Hot Posts

6/recent/ticker-posts

Ad Code

সাম জাতকে বর্ণিত ব্রাহ্মণ‍্য শ্রবণ কুমারের গল্প ড. বরসম্বোধি ভিক্ষু


 সাম জাতকে বর্ণিত ব্রাহ্মণ্য শ্রবণ কুমারের গল্প

ড. বরসম্বোধি ভিক্ষু
বৌদ্ধ সাহিত্য জাতকে বর্ণিত অন্ধ মাতা-পিতার সেবাকারী শ্রবণ কুমার হিন্দু নয়, বরং তিনি ছিলেন মূল নিবাসী বৌদ্ধ। আজকের এ লেখনী আপনারা মনোযোগ সহকারে পড়লে এর সত্যতা উপলব্দি করতে পারবেন॥
প্রশ্ন ইহাই যে, যদি মূল ভারতীয় শ্রবণ কুমার বৌদ্ধ ছিলেন তাহলে হঠাৎ তিনি কিভাবে হিন্দু হয়ে গেলেন? এর উত্তর জানার জন্য শেষ পর্যন্ত না পড়লে মনের দ্বিধা দূর হওয়া সম্ভব নয়।
বৌদ্ধ জাতক কাহিনী সমূহের ঐতিহাসিকতা এমন যে, যেগুলির পর্যাপ্ত পুরাতাত্ত্বিক ও সাহিত্যিক প্রমাণ আমাদের কাছে রয়েছে। ইহাকে মোগলকালীন মুসলিম শাসন এবং ইংরেজ রাজত্ব কালে ধূর্ততার সাথে ব্রাহ্মণ্য সাহিত্যে অন্তর্ভুক্ত করে ব্রাহ্মণীকরণ করা হয়েছে এবং ভারত স্বাধীনতার পরে টিভি সিরিয়ালের মাধ্যমের দ্বারা প্রচার করে সহজ-সরল ভারতীয়দের মস্তিষ্কে আরও দৃঢ়ভাবে ডুকিয়ে দেওয়া হয়েছে।
অতীতে ভারতবর্ষের অধিকাংশ লোক যখন বৌদ্ধ ছিলেন তখন তাঁরা লোকমুখে মুখে শুনতে শুনতে এ সমস্ত কাহিনীর সাথে পরিচিত ছিলেন। যখন বৌদ্ধদেরকে হিন্দু বলতে শুরু করা হয়েছে তখনও মূল কাহিনীর নায়ক-নায়িকার সাথে তাঁরা পরিচিত থাকার পরিণাম স্বরূপ কাহিনীকে তাঁরা পরিবর্তন করার চেষ্টা করতে পারেননি।
একটি উদাহরণের মাধ্যমে বুঝার চেষ্টা করুন। ৬২৯ খৃষ্টাব্দে নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র কর্তৃক স্বীয় গান্ধারা (বর্তমান পাকিস্তান-আফগানিস্তানের অংশ) যাত্রাকালে তিনি তথায় স্বচক্ষে সাম বোধিসত্বের জন্য নির্মিত ভব্য স্তূপ দেখেছিলেন এবং এর বর্ণনাও স্বীয় ডায়েরিতে লিখে রেখেছেন। কেবল তা নয়, চৈনিক বৌদ্ধ পরিব্রাজক ভিক্ষু ফা-হিয়েনও (337-422) ৩৯৯ খৃষ্টাব্দে ভারত ভ্রমণকালে তিনি স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করা সাম বোধিসত্বের স্তূপ সম্বন্ধে বর্ণনা করেছেন।
অর্থাৎ সপ্তম শতাব্দী পর্যন্ত সাম বোধিসত্ব ছিলেন, যিনি স্বীয় অন্ধ মাতা-পিতার সেবা করতেন এবং বারাণসী নরেশের দ্বারা বিষময় তির বিদ্ধ হলে নদীর কিনারে মৃতপ্রায় হয়ে পড়ে থেকেছিলেন, যিনি আবার ঔষধী সেবনের মাধ্যমে সুস্থ হয়ে উঠেছিলেন এবং বারাণসী রাজাকে দশবিধ রাজ ধম্মের উপদেশ দিয়েছিলেন, যা পরে বুদ্ধ কর্তৃক দেশিত হয়েছে।
খৃষ্টের জন্মের ২০০ বছর পূর্বে সম্রাট অসোক কর্তৃক নির্মিত মধ্য প্রদেশের সাঁচীর স্তূপেও সাম জাতকের কাহিনী (জাতক সংখ্যা ৫৪০) পাথরে উৎকীর্ণ করা হয়েছে, যার পুরাতত্ব প্রমাণও সেখানে রয়েছে।
অর্থাৎ পুরাতাত্ত্বিক স্বাক্ষ্য, নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের কতিপয় মেধাবী বিদ্যার্থীর লেখা এবং জাতক কাহিনী আমাদেরকে পাকাপোক্ত প্রমাণ উপস্থাপন করে থাকে যে, সাম বোধিসত্ব বুদ্ধ ধম্মেরই অনুসারী ছিলেন।
উল্লেখ্য যে, ভারতবর্ষে ছাপাখানা এসেছে ইংরেজ শাসনামলে। এর পূর্বে কোনো প্রিন্টিং প্রেস ছিলনা। ব্রাহ্মণ্য সাহিত্যে শ্রবণ কুমার মাতা-পিতাকে কাঁধে বহন করে চারধাম বর্ণনা পাওয়া যায়, সে চারধামের সঙ্কল্পনাও এসেছে বৌদ্ধ চার মহাপুণ্যতীর্থ (লুম্বিনী, বুদ্ধগয়া, সারনাথ, কুশীনগর) হতে, যা অষ্টম শতাব্দীতে শঙ্করাচার্যের দ্বারা স্থাপিত। যে চারধাম তিনি স্থাপনা করেছেন সেগুলিও হিংস্রতার দ্বারা বৌদ্ধ বিহার দখল করে, যার পুরাতাত্ত্বিক ও সাহিত্যিক দলিলও রয়েছে। সুতরাং রামায়ণও অষ্টম শতাব্দীর অনেক পরের রচনা সন্দেহ নাই।
ভারতে যখন ইংরেজ এসেছিলেন এবং প্রিন্টিং মেশিন স্থাপন করেছিলেন তখনই রামায়ণ ছাপার জন্য উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। সে সময় সাম জাতকে বর্ণিত কথার এ অংশ বারাণসী নরেশের পরিবর্তে কাল্পনিক দশরথের সাথে সামান্য কিছু উল্টাপাল্টা করে বোধিসত্ব সামকে রামভক্ত বানানো হয়েছে। আবার টিভি সিরিয়ালের মাধ্যমে ঘরে ঘরে সকল লোকেরা ইহাকে দেখেছেন এবং ইহা তখন তাঁরা ইহাকে হিন্দু কাহিনী বলে মনে ধারণা করে নিয়েছেন।
এভাবে বৌদ্ধদের প্রায় তত্ব ও তথ্য ব্রাহ্মণ্যবাদীরা ধূর্ততার আশ্রয়ে চুরি করে নিজেদের মত করে সাহিত্য রচনা করে ইতিহাসে চরম দুর্নীতির প্রমাণ রেখে প্রচার করতে লাগল বৌদ্ধরা হিন্দু হতে এসেছে এবং সকল ভারতীয়দেরকে হিন্দু মনে করতে লাগলেন। সত্যিকার অর্থে কেবল অন্যেরা বলার মাধ্যমে আমরা সবাই হিন্দু হয়ে যাইনি, বরং আধ্যাত্মিক রূপেও বৌদ্ধ কথা সমূহের ব্রাহ্মণীকরণ করে ইতিহাস দুর্নীতি করেও এরূপ করা হয়েছে। এজন্য সাধারণ জনমানসে এখনও এরূপ অনুভব হচ্ছে না যে, বিভিন্ন রকমের দেব-দেবী যে রয়েছে, যেগুলিকে আজকে হিন্দুর লেবেল লাগিয়ে পূজা করা হচ্ছে, সেগুলি এবং সেগুলির পীঠস্থান সমূহের পুরাতত্ব প্রমাণ বৌদ্ধদের মধ্যেই কেনো পাওয়া যায়?
তথ্য রেফারেন্সের কিছু অংশ যুক্ত করা হয়েছে, উৎসুক্য পাঠকগণ নিজেরাই সেগুলি সংগ্রহ করে পড়ে নিতে বা গিয়ে স্বচক্ষে পরীক্ষা করে দর্শন করতে পারেন। যেমন-
১) হিউয়েন সাংয়ের ভারত ভ্রমণ বৃত্তান্ত।
২) পিপলায়ন রচিত হিন্দিতে ‘সাম জাতক কথা’ বর্ণনা এবং ইশান চন্দ্র ঘোষ অনুদিত বাংলায় জাতক গ্রন্থ।
৩) প্রমাণের জন্য প্রদত্ত পুরাতত্ব ফলক।
জাতক কাহিনী সমূহ হল লোকদেরকে ভাল-মন্দ অবগত করানোর জন্য উৎকৃষ্ট মানের নৈতিক ও মানবিক শিক্ষামূলক কাহিনী। যেগুলি স্বয়ং বুদ্ধ দ্বারা ভাষিত হয়েছে এবং সম্রাট অসোক ও তাঁর পরের বৌদ্ধ রাজাগণ কর্তৃক নির্মিত স্তূপ এবং শিল্প কর্মের মধ্যে পাথরে উৎকীর্ণ করে দীর্ঘকালের জন্য জীবিত রেখে দিয়েছেন। হয়তো তাঁরা জানতেন যে, তাঁদের বংশধরেরা দু’হাজার বছর পরে বিষম পরিস্থিতিতেও পুণর্বার হলেও নিজেদের হৃত গৌরবময় ইতিহাসকে অনুসন্ধান করে বের করবেন।

সাম জাতকে বর্ণিত ব্রাহ্মণ্য শ্রবণ কুমারের গল্প
ড. বরসম্বোধি ভিক্ষু
বৌদ্ধ সাহিত্য জাতকে বর্ণিত অন্ধ মাতা-পিতার সেবাকারী শ্রবণ কুমার হিন্দু নয়, বরং তিনি ছিলেন মূল নিবাসী বৌদ্ধ। আজকের এ লেখনী আপনারা মনোযোগ সহকারে পড়লে এর সত্যতা উপলব্দি করতে পারবেন॥
প্রশ্ন ইহাই যে, যদি মূল ভারতীয় শ্রবণ কুমার বৌদ্ধ ছিলেন তাহলে হঠাৎ তিনি কিভাবে হিন্দু হয়ে গেলেন? এর উত্তর জানার জন্য শেষ পর্যন্ত না পড়লে মনের দ্বিধা দূর হওয়া সম্ভব নয়।
বৌদ্ধ জাতক কাহিনী সমূহের ঐতিহাসিকতা এমন যে, যেগুলির পর্যাপ্ত পুরাতাত্ত্বিক ও সাহিত্যিক প্রমাণ আমাদের কাছে রয়েছে। ইহাকে মোগলকালীন মুসলিম শাসন এবং ইংরেজ রাজত্ব কালে ধূর্ততার সাথে ব্রাহ্মণ্য সাহিত্যে অন্তর্ভুক্ত করে ব্রাহ্মণীকরণ করা হয়েছে এবং ভারত স্বাধীনতার পরে টিভি সিরিয়ালের মাধ্যমের দ্বারা প্রচার করে সহজ-সরল ভারতীয়দের মস্তিষ্কে আরও দৃঢ়ভাবে ডুকিয়ে দেওয়া হয়েছে।
অতীতে ভারতবর্ষের অধিকাংশ লোক যখন বৌদ্ধ ছিলেন তখন তাঁরা লোকমুখে মুখে শুনতে শুনতে এ সমস্ত কাহিনীর সাথে পরিচিত ছিলেন। যখন বৌদ্ধদেরকে হিন্দু বলতে শুরু করা হয়েছে তখনও মূল কাহিনীর নায়ক-নায়িকার সাথে তাঁরা পরিচিত থাকার পরিণাম স্বরূপ কাহিনীকে তাঁরা পরিবর্তন করার চেষ্টা করতে পারেননি।
একটি উদাহরণের মাধ্যমে বুঝার চেষ্টা করুন। ৬২৯ খৃষ্টাব্দে নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র কর্তৃক স্বীয় গান্ধারা (বর্তমান পাকিস্তান-আফগানিস্তানের অংশ) যাত্রাকালে তিনি তথায় স্বচক্ষে সাম বোধিসত্বের জন্য নির্মিত ভব্য স্তূপ দেখেছিলেন এবং এর বর্ণনাও স্বীয় ডায়েরিতে লিখে রেখেছেন। কেবল তা নয়, চৈনিক বৌদ্ধ পরিব্রাজক ভিক্ষু ফা-হিয়েনও (337-422) ৩৯৯ খৃষ্টাব্দে ভারত ভ্রমণকালে তিনি স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করা সাম বোধিসত্বের স্তূপ সম্বন্ধে বর্ণনা করেছেন।
অর্থাৎ সপ্তম শতাব্দী পর্যন্ত সাম বোধিসত্ব ছিলেন, যিনি স্বীয় অন্ধ মাতা-পিতার সেবা করতেন এবং বারাণসী নরেশের দ্বারা বিষময় তির বিদ্ধ হলে নদীর কিনারে মৃতপ্রায় হয়ে পড়ে থেকেছিলেন, যিনি আবার ঔষধী সেবনের মাধ্যমে সুস্থ হয়ে উঠেছিলেন এবং বারাণসী রাজাকে দশবিধ রাজ ধম্মের উপদেশ দিয়েছিলেন, যা পরে বুদ্ধ কর্তৃক দেশিত হয়েছে।
খৃষ্টের জন্মের ২০০ বছর পূর্বে সম্রাট অসোক কর্তৃক নির্মিত মধ্য প্রদেশের সাঁচীর স্তূপেও সাম জাতকের কাহিনী (জাতক সংখ্যা ৫৪০) পাথরে উৎকীর্ণ করা হয়েছে, যার পুরাতত্ব প্রমাণও সেখানে রয়েছে।
অর্থাৎ পুরাতাত্ত্বিক স্বাক্ষ্য, নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের কতিপয় মেধাবী বিদ্যার্থীর লেখা এবং জাতক কাহিনী আমাদেরকে পাকাপোক্ত প্রমাণ উপস্থাপন করে থাকে যে, সাম বোধিসত্ব বুদ্ধ ধম্মেরই অনুসারী ছিলেন।
উল্লেখ্য যে, ভারতবর্ষে ছাপাখানা এসেছে ইংরেজ শাসনামলে। এর পূর্বে কোনো প্রিন্টিং প্রেস ছিলনা। ব্রাহ্মণ্য সাহিত্যে শ্রবণ কুমার মাতা-পিতাকে কাঁধে বহন করে চারধাম বর্ণনা পাওয়া যায়, সে চারধামের সঙ্কল্পনাও এসেছে বৌদ্ধ চার মহাপুণ্যতীর্থ (লুম্বিনী, বুদ্ধগয়া, সারনাথ, কুশীনগর) হতে, যা অষ্টম শতাব্দীতে শঙ্করাচার্যের দ্বারা স্থাপিত। যে চারধাম তিনি স্থাপনা করেছেন সেগুলিও হিংস্রতার দ্বারা বৌদ্ধ বিহার দখল করে, যার পুরাতাত্ত্বিক ও সাহিত্যিক দলিলও রয়েছে। সুতরাং রামায়ণও অষ্টম শতাব্দীর অনেক পরের রচনা সন্দেহ নাই।
ভারতে যখন ইংরেজ এসেছিলেন এবং প্রিন্টিং মেশিন স্থাপন করেছিলেন তখনই রামায়ণ ছাপার জন্য উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। সে সময় সাম জাতকে বর্ণিত কথার এ অংশ বারাণসী নরেশের পরিবর্তে কাল্পনিক দশরথের সাথে সামান্য কিছু উল্টাপাল্টা করে বোধিসত্ব সামকে রামভক্ত বানানো হয়েছে। আবার টিভি সিরিয়ালের মাধ্যমে ঘরে ঘরে সকল লোকেরা ইহাকে দেখেছেন এবং ইহা তখন তাঁরা ইহাকে হিন্দু কাহিনী বলে মনে ধারণা করে নিয়েছেন।
এভাবে বৌদ্ধদের প্রায় তত্ব ও তথ্য ব্রাহ্মণ্যবাদীরা ধূর্ততার আশ্রয়ে চুরি করে নিজেদের মত করে সাহিত্য রচনা করে ইতিহাসে চরম দুর্নীতির প্রমাণ রেখে প্রচার করতে লাগল বৌদ্ধরা হিন্দু হতে এসেছে এবং সকল ভারতীয়দেরকে হিন্দু মনে করতে লাগলেন। সত্যিকার অর্থে কেবল অন্যেরা বলার মাধ্যমে আমরা সবাই হিন্দু হয়ে যাইনি, বরং আধ্যাত্মিক রূপেও বৌদ্ধ কথা সমূহের ব্রাহ্মণীকরণ করে ইতিহাস দুর্নীতি করেও এরূপ করা হয়েছে। এজন্য সাধারণ জনমানসে এখনও এরূপ অনুভব হচ্ছে না যে, বিভিন্ন রকমের দেব-দেবী যে রয়েছে, যেগুলিকে আজকে হিন্দুর লেবেল লাগিয়ে পূজা করা হচ্ছে, সেগুলি এবং সেগুলির পীঠস্থান সমূহের পুরাতত্ব প্রমাণ বৌদ্ধদের মধ্যেই কেনো পাওয়া যায়?
তথ্য রেফারেন্সের কিছু অংশ যুক্ত করা হয়েছে, উৎসুক্য পাঠকগণ নিজেরাই সেগুলি সংগ্রহ করে পড়ে নিতে বা গিয়ে স্বচক্ষে পরীক্ষা করে দর্শন করতে পারেন। যেমন-
১) হিউয়েন সাংয়ের ভারত ভ্রমণ বৃত্তান্ত।
২) পিপলায়ন রচিত হিন্দিতে ‘সাম জাতক কথা’ বর্ণনা এবং ইশান চন্দ্র ঘোষ অনুদিত বাংলায় জাতক গ্রন্থ।
৩) প্রমাণের জন্য প্রদত্ত পুরাতত্ব ফলক।
জাতক কাহিনী সমূহ হল লোকদেরকে ভাল-মন্দ অবগত করানোর জন্য উৎকৃষ্ট মানের নৈতিক ও মানবিক শিক্ষামূলক কাহিনী। যেগুলি স্বয়ং বুদ্ধ দ্বারা ভাষিত হয়েছে এবং সম্রাট অসোক ও তাঁর পরের বৌদ্ধ রাজাগণ কর্তৃক নির্মিত স্তূপ এবং শিল্প কর্মের মধ্যে পাথরে উৎকীর্ণ করে দীর্ঘকালের জন্য জীবিত রেখে দিয়েছেন। হয়তো তাঁরা জানতেন যে, তাঁদের বংশধরেরা দু’হাজার বছর পরে বিষম পরিস্থিতিতেও পুণর্বার হলেও নিজেদের হৃত গৌরবময় ইতিহাসকে অনুসন্ধান করে বের করবেন।
সাম জাতকে বর্ণিত ব্রাহ্মণ্য শ্রবণ কুমারের গল্প
ড. বরসম্বোধি ভিক্ষু
বৌদ্ধ সাহিত্য জাতকে বর্ণিত অন্ধ মাতা-পিতার সেবাকারী শ্রবণ কুমার হিন্দু নয়, বরং তিনি ছিলেন মূল নিবাসী বৌদ্ধ। আজকের এ লেখনী আপনারা মনোযোগ সহকারে পড়লে এর সত্যতা উপলব্দি করতে পারবেন॥
প্রশ্ন ইহাই যে, যদি মূল ভারতীয় শ্রবণ কুমার বৌদ্ধ ছিলেন তাহলে হঠাৎ তিনি কিভাবে হিন্দু হয়ে গেলেন? এর উত্তর জানার জন্য শেষ পর্যন্ত না পড়লে মনের দ্বিধা দূর হওয়া সম্ভব নয়।
বৌদ্ধ জাতক কাহিনী সমূহের ঐতিহাসিকতা এমন যে, যেগুলির পর্যাপ্ত পুরাতাত্ত্বিক ও সাহিত্যিক প্রমাণ আমাদের কাছে রয়েছে। ইহাকে মোগলকালীন মুসলিম শাসন এবং ইংরেজ রাজত্ব কালে ধূর্ততার সাথে ব্রাহ্মণ্য সাহিত্যে অন্তর্ভুক্ত করে ব্রাহ্মণীকরণ করা হয়েছে এবং ভারত স্বাধীনতার পরে টিভি সিরিয়ালের মাধ্যমের দ্বারা প্রচার করে সহজ-সরল ভারতীয়দের মস্তিষ্কে আরও দৃঢ়ভাবে ডুকিয়ে দেওয়া হয়েছে।
অতীতে ভারতবর্ষের অধিকাংশ লোক যখন বৌদ্ধ ছিলেন তখন তাঁরা লোকমুখে মুখে শুনতে শুনতে এ সমস্ত কাহিনীর সাথে পরিচিত ছিলেন। যখন বৌদ্ধদেরকে হিন্দু বলতে শুরু করা হয়েছে তখনও মূল কাহিনীর নায়ক-নায়িকার সাথে তাঁরা পরিচিত থাকার পরিণাম স্বরূপ কাহিনীকে তাঁরা পরিবর্তন করার চেষ্টা করতে পারেননি।
একটি উদাহরণের মাধ্যমে বুঝার চেষ্টা করুন। ৬২৯ খৃষ্টাব্দে নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র কর্তৃক স্বীয় গান্ধারা (বর্তমান পাকিস্তান-আফগানিস্তানের অংশ) যাত্রাকালে তিনি তথায় স্বচক্ষে সাম বোধিসত্বের জন্য নির্মিত ভব্য স্তূপ দেখেছিলেন এবং এর বর্ণনাও স্বীয় ডায়েরিতে লিখে রেখেছেন। কেবল তা নয়, চৈনিক বৌদ্ধ পরিব্রাজক ভিক্ষু ফা-হিয়েনও (337-422) ৩৯৯ খৃষ্টাব্দে ভারত ভ্রমণকালে তিনি স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করা সাম বোধিসত্বের স্তূপ সম্বন্ধে বর্ণনা করেছেন।
অর্থাৎ সপ্তম শতাব্দী পর্যন্ত সাম বোধিসত্ব ছিলেন, যিনি স্বীয় অন্ধ মাতা-পিতার সেবা করতেন এবং বারাণসী নরেশের দ্বারা বিষময় তির বিদ্ধ হলে নদীর কিনারে মৃতপ্রায় হয়ে পড়ে থেকেছিলেন, যিনি আবার ঔষধী সেবনের মাধ্যমে সুস্থ হয়ে উঠেছিলেন এবং বারাণসী রাজাকে দশবিধ রাজ ধম্মের উপদেশ দিয়েছিলেন, যা পরে বুদ্ধ কর্তৃক দেশিত হয়েছে।
খৃষ্টের জন্মের ২০০ বছর পূর্বে সম্রাট অসোক কর্তৃক নির্মিত মধ্য প্রদেশের সাঁচীর স্তূপেও সাম জাতকের কাহিনী (জাতক সংখ্যা ৫৪০) পাথরে উৎকীর্ণ করা হয়েছে, যার পুরাতত্ব প্রমাণও সেখানে রয়েছে।
অর্থাৎ পুরাতাত্ত্বিক স্বাক্ষ্য, নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের কতিপয় মেধাবী বিদ্যার্থীর লেখা এবং জাতক কাহিনী আমাদেরকে পাকাপোক্ত প্রমাণ উপস্থাপন করে থাকে যে, সাম বোধিসত্ব বুদ্ধ ধম্মেরই অনুসারী ছিলেন।
উল্লেখ্য যে, ভারতবর্ষে ছাপাখানা এসেছে ইংরেজ শাসনামলে। এর পূর্বে কোনো প্রিন্টিং প্রেস ছিলনা। ব্রাহ্মণ্য সাহিত্যে শ্রবণ কুমার মাতা-পিতাকে কাঁধে বহন করে চারধাম বর্ণনা পাওয়া যায়, সে চারধামের সঙ্কল্পনাও এসেছে বৌদ্ধ চার মহাপুণ্যতীর্থ (লুম্বিনী, বুদ্ধগয়া, সারনাথ, কুশীনগর) হতে, যা অষ্টম শতাব্দীতে শঙ্করাচার্যের দ্বারা স্থাপিত। যে চারধাম তিনি স্থাপনা করেছেন সেগুলিও হিংস্রতার দ্বারা বৌদ্ধ বিহার দখল করে, যার পুরাতাত্ত্বিক ও সাহিত্যিক দলিলও রয়েছে। সুতরাং রামায়ণও অষ্টম শতাব্দীর অনেক পরের রচনা সন্দেহ নাই।
ভারতে যখন ইংরেজ এসেছিলেন এবং প্রিন্টিং মেশিন স্থাপন করেছিলেন তখনই রামায়ণ ছাপার জন্য উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। সে সময় সাম জাতকে বর্ণিত কথার এ অংশ বারাণসী নরেশের পরিবর্তে কাল্পনিক দশরথের সাথে সামান্য কিছু উল্টাপাল্টা করে বোধিসত্ব সামকে রামভক্ত বানানো হয়েছে। আবার টিভি সিরিয়ালের মাধ্যমে ঘরে ঘরে সকল লোকেরা ইহাকে দেখেছেন এবং ইহা তখন তাঁরা ইহাকে হিন্দু কাহিনী বলে মনে ধারণা করে নিয়েছেন।
এভাবে বৌদ্ধদের প্রায় তত্ব ও তথ্য ব্রাহ্মণ্যবাদীরা ধূর্ততার আশ্রয়ে চুরি করে নিজেদের মত করে সাহিত্য রচনা করে ইতিহাসে চরম দুর্নীতির প্রমাণ রেখে প্রচার করতে লাগল বৌদ্ধরা হিন্দু হতে এসেছে এবং সকল ভারতীয়দেরকে হিন্দু মনে করতে লাগলেন। সত্যিকার অর্থে কেবল অন্যেরা বলার মাধ্যমে আমরা সবাই হিন্দু হয়ে যাইনি, বরং আধ্যাত্মিক রূপেও বৌদ্ধ কথা সমূহের ব্রাহ্মণীকরণ করে ইতিহাস দুর্নীতি করেও এরূপ করা হয়েছে। এজন্য সাধারণ জনমানসে এখনও এরূপ অনুভব হচ্ছে না যে, বিভিন্ন রকমের দেব-দেবী যে রয়েছে, যেগুলিকে আজকে হিন্দুর লেবেল লাগিয়ে পূজা করা হচ্ছে, সেগুলি এবং সেগুলির পীঠস্থান সমূহের পুরাতত্ব প্রমাণ বৌদ্ধদের মধ্যেই কেনো পাওয়া যায়?
তথ্য রেফারেন্সের কিছু অংশ যুক্ত করা হয়েছে, উৎসুক্য পাঠকগণ নিজেরাই সেগুলি সংগ্রহ করে পড়ে নিতে বা গিয়ে স্বচক্ষে পরীক্ষা করে দর্শন করতে পারেন। যেমন-
১) হিউয়েন সাংয়ের ভারত ভ্রমণ বৃত্তান্ত।
২) পিপলায়ন রচিত হিন্দিতে ‘সাম জাতক কথা’ বর্ণনা এবং ইশান চন্দ্র ঘোষ অনুদিত বাংলায় জাতক গ্রন্থ।
৩) প্রমাণের জন্য প্রদত্ত পুরাতত্ব ফলক।
জাতক কাহিনী সমূহ হল লোকদেরকে ভাল-মন্দ অবগত করানোর জন্য উৎকৃষ্ট মানের নৈতিক ও মানবিক শিক্ষামূলক কাহিনী। যেগুলি স্বয়ং বুদ্ধ দ্বারা ভাষিত হয়েছে এবং সম্রাট অসোক ও তাঁর পরের বৌদ্ধ রাজাগণ কর্তৃক নির্মিত স্তূপ এবং শিল্প কর্মের মধ্যে পাথরে উৎকীর্ণ করে দীর্ঘকালের জন্য জীবিত রেখে দিয়েছেন। হয়তো তাঁরা জানতেন যে, তাঁদের বংশধরেরা দু’হাজার বছর পরে বিষম পরিস্থিতিতেও পুণর্বার হলেও নিজেদের হৃত গৌরবময় ইতিহাসকে অনুসন্ধান করে বের করবেন।
সাম জাতকে বর্ণিত ব্রাহ্মণ্য শ্রবণ কুমারের গল্প
ড. বরসম্বোধি ভিক্ষু
বৌদ্ধ সাহিত্য জাতকে বর্ণিত অন্ধ মাতা-পিতার সেবাকারী শ্রবণ কুমার হিন্দু নয়, বরং তিনি ছিলেন মূল নিবাসী বৌদ্ধ। আজকের এ লেখনী আপনারা মনোযোগ সহকারে পড়লে এর সত্যতা উপলব্দি করতে পারবেন॥
প্রশ্ন ইহাই যে, যদি মূল ভারতীয় শ্রবণ কুমার বৌদ্ধ ছিলেন তাহলে হঠাৎ তিনি কিভাবে হিন্দু হয়ে গেলেন? এর উত্তর জানার জন্য শেষ পর্যন্ত না পড়লে মনের দ্বিধা দূর হওয়া সম্ভব নয়।
বৌদ্ধ জাতক কাহিনী সমূহের ঐতিহাসিকতা এমন যে, যেগুলির পর্যাপ্ত পুরাতাত্ত্বিক ও সাহিত্যিক প্রমাণ আমাদের কাছে রয়েছে। ইহাকে মোগলকালীন মুসলিম শাসন এবং ইংরেজ রাজত্ব কালে ধূর্ততার সাথে ব্রাহ্মণ্য সাহিত্যে অন্তর্ভুক্ত করে ব্রাহ্মণীকরণ করা হয়েছে এবং ভারত স্বাধীনতার পরে টিভি সিরিয়ালের মাধ্যমের দ্বারা প্রচার করে সহজ-সরল ভারতীয়দের মস্তিষ্কে আরও দৃঢ়ভাবে ডুকিয়ে দেওয়া হয়েছে।
অতীতে ভারতবর্ষের অধিকাংশ লোক যখন বৌদ্ধ ছিলেন তখন তাঁরা লোকমুখে মুখে শুনতে শুনতে এ সমস্ত কাহিনীর সাথে পরিচিত ছিলেন। যখন বৌদ্ধদেরকে হিন্দু বলতে শুরু করা হয়েছে তখনও মূল কাহিনীর নায়ক-নায়িকার সাথে তাঁরা পরিচিত থাকার পরিণাম স্বরূপ কাহিনীকে তাঁরা পরিবর্তন করার চেষ্টা করতে পারেননি।
একটি উদাহরণের মাধ্যমে বুঝার চেষ্টা করুন। ৬২৯ খৃষ্টাব্দে নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র কর্তৃক স্বীয় গান্ধারা (বর্তমান পাকিস্তান-আফগানিস্তানের অংশ) যাত্রাকালে তিনি তথায় স্বচক্ষে সাম বোধিসত্বের জন্য নির্মিত ভব্য স্তূপ দেখেছিলেন এবং এর বর্ণনাও স্বীয় ডায়েরিতে লিখে রেখেছেন। কেবল তা নয়, চৈনিক বৌদ্ধ পরিব্রাজক ভিক্ষু ফা-হিয়েনও (337-422) ৩৯৯ খৃষ্টাব্দে ভারত ভ্রমণকালে তিনি স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করা সাম বোধিসত্বের স্তূপ সম্বন্ধে বর্ণনা করেছেন।
অর্থাৎ সপ্তম শতাব্দী পর্যন্ত সাম বোধিসত্ব ছিলেন, যিনি স্বীয় অন্ধ মাতা-পিতার সেবা করতেন এবং বারাণসী নরেশের দ্বারা বিষময় তির বিদ্ধ হলে নদীর কিনারে মৃতপ্রায় হয়ে পড়ে থেকেছিলেন, যিনি আবার ঔষধী সেবনের মাধ্যমে সুস্থ হয়ে উঠেছিলেন এবং বারাণসী রাজাকে দশবিধ রাজ ধম্মের উপদেশ দিয়েছিলেন, যা পরে বুদ্ধ কর্তৃক দেশিত হয়েছে।
খৃষ্টের জন্মের ২০০ বছর পূর্বে সম্রাট অসোক কর্তৃক নির্মিত মধ্য প্রদেশের সাঁচীর স্তূপেও সাম জাতকের কাহিনী (জাতক সংখ্যা ৫৪০) পাথরে উৎকীর্ণ করা হয়েছে, যার পুরাতত্ব প্রমাণও সেখানে রয়েছে।
অর্থাৎ পুরাতাত্ত্বিক স্বাক্ষ্য, নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের কতিপয় মেধাবী বিদ্যার্থীর লেখা এবং জাতক কাহিনী আমাদেরকে পাকাপোক্ত প্রমাণ উপস্থাপন করে থাকে যে, সাম বোধিসত্ব বুদ্ধ ধম্মেরই অনুসারী ছিলেন।
উল্লেখ্য যে, ভারতবর্ষে ছাপাখানা এসেছে ইংরেজ শাসনামলে। এর পূর্বে কোনো প্রিন্টিং প্রেস ছিলনা। ব্রাহ্মণ্য সাহিত্যে শ্রবণ কুমার মাতা-পিতাকে কাঁধে বহন করে চারধাম বর্ণনা পাওয়া যায়, সে চারধামের সঙ্কল্পনাও এসেছে বৌদ্ধ চার মহাপুণ্যতীর্থ (লুম্বিনী, বুদ্ধগয়া, সারনাথ, কুশীনগর) হতে, যা অষ্টম শতাব্দীতে শঙ্করাচার্যের দ্বারা স্থাপিত। যে চারধাম তিনি স্থাপনা করেছেন সেগুলিও হিংস্রতার দ্বারা বৌদ্ধ বিহার দখল করে, যার পুরাতাত্ত্বিক ও সাহিত্যিক দলিলও রয়েছে। সুতরাং রামায়ণও অষ্টম শতাব্দীর অনেক পরের রচনা সন্দেহ নাই।
ভারতে যখন ইংরেজ এসেছিলেন এবং প্রিন্টিং মেশিন স্থাপন করেছিলেন তখনই রামায়ণ ছাপার জন্য উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। সে সময় সাম জাতকে বর্ণিত কথার এ অংশ বারাণসী নরেশের পরিবর্তে কাল্পনিক দশরথের সাথে সামান্য কিছু উল্টাপাল্টা করে বোধিসত্ব সামকে রামভক্ত বানানো হয়েছে। আবার টিভি সিরিয়ালের মাধ্যমে ঘরে ঘরে সকল লোকেরা ইহাকে দেখেছেন এবং ইহা তখন তাঁরা ইহাকে হিন্দু কাহিনী বলে মনে ধারণা করে নিয়েছেন।
এভাবে বৌদ্ধদের প্রায় তত্ব ও তথ্য ব্রাহ্মণ্যবাদীরা ধূর্ততার আশ্রয়ে চুরি করে নিজেদের মত করে সাহিত্য রচনা করে ইতিহাসে চরম দুর্নীতির প্রমাণ রেখে প্রচার করতে লাগল বৌদ্ধরা হিন্দু হতে এসেছে এবং সকল ভারতীয়দেরকে হিন্দু মনে করতে লাগলেন। সত্যিকার অর্থে কেবল অন্যেরা বলার মাধ্যমে আমরা সবাই হিন্দু হয়ে যাইনি, বরং আধ্যাত্মিক রূপেও বৌদ্ধ কথা সমূহের ব্রাহ্মণীকরণ করে ইতিহাস দুর্নীতি করেও এরূপ করা হয়েছে। এজন্য সাধারণ জনমানসে এখনও এরূপ অনুভব হচ্ছে না যে, বিভিন্ন রকমের দেব-দেবী যে রয়েছে, যেগুলিকে আজকে হিন্দুর লেবেল লাগিয়ে পূজা করা হচ্ছে, সেগুলি এবং সেগুলির পীঠস্থান সমূহের পুরাতত্ব প্রমাণ বৌদ্ধদের মধ্যেই কেনো পাওয়া যায়?
তথ্য রেফারেন্সের কিছু অংশ যুক্ত করা হয়েছে, উৎসুক্য পাঠকগণ নিজেরাই সেগুলি সংগ্রহ করে পড়ে নিতে বা গিয়ে স্বচক্ষে পরীক্ষা করে দর্শন করতে পারেন। যেমন-
১) হিউয়েন সাংয়ের ভারত ভ্রমণ বৃত্তান্ত।
২) পিপলায়ন রচিত হিন্দিতে ‘সাম জাতক কথা’ বর্ণনা এবং ইশান চন্দ্র ঘোষ অনুদিত বাংলায় জাতক গ্রন্থ।
৩) প্রমাণের জন্য প্রদত্ত পুরাতত্ব ফলক।
জাতক কাহিনী সমূহ হল লোকদেরকে ভাল-মন্দ অবগত করানোর জন্য উৎকৃষ্ট মানের নৈতিক ও মানবিক শিক্ষামূলক কাহিনী। যেগুলি স্বয়ং বুদ্ধ দ্বারা ভাষিত হয়েছে এবং সম্রাট অসোক ও তাঁর পরের বৌদ্ধ রাজাগণ কর্তৃক নির্মিত স্তূপ এবং শিল্প কর্মের মধ্যে পাথরে উৎকীর্ণ করে দীর্ঘকালের জন্য জীবিত রেখে দিয়েছেন। হয়তো তাঁরা জানতেন যে, তাঁদের বংশধরেরা দু’হাজার বছর পরে বিষম পরিস্থিতিতেও পুণর্বার হলেও নিজেদের হৃত গৌরবময় ইতিহাসকে অনুসন্ধান করে বের করবেন।
সাম জাতকে বর্ণিত ব্রাহ্মণ্য শ্রবণ কুমারের গল্প
ড. বরসম্বোধি ভিক্ষু
বৌদ্ধ সাহিত্য জাতকে বর্ণিত অন্ধ মাতা-পিতার সেবাকারী শ্রবণ কুমার হিন্দু নয়, বরং তিনি ছিলেন মূল নিবাসী বৌদ্ধ। আজকের এ লেখনী আপনারা মনোযোগ সহকারে পড়লে এর সত্যতা উপলব্দি করতে পারবেন॥
প্রশ্ন ইহাই যে, যদি মূল ভারতীয় শ্রবণ কুমার বৌদ্ধ ছিলেন তাহলে হঠাৎ তিনি কিভাবে হিন্দু হয়ে গেলেন? এর উত্তর জানার জন্য শেষ পর্যন্ত না পড়লে মনের দ্বিধা দূর হওয়া সম্ভব নয়।
বৌদ্ধ জাতক কাহিনী সমূহের ঐতিহাসিকতা এমন যে, যেগুলির পর্যাপ্ত পুরাতাত্ত্বিক ও সাহিত্যিক প্রমাণ আমাদের কাছে রয়েছে। ইহাকে মোগলকালীন মুসলিম শাসন এবং ইংরেজ রাজত্ব কালে ধূর্ততার সাথে ব্রাহ্মণ্য সাহিত্যে অন্তর্ভুক্ত করে ব্রাহ্মণীকরণ করা হয়েছে এবং ভারত স্বাধীনতার পরে টিভি সিরিয়ালের মাধ্যমের দ্বারা প্রচার করে সহজ-সরল ভারতীয়দের মস্তিষ্কে আরও দৃঢ়ভাবে ডুকিয়ে দেওয়া হয়েছে।
অতীতে ভারতবর্ষের অধিকাংশ লোক যখন বৌদ্ধ ছিলেন তখন তাঁরা লোকমুখে মুখে শুনতে শুনতে এ সমস্ত কাহিনীর সাথে পরিচিত ছিলেন। যখন বৌদ্ধদেরকে হিন্দু বলতে শুরু করা হয়েছে তখনও মূল কাহিনীর নায়ক-নায়িকার সাথে তাঁরা পরিচিত থাকার পরিণাম স্বরূপ কাহিনীকে তাঁরা পরিবর্তন করার চেষ্টা করতে পারেননি।
একটি উদাহরণের মাধ্যমে বুঝার চেষ্টা করুন। ৬২৯ খৃষ্টাব্দে নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র কর্তৃক স্বীয় গান্ধারা (বর্তমান পাকিস্তান-আফগানিস্তানের অংশ) যাত্রাকালে তিনি তথায় স্বচক্ষে সাম বোধিসত্বের জন্য নির্মিত ভব্য স্তূপ দেখেছিলেন এবং এর বর্ণনাও স্বীয় ডায়েরিতে লিখে রেখেছেন। কেবল তা নয়, চৈনিক বৌদ্ধ পরিব্রাজক ভিক্ষু ফা-হিয়েনও (337-422) ৩৯৯ খৃষ্টাব্দে ভারত ভ্রমণকালে তিনি স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করা সাম বোধিসত্বের স্তূপ সম্বন্ধে বর্ণনা করেছেন।
অর্থাৎ সপ্তম শতাব্দী পর্যন্ত সাম বোধিসত্ব ছিলেন, যিনি স্বীয় অন্ধ মাতা-পিতার সেবা করতেন এবং বারাণসী নরেশের দ্বারা বিষময় তির বিদ্ধ হলে নদীর কিনারে মৃতপ্রায় হয়ে পড়ে থেকেছিলেন, যিনি আবার ঔষধী সেবনের মাধ্যমে সুস্থ হয়ে উঠেছিলেন এবং বারাণসী রাজাকে দশবিধ রাজ ধম্মের উপদেশ দিয়েছিলেন, যা পরে বুদ্ধ কর্তৃক দেশিত হয়েছে।
খৃষ্টের জন্মের ২০০ বছর পূর্বে সম্রাট অসোক কর্তৃক নির্মিত মধ্য প্রদেশের সাঁচীর স্তূপেও সাম জাতকের কাহিনী (জাতক সংখ্যা ৫৪০) পাথরে উৎকীর্ণ করা হয়েছে, যার পুরাতত্ব প্রমাণও সেখানে রয়েছে।
অর্থাৎ পুরাতাত্ত্বিক স্বাক্ষ্য, নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের কতিপয় মেধাবী বিদ্যার্থীর লেখা এবং জাতক কাহিনী আমাদেরকে পাকাপোক্ত প্রমাণ উপস্থাপন করে থাকে যে, সাম বোধিসত্ব বুদ্ধ ধম্মেরই অনুসারী ছিলেন।
উল্লেখ্য যে, ভারতবর্ষে ছাপাখানা এসেছে ইংরেজ শাসনামলে। এর পূর্বে কোনো প্রিন্টিং প্রেস ছিলনা। ব্রাহ্মণ্য সাহিত্যে শ্রবণ কুমার মাতা-পিতাকে কাঁধে বহন করে চারধাম বর্ণনা পাওয়া যায়, সে চারধামের সঙ্কল্পনাও এসেছে বৌদ্ধ চার মহাপুণ্যতীর্থ (লুম্বিনী, বুদ্ধগয়া, সারনাথ, কুশীনগর) হতে, যা অষ্টম শতাব্দীতে শঙ্করাচার্যের দ্বারা স্থাপিত। যে চারধাম তিনি স্থাপনা করেছেন সেগুলিও হিংস্রতার দ্বারা বৌদ্ধ বিহার দখল করে, যার পুরাতাত্ত্বিক ও সাহিত্যিক দলিলও রয়েছে। সুতরাং রামায়ণও অষ্টম শতাব্দীর অনেক পরের রচনা সন্দেহ নাই।
ভারতে যখন ইংরেজ এসেছিলেন এবং প্রিন্টিং মেশিন স্থাপন করেছিলেন তখনই রামায়ণ ছাপার জন্য উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। সে সময় সাম জাতকে বর্ণিত কথার এ অংশ বারাণসী নরেশের পরিবর্তে কাল্পনিক দশরথের সাথে সামান্য কিছু উল্টাপাল্টা করে বোধিসত্ব সামকে রামভক্ত বানানো হয়েছে। আবার টিভি সিরিয়ালের মাধ্যমে ঘরে ঘরে সকল লোকেরা ইহাকে দেখেছেন এবং ইহা তখন তাঁরা ইহাকে হিন্দু কাহিনী বলে মনে ধারণা করে নিয়েছেন।
এভাবে বৌদ্ধদের প্রায় তত্ব ও তথ্য ব্রাহ্মণ্যবাদীরা ধূর্ততার আশ্রয়ে চুরি করে নিজেদের মত করে সাহিত্য রচনা করে ইতিহাসে চরম দুর্নীতির প্রমাণ রেখে প্রচার করতে লাগল বৌদ্ধরা হিন্দু হতে এসেছে এবং সকল ভারতীয়দেরকে হিন্দু মনে করতে লাগলেন। সত্যিকার অর্থে কেবল অন্যেরা বলার মাধ্যমে আমরা সবাই হিন্দু হয়ে যাইনি, বরং আধ্যাত্মিক রূপেও বৌদ্ধ কথা সমূহের ব্রাহ্মণীকরণ করে ইতিহাস দুর্নীতি করেও এরূপ করা হয়েছে। এজন্য সাধারণ জনমানসে এখনও এরূপ অনুভব হচ্ছে না যে, বিভিন্ন রকমের দেব-দেবী যে রয়েছে, যেগুলিকে আজকে হিন্দুর লেবেল লাগিয়ে পূজা করা হচ্ছে, সেগুলি এবং সেগুলির পীঠস্থান সমূহের পুরাতত্ব প্রমাণ বৌদ্ধদের মধ্যেই কেনো পাওয়া যায়?
তথ্য রেফারেন্সের কিছু অংশ যুক্ত করা হয়েছে, উৎসুক্য পাঠকগণ নিজেরাই সেগুলি সংগ্রহ করে পড়ে নিতে বা গিয়ে স্বচক্ষে পরীক্ষা করে দর্শন করতে পারেন। যেমন-
১) হিউয়েন সাংয়ের ভারত ভ্রমণ বৃত্তান্ত।
২) পিপলায়ন রচিত হিন্দিতে ‘সাম জাতক কথা’ বর্ণনা এবং ইশান চন্দ্র ঘোষ অনুদিত বাংলায় জাতক গ্রন্থ।
৩) প্রমাণের জন্য প্রদত্ত পুরাতত্ব ফলক।
জাতক কাহিনী সমূহ হল লোকদেরকে ভাল-মন্দ অবগত করানোর জন্য উৎকৃষ্ট মানের নৈতিক ও মানবিক শিক্ষামূলক কাহিনী। যেগুলি স্বয়ং বুদ্ধ দ্বারা ভাষিত হয়েছে এবং সম্রাট অসোক ও তাঁর পরের বৌদ্ধ রাজাগণ কর্তৃক নির্মিত স্তূপ এবং শিল্প কর্মের মধ্যে পাথরে উৎকীর্ণ করে দীর্ঘকালের জন্য জীবিত রেখে দিয়েছেন। হয়তো তাঁরা জানতেন যে, তাঁদের বংশধরেরা দু’হাজার বছর পরে বিষম পরিস্থিতিতেও পুণর্বার হলেও নিজেদের হৃত গৌরবময় ইতিহাসকে অনুসন্ধান করে বের করবেন।

Post a Comment

0 Comments

Ad Code

Responsive Advertisement