একসময় রাঙামাটি রাজবন বিহারের পুরাতন দেশনালয়ে পরম পূজনীয় বনভান্তে দেশনা করতে গিয়ে বলেন—মানুষের মনে অবিদ্যা থাকে, অজ্ঞানতা থাকে এবং মিথ্যাদৃষ্টি থাকে। মানুষ মাত্রই অবিদ্যা-অজ্ঞানতা দ্বারা আচ্ছন্ন। অজ্ঞানতার কারণে তোমরা- যেখানে সুখ নেই, সেখানে সুখের অসি-ত্ব কল্পনা কর; আপন নয়, অথচ এই দেহটি আপন মনে কর। পরের জিনিষকে সুখ বলে মনে কর। যেমন্ত ‘আমার স্ত্রী’, ‘আমার স্বামী’, ‘আমার পুত্র’, ‘আমার কন্যা’; এভাবে নিজের বলে দাবী কর, অধিকার প্রকাশ কর। কেন কর? অজ্ঞানতার কারণে। জ্ঞানে পরের জিনিষকে সুখ বলেনা, নিজের বলে দাবী করেনা। মিথ্যাদৃষ্টি কাকে বলে? চারি আর্য্য সত্য বিশ্বাস না করা, কর্মফল বিশ্বাস না করা; এটাই হল মিথ্যাদৃষ্টি। মিথ্যাদৃষ্টি মানুষ মহাপাপী। ভগবান বুদ্ধ অজ্ঞানকে তাড়িয়ে দিয়ে জ্ঞান লাভ করে, মিথ্যাদৃষ্টি জয় করে সম্যকদৃষ্টি হয়ে, মার সৈন্য জয় করে; পরম সুখ নির্বাণ লাভ করতে পেরেছিলেন। সেদিন ডি.সি. এসেছিল। তাকে বললাম—“এখানকার মানুষদের অবস্থা এখন খুবই খারাপ। চুরি করছে, ডাকাতি করছে, গাড়ি লুট করছে। এখানে সবাই গরীব। বাংলাদেশের সরকারও গরীব। সরকারের সামর্থ নেই যে এখানে মিল-ফ্যাক্টরি স্থাপন করবে। যদি মিল-ফ্যাক্টরি তৈরী করতে না পার, তাহলে মানুষরা এখানে চুরি-ডাকাতি করবে, পাপ করবে। ভাত খেতে না পেলে পেটের দায়ে বাধ্য হয়ে চুরি-ডাকাতি করবে। বহু ছাত্র এখন বি.এ. এম.এ. পাস করে চাক্রি পাচ্ছে না। চাক্মারা আমাকে বলছে—‘ভান্তে, শিক্ষিত ছেলেরা চাক্রি পাচ্ছে না, টাকা রোজগার করতে পারছে না; কাজেই এখন ওরাই গাড়ি লুট করছে, চুরি-ডাকাতি করছে’। সরকারের কি সামর্থ আছে? সে ছেলেদের বলুক—তোমরা চুরি-ডাকাতি করো না, আমি মিল-ফ্যাক্টরি তৈরী করে দিচ্ছি; এসবে চাক্রি করে ভাত খেতে পারবে।” তাকে আরো বললাম—“আগে চাক্মাদের জুম ছিল। সেখানে চাষ করে তারা বেঁচেছে। কিছু চাক্মা গাছ বিক্রি করে খেয়েছে, বাঁশ বিক্রি করে খেয়েছে, শণ বিক্রি করে খেয়েছে, জ্বালানি কাঠ বিক্রি করে খেয়েছে। চাক্মারা আমাকে বলছে—‘ভান্তে, এখন জুমও নেই, গাছও ফুরিয়েছে, বাঁশও ফুরিয়েছে, জ্বালানি কাঠও ফুরিয়েছে, শণও ফুরিয়েছে’। তাহলে কি করে ভাত খাবে চাক্মারা। সরকার যদি পারে মিল-ফ্যাক্টরি খুলে দিক; তা নাহলে মরতে হবে।” আচ্ছা, সরকারতো গরীব, সে দিতে পারছে না; আমি বলি আরেক রকম—“চুরি-ডাকাতি না করে, গাড়ি লুট না করে তোমরা পঞ্চশীল পালন কর। প্রাণী হত্যা করবে না, চুরি করবে না, ব্যভিচার করবে না, মিথ্যা কথা বলবে না, মদ খাবে না।” এসব পালন করলে ইহকাল-পরকালে সুখ হয়। আর যদি পালন না কর, তাহলে তোমরা সবাই নরকে পড়ে যাবে। সদ্ধর্ম শ্রবণ র্দূলভ। বুদ্ধ ধর্ম মার রাজ্যের ভিতর না করা উচিত। মার রাজ্যের ভিতর বুদ্ধ ধর্ম করলে মার বাঁধা দেয়, হীন মানুষকে নিয়ে থাকার জন্য বলে, নিন্দা করে। নির্বাণ রাজ্যে যদি বুদ্ধ ধর্ম কর, সেখানে বাঁধা নেই, বলার নেই। তাই সুখী হতে পারবে, দুঃখ থেকে মুক্ত হতে পারবে। আমি সারারাত ঘুমাইনা, বসে থাকি। একাই আমার সুখ হয়েছে, একাই আমি মুক্ত হয়েছি, একাই আমি বুঝতে পেরেছি বুদ্ধ ধর্ম। তোমরাতো আমার কথা শুননা। তাই এখন আমি সভায় বলবো—“তোমরা বুদ্ধ ধর্ম পারবে না, বুঝবে না। আমারটা আমার হয়েছে, তোমাদের খবর আর আমি বলতে পারবো না।” আমিতো মরবো বলে মনে করেছিলাম। এজন্য আমার শিষ্যদের বলি— “বুদ্ধ ধর্ম চেন? বুদ্ধ ধর্মে ভিক্ষুরা টাকা-পয়সা ধরতে পারে না, বেচা-কেনা করতে পারে না, হোটেলে ভাত খেতে পারে না, চায়ের দোকানে চা খেতে পারেনা, সাধারণ যাত্রীবাহী গাড়ীতে চড়তে পারেনা, সাধারণ যাত্রীবাহী লঞ্চে চড়তে পারেনা।” এরকম হলেতো মরার কান্ড, তাই না? আমাকে ভিক্ষুরা বলেছিল—“টাকা পয়সা না ধরলে মরবে তুমি।” কেন? “তোমাকে ভাত না দিলে, তুমি কোথায় খাবে?” আমি বহুবার উপোস রয়েছিলাম। জঙ্গলে থাকাকালে আমি ভগবান বুদ্ধকে বলতাম—“ভগবান বুদ্ধ, আপনি যা পালন করেছিলেন, আমিও তা পালন করবো। আপনার কথা অনুসরণ করবো। এতে যদি আমার মরতে হয়, মরবো।” বেঁচে আছিতো, তাই না। অনেক চাক্মা বলে—“পঞ্চশীল পালন করলে মরবো।” আমি বলছি—“পঞ্চশীল পালন করলে ধনী হয়।” ভিক্ষুরা যদি শীল পালন করে, দায়ক-দায়িকারা যদি শীল পালন করে ধনী হবে। ভিক্ষুরা যদি শীল পালন না করে, দায়ক-দায়িকারা যদি শীল পালন না করে; তাহলে ভিক্ষুরাও গরীব, দায়ক-দায়িকারাও গরীব। এখানে সবাই গরীব। চুরি-ডাকাতি করছে, মানা করলে শুনছে না। ঐদিন চাক্মারা আমাকে বলছে—বি.এ. এম.এ. পড়া ছেলে নাকি শতের চেয়ে বেশী মরে গেছে। আমিতো মনে করেছিলাম বার-চৌদ্দ জন। দুই শতের চেয়ে নাকি বেশী মরে গেছে, নিজেরা-নিজেরা মারামারি করে; আরো যাচ্ছে মরে। ওরা যদি এখানে আসত; আমার কাছে এসে বলত—“ভান্তে, আপনার কাছে চলে আসলাম।” আমি তাদেরকে বলতাম—“সুখ করবে না, ভোগ করবে না, পাপ নিয়ে সুখ করবে না; তারপরেই নির্বাণ সুখ হবে। সুখ করলে মার, ভোগ করলে মার, পাপকে নিয়ে সুখ করলে মার।” এসবতো একেবারে ভগবান বুদ্ধের মূলতত্ত্ব। তিনি সুখ করতে দিচ্ছেন না, ভোগ করতে দিচ্ছেন না। কারণ সুখ করলে দুঃখ, ভোগ করলে দুঃখ। এখনতো আমি প্রমাণ পাচ্ছি যে, স্বামী-সত্রীতে দুঃখ পাচ্ছে। বাপে-ছেলে, বাপে-মেয়ে, মায়ে-ছেলে, মায়ে-মেয়ে, বোন্তেবোনে, ভাইয়ে-ভাইয়ে, গ্রামে-গ্রামে দুঃখ পাচ্ছে। এই দুঃখটা দেখে তোমরা বল—“আমরা দেখতে পাচ্ছি, এসবের মধ্যে শুধু দুঃখ। আমাদের এসবের প্রয়োজন নেই।” তাহলে দুঃখ থেকে মুক্ত হতে পারবে। আসলে কি তোমাদের সুখ আছে? সুখ নেই। একজন বি.এ. পাস করা ছেলে আমাকে বলছে—“ভান্তে, আমি প্রব্রজ্যা গ্রহণ করে, আপনার কাছে একেবারে থাকব।” আমি তাকে বলেছি- “প্রব্রজ্যা দেব না। কারণ থাকতে পারবে না।” কেন? “সাজ-গোছ করা একটি মেয়ে দেখলে, তাকে বিয়ে করবে।” আমার কাছে আসলে মনে রাখতে হবে- মেয়েরা উত্তম নয়, মেয়েরা শ্রেষ্ঠ নয়। মেয়ে; এরা উত্তম নয়, শ্রেষ্ঠ নয়। মেয়েকে উত্তম মনে করিনি, শ্রেষ্ঠ মনে করিনি বলে আমি থাকতে পেরেছি। ভগবান বুদ্ধ বলেছেন—“নির্বাণই উত্তম, নির্বাণই শ্রেষ্ঠ, নির্বাণই মনোহর, নির্বাণই সুখ।” মেয়েরা উত্তম নয়, শ্রেষ্ঠ নয়; এদের বিয়ে করলে আশাহত হতে হয়, লজ্জা পেতে হয়, দুঃখ পেতে হয়। মেয়েরাও! তোমরা স্বামীকে নিয়ে থাকলে আশাহত হবে, লজ্জা পাবে, দুঃখ পাবে। তোমরা স্বামী-স্ত্রী-পুত্র-কন্যা সবাই একত্রে আছ বটে, তবে আশাহত হচ্ছ, লজ্জা পাচ্ছ, দুঃখ পাচ্ছ। নির্বাণে আশাহত হতে হয় না, লজ্জা পেতে হয় না, দুঃখ পেতে হয় না; সু-খ। আমারটা আমার হয়েছে, একাই আমি বুঝেছি বুদ্ধ ধর্ম। এসব তোমাদেরকে বললে বুঝবে না। কাজেই আমি পারবোনা আর তোমাদেরকে বলে। ফাং(আমন্ত্রন)এ-ও যেতে পারবো না। এখানে আমি যেরকম অবস্থা দেখেছিলাম, আমারতো মরে যাওয়ার কথা। বুদ্ধ ধর্মে প্রব্রজিতদের খাদ্য-দ্রব্য হাতে তুলে না দিলে, খেতে পারে না। আমাকে সেসময় পূরঞ্জয় মহাজন বলেছিল—“ভান্তেকে সিয়ং না দিলে, আমরা ভান্তেকে মেরে ফেলতে পারব।” একথা বলার পর সে তের দিনে মরেছিল। পিওর-ও বলেছিল এরকম কথা। এরা নরকে পড়বে। শান্তিময় দেওয়ান আর দীনেশ দেওয়ান্তও আমার সম্বন্ধে বাজে কথা বলেছিল। ওরা দুজনে আর্মির কাছ থেকে খুব করে মার খেয়েছিল। দীনেশ দেওয়ান আমাকে ‘ভন্ড-ভন্ড’ বলত। আর্মির কাছ থেকে এমন মার খেল, তারপর থেকে আর এ-কথা বলে না। তাহলে বুঝা যাচ্ছে সে-ই ভন্ড। আর্মিরাতো আমাকে সম্মান করে। তাকে কেন মারল? যে বিপদটি নেই, সে বিপদটি চাক্মারা ডাকে। তা হচ্ছে অজ্ঞানতা আর মিথ্যাদৃষ্টি। চাক্মারা খুব অজ্ঞান আর মিথ্যাদৃষ্টি। অজ্ঞান দূরীভূত হলে, মিথ্যাদৃষ্টি সম্যকদৃষ্টি হলে; দুঃখ থেকে মুক্ত হতে পারে, নির্বাণ উপলব্ধি করতে পারে। আহা! পূরঞ্জয় মহাজন বলেছিল ‘ভান্তেকে সিয়ং না দিলে, আমরা ভান্তেকে মেরে ফেলতে পারব’; তের দিনে সে পায়খানা করতে করতে শেষ। তাহলে বুদ্ধ ধর্মটিতে সার আছে। সে যা বলেছিল, তা কি পাপ কথা নয়? পূরঞ্জয় মহাজন বেঁচে থাকার সময়; শহরে গেলে হাঙ্গর মাছ কিনে আনত আধমণ-একমণ। অন্যেরা এক পোয়া কিনতে পারছে না, সে কিনছে আধমণ-একমণ। আর কিছু লোক আমাকে বলত, সে বাজারে গেলে নাকি তার জন্য অন্যরা বেতাগী খেতে পেত না; বাজারে নিয়ে আসা সব বেতাগীগুলো সে কিনে নিত। এখন মরার পর সে কত মণ হাঙ্গর মাছ খাচ্ছে, আর কত বেতাগী খাচ্ছে? একবার সে আমার কাছে প্রব্রজ্যা নিয়েছিল এক সপ্তাহের জন্য। আমি লক্ষ্য করেছিলাম, সে এখান থেকে সিয়ং খায় না। তার বাড়ী থেকে এনে দিলে, তারপর খেত। ভগবান বুদ্ধ বলেছেন, বাড়ী থেকে এনে না খাওয়ার জন্য, ধনী হলেও না খাওয়ার জন্য। সেটিও অহংকার। একটি কথা তোমরা চিন্তা করে দেখ, বেঁচে থাকার সময় সে ভাল-ভাল খাদ্য খেয়েছিল, মরার পর সে কি আর তা খেতে পাচ্ছে? খেতে পাচ্ছে না। তোমরা যদি শীল পালন কর, পুণ্য কর; তাহলে উচ্চ কুলে, ধনী কুলে জন্ম হবে, ভাল-ভাল খাদ্য খেতে পাবে। আর যদি পাপ কর, তখন ভাল খাদ্য কি, দুইবেলা ভাতও খেতে পাবে না। পূরঞ্জয় মহাজন মরার পর কি আবার মহাজন হয়েছে? হয়নি। তাই তোমরাও সাবধান। কারো সাথে অন্যায় করবে না, উত্তম ভাবে আচরণ করবে, কাউকে ক্ষতি করবে না, কাউকে হিংসা করবে না, কারো সাথে শত্রুতা করবে না। পঞ্চশীল পালন কর—প্রাণী হত্যা করবে না, চুরি করবে না, ব্যভিচার করবে না, মিথ্যাকথা বলবে না, মদ খাবে না। পঞ্চশীল পালন করে ছেলে-মেয়েরা মরণের পর দেবকুলে, রাজকুলে, ধনীকুলে জন্মায়। মেয়েরা শীল পালন করলে মরণের পর দেবকন্যা, রাজকন্যা অথবা ধনী মানুষের মেয়ে হয়ে জন্মাবে। ছেলেরা শীল পালন করলে মরণের পর দেবপুত্র, রাজপুত্র অথবা ধনী মানুষের ছেলে হয়ে জন্মাবে। শীল পালন করলে মরণের পর দেবকুলে, রাজকুলে, ধনীকুলে জন্ম গ্রহণ করে, তা বিশ্বাস করবে। শীল পালন না করলে, অহংকার করলে চন্ডাল, মেথর, ডোম আর নীচকুলে জন্মাবে। ভগবান বুদ্ধ অহংকার করার কারণে বোধিসত্ত্ব থাকাকালীন চন্ডাল হয়ে জন্মেছিলেন। এমন কি তিনি চন্ডাল জন্মে মারও খেয়েছিলেন। তোমরা অহংকার করবে না। অহংকার করলে দুঃখ পায়। মিথ্যাদৃষ্টি করবে না, সম্যকদৃষ্টি হও। কর্মফল বিশ্বাস কর, চারি আর্য্য সত্য বিশ্বাস কর। কর্মফল বিশ্বাস না করলে, চারি আর্য্য সত্য বিশ্বাস না করলে মহাপাপ। চাক্মারা আমাকে বলছে—কলেজের ছেলে শতের চেয়ে বেশী গোলা-গুলি করে মরে গেছে। এরা প্রায় সবাই বি.এ. এম.এ. পাস করা ছেলে। ওরা যদি এখানে আসত, বুদ্ধ ধর্মটি কি আরো উজ্জ্বল হতো না? শুধু-শুধুই মরে গেল। বাবা-মারা এত টাকা-পয়সা খরচ করে বি.এ. এম.এ. পড়িয়েছে; টাকাগুলি কি বরবাদ নয়? নরকেও পড়ে গেল। এসব হচ্ছে কেন? শিক্ষার দোষে। সন্তোষ বলছে—“আমার দলে আস।” প্রসীত বলছে—“আমার দলে আস।” সন্তোষও পড়বে নরকে, প্রসীতও পড়বে নরকে। সন্তোষ কয়দিন বাঁচবে? এক হাজার বছর বাঁচবে কি? প্রসীত বাঁচবে কি এক হাজার বছর? তাহলে ওরা সেসব কেন করছে? তোমরা সেই পাপ কাজগুলি করবে না। কেউ নিজে-নিজে পাপ কাজ করে, আর কেউ অপরের কথায় পাপ কাজ করে। যেমন্ত একজন চুরি করেছে, তার বিচার হচ্ছে- “তুমি কি নিজের ইচ্ছায় চুরি করেছ, নাকি তোমাকে অন্য কেউ বলেছে চুরি করার জন্য?” সে যদি বলে—“আমি একা নই, অমুকের কথায় আমি চুরি করেছি।” তাহলে চুরি করার জন্য যে হুকুম দিয়েছে, তারও পাপ হবে, আর যে চুরি করেছে, তারও পাপ হবে। এখন পক্ষ-বিপক্ষের মানুষরা হুকুম দিচ্ছে কি? ‘অমুককে কেটে আস’, ‘অমুককে মেরে আস’। সেসব করলে পাপ হয়ে যায়। আমি-তো কাউকে বলছি না যে, “অমুককে কাট, অমুককে মার।” আমি সেসব বলি না। মাইনীতে যে ভিক্ষুরা মারামারি করেছে, তাদের গায়ের রং কাপড়গুলি নাকি সেখানকার ছেলেরা কেড়ে নিয়েছে। এসব করছে মার। বার্মায় হলে সেই ভিক্ষুরা জেল খাটত। বার্মার সরকার তাদেরকে তিনবছর জেলে বন্দী করে রাখত। বার্মা থেকে একজন ভিক্ষু এসেছিল; সে আমাকে বলেছে—বার্মায় নাকি চৌদ্দ হাজার দুঃশীল ভিক্ষুর কাপড় ফেলে দিয়েছে সেখানকার সরকার। আর যে ভিক্ষুরা নাকি অতিরিক্ত দোষ করেছিল তাদেরকে জেলে দিয়েছে। এভাবে বার্মার সরকার বুদ্ধ ধর্ম ঠিক করেছে সেখানে। বাংলাদেশে ভিক্ষুরা যা মন চায়, তাই করছে। এসব কেন করতে পারছে? কারণ, বৌদ্ধ সরকার নেই। বৌদ্ধ সরকার হলে সাজা পেত। কাজেই, আমি কোথাও যাবো না, পারা যাবে না আর। আর্মিরা আমাকে বলে—“আমরা আপনার কথা ধরবো, আপনি যা করতে বলেন, তা করবো।” আমাকে ব্রিগেডিয়ার বলছে—“বাংলাদেশের কোন্ ভিক্ষুটি বড়াই করছে; আমাদেরকে বলুন, বেঁধে আনি।” আমি তা করবো না। আমার কাছে একদল বাঙালি আসে, এখানে অনেক কিছু দান করে। ওরা আমাকে বলে—“ভান্তে, আপনার শত্রু কে-কে? আমাদেরকে বলুন, আমরা তাদেরকে শেষ করি।” যদি আমি তাদেরকে বলি, ‘অমুককে মার।’ মারবে, কি মারবে না? মারবে। কিন্তু, আমি কি এসব করবো? আমি প্রত্যেক প্রাণীকে দয়া করি। এরকম দেশে বুদ্ধ ধর্ম করতে পারবে না। কারণ আজ্ঞাচক্র না থাকলে, ধর্মচক্র রক্ষা করতে পারে না; স্বজাতি রাজা না থাকলে, নিজ ধর্ম বজায় রাখতে পারে না। বৌদ্ধ সরকার নেই, বুঝা যাচ্ছে এখানে বুদ্ধ ধর্ম পারবে না। এখানে চাক্মা-বড়ুয়ারা অশিক্ষিত ছেলেদের পড়ার জন্য ভিক্ষু হতে দেয়; কিন্তু বি.এ. এম.এ. পাস করা ছেলেদের ভিক্ষু হতে দেয় না। মার্মার মধ্যে ব্রহ্মদত্ত এম.এ. পাস করে আমার কাছে প্রব্রজ্যা নিয়েছে। তার বাবা-মা তাকে এখানে নিয়ে এসে, আমাকে বলেছিল—“ভান্তে, আমাদের ছেলেকে আপনার হাতে তুলে দিচ্ছি।” সে এখন জঙ্গলের ভিতর আছে। চাক্মা হলে এভাবে দিত না। এখন দুই দল থেকে বি.এ. এম.এ. পাস করা অনেক চাক্মা ছেলে মারা গেছে কাটাকাটি, মারামারি করে। এসব না ছাড়লে আরো শেষ হবে। এসমস্ত কাজগুলি করে একমাত্র অজ্ঞান, মূর্খরা। মূর্খ অনর্থকারী, অহিতকারী, দুঃখ সৃষ্টিকারী, দুর্বাক্য ভাষণ কারী। সবাই পণ্ডিত হলে, তারপর সুখ হবে। সন্তোষ যদি পণ্ডিত হয়, প্রসীত যদি পণ্ডিত হয়, কলেজের ছাত্ররা যদি পণ্ডিত হয়; শান্তি হবে। মূর্খদের সহ্য ক্ষমতা নেই, দয়া নেই, ক্ষমা নেই, মৈত্রী নেই; এরা পাপ কাজ করে, ক্ষুণ্ন মনে থাকে। পণ্ডিতরা সহ্য করে, দয়ালু, কুশল কার্যে নির্ভীক, ক্ষমা শীল, মৈত্রীময় এবং সবসময় অক্ষুণ্ন মনে থাকে। পণ্ডিত মানুষ নির্বাণ যেতে পারে। ভগবান বুদ্ধ বলেছেন—“হে ভিক্ষুগণ! মূর্খকে পন্ডিতে পরিণত কর, অসাধুকে সাধুতে পরিণত কর।” যে পঞ্চশীল পালন করে, সে সাধু; যে পঞ্চশীল পালন করেনা, সে অসাধু। অসাধু মানুষ নরকে পড়বে, সাধু মানুষ স্বর্গে যাবে। ভিক্ষুরা কাপড় ছাড়লে আমি মানা করি না। কারণ অতীতের পারমী না থাকলে গায়ে চীবর রাখতে পারে না। পারমী না থাকলে ভিক্ষু অরহত্ব মার্গ ফল লাভ করেও একদিন পর মরে যায়। ভগবান বুদ্ধের ধর্মটি দেখলাম; ধনীর ছেলে, রাজার ছেলে না হলে পারবে না। গরীব মানুষের ছেলেরা ভিক্ষু হলে চাক্মারা বলবে—“সে ভাত খাওয়ার জন্য ভিক্ষু হয়েছে, আমরা তাকে কিছুই দেব না।” বড়ুয়ারাও বলে এরকম কথা; মারমারাও বলে। ভগবান বুদ্ধ রাজার ছেলে বলে তাঁকে এভাবে বলে না। একারণে আমি বেড়াতে লজ্জা বোধ করি। আমি এখন বড়ুয়াদের কাছেও যাই না। কেন যাই না? গেলে বলবে—“ভাত খাওয়ার জন্য এসেছেন।” খাগড়াছড়িতে গেলে চাক্মারা বলবে—“রাঙ্গামাটিতে খেতে পাচ্ছেন না, ভাল-খাদ্য খাওয়ার জন্য এখানে এসেছেন।” ইন্ডিয়া গেলে হিন্দুর ছেলে-মেয়েরা বলবে—“মনে হয় তিনি বাংলাদেশে খেতে পাচ্ছেন না, এখানে এসেছেন খাওয়ার জন্য।” বাংলাদেশ গরীব-তো, তাই আমি ইন্ডিয়া যেতে লজ্জা-বোধ করি। কাজেই, আমি এখানে না খেয়ে মরে যাবো, তবুও কোথাও যাবো না। সেদিন কুন্তিকে বললাম—“তোমাদের গ্রামের খালটিতে ব্রীজ করতে পারছ না। তোমার যদি চল্ল্লিশ কোটি টাকা থাকত, তাহলে দুপাশে রাস্তাটি বড় করে দিয়ে খালটির উপর একটি ব্রীজ তৈরী করতে পারতে। তাতে না-হয় তোমার দুই কোটি টাকা খরচ হত।” কিন্তু তোমরা গরীব। আমি লজ্জা বোধ করছি। আমি চাক্মাদের কাছেও যাবো না, বড়ুয়াদের কাছেও যাবো না, মারমাদের কাছেও যাবো না; লজ্জাবোধ করছি। লজ্জায় আমি ভাতও খেতে পারছি না। সামান্য একটু তরকারী বেশী খেলে সারারাত পেটে চিন্চিন্ করে। আমি আর ভাত খাবো না। ভাতও বন্ধ; কারণ খেলে দুঃখ পাচ্ছি। আমি যা করেছি, তাতে আমারটা আমার হয়েছে। আমার মতো করে তোমরা পারবে না। আমি জঙ্গলে উপোস রয়েছি, বৃষ্টিতে ভিজেছি, শীতে কষ্ট পেয়েছি; বার্মায় হলে এভাবে আমার কষ্ট পেতে হতো না। এখানে আমাকে খেয়াল করেনি। উপোস থাকতে হয়েছিল, বৃষ্টিতে ভিজে-ভিজে থাকতে হয়েছিল, শীতে কষ্ট পেতে হয়েছিল; এখন এসবের জন্য কষ্ট পাচ্ছি না, কুটির তুলে দিয়েছে। সময় থাকতে যখন শরীরে শক্তি ছিল, তখন যদি এই ঘর, এই গাড়ি, এই পিটকীয় বইগুলি দিত; আমি বুদ্ধ ধর্মটিকে আরো উন্নতি করতে পারতাম। এখন দিচ্ছে, কিন্তু আমি বুড়ো হয়ে গেছি; পারছিনা আর। ‘সতিপট্ঠানসুত্র’টিও বুড়ো কালে পেলাম। তখন খুঁজেও, পাইনি। এখন সমগ্র ত্রিপিটক খন্ডগুলি যদি ইংরেজীতে অনুবাদ করে দিতে পার; তারপর চাক্মা, বড়ুয়া, মারমাদের বলব- “তোমরা দিন দিন অধঃপাতে যাচ্ছ; শিক্ষিত মানুষরা এখানে আস। আমি থাকতে বুদ্ধ ধর্মটি উজ্জল করি, উন্নতি করি।” বর্তমান ভিক্ষুরা অধঃপাতে যাবে। কেন? এরা বি.এ. এম.এ পড়ার পর কাপড় ছেড়ে বিয়ে করবে। সেদিন একজন বড়ুয়া মেয়ে আমাকে বলছে, “ভান্তে, ভিক্ষুরা কেন এরকম? রং কাপড় গায়ে দিয়ে লেখা-পড়া করবে; বি.এ. এম.এ পাস করার পর কাপড় ছেড়ে বিয়ে করে। এমন কেন?” ব্রহ্মদত্ত গৃহীজীবনে এম.এ. পাস করে এখানে ভিক্ষু হয়েছে; তাকে বলেছি, “ তুমি যে এম.এ. পাস, তা প্রকাশ করবে না। বোকা সেজে থাকবে। তা-নাহলে মেয়েরা বিয়ে করতে চায়বে।” আমাকে বলেছে—গপ্পো ভিক্ষু নাকি খাগড়াছড়িতে গিয়ে ইংরেজীতে ধর্ম কথা বলেছিল, তা দেখে একটি মেয়ে তাকে বিয়ে করেছে। তাহলে মেয়েরা তোমরা খারাপ! বিহারে নানা রকমের মানুষ আসা-যাওয়া করে; এজন্য ভগবান বুদ্ধ বলেছেন—“তরুণ ভিক্ষুরা জঙ্গলে গিয়ে থাক। তরুণদেরকে মেয়েরা বিয়ে করতে চায়। জঙ্গলে চলে যাও; সেখানে বাঘে খেয়ে ফেললে, খেয়ে ফেলুক; সাপে কামড় দিলে, কামড় দিক; মৃত্যু আসলে, মৃত্যুকে বরণ করে নিবে; তবুও গ্রামে থাকবে না।” এসব আমি বইয়ে অনেক আগে পড়েছিলাম। তাই আমি যৌবনকালে জঙ্গলে-জঙ্গলে ছিলাম। আমাকে বাঘে খেয়ে ফেললে, খেয়ে ফেলুক; হাতিরা মেরে ফেললে, মেরে ফেলুক। কিন্তু বাঘেও খায়নি, হাতিরাও মারেনি; ফিরে এসেছি। মরণের পথ থেকে ফিরে এসেছি। আমার শিষ্যদেরকে বলি— জঙ্গলের ভেতর গিয়ে যদি তোমাদেরকে তিনদিনে বাঘে খেয়ে ফেলে, তখন তোমাদের বাবা-মারা আমাকে বলবে—‘আমাদের ছেলেদেরকে বাঘের কাছে খাওয়ালেন’। বাঘে খেলে খেয়ে ফেলুক। ‘স্মৃতিপঠ্টান সুত্র অঠ্টকথা’ বইয়ে আছে—একজন ভিক্ষুকে বাঘে খাচ্ছে, সে-সময় সে বাঘকে বলছে—‘হে! বাঘ, খাও মোরে।’ বাঘে খেতে খেতে সে অরহত মার্গফল প্রাপ্ত হয়েছিল। বাঘে খেতে খেতে অরহত হয়েছে, সেটিকে আমি ভাল মনে করি। বনের বাঘে খেতে খেতে অরহত হয়ে যাবে, কিন্তু মেয়ে বাঘে খেলে নরকে পড়বে। বইয়ে পড়েছি বাঘ দুইরকমের। একটি মেয়ে বাঘ, আর একটি জঙ্গলের বাঘ। গ্রামে থাকলে মেয়ে বাঘে খেয়ে ফেলবে। মেয়ে বাঘে খেলে নরকে পড়বে; আর জঙ্গলের বাঘে খেলে নির্বাণ যাবে। মেয়েদের বাঘ হচ্ছে ছেলেরা; ছেলেদের বাঘ হচ্ছে মেয়েরা। মেয়েরা যদি এখন প্রব্রজ্যা গ্রহণ করে, ছেলে বাঘে কি খাবেনা, তাদেরকে? মেয়েরা জঙ্গলের ভিতর থাকতে পারবে না, ছেলে বাঘে খেয়ে ফেলবে। জঙ্গলের ভিতর একটি ভিক্ষুণী থাকলে, পারবে কি থাকতে? ছেলেরা কি রাত্রে যাবে না, সেখানে? কিন্তু মেয়েরা ভেজাল করার জন্য জঙ্গলে যাবে না; ওদের ভয় করবে। তোমরা সাবধান। বুদ্ধ ধর্মে মানুষটি দুঃখ, ছেলে-মেয়ে দুঃখ, ধর্ম-কর্ম দুঃখ, মার রাজ্যে দুঃখ। তাই ‘মানুষ’ নিয়ে না থাকা, ‘ছেলে-মেয়ে’ নিয়ে না থাকা, ‘ধর্ম-কর্ম’ নিয়ে না থাকা, মার রাজ্যে না থাকা; শুধু নির্বাণ করা। ভগবান বুদ্ধের ধর্মে দেখলাম মানুষ নিয়ে থাকলে দুঃখ পেতে হয়, ছেলে-মেয়ে নিয়ে থাকলে দুঃখ পেতে হয়, ধর্ম-কর্ম নিয়ে থাকলে দুঃখ পেতে হয়, মার রাজ্যে থাকলে দুঃখ পেতে হয়। তোমরা বল—“আমরা জ্ঞান নিয়ে থাকব, সত্য নিয়ে থাকব, নির্বাণ রাজ্যে থাকব। মার রাজ্য ছেড়ে আমরা নির্বাণ রাজ্যে যাব; সেখানে সুখ, পুণ্য, মুক্ত। মার রাজ্যে থাকলে দুঃখ, পাপ, মুক্ত নেই।” এবার তোমাদের শক্তি কতটুকু আছে যাচাই কর। মার রাজ্য ছেড়ে নির্বাণ রাজ্যে কে যায়? তোমাদের মন, তোমাদের চিত্ত। মন্তচিত্ত যদি মার রাজ্য ছেড়ে নির্বাণ রাজ্যে থাকে, সুখ হবে। বল—“মন্তচিত্ত নির্বাণ রাজ্যে গেলে সুখ; মার রাজ্যে থাকলে দুঃখ পায়, পাপ হয়।” কাটাকাটি, মারামারি, চুরি-ডাকাতি করছে, আগুন লাগিয়ে দিচ্ছে, অন্যের মেয়েকে নিয়ে পালিয়ে যাচ্ছে; এসব সব মার রাজ্য। মার রাজ্যে থাকলে এগুলি হয়। এজন্য মার রাজ্য ত্যাগ করে নির্বাণ রাজ্যে থাকলে সুখ। বুদ্ধ ধর্মে কোথায় সুখ? মার রাজ্যে সুখ নেই, নির্বাণ রাজ্যেই সুখ। স্রোতাপত্তি, সকৃদাগামী, অনাগামী, অরহত, মার্গস', ফলস', নির্বাণ; এসব হচ্ছে নির্বাণ রাজ্য। তাহলে তোমাদের সামর্থে কুলায় নাকি দেখ। সবাই বল—“মার রাজ্য ছেড়ে আমরা নির্বাণ রাজ্যে যাব; সেখানে পরম সুখ, পাপ নেই, দুঃখ থেকে মুক্ত হতে পারব। মার রাজ্যে থাকব না।” একথা বলে শেষ করে দিলাম।


0 Comments