Hot Posts

6/recent/ticker-posts

Ad Code

আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ কাদের দ্বারা প্রতিপাল‍্য

 

পালি সাহিত্যের ত্রিপিটকান্তর্গত সূত্র পিটকের সংযুক্ত নিকায়ের নদী সূত্রে বুদ্ধ তথাগত এরকম বলেছেন যে, ভিক্ষুগণ! আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গের অনুশীলন কামভোগী সাধারণ গৃহস্থজনদের জন্য সেবিতব্য নয়। ইহা হল তথাগত বুদ্ধের বচন।
তথাগত বুদ্ধ বলেছেন যে, ভিক্ষুগণ! গঙ্গা নদী যখন পূর্ব দিকে প্রবাহিত হয়, তখন লোকদের এক সমূহ কোদাল, টুকরী নিয়ে আসে এবং বলে যে, আমরা গঙ্গা নদীকে পশ্চিম দিকে প্রবাহিত করবো। ভিক্ষুগণ! তোমরা কি মনে করো যে, তারা গঙ্গা নদীকে পশ্চিম দিকে প্রবাহিত করতে পারবে?’
ভিক্ষুগণ উত্তর দিলেন-‘না ভন্তে।’
‘কেনো এরকম’? বুদ্ধ জানতে চাইলেন।
উত্তরে তাঁরা জানালেন-‘ভন্তে! গঙ্গা নদী পূর্বের দিকে প্রবাহিত হয়। ইহাকে পশ্চিমে প্রবাহিত করিয়ে দেওয়া সহজ নয়। তাতে লোকদের কষ্টের সীমা থাকবেনা।
ভিক্ষুগণ! এরকমই, আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গের অনুশীলনকারী ভিক্ষুকে রাজা, রাজমন্ত্রী, মিত্র, উপদেষ্টা বা অন্য কোনো বন্ধু-বান্ধব লোভের বশীভূত করতে আহ্বান করে যে-‘ওহে! গেরুয়া বস্ত্র কেনো পরিধান করেছো? কেনো মস্তক মুণ্ডন করে রয়েছো? এসো, গৃহে অবস্থান করে কামসুখ সমূহ ভোগ করো এবং পূণ্য করো অর্থাৎ গৃহস্থ জীবনে আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গের অনুশীলন করো।’
ভিক্ষুগণ! তখন এরূপ হওয়া সম্ভব নয় যে, সে শিক্ষাপদকে ত্যাগ করে গৃহস্থ হবে। কেনো এরকম?’
‘ভিক্ষুগণ! যে ভিক্ষু দীর্ঘকাল পর্যন্ত যে চিত্ত বিবেকের দিকে নিয়োজিত রয়েছে, তারপক্ষে গৃহস্থাশ্রমের দিকে অগ্রসর হওয়া সম্ভব নয়।
ভিক্ষুগণ! ভিক্ষু আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ কিভাবে অনুশীলন করবে?
ভিক্ষুগণ! ভিক্ষুর সম্যক দৃষ্টি হলে তখনই সম্যক সঙ্কল্প হয়, সম্যক সঙ্কল্প হলে তখন সম্যক বাক্য হয়, সম্যক বাক্য হলে কর্মান্ত হয়, সম্যক কর্মান্ত হলে সম্যক আজীব হয়, সম্যক আজীব হলে সম্যক ব্যায়াম হয়, সম্যক ব্যায়াম হলে সম্যক স্মৃতি হয় এবং সম্যক স্মৃতি হলে সম্যক সমাধি হয়।
অনুরূপভাবে যেমন মিথ্যা দৃষ্টি হলে তখন মিথ্যা সঙ্কল্প, মিথ্যা বাক্য, মিথ্যা কর্মান্ত, মিথ্যা আজীব, মিথ্যা ব্যায়াম, মিথ্যা স্মৃতি এবং মিথ্যা সমাধি হয়ে থাকে। ইহা হল বুদ্ধ বচন।
সম্ভবত: সকলে নিজেকে সম্যক দৃষ্টি সম্পন্ন মান্য করে থাকে। এজন্য আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গের অনুশীলন অর্থাৎ শীল-সমাধি-প্রজ্ঞার একসাথে তিনটির অনুশীলন দশদিন বিদর্শন ভাবনার শিবিরে পূর্ণ হয় বলে আচার্য এবং অনুশীলনকারীরা মনে করে থাকেন। কেননা তাঁরা তথাকথিত ধম্মে প্রতিষ্ঠিত। ভিক্ষু হয়ে ধ্যান অনুশীলন করার পক্ষে তাঁরা বলেননা। আমি দেখেছি বর্তমানে অনেক বিদর্শনাচার্যও রয়েছেন এবং বিভিন্ন ধ্যান কেন্দ্রে বিদর্শন ভাবনা পরিচালনা করছেন তাঁদের অধিকাংশই ত্রিরত্নের প্রতি যথাযথ গৌরব যেমন নাই, তেমনি আর্য বিনয়েও বিনীত নয়। তাঁরা আর্য ধম্মের সিদ্ধান্তের সাথেও পরিচিত নন। আর্য দৃষ্টির সাথেও অপরিচিত এবং তাঁদেরকে আর্য সৎপুরুষও বলা যাবেনা।
তাঁরা পরিয়ত্তি, পটিপত্তি ধম্মে পরিপক্ক নন, যদি সেরকম হতো তাহলে ভুল শিক্ষা অর্থাৎ ত্রিরত্নের প্রতি অগৌরব রাখতে পারতেননা। তথাগত বুদ্ধ বৈরাগ্যের জন্য, সম্যক দৃষ্টি সম্পন্নদের জন্য আর্য অষ্টাদশ মার্গ সোজা রাস্তা বলে অভিহিত করেছেন। মিথ্যাদৃষ্টি হয়েও এবং ভুল শিক্ষার সমর্থন করেও কিভাবে বিদর্শন আচার্য হওয়া যায়?
এ বিষয় সমূহ চতুর্পরিষদে পরিস্কার হওয়া প্রয়োজন নয় কি?
অঙ্গুত্তর নিকায়ে তথাগত বুদ্ধ বলেছেন-‘নিপ্পপঞ্চারামস্সাযং ধম্মো পপঞ্চারতিনো, নাযং ধম্মো পপঞ্চারামস্স পপঞ্চরতিনো’তি।’
অর্থাৎ নিষ্প্রপঞ্চের জন্যই হল এ ধম্মের উপযোগী, প্রপঞ্চ সম্পন্নদের জন্য নয়।
ভগবান তথাগত বুদ্ধ বলেছেন যে, ছোট আপত্তিকে বড় আপত্তি এবং বড় আপত্তিকে ছোট আপত্তি বললে, ধম্মকে অধম্ম (যা তথাগত কখনও বলেননি) এবং অধম্মকে ধম্ম বললে, বুদ্ধ ভাষিতকে অবুদ্ধ ভাষিত এবং অবুদ্ধ ভাষিতকে বুদ্ধ ভাষিত বললে, বুদ্ধ আচরণকে অ-আচরণ এবং অ-আচরণকে বুদ্ধ আচরণ (দশদিনের ধ্যান শিবিরকে একমাত্র আচরণ বলা, ভিক্ষুর কাছ হতে সূত্র শ্রবণ করা, জন্ম হতে মৃত্যু পর্যন্ত ধম্ম কার্যাদিকে কর্মকাণ্ড বলে উপহাস করাকে ধম্মকে অধম্ম বলা হয়, সঙ্ঘভেদ করা হয়। তাতে প্রজ্ঞার ক্ষেত্র লোপ পেয়ে যায়।
ভিক্ষুদেরকে বুদ্ধ যা বলেছিলেন তা স্মরণ থাকা উচিত যে, ভিক্ষুগণ! যে ভিক্ষু দীর্ঘকাল পর্যন্ত চিত্ত বিবেকের দিকে অগ্রসর হয়েছে, তার পক্ষে গৃহস্থদের কামভোগের দিকে অগ্রসর হওয়া অসম্ভব।
অর্থাৎ কায়, বাক্য এবং মনকে সংযত করে যে ভিক্ষু শীল, সমাধি, প্রজ্ঞাকে জাগ্রত রেখে চিত্ত বিবেকের দিকে নিয়োজিত আছেন, তিনি কখনও গৃহস্থের দিকে ধাবিত হতে পারেননা।
বুদ্ধ তথাগত সংযুক্ত নিকায়ের অপ্রমাদ বর্গে ইহাও বলেছেন যে-ভিক্ষুগণ! এমনিতেই যত প্রকার কুশল ধম্ম রয়েছে, সবের মূলধার হল অপ্রমাদ। অপ্রমাদকেই ধম্মের অগ্র বলে মান্য করা হয়।
ভিক্ষুগণ! এরকম আশা করা হয় যে, অপ্রমত্ত ভিক্ষু আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গের চিন্তন ও অনুশীলন করবে। ভিক্ষুগণ! অপ্রমত্ত ভিক্ষু কিভাবে আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গের চিন্তন এবং অনুশীলন করবে? ভিক্ষুগণ! ভিক্ষু বিবেক, বিরাগ এবং নিরোধের দিকে নিয়ে যাওয়ার সম্যক দৃষ্টির, সম্যক সঙ্কল্পের, সম্যক বাক্যের, সম্যক কর্মান্তের, সম্যক আজীবের, সম্যক ব্যায়ামের, সম্যক স্মৃতির এবং সম্যক সমাধির গভীর অনুশীলন করে থাকবে।
এখন কোথায় ভুল হচ্ছে? সমস্যা ইহাই যে, দশদিনের শিবির পদ্ধতিতে শরীরে যে বেদনা অনুভূত হয়, তা জানতে জানতে এবং সেগুলির প্রতি তটস্থ ভাব রাখা, স্মৃতির সাথে বেদনাকে জানা। বেদনা যাওয়ার জন্যই আসে এবং চলেও যায়। মনকে কখনও চঞ্চল হতে দেওয়া উচিত নয়। এজন্য শীল বিশুদ্ধি ও ত্রিরত্নের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা প্রয়োজন। চিত্তের একাগ্রতা সাধনই হল ধ্যান, এরকম আজকাল সবাই মান্য করে থাকে। ইহা ততো জটিল নয়। যে কেউ তাতে সুখ অনুভব করে থাকে। অনেক ভিক্ষু শীল বিশুদ্ধি ও দৃষ্টিবিশুদ্ধিহীন গৃহস্থদের দ্বারা পরিচালিত ভ্রান্তিকেই প্রসারণের কাজে লিপ্ত আছেন। সম্যক শীলে প্রতিষ্ঠিত না হয়ে ভুল পদ্ধতি অনুসরণকারী কৃত্রিম যোগীকে বুদ্ধ নিগণ্ঠনাথপুত্রের অনুসারী বলে অভিহিত করেছেন। কিন্তু তথাগত মধ্যম নিকায়ের দেবদহ সূত্রে নিগণ্ঠকে জিজ্ঞাসা করেছেন-‘নিগণ্ঠ নাথপুত্র! তুমি কি রকম মান্য করছো? তুমি পূর্বে ছিলে ইহা জানো কি? নিগণ্ঠ না বোধক উত্তর দিয়েছেন।
তুমি যখন পূর্বে ছিলেনা তা জানতে পারছোনা, তাহলে কিসের ভিত্তিতে মান্য করছো যে, সুখ বেদনা, দুঃখ বেদনা এবং অদুঃখ-অসুখ বেদনায় অনুভূতি করলে এত এত অকুশল কর্ম কম হচ্ছে, এবং এত এত কুশল কর্ম বৃদ্ধি পাচ্ছে? এবং দুঃখ মুক্তি লাভ করো সরাসরি দশদিন শিবির পদ্ধতির দ্বারা, পূর্বে এরকম কতজন অরহত হয়েছেন? এবং কতজন ভবিষ্যতে এরকম ভিক্ষু উৎপন্ন হবেন, দশদিন শিবিরে সে রকম হবে বলে তথাগত কি বচন দিয়েছেন?
সে সকল ভিক্ষু-ভিক্ষুণীদের ধম্মকে প্রমাণ করা অনিবার্য। অন্যথায় ধম্ম অব্যাকৃত হয়ে যায়। ধম্ম অধম্ম হয়ে যায়। সঙ্ঘভেদ হয়।
সূক সূত্রে ভগবান বলেছেন যে, সঠিক ধারণা হতে নির্বাণ প্রাপ্তি হয়।’
এক সময় ভগবান শ্রাবন্তীতে অনাথ পিণ্ডিকের জেতবনারামে বিরাজমান ছিলেন। তখন বুদ্ধ ভিক্ষুদেরকে সম্বোধন করে বলেছেন-ভিক্ষুগণ! যেমন মিথ্যাদৃষ্টিতে বশীভূত ভিক্ষু কখনও উচ্চতর নির্বাণ লাভ করতে পারেনা।
ভিক্ষুগণ! সম্যক দৃষ্টির সাথে যুক্ত না হলে, মার্গকে ভালমতে অনুশীলনকারী না করা ভিক্ষু অবিদ্যাকে কেটে বিদ্যা উৎপন্ন করে, নির্বাণ কিভাবে সাক্ষাৎকার করতে পারেনা। কেনো পারেনা? ভিক্ষুগণ! কারণ তার ধারণা হল ভ্রান্ত, মিথ্যাদৃষ্টি সম্পন্ন।
এবং ভিক্ষুগণ! কোনো ভিক্ষু সম্যক ধারণাকে নিয়ে মার্গের ভালমতে অনুশীলন করে থাকলে নির্বাণের সাক্ষাৎ করতে পারেবে। এরকম সম্ভব। কেনো সম্ভব? কেননা তার ধারণা হল সম্যক দৃষ্টিসম্পন্ন।
ভিক্ষুগণ! সম্যক ধারণা যুক্ত হলে মার্গের সম্যকভাবে অনুশীলনকারী ভিক্ষু অবিদ্যাকে কেটে বিদ্যা উৎপন্ন পূর্বক নির্বাণের সাক্ষাৎ কিভাবে করতে পারে?
ভিক্ষুগণ! ভিক্ষু সম্যক দৃষ্টির চিন্তন করে থাকে, তাতে মুক্তি সিদ্ধ হয়।
ভিক্ষুগণ! এভাবে সম্যক ধারণ হতে যুক্ত হলে মার্গের ভালমতে অনুশীলন করে ভিক্ষু অবিদ্যাকে কেটে বিদ্যা উৎপন্ন পূর্বক নির্বাণের সাক্ষাৎ করতে পারে। বর্তমানে গৃহস্থ আচার্য বলে থাকেন যে, ‘আমি আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গের অনুশীলন করছি’ এভাবে কি যথার্থ অনুশীলন হয়? কেননা ভগবান বুদ্ধ বলেছেন-গৃহস্থের দ্বারা আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গের সম্যক অনুশীলন সম্ভব হতে পারেনা।
অর্থাৎ ভুল কি হয়েছে?
নিগণ্ঠ নাথপুত্তের ধ্যানে সুখদ, দুঃখদ, অসুখ-অদুঃখদ তিন প্রকার বেদনা জেনে থাকে এবং তথাগত বুদ্ধও এরূপ বলেছেন। কিন্তু উভয়ের মধ্যে পার্থক্য কি ইহাই বুঝতে চায়না। পার্থক্য হল ভিক্ষু হয়ে অপ্রমাদী থাকা, বেদনার স্পর্শ হেতু প্রত্যয়কে যথার্থভাবে জানতে থাকা।
ভগবানের বাণীকে মিথ্যা দৃষ্টির দ্বারা পরিচয় জানা যায়না। এ কথাই বুঝতে পারেনা। কেননা, নিজেকে সম্যকদৃষ্টি সম্পন্ন বলেই মনে করে থাকে। ভগবান বুদ্ধ সম্যক দৃষ্টিকে পূর্বগামী কেনো বলেছেন তা জানলে নিজের মধ্যে মিথ্যা ধারণা থাকতে পারেনা।
এজন্য সম্যক দৃষ্টিকে বুদ্ধ উপদিষ্টিত ধম্মে বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। বিদর্শন হল প্রজ্ঞা, ইহার সাথে মিথ্যাদৃষ্টি দ্বারা পরিচিত হওয়া যায়না।
তাই তথাগত বুদ্ধ ক্রমশ: ধম্ম শিক্ষা দিয়েছেন। অরহন্ত অবস্থা পর্যন্ত পৌঁছতে ক্রমশ: অগ্রসর হতে হয়। চার স্মৃতি প্রস্থান ভাবনা দ্বারা খুব বেশী হলে সাত বছর এবং কম হলে সাতদিন হতে এমনকি একদিনেও উপাদিশেষ অনাগামী বা অরহন্ত পদ লাভ করতে পারে এরকম বচন দিয়েছেন তথাগত বুদ্ধ মহাসতিপট্ঠান সূত্রের শেষে।
পঞ্ঞাবতো অযং ধম্মো, নাযং ধম্মো দুপ্পঞ্ঞস্সা’তি।’
প্রজ্ঞাবানের জন্য হল এ ধম্ম, ধম্ম দুষ্প্রজ্ঞাবানের জন্য নয়।
সম্যক দৃষ্টি এবং সাত বিশুদ্ধি পরিস্কৃত না হলে তখন সম্যক সমাধি কিভাবে সম্পন্ন হয়? সেজন্য দীর্ঘকাল ধ্যান সাধনা অনুশীলন করলেও অনেককে এখনও ত্রিরত্নের প্রতি অচল শ্রদ্ধায় প্রতিষ্ঠিত দেখা যায়না। বুদ্ধের নামে তারা কৃত্রিম শিক্ষাই প্রচার করছে।

Post a Comment

0 Comments

Ad Code

Responsive Advertisement