলমান থাকে, তাহলে যে ‘আমি’কে ধরে আমরা বসে রয়েছি, তাও সেরকম সরল এবং স্থায়ী হতে পারেনা, যতটুকু আমরা মনে করে থাকি।
ইহার অর্থ এরকম নয় যে, ব্যক্তির অস্তিত্বই নাই। বরং সত্য ইহাই যে, আমাদের স্থায়ী এবং স্বতন্ত্র আত্মার বিচার হল পরীক্ষা-নিরীক্ষণের যোগ্য।
কর্মের অর্থ
—————
বুদ্ধের ধম্ম দর্শনে কর্মকে কেবল ভাগ্যের মত বুঝলে তাতে অপূর্ণ থেকে যায়। কর্মের সম্বন্ধ রয়েছে বিশেষভাবে ইচ্ছা এবং মানসিক প্রবৃত্তির সাথে। আমরা বার বার যেভাবে ভাবতে এবং কার্য করতে থাকি, তদনুরূপে আমাদের মানসিক অভ্যাস সমূহও শক্তিশালী হতে থাকে।
ক্রোধকে বার বার পোষণ করলে সে ক্রোধের প্রবৃত্তি শক্তিশালী হয়ে যায়। লোভকে বার বার পোষণ করলে সে লোভ শক্তি পেয়ে থাকে এবং জাগরুকতা তথা মৈত্রী-করুণার অভ্যাসও মনকে নকারাত্মক প্রবৃত্তি হতে পরিবর্তন করতে পারে।
এরূপ অর্থে মন কেবল পৃথিবীকে দেখা নয়, মন আমাদের অনুভবের দুনিয়াকে আকারও দিয়ে থাকে।
বুদ্ধের সবচেয়ে বড় সাবধানতা
——————————-
বুদ্ধের দর্শন আমাদেরকে ইহা বলেনা যে, জীবনকে স্বীয় নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নাও। তিনি প্রায় ইহার বিপরীতই বলে থাকেন। প্রথমে ইহা দেখতে হবে যে, বাহ্যিক যা কিছু আমি নিয়ন্ত্রিত করতে ইচ্ছা করছি, সেগুলির কিছুই বাস্তবে আমাদের নিয়ন্ত্রণেই নাই।
আমাদের ইচ্ছা সমূহ, আমাদের প্রত্যাশা সমূহ, আমাদের পরিচয়, আমাদের ভয় এবং আমাদের স্মৃতি সমূহ সবই অনিয়ন্ত্রিত।
এ সবের নিরন্তরতা বা সংস্পর্শকে দেখলে সেখান হতেই সজাগতা (Mindfulness) শুরু হয়ে থাকে।
বুদ্ধের দৃষ্টিতে জ্ঞান কেবল কোনো সিদ্ধান্তে বিশ্বাস করা নয়, বরং সত্যকে স্বয়ং দেখা এবং হয়তো তাঁর দর্শনের সবচেয়ে কঠিন প্রশ্ন ইহাই যে-
আমাদের দুঃখ কেবল পরিস্থিতি হতেই উৎপন্ন নয়, বরং সে পরিস্থিতি সমূহের প্রতি আমাদের ঝুঁকার মধ্য হতেও উৎপন্ন হয়ে থাকে, তাহলে আমরা কোন বিষয়কে ত্যাগের জন্য তৈরী হবো? এখানে ত্যাগ বা গ্রহণ ময়, বরং পরিস্থিতির স্বভাবকে গম্ভীরভাবে দেখে চিত্তের নিরপেক্ষতা বজায় রাখাই হল জীবনের কঠোর সাধনা।

Post a Comment

0 Comments

Ad Code

Responsive Advertisement