আমাদের দৈনন্দিন জীবনে প্রতিটি মূহুর্ত গুলো একই রকমে সময় যায় না, যদি ও আমরা চাই দিন গুলো যেন সব সময় ভালো কাটুক। আমাদের এই চাওয়াটা কেমন জানি সব সময় পাওয়া হয়ে উঠে না। তাই স্বাভাবিকভাবে কোনো সময় ভালো যাচ্ছে কোনো কোনো সময় অনেক কষ্টের ও বিভিন্ন রকমে বাধা সম্মুখীন মুখোমুখি হতে হচ্ছে। তখন অধিকাংশ লোকেরা সেই সব বিষয় গুলো জন্য তাদের মন অনেক ভারাক্রান্ত হয়ে উঠে। কেউ কেউ সহ্য করতে না পেরে নিজের জীবন নিজেই শেষ করে দিচ্ছে। এই সব অনাকাঙ্ক্ষিত বা অপ্রীতিকর ঘটনা মুখোমুখি হওয়াটা আমাদের জন্য খুবই স্বাভাবিক বিষয় যা কেউ এড়াতে পারে না, এমনকি ত্রিলোক পূজ্য সম্যকসম্বুদ্ধ, বুদ্ধত্ব লাভের পরে ও তো অনেক কিছু অপ্রীতিকর ঘটনা মুখোমুখি হতে হয়েছিলো তথাপি বুদ্ধের মন কোনো কিছু দ্বারা বিচলিত হইনি। কিন্তু আমরা তো সাধারণ পৃথকজন পুদগল আমরা তো সেইসব অকুশল বাতাসে কারনের মনকে আর স্থির রাখতে পারি না।
সব সময় মানসিকভাবে প্রশান্তি ও সুন্দর জীবন যাপনের জন্য আমাদের চিন্তা-চেতনা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এই চিন্তা চেতনা উপর নির্ভর করে আমাদের মানসিক ভাবে সুখী হওয়া বা না হওয়া। তাই বুদ্ধ ৰিতক্কসণ্ঠানসুত্তে দেখিয়েছে কিভাবে মনের সকল প্রকার অস্থিরতাকে দূর করে প্রশান্তি ও একাগ্রতা আনা যায়। এই ক্ষেত্রে বুদ্ধ ৫টি উপায় দেখিয়েছে:
[১] চিন্তা করা বিষয় গুলোকে পরিবর্তন করাঃ লোভ, দ্বেষ মোহ নামক অকুশল মূল আমাদের চিত্তকে কলুষিত করে থাকে তাই মন গুলো সব সময় বিষাদ ও মলিন হয়ে থাকে। কোনো বস্তুর প্রতি পাওয়ার ইচ্ছা হচ্ছে লোভ, না পেলে দ্বেষ চিত্ত হয়ে যায়। আর যেখানে লোভ আছে সেখানে মোহ ও আছে, যেখানে দ্বেষ আছে সেখানে ও মোহ আছে। এই লোভ, দ্বেষ ও মোহ শুধু নিজেকে ক্ষতি করে না, অন্যের ও ক্ষতির কারণ হয়ে থাকে। এখন কথা হচ্ছে কোনো ব্যক্তির বা প্রাণীর প্রতি আর্কষণ বা চাওয়ার চিত্তকে কিভাবে নিয়ন্ত্রণ করবেন? বুদ্ধের মতে এই ক্ষেত্রে আমাদেরকে অশুভ কর্মস্থান ভাবনা দিকে মন দিতে হবে। যেমন আপনি কাউকে পছন্দ করছেন তার প্রতি আপনার মন অনেক ব্যাকুল হয়ে উঠছেন এটিকে বলা কামরাগ চিত্ত, তখন আপনাকে ভাবতে হবে ওহ যাকে আমি অনেক সুন্দর বলে মনে করি তার চুল সুন্দর, হাতের নখ সুন্দর, তার দাঁতগুলো সুন্দর মনে করেন তাঁর সেইসব চূল, নখ, দাঁত গুলো ভাতের প্লেটের পড়লে সেইসব খেতে চাই না কোথায় তাঁর সৌন্দর্য। আর এই লোক ও তো যে কোনো সময় মারা যেতে পারে, মারা যাওয়ার কিছুদিন পরে তার চেহারা কী হবে? যাকে আমি চাঁদের সাথে তুলনা করি সেই ও তো কয়েকদিন শারীরিক অসুস্থটা হলে তার চেহারা আর দেখার মতো হই না। এইসব চিন্তাকে মনের মধ্যে বার বার আনতে হবে। বস্তুর প্রতি যে তৃষ্ণা বা চাওয়া চিত্ত উৎপত্তি হলে তখন ভাবতে হবে এটি ও অনিত্য, আজকে কেনা ফোন দুইদিন পরে সেই দামে বিক্রি পাবে না, যতই খাটি সোনা হই না কেন তা কয়েকবছর পরে সেরকম উজ্বল হবে না। সবকিছু তো অনিত্য বলে বার বার ভাবতে হবে এতে করে সেইসব জিনিসের প্রতি প্রছন্ন মোহ গুলো দূরীকরণ হয়ে আপনার মন শান্ত ও নির্মল হবে।
[২] অকুশল চিন্তা চেতনার ফলগুলো নিয়ে ভেবে দেখাঃ নিজেই নিজেই চিন্তা করে দেখা যে আমার এইসব চিন্তা চেতনা গুলো তো অকুশল ও অসার যা লোভ, দ্বেষ ও মোহের কারণে উৎপন্ন হচ্ছে, এইসবের ফল ও তো নিশ্চয় অকুশল বাদে কুশল বা ভালো কিছু দিবে না। এইসব অকুশল ও খারাপ চিন্তা মানে হচ্ছে সবার কাছে নিন্দনীয় কাজ, খারাপ চিন্তা মানে দু:খকে আনয়ন করা কাজ এইসব চিন্তাকে বার বার করা। যেমন: বাশ গাছের ফল যেমন বাশ গাছকে ধ্বংস করে, তেমনি লোভ, দ্বেষ, মোহ ও মানুষকে ধ্বংস করে। এইসব চিন্তার মাধ্যমে সকল রকমে অকুশল চিন্তাভাবনা গুলো ধীরে ধীরে কমে যায়।
[৩] যে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনাকে ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করাঃ আপনার সাথে ঘটে যাওয়ার যে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনাকে মনে না আনা বা ভুলে যাওয়া চেষ্টা করা। এই ক্ষেত্রে আমাদেরকে জানতে হবে যে কোনটিকে মনে রাখা আর কোনটিকে ভুলে যাওয়া। এইজন্য নিজেকে অন্য যেকোনো ভালো কাজ কর্মের নিজেকে নিয়োজিত রাখা যেন খারাপ ঘটনা গুলো মনে না পড়ে। এখানে খারাপ কিছুকে ভুলে যাওয়া মানে হচ্ছে নিজেকে ভালো দিকে এগিয়ে রাখার। খারাপকে মনে রাখলে সব সময় মানসিক অস্থিরতা ভুগতে হবে, তাই সেটিকে ভুলে যাওয়াটা সবচেয়ে ভালো।
[৪] অকুশল চিত্ত কেন উৎপত্তি হই তা খুঁজে দেখাঃ অকুশল চিন্তা চেতনা যেখান থেকে বা যে বিষয় থেকে উৎপত্তি হই সেদিকে মনোযোগ দেয়া। যখন অকুশল চিন্তা চেতনা উৎপত্তি কারন দিকে মনোযোগ দেয়া হই তখন যা যা দেখা যায় তা হলো: জ্ঞান না থাকার কারনে, খারাপ কাজ করতে লজ্জ্বা বোধ না থাকার কারনে, খারাপ কাজ করতে ভয় ভয়-ভীতি না থাকার কারনে এইসব অকুশল চিন্তা চেতনা গুলো বার বার উৎপত্তি ঘটে। তখন নিজেকে নিজেই সর্তকতা অবলম্বন করতে পারবে।
[৫] ভালো চিন্তা চেতনা দ্বারা খারাপ চিন্তা চেতনাকে আক্রমণ করাঃ আমাদের মনের প্রকৃতি বা বৈশিষ্ট্য হচ্ছে কোনো না কোনো বিষয়কে ধরে থাকা বা কোনো না কোনো চিন্তা করে থাকা। তাই খারাপ চিন্তাকে মন থেকে বের করে দিতে গেলে সেই খালি জায়গাতে নতুন কিছু চিন্তা চেতনা গুলোকে আনতে হবে অথবা অন্য কোনো খারাপ চিন্তা প্রবেশ করবে। এইজন্য নিজের জীবনে সবচেয়ে ভালো কোনো পূন্যকর্মে স্মৃতিকে মনে আনা। নিজের জীবনে প্রথম নিজ হাতে ভালো কোনো কাজকে স্মরনে আনা। সেইসব ভালো পূন্যকর্মকে মনে বার বার রোমন্থন করার মাধ্যমে অকুশল চিন্তাভাবনা গুলো দূরে থাকবে এতে আপনার মন শান্ত হবে।
আমাদের মন সব সময় পঞ্চ কামগুণে প্রভাবিত হয়ে অস্থির ও চঞ্চল হয়ে থাকে। শমথ ভাবনাকারীরা পঞ্চ কামগুনে থেকে বের হওয়ার জন্য বুদ্ধ এই ৫টি উপায় বা শিক্ষা দিয়েছেন। তারপর ও এটি শুধু শমথ ভাবনাকারীদের জন্য না এই শিক্ষা আমার ও আপনার দৈনন্দিন জীবনে খুবই ফলপ্রসূ হবে যদি আপনি অনুসরণ করেন। তাই বুদ্ধের এই মহান শিক্ষাকে অনুসরণ করে আপনার আমার মন যেন অনাবিল সুখ, শান্ত ও নির্মল হয়ে অবস্থান করতে পারি এই কামনা রইলো।
0 Comments