Hot Posts

6/recent/ticker-posts

Ad Code

ভাদ্র পূর্ণিমার তাৎপর্য

 

ড. বরসম্বোধি ভিক্ষু

বৌদ্ধ জগতে ভাদ্র পূর্ণিমার গুরুত্ব অপরিসীম। ভাদ্র পূর্ণিমার এদিনেই ভগবান মহাকারুণিক তথাগত সম্যক সম্বুদ্ধ তাঁর বুদ্ধত্ব লাভের পাঁচ বছর পর বৈশালীতে ভিক্ষু, ভিক্ষুণী, উপাসক, উপাসিকা- তাঁর সদ্ধম্ম শাসনের এ চার স্তম্ভের অন‍্যতম স্তম্ভ মহান ভিক্ষুণী সঙ্ঘের স্থাপনা করছিলেন। আষাঢ়ী পূর্ণিমায় যেমন বুদ্ধ তথাগত সারনাথে ভিক্ষু সঙ্ঘ স্থাপনা করেন, তেমনি ভাদ্র পূর্ণিমায় তিনি ভিক্ষুণী সঙ্ঘের স্থাপনা করেন। সুতরাং এদিনটি সমগ্র বৌদ্ধ জগতে ভিক্ষুণী সঙ্ঘের স্থাপনা দিবস বা জন্ম দিবস রূপে চিরস্মরণীয় আছে।

বর্তমান পৃথিবীতে সকল সভ্য ও প্রগতিশীল লোকেরা তথাকথিত ধর্মগুরু ও ধর্মীয় গ্রন্থ সমূহের রক্ত চক্ষুকে উপেক্ষা করে নারী-পুরুষের সমানতা ও সম-অধিকারের কথা বলছেন এবং তা বাস্তবায়িত করতে কার্যকরী পদক্ষেপও গ্রহণ করেছেন। বিশ্বব্যাপী সুধী ও প্রগতিশীল সমাজ এখন নারী-পুরুষের মধ্যে সম অধিকার ও সম মর্যাদার জন্য সর্বত্র সোচ্চার হতে দেখা যাচ্ছে। পৃথিবীর মানুষ জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিক্ষা-সভ্যতা ও আধুনিকতার যুগে যা চিন্তা করছেন, পৃথিবীর প্রথম প্রগতিশীল মহামানব, মহাজ্ঞানী ও মহাবৈজ্ঞানিক তথাগত সম্যক সম্বুদ্ধ আজ হতে আড়াই হাজার বছর পূর্বে নারী-পুরুষের সম মর্যাদা ও সম অধিকার প্রতিষ্ঠা করে গিয়েছেন আজকের এদিনে। সমগ্র পৃথিবীতে বুদ্ধই একমাত্র মহামানব, যিনি নারীদের অচ্ছুত, অবহেলিত ও নিম্নস্তর হতে উপরের সারিতে তুলে এনেছিলেন। এজন্য তাঁকে তৎকালীন তথাকথিত ধর্মীয়গুরু, মনুবাদী ও নারী শোষণকারী ব্রাহ্মণ্য ও পুরুষ শাসিত সমাজের অনেক অপবাদ ও লাঞ্ছনা সহ্য করতে হয়েছিল।

যখন ধরাধামে ভগবান তথাগত বুদ্ধের আবির্ভাব হননি, তখন তথাকথিত ধর্ম সমূহ নারীদের উপর ধর্মের নামে অনেক নিপীড়ন, নির্যাতন ও যৌন শোষণ করত। তাঁদেরকে বিবিধ মানবাধিকার হতে বঞ্চিত করে রেখেছিল। তাঁদেরকে পুরুষের সেবাদাসীরূপে ব্যবহার করত। পুরুষ শাসিত সমাজে পুরুষ হল স্বামী অর্থাৎ প্রভূ এবং নারী হল স্ত্রী অর্থাৎ দাসী। তখন হতে স্বামী-স্ত্রীর মধ‍্যে প্রভূ-ভৃত্যের যে প্রথা চালু ছিল, তা এখনও চলে আসছে বিশেষ করে আমাদের এশীয় সমাজে। বুদ্ধ নারীদেরকে মর্যাদা দান করে এ কু-প্রথা হতে বের করে এনে স্বাধীন ও বিমুক্তি সুখের আস্বাদন করিয়েছিলেন। যে নারীরা ঘরের বা মহলের চার দেওয়ালে বন্দী জীবন যাপন করতেন বলে তাঁদেরকে ‘মহিলা’ রূপে আখ্যায়িত করা হয়েছে, তাঁদেরকে বুদ্ধ ভিক্ষুণী সঙ্ঘে স্থান দিয়ে মুক্ত বিহঙ্গের মত স্বাধীনভাবে বিচরণের সুযোগ করে দিয়েছিলেন। নারীদের কথা বলার অধিকার ছিনিয়ে নিয়ে তাঁদেরকে ‘অবলা’ রূপে চিহ্নিত করেছিল তথাকথিত ধর্মীয়গুরুরা। সেখানে বুদ্ধ তাঁদেরকে আধ‍্যাত্মিক মর্যাদা দান করে ধর্মের বিশেষ প্রবক্তা বানিয়েছিলেন। বুদ্ধের অন‍্যতম অগ্র শ্রাবিকা উৎপলবর্ণা ছিলেন তেমনতর একজন ভিক্ষুণী, যিনি ধর্মের সুব্যাখ্যান দিয়ে শ্রোতাদের বিমুগ্ধ করতেন। ভিক্ষু সঙ্ঘের মধ‍্যে যেমন ভদন্ত সারিপুত্রের স্থান, তেমনি ভিক্ষুণী সঙ্ঘের মধ‍্যেও ছিল আয়‍্যা উৎপলবর্ণা’র স্থান। ব্রাহ্মণ‍্য ধর্মীয় গ্রন্থ সমূহে যে নারীদেরকে নরকের দ্বার বা অশুচির কারখানা বলা হয়েছে, অসূর্যস্পৃশ্য করে রেখে দিয়েছিল, ভগবান মহাকারুণিক বুদ্ধ তাঁদেরকে ভিক্ষুণী সঙ্ঘে স্থান দিয়ে অরহত্ব লাভ ফল করার মাধ‍্যমে বোধিজ্ঞান অর্জনের যোগ্যতা প্রমাণ করে দেখিয়ে দিয়েছেন। সুতরাং তথাগতের বিমাতা বা মহারাণী প্রজাপতি গৌতমীর নেতৃত্বে আজকের দিনে ভিক্ষুণী সঙ্ঘের স্থাপনা করা ছিল বুদ্ধের এক ঐতিহাসিক ও যুগান্তরকারী পদক্ষেপ। সামাজিক ও ধম্ম জাগরণে ইহা ছিল তথাগত বুদ্ধের অত্যন্ত সাহসী ও বলিষ্ট ভূমিকা। সুতরাং, আজকের দিনটি হল নারী দাসত্ব মুক্তির ঐতিহাসিক সনদ।

আধ্যাত্ম এবং সামাজিক স্তরে লিঙ্গ আধারিত ভেদভাব সমাপ্ত করতে গিয়ে বুদ্ধ ভিক্ষুণী সঙ্ঘ স্থাপনা করেছেন। বুদ্ধের সাম্য, মৈত্রী ও করুণার শিক্ষায় প্রভাবিত হয়ে তৎকালীন সমাজের উচ্চস্তর হতে নিম্নস্তর পর্যন্ত সকল শ্রেণীর নারীরা ভিক্ষুণী সঙ্ঘে যোগদান করে বুদ্ধ প্রবর্তিত ধম্মের বিমুক্তি সুখের আস্বাদ গ্রহণ করেছিলেন। তাঁদের মধ্যে ভগবানের বিমাতা মহারাণী মহাপ্রজাপতি গৌতমী, শাক্যরাজকুমারী রাহুলমাতা যশোধরা, রাজা বিম্বিসার মহীষী মহারাণী ক্ষেমা, অগ্রশ্রাবক সারিপুত্র স্থবিরের ছোট বোন চালা, উপচালা ও শিশুপচালা সহ অঞ্ঞতরা, মুত্তা, পুণ্ণা, মিত্তা, তিষ্যা, উৎপলবর্ণা, ধীরা, পটাচারা, কৃশা গৌতমী, সুমনা, ধম্মা, সুমঙ্গল মাতা, অভয় মাতা, চিত্তা, সোমা, ভদ্রকপিলানী, সুন্দরী নন্দা, মেত্তিকা, উত্তরা, ইসিদাসী, সুমেধার মত অসংখ্য নারীরা রয়েছেন, যাঁরা ভিক্ষুণী সঙ্ঘে সামিল হয়ে আধ্যাত্মিক জগতে নতুন দিশা দেখিয়েছেন। বুদ্ধ পরবর্তী সময়েও রাজকুমারী সঙ্ঘমিত্রা, রাজকুমারী অনুলা সহ অনেক সম্ভ্রান্ত পরিবারের নারীরা ভিক্ষুণী সঙ্ঘে যোগদান করে দিকে দিকে সদ্ধম্মের বিজয় পতাকা উড্ডীন করেছেন।

অতএব, আজকের ভাদ্র পূর্ণিমা দিনটি মানব জাতির ইতিহাসে নারী, মুক্তি, নারী জাগরণ ও নারী স্বাধীনতার দিবসরূপে উজ্জ্বল হয়ে রয়েছে।

কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হল যে, কোশম্বীতে ভিক্ষু সঙ্ঘের বিবাদের কারণে বুদ্ধ তথাগত লোকালয় ত্যাগ করে তাঁর দশম বর্ষা অতিবাহিত করেছিলেন পারিলেয়্য বনে বা অরণ‍্যে। ভিক্ষু সঙ্ঘ এতই উশৃঙ্খল ও ঔদ্ধত্য স্বভাবের হয়েছিলেন যে, তাঁরা তথাগতের উপদেশ পর্যন্ত অমান্য-অগ্রাহ‍্য করছিলেন। সেজন্য বুদ্ধ তথাগত মুর্খ সংসর্গ ত্যাগ করে পারিলেয়্য বনে বর্ষাবাস করতে গিয়েছিলেন। সেখানে তির্যক প্রাণী বানর যে ভগবান বুদ্ধকে আজকের দিনে মধুদান করেছিল, তাকে যতটুকু গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, তাকে সামনে এনে তার যত মাহাত্য প্রচার করা হয়েছে, সে তুলনায় ভিক্ষুণী সঙ্ঘ প্রতিষ্ঠাকে কেবল খাটোই করা হয়নি, তার উল্লেখ পর্যন্ত কোথাও করা হয়না। ইতিহাস হতেও সে প্রসঙ্গ আড়াল করে রাখা হয়েছে। তা অনেকটা ইতিহাসের পাতা থেকেও মুছে দিয়েছে। যুগে যুগে এমনই অবিচার করা হয়েছে নারী অর্থাৎ মাতৃজাতির প্রতি। ‘মহাপুরুষ’ ‘মহাপুরুষ’ বলে পুরুষের মহিমায়, পুরুষের কৃতিত্বে যত উজ্জ্বলতা দান করা হয়েছে, সে তুলনায় নারীকে তত বেশী ঘৃণিত পদার্থরূপে চিহ্নিত করে দেখানো হয়েছে। কোথাও মহানারী শব্দ পরিলক্ষিত হয়না। নারী শক্তি, নারী প্রতিভা ও নারী কৃতিত্ব বিকশিত করার সেরকম সুযোগই দিয়ে আসেনি পুরুষেরা। অতএব, তাঁদের মাহাত‍্য কীর্তিত হওয়ার প্রশ্নই আসেনা।

ভগবান তথাগত বুদ্ধকে দশম বর্ষাবাস জঙ্গলে দিয়ে কেন যাপন করতে হয়েছিল? তা ছিল ভিক্ষুদের ঝগড়া, ভিক্ষুদের ঔদ্ধত্য স্বভাব, ভিক্ষুদের জেদ, ভিক্ষুদের অবিনয় আচার, ভিক্ষুদের অনমনীয়তা, ভিক্ষুদের ধর্ম গৌরবহীনতা এবং সর্বোপরি ভিক্ষুদের ‘আমার’, ‘আমিত্বে’রই চরম পরিণাম। কৌশম্বীর ভিক্ষুগণ, ভিক্ষু দেবদত্ত এবং তাঁর অনুসারী ভিক্ষুগণ, ষড়বর্গীয় ভিক্ষু হতে শুরু করে সুভদ্র ভিক্ষু পর্যন্ত বুদ্ধের জীবদ্দশায় বা বুদ্ধ সমকালীন সময়ে ভিক্ষুরাই অধিকতর নানা রকম অবিনয়াচার করে, নানা ঔদ্ধত্য আচরণ করে বার বার সঙ্ঘের মধ্যে বিভিন্ন সমস্যা সৃষ্টি করেছিলেন, যা সমাধান বা নিরসন করতে ভগবানকে নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হয়েছিল। অথচ সে তুলনায় ভিক্ষুণী সঙ্ঘকে নিয়ে বুদ্ধের সময়ে তেমন কোন বিশৃঙ্খলতার খবর কিম্বা ভিক্ষুণী সঙ্ঘে সেরকম ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণের খবর আমাদের সামনে আসেনি। যেমন বর্তমানেও পুরুষরা যত জঘন্য অপরাধে লিপ্ত থাকে সে তুলনায় নারীদের অপরাধ খুবই কম। তা আমরা কারাগারের দিকে দৃষ্টিপাত করলেই বুঝতে পারি। কারাগারে পুরুষ কয়েদীর তুলনায় নারী কয়েদীর সংখ‍্যা হল যৎসামান‍্য। তারপরেও নারীদেরকেই দোষারোপ করা হয় বেশী।

কৌশম্বীর ভিক্ষু সঙ্ঘের বিবাদ নিরসনে তথাকার উপাসক-উপাসিকাদের ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। তাঁরা যদি ভিক্ষু সঙ্ঘদেরকে আহার দান বন্ধের মত কঠোর উদ্যোগ গ্রহণ না করতেন, তাহলে এ বিবাদ আরও কত যে দীর্ঘতর হত এবং এর পরিণাম কত যে ভয়াবহ হত, তা আর বলার অপেক্ষা রাখেনা। ভিক্ষুদের স্বেচ্ছাচারিতার মাত্রা, ভিক্ষুদের অনমনীয়তা, ভিক্ষুদের দুর্ব্যহার, ভিক্ষুদের আমার-আমিত্বের প্রভাব কতটুকু সীমা ছাড়ালে এবং তাঁদের আচরণে কতটুকু বিরক্তিকর হলে মহাকারুণিক বুদ্ধের মত ক্ষান্তিবাদী মহাপুরুষকে ভিক্ষুদের সঙ্গ ত্যাগ করে বনে আশ্রয় নিতে হয়েছিল, তা আজকের মধু পূর্ণিমাই আমাদেরকে বার বার স্মরণ করিয়ে দেয়। সে কারণে বুদ্ধ ভিক্ষুদেরকে উদ্দেশ্য করে উপদেশ দিয়েছিলেন-

‘ন পরেসং বিলোমানি ন পরেসং কতাকতং।
অত্তনো’ব অবেক্খেয্য কতানি অকতানি চ।’

অর্থাৎ অন্যের দোষ ক্রুটি না দেখে, অন্যের কৃত্য-অকৃত্য না দেখে, নিজের দোষ-ক্রুটি ও নিজের কৃত্য-অকৃত্য দেখাই উচিত।’ তাতেই হয় সকলের মঙ্গল।

অপর ব্যক্তির দোষ-ক্রুটির প্রতি লক্ষ্য করা এবং সব সময় অপরের ছিদ্রান্বেষণ করা উচিত নয়। অমুক ব্যক্তি অশ্রদ্ধাবান, অমুক পাড়ার বা গ্রামের লোক খারাপ, দান-শীলের প্রতি উদাসীন বা করণীয় কর্তব্যে অবহেলা প্রকাশ করে’ ইত‍্যাদিভাবে অপরের দোষের কথা চিন্তা বা চর্চা না করে নিজে কতদূর শুদ্ধ বা সঠিক আছি, শমথ-বিদর্শন ভাবনায় প্রতিষ্ঠিত হয়ে কতদূর নিজের চিত্তকে নির্মল করে অগ্রসর হয়েছি, তাহাই দেখা উচিত। ইহাই হোক ভাদ্র পূর্ণিমার মূল শিক্ষা।

Post a Comment

0 Comments

Ad Code

Responsive Advertisement