বৌদ্ধ পরম্পরায় বন্দনা বা প্রণাম
ড. বরসম্বোধি ভিক্ষু
প্রত্যেক ধর্ম সম্প্রদায়ের অনুসারীগণ কর্তৃক তাঁদের ইষ্ট বা আরাধ্যের প্রতি অবনত মস্তকে নতি স্বীকার করতে দেখা যায়। তাঁরা তাঁদের ইষ্টের প্রতি অবনত হয়ে নিজেদের কৃত দুষ্কর্মের জন্য যেমন ক্ষমা প্রার্থনা করেন এবং সুকর্মের জন্যও তেমনি পুরস্কার স্বরূপ পার্থিব স্থাবর-অস্থাবর ধন-সম্পদ, যশ-খ্যাতি, পদ প্রতিষ্ঠা এবং স্ত্রী-পুত্র প্রভৃতি প্রদান ও যান-মাল রক্ষার জন্য কামনা করে থাকেন। কারণ তাঁদের ইষ্ট তাঁদের অপকর্মের মাফ এবং সুকর্মের পুরস্কার প্রদান করবেন বলে তাঁদেরকে প্রতিশ্রুতি দিয়ে রেখেছেন। কিন্তু প্রদত্ত প্রতিশ্রুতি তিনি কার জন্য কতটুকু পূরণ করেছেন তা অন্যকথা। সেদিকে যাচ্ছিনা। অনুরূপভাবে বৌদ্ধদের মধ্যেও তাঁদের আরাধ্যের প্রতি সেরকম নতি স্বীকার ও শ্রদ্ধা নিবেদনের পরম্পরা রয়েছে। তবে বুদ্ধ কখনও কাউকে পার্থিব সম্পদ দানের প্রতিশ্রুতি যেমন দেননি, তেমনি পাপ মাফ করে স্বর্গ পাইয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দেননি এবং তাঁকে না মানলে ভয়ানক শাস্তি স্বরূপ নরকের আগুনে জ্বালাবেন বলে ভয়ও দেখাননি। কেননা বুদ্ধ কারো স্রষ্টা কিংবা মোক্ষ দাতারূপে তেমন উদ্ভট দাবী করেননি। বরং তিনি হলেন সত্যের মার্গ প্রদর্শনকারী। বৌদ্ধদের মুখ্য আরাধ্য হল বুদ্ধ, ধম্ম এবং সঙ্ঘ-এ ত্রিরত্ন। বৌদ্ধদের মধ্যে সেজন্য কখনও ত্রিরত্নের কাছে অবনত হয়ে জাগতিক কোনো কামনা-প্রার্থনা করার নিয়ম নাই। বুদ্ধ, ধম্ম এবং সঙ্ঘের প্রতি বৌদ্ধেরা অবনত মস্তকে নত হয়ে সত্য প্রদর্শনের জন্য কেবল কৃতজ্ঞতা ও শ্রদ্ধা নিবেদনার্থে বন্দনা করে থাকেন।
বৌদ্ধ পরম্পরায় ত্রিরত্নকে আমরা তিন প্রকারের বন্দনা, প্রণাম বা শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন করে থাকি। সে তিন প্রকার বন্দনা বা শ্রদ্ধা নিবেদন হল কায় বন্দনা, বাক্য বন্দনা এবং মন বন্দনা। নিম্নের এগুলির সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দেওয়া হল।
১) কায়-বন্দনা
——————
দু’হাত জোড় করে অঞ্জলিবদ্ধভাবে অবনত মস্তকে দণ্ডবৎ বা দাঁডিয়ে বা বসে বা ষষ্টাঙ্গে শুয়ে বিনম্র বন্দনা বা শ্রদ্ধা করা। এরূপ বন্দনা বা প্রণামকে বলা হয় কায় দ্বারা কৃত শ্রদ্ধা নিবেদন। এতে মুখ্যত: শ্রদ্ধা নিবেদন কর্তার বিনয়, কৃতজ্ঞতা এবং সমর্পণভাব প্রদর্শিত হয়।
২) বাক্ বন্দনা
——————-
এরূপ বন্দনায় শ্রদ্ধা নিবেদনকারী কেবল অবনত মস্তকই হননা, তাঁরা বাক্য দ্বারা উচ্চারণ করেও বিনম্রতা প্রকাশ করে থাকেন। বন্দনা বা শ্রদ্ধা নিবেদনের সময় প্রকাশ করে থাকেন যে-‘বুদ্ধং বন্দামি, ধম্মং বন্দামি, সঙ্ঘং বন্দামি অহং বন্দামি সব্বদা। দুতিযম্পি ..…… ততিযম্পি ….।’ এভাবে তিনবার মুখে ব্যক্ত করে সংক্ষেপে বন্দনা বা শ্রদ্ধা নিবেদন করাই হল বাক্য দ্বারা বন্দনা। বাক্য দ্বারা বন্দনা দু’ভাবে করা যায়। যেমন-
প্রথমত: উপরিউক্তভাবে কেবল বিশেষন রহিত বন্দনা বা শ্রদ্ধা নিবেদন। অর্থাৎ ‘বুদ্ধং বন্দামি, ধম্মং বন্দামি, সঙ্ঘং বন্দামি…..ইত্যাদি। এভাবে করলে তা হয় সরল এবং সংক্ষিপ্ত বন্দনা।
দ্বিতীয়ত: ত্রিরত্ন গুণানুস্মরণ পূর্বক শ্রদ্ধা-বন্দনা নিবেদন করা। উদাহরণ স্বরূপ-
‘নমো তস্স ভগবতো অরহতো সম্মাসম্বুদ্ধস্স’ তিনবার উচ্চারণ করে ত্রিরত্ন গুণ স্মরণ করতে হয় এভাবে-
‘ইতিপি সো ভগবা অরহং সম্মাসম্বুদ্ধো, বিজ্জাচরণ সম্পন্নো, সুগতো, লোকবিদূ, অনুত্তরো পুরিসদম্ম সারথি, সত্থা দেবমনুস্সানং, বুদ্ধো, ভগবা’তি।’
ধম্ম গুণানুস্মরণ-
‘স্বাক্খাতো ভগবতা ধম্মো, সন্দিট্ঠিকো, অকালিকো, এহিপস্সিকো, ওপনায়িকো, পচ্চত্তং বেদিতব্বো বিঞ্ঞূহী’তি।’
সঙ্ঘগুণানুস্মরণ-
‘ সুপটিপন্নো ভগবতো সাবক সঙ্ঘো, উজুপটিপন্নো ভগবতো সাবকসঙ্ঘো, ঞাযপটিপন্নো ভগবতো সাবকসঙ্ঘো, সামীচিপটিপন্নো ভগবতো সাবকসঙ্ঘো, যদিদং চত্তারি পুরিস যুগানি অট্ঠপুরিস পুগ্গলা এস ভগবতো সাবকসঙ্ঘো, আহুনেয্যো, পাহুনেয্যো, দক্খিনেয্যো, অঞ্জলীকরণীয্যো, অনুত্তরং পুঞ্ঞক্খেত্তং লোকস্সা’তি’
শ্রদ্ধা, একাগ্র ও বিনম্রচিত্তে এভাবে ত্রিরত্নের গুণানুস্মরণ করে উপবেশন রত অবস্থায় অবনত হয়ে করজোড়ে বন্দনা করা।
এরূপে শ্রদ্ধা, স্মৃতি এবং প্রজ্ঞা বৃদ্ধিকারক হতে পারলে তা উত্তম মান্য করা হয়। এরূপ শ্রদ্ধা নিবেদনে মহাফলও মহাকল্যাণ হয়ে থাকে। কেননা, ত্রিরত্ন গুণ স্মরণ করে বন্দনা ও শ্রদ্ধা নিবেদন করলে মন শুদ্ধ চেতনা সম্পন্ন হয়।
৩) মন দ্বারা বন্দনা
————————
ত্রিরত্নকে মনের দ্বারা স্মরণ করে শ্রদ্ধা, কৃতজ্ঞতা এবং শরণাগতভাবে ধ্যানে ত্রিরত্ন গুণ চিন্তন পূর্বক আন্তরিক শ্রদ্ধা উৎপন্ন করা। বুদ্ধের শিক্ষা অনুসারে ছলনা, প্রতারণা, কপটতা, হত্যা, চুরি, ব্যভিচার, মিথ্যভাষণ, মদ্যাদি নেশা দ্রব্য সেবন বিরতি শীলাদি রক্ষা করে এবং ভাবনা অনুশীলন পূর্বক জীবন-যাপন করাও হল আন্তরিক শ্রদ্ধা বা বন্দনা নিবেদন। এতে মনের শুদ্ধিতা, পবিত্রতা, নির্মলতা এবং শ্রদ্ধা বর্ধিত হয়ে থাকে। ইহাকে ত্রিরত্নের প্রতি শ্রেষ্ঠ বন্দনা বা শ্রদ্ধা নিবেদন রূপে আখ্যায়িত করা হয়েছে।
সারকথা হল, কায়ের দ্বারা বন্দনায় বিনয় এবং নম্রতা, বাক্যের দ্বারা বন্দনায় নিজের এবং অন্যের জন্যও কুশল বর্ধক এবং মনের চেতনা দ্বারা বন্দনায় আন্তরিক শ্রদ্ধা ও চিত্ত শুদ্ধি হয়ে থাকে। তিন প্রকার বন্দনার মধ্যে কোনো বন্দনাতেই বুদ্ধের কাছে পার্থিব কিছু চাওয়ার আরাধনা নাই। এখানে বন্দনা মানে হল বুদ্ধ একজন সত্যদর্শী এবং মার্গদাতা শাস্তা বা শিক্ষকরূপে কৃতজ্ঞতাপূর্ণ শ্রদ্ধা নিবেদন এবং তাঁর গুণ, বাণী, শিক্ষা, উপদেশ অনুসরণ করে নিজেদের অভ্যন্তরিক পশুত্ব বৃত্তি সমূহকে বিনাশের চেষ্টা করা। ইহাই হল শ্রেষ্ঠ বন্দনা।

0 Comments