Hot Posts

6/recent/ticker-posts

Ad Code

ধর্মের অপব্যবহার ড. বরসম্বোধি ভিক্ষু

 

যখন তথাগত বুদ্ধ সত্যনুসন্ধান অর্থাৎ দুঃখ মুক্তির উপায় অনুসন্ধান করার পর দিকে দিকে ধম্মোপদেশ প্রদানের জন্য লোকের দ্বারে দ্বারে গিয়ে পিণ্ড অর্থাৎ আহার গ্রহণ করতেন, তখন তিনি কেবল স্বীয় ক্ষুধা নিবারণের জন্য পর্যাপ্ত অন্নই গ্রহণ করতেন। কেননা তিনি ছিলেন গৃহত্যাগী এবং অন্ন গ্রহণের জন্য স্বীয় পিতার প্রাসাদে ফিরে যেতে পারতেননা। তিনি ছিলেন ভোজনে মাত্রাজ্ঞ অর্থাৎ যতটুকু প্রয়োজন কেবল ততটুকুই গ্রহণ করতেন। সংগ্রহে রাখার জন্য খাদ্য যেমন বহন করতেননা, তেমনি ব্যবহার্য পাত্র-চীবর ব্যতীত অতিরিক্ত অন্য কোনো বস্তু সামগ্রীও সঙ্গে নিতেননা। অল্পাহার, অল্পে তুষ্ট থাকার পদ্ধতি তিনি নিজেও অনুশীলন করতেন এবং তাঁর অনুগামী শিষ্য-শিষ্যাদেরকেও তিনি অল্পে তুষ্ট থাকার শিক্ষা প্রদান করেছেন।
ভগবান তথাগত বুদ্ধ ইহাও বলেছিলেন যে, আমার মতো গৃহত্যাগ করে নির্জন জঙ্গল বা অরণ্যে বসবাস করা, ঘর ঘর হতে খাদ্যান্ন সংগ্রহ করে ভোজন করা সকলের জন্য আবশ্যক নয়। বুদ্ধ তথাগত বলেছেন-ব্যক্তি স্বীয় পরিবার-পরিজন, স্ত্রী-পুত্র-কন্যার সাথে অবস্থান করেও পাপ ও কপটতা রহিত হয়ে তথাগতের সম্যক ধম্ম মার্গ অনুসরণ করতে পারে। ইহাই হল তথাগতের শিক্ষা।
এখন আমরা দেখতে পাই যে, প্রত্যেক ধর্মের বিভিন্ন ধম্ম গুরুরা হাত পেতে ভিক্ষা করে থাকেন। তাঁরা বিভিন্ন দেবী-দেবতা, ভূত-প্রেত এবং নরকের ভয়ানক শাস্তির ভয় প্রদর্শন করে থাকেন এবং গৃহস্থের কাছ হতে উপাদেয় নানা খাদ্য, বস্তু ও অর্থ আদায় করে থাকেন। তাঁরা স্বর্গের প্রলোভন এবং নরকের অগ্নিতে জ্বলনের ভয় দেখিয়ে নিজেদের জন্য উপাদেয় ভোগ্য বস্তু আদায় করেন এবং সেগুলির দ্বারা পরিবার-পরিজনও পোষণ করে থাকেন। অন্যান্য ধর্ম গুরুরা বিশেষ করে হিন্দু ধর্মের গুরু ব্রাহ্মণেরা শনির মতো সৌরজগতের বিশাল গ্রহের দিশা পরিবর্তন করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দিয়ে থাকেন, দেব-দেবী সম্পর্কিত মহান শক্তি বা প্রভাবের দাবী করে থাকেন এবং লোকদের নিকট হতে এগুলির নামে মোটা অঙ্কের অর্থ-সম্পদ হাতিয়ে নিয়ে আসছেন।
সমাজে অনেক দম্পতি রয়েছেন, যাঁরা নি:সন্তান হয়ে একাকীত্ব, দুঃখিত ও হতাশাগ্রস্থ জীবন-যাপন করছেন এবং নারীদের এরূপ অসহায় বন্ধ্যাত্বের সুযোগ নিয়ে দুর্বল মনের নারীদেরকে মুর্খ ও বেওকূপ বানিয়ে কিছু ধূর্ত, প্রতারক ও ভণ্ড ধর্মগুরু নানা বস্তু সামগ্রী তাঁদের কাছ হতে দফায় দফায় লুঠতে থাকেন। আমার জানা মতে, ভিক্ষুদের মধ্যেও এমন ভিক্ষু রয়েছেন যিনি এক এমনতর ধনাঢ্য অথচ ব্যথিত, দুঃখিত এবং নি:সন্তান দম্পতিকে সন্তান পাইয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রচুর অর্থ যেমন আদায় করে নিয়েছেন তেমনি বিভিন্ন অজুহাতে যথেচ্ছ বস্তু সামগ্রীও আদায় করেছেন। দম্পত্তি সন্তান প্রাপ্তির জন্য এতই অন্ধবিশ্বাসী হয়ে মরিয়া ছিলেন যে, গুরু যা বলেছেন অন্ধের মতো সব অনুসরণ করে যাচ্ছিলেন। এভাবে বেশ কয়েক বছর অপেক্ষা করার পরও যখন সন্তান প্রাপ্তি হচ্ছেনা, তখন গুরু তাঁর ভক্তকে দ্বিতীয় বিয়ের আদেশ দিলেন। গুরুর প্রতি অন্ধভক্তিতে ভক্ত দ্বিতীয় বিয়ে করলে সন্তান হবে মনে করে তাতেও সম্মত হয়ে আরেকটা বিয়ে করলেন। এবার গুরু বললেন যে একটা স্বর্ণের নৌকা দান করো, তাহলে সন্তান হবে। সে ভরসায় ভক্ত স্বর্ণের নৌকাও দান করলেন। এভাবে তাঁর কাছ স্বর্ণের নৌকা হতে আরম্ভ করে লক্ষ লক্ষ মূল্যের বস্তু ও অর্থ লুণ্ঠন করেছিলেন। এত কিছু করার পরেও দ্বিতীয় স্ত্রী হতেও যখন সন্তান হচ্ছেনা তখন বলা হল-‘আপনার কর্মে সন্তান নাই।’ অতঃপর দম্পতি ক্ষুদ্ধ হয়ে সে গুরুর সাথে জীবনের জন্য সম্পর্কই কেবল ছিন্ন করেননি, ভিক্ষুদের প্রতিও তারা বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়েছেন। এরকমভাবে না জানি কত দম্পতিকে যে এ সকল ধম্মগুরু ও তাঁর শিষ্যরা প্রতারণা করেছেন। উক্ত দম্পতিকে মুর্খ বানিয়ে অর্থ আদায় করে নিজের স্বার্থই হাসিল করেছেন। এভাবে নানাভাবে ফাঁদ পেতে বিভিন্ন ধর্মগুরুরা অপকর্মের মাধ্যমে অর্থ লুঠের কাজে লিপ্ত রয়েছেন। এগুলি ধম্মের জন্য কী যে হানিকর তা আর বলার অপেক্ষা রাখেনা।
দ্বিতীয়ত: দেব-দেবীদেরকে সৃষ্টি করেছেন পুরোহিতেরা এবং এগুলির বদনামও করে পুরোহিতেরা। স্বর্গ-নরক বর্ণনা এবং দেব-দেবীদের অপার শক্তি তথা প্রভাবে কথাও তাঁরা বলে থাকেন। পুরোহিতদের দ্বারা প্রসারিত অনেক পরম্পরার বিষয়ে জিজ্ঞাসু ব্যক্তিরা আজ প্রশ্ন উত্থাপন করছেন। যদি পুরোহিত তথা ধম্মগুরুগণ নিজেদেরকে সংশোধন না করেন, তাহলে বিজ্ঞান মনস্ক শিক্ষিত সমাজের কাছে ধম্মগুরুগণ ভবিষ্যতে প্রশ্নবাণে আরও অধিক জর্জরিত হবেন এবং ধম্মকে হাঁস্যকর করে তুলবেন।
যে সকল দেবী-দেবতা এবং ধম্মগুরুর উপর প্রশ্ন করা হচ্ছে, আইন-কানুন তাঁদের বিরুদ্ধে নয়। আমার মতে আইন-কানুন অবৈজ্ঞানিক, অবাস্তব আস্থা বা বিশ্বাসের ভিত্তিতে তৈরী হওয়া উচিত নয়। বিজ্ঞান ভিত্তিক বাস্তব আইন তৈরী করে এ সমস্ত অলৌকিক চমৎকারিক শক্তির নামে প্রতারক, ভণ্ড, ঠকবাজ, চাটুকার ও লোভী ধম্মগুরু যাঁরা সর্বদা লুণ্ঠনে ব্যস্ত, তাঁদের বিরুদ্ধে কঠোর আইন হওয়া প্রয়োজন। দুঃখী, হতাশা গ্রস্থ ও মানসিক দুর্বল লোকদেরকে মুর্খ বানিয়ে প্রতারণা করে মনস্কামনা পূরণ ও পুণ্য পাইয়ে দেওয়ার নামে অর্থ ও সম্পদ লুঠ করা বুদ্ধ শিক্ষার সরাসরি লঙ্ঘন। যা অধম্ম ব্যতীত অন্য কিছু নয়।

Post a Comment

0 Comments

Ad Code

Responsive Advertisement