পৃথিবী আজ কত দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে! আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান, তথ্য-প্রযুক্তি এবং মানবজীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে উচ্চতর গবেষণা ও উদ্ভাবনের মাধ্যমে বিশ্ব প্রতিনিয়ত এগিয়ে যাচ্ছে। অথচ আমরা অনেক সময় অহেতুক বিতর্ক, পরস্পরের সমালোচনা এবং একে-অপরের পেছনে কথা বলার মতো অনুৎপাদনশীল কাজে আমাদের মূল্যবান মেধা, সময় ও শক্তির বড় একটি অংশ ব্যয় করে ফেলছি।
আমাদের ছোট্ট বঙ্গীয় বৌদ্ধ সমাজে আজ কত রকমের অসঙ্গতি, অনৈক্য, বিভাজন ও ক্ষণস্থায়ী প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়!
আগামী প্রজন্মের মেধার বিকাশ, সৃজনশীলতা ও নৈতিক-মানবিক উৎকর্ষের জন্য আমাদের মধ্যে এখনো প্রয়োজনীয় জাতীয় ঐক্য, প্রাতিষ্ঠানিক পরিকল্পনা ও কার্যকর সমন্বয়ের বহু অভাব রয়েছে। এটি নিঃসন্দেহে আমাদের গভীরভাবে ভাবার বিষয়।
মনে হয়, উনিশ ও বিশ শতকে যেসব দূরদর্শী জাতীয় পর্যায়ের ভিক্ষু-নেতৃত্ব এবং গৃহী-নেতৃত্বের ত্যাগী, গুণী ও প্রজ্ঞাবান ব্যক্তিত্ব আমাদের সমাজের শিক্ষা, ধর্ম, সংস্কৃতি ও সামাজিক অগ্রগতির জন্য যে ভিত্তি নির্মাণ করে গেছেন, আজও আমরা অনেকাংশে তাঁদের সেই আলোকপ্রভা ও উত্তরাধিকারের ওপর নির্ভর করেই, কোন রকমেই এগিয়ে চলেছি।
কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের সমাজের নানা পুরোনো দুর্বলতা ও অবক্ষয়ও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। ছোট ছোট আদর্শ পরিবার ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যেও পরিবর্তন ঘটছে। অতীতের বহু আদর্শ পরিবার, মূল্যবোধ এবং প্রগতিশীল সামাজিক ধারাও যেন ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ছে।
তাই এই মুহূর্তে আমাদের বঙ্গীয় বৌদ্ধ সমাজের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন—ঐক্যকে সুদৃঢ় করা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহযোগিতা বৃদ্ধি করা এবং ব্যক্তি থেকে পরিবার, পরিবার থেকে সমাজ এবং সমাজ থেকে জাতীয় পর্যায়ে বিদ্যমান সমস্যাগুলো কীভাবে চিন্তাশীল ও বাস্তবসম্মত উপায়ে সমাধান করা যায়, সে বিষয়ে সম্মিলিতভাবে কাজ করা।
ত্রিপিটক এবং পরবর্তী ভাষ্যগ্রন্থসমূহ নিঃসন্দেহে আমাদের বৌদ্ধিক ঐতিহ্য, নৈতিক আদর্শ ও জ্ঞানচর্চার, প্রজ্ঞা চর্চার এক অফুরন্ত ভাণ্ডার। তাই এসব গ্রন্থ যথাযথভাবে অধ্যয়ন, গবেষণা ও আত্ম-অনুশীলনের মাধ্যমে বোঝার চেষ্টা করা আমাদের দায়িত্ব।
কোনো ঐতিহাসিক বা শাস্ত্রীয় বিষয় যথাযথভাবে অধ্যয়ন না করে হঠাৎ করে তা নিয়ে বিতর্ক, মন্তব্য বা সিদ্ধান্তে পৌঁছে যাওয়া বোধহয় আমাদের জ্ঞানচর্চার জন্য খুব বেশি ফলপ্রসূ নয়। বরং কোনো বিষয়ে মতামত প্রদান বা গবেষণামূলক বক্তব্য উপস্থাপনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ত্রিপিটকীয় ও ভাষ্যগ্রন্থের যথাযথ অধ্যয়ন, প্রাসঙ্গিক সূত্র, গ্রন্থ ও পৃষ্ঠাসংখ্যা উল্লেখ এবং প্রয়োজনীয় একাডেমিক রেফারেন্স প্রদান করা অধিকতর যুক্তিসংগত ও গ্রহণযোগ্য। এভাবেই জ্ঞানচর্চা গভীর হয়, আলোচনা অর্থবহ হয় এবং সমাজও ধীরে ধীরে প্রগতির পথে এগিয়ে যায়।
যে কারও ব্যক্তিগত চিন্তাধারা, উপলব্ধি কিংবা বক্তব্যের পেছনে অতিরিক্ত সময় ব্যয় না করে—আমাদের সমাজের মেধাবী মানুষগুলোর মেধা, সময় ও শক্তি যেন জ্ঞানচর্চা ও মানবকল্যাণ এবং ভঙ্গুর সমাজের বৃহত্তর ঐক্য প্রতিষ্ঠা এবং সমাজের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নে অধিকতর বিনিয়োগ করা হয়—এটাই আমার বিনীত অনুরোধ।
[লেখাটি কাউকে উদ্দেশ্যে করে নয়, কিংবা এতে কোন ভূল-ভ্রান্তি চোখে পড়লে, তা অবশ্যই সংশোধনযোগ্য এবং গঠনমূলক মতামতকে সাদরে গ্রহণ ও সম্মান করি।]
সকলের জ্ঞান ও প্রজ্ঞা বিকশিত হোক।
.jpg)
0 Comments