সাত বছর গর্ভযাতনায় লাভীশ্রেষ্ঠ-ভদন্ত সীবলী।
বৈশালী রাজ্যের রাজা মহালী কুমার ও রাণী সুপ্রবাসা পরম সৌভাগ্যবান দমপতি। তথাগত বুদ্ধের ধর্ম দেশনা শুনিয়া উভয়েই স্রোতাপত্তি ফলে প্রতিষ্ঠিত হইয়াছেন। মহালী কুমারের ঔরসে, সুপ্রবাসার গর্ভে সীবলী কুমার জন্মগ্রহণ করেন। সুপ্রবাসার গর্ভে প্রতিসন্ধি গ্রহণ করিলে তাঁহাদের ধনরত্ন প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পাইতে থাকে। সকালে পাঁচ গাড়ী এবং বিকালে পাঁচ গাড়ী পূর্ণ হইয়া প্রত্যহ ধনরত্ন ও অলঙ্কারাদি আগমন করিতে থাকে। মহালি কুমার ও সুপ্রবাসা ইহাতে বিস্মিত হইলেন এবং প্রতিবেশীগণও সকলে আশ্চর্যান্বিত হইয়া সুপ্রবাসার গর্ভস্থ সন্তান অতি পুণ্যবান বলিয়া ধারণা করিতে লাগিলেন। সুপ্রবাসার হস্ত সপর্শ করিয়া বীজ বপন করিলে সেই বীজ হইতে শত সহস্রগুণ ফসল উৎপন্ন হয় এবং তাঁহার হস্ত স্পর্শ করিয়া গোলায় শস্য রাখিলে সেই শস্য নিঃশেষ হয় না- যতই খরচ করা হোক না কেন অফুরন্ত থাকিয়া যায়। সকলেই বিস্ময়াপন্ন হইয়া দেখিলেন সুপ্রবাসা কোন পুণ্যবান সন্তান প্রসব করিবেন। কিন্তু দশ মাস, দশ দিন অতিবাহিত হইলেও সুপ্রবাসা সন্তান প্রসব করিলেন না। গর্ভস্থ সন্তান গর্ভেই রহিল।
সাত বৎসর, সাত মাস, সাত দিন পূর্ণ হইলে সুপ্রবাসার গর্ভ যাতনা আরম্ভ হইল। গর্ভমুক্ত না হইয়া সুপ্রবাসা অসহনীয় যন্ত্রণায় কষ্ট পাইতে লাগিলেন। তথাগত বুদ্ধ তখন বৈশালীতে অবস্থান করিতেছেন। সুপ্রবাসা বুদ্ধের দিকে করজোড়ে বন্দনা করিয়া মহালী কুমারকে বুদ্ধের আশীর্বাদ প্রার্থনা করিবার জন্য পাঠাইলেন। মুর্ছাহত সুপ্রবাসাকে রাখিয়া মহালী কুমার বুদ্ধ সমীপে উপনীত হওতঃ বুদ্ধকে বন্দনা করিয়া সুপ্রবাসার গর্ভ যন্ত্রণার কথা নিবেদন করিলেন। বুদ্ধ নিুাকে্ত গাথা দ্বারা স্বস্তিবাচন করিয়া বলিলেন- সুপ্রবাসা নিরোগ সুস্থ সন্তান প্রসব করুক।
“যতোহং ভগিনী অরিযায,
জাতিযা জাতো নাভি জানামি
সঞ্চিচ্চ পানং জীবিতা বোরোপেয্যা,
তেন সচ্চেন সোত্থিতে হোতু, সোত্থি গব্ভস্স।”
বুদ্ধ স্বন্তিবাচনসহ আশীর্বাদ করার সঙ্গে সঙ্গে সুপ্রবাসা সুস্থ হইলেন এবং সুস্থ, সবল, সুন্দর এক পুত্র সন্তান প্রসব করিলেন। নবজাত সন্তানের সুদিব্য দেহ কান্তি, প্রফুল্ল্ল বদনমন্ডল দর্শনমাত্র সকলের ক্ষোভ, রুক্ষতা বিদূরিত হওয়ার কারণে তাহার নাম সবাই সীবলী কুমার নামে অভিহিত করিলেন।
তথাগত বুদ্ধ সুপ্রবাসাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, “হে সুপ্রবাসা, মানব জন্ম বড় দুঃখজনক নহে কি? তোমার এই সন্তানকে এতদিন গর্ভে ধারণ করিয়া যে কষ্ট ভোগ করিয়াছ তাহা স্মরণ করিতেছ কি?” সুপ্রবাসা তখন বিনীতভাবে বলিলেন, “প্রভু, এইরকম ভাগ্যবান সন্তান হইলে শতবার আমি গর্ভধারণ করিতে রাজী আছি।”
সীবলী কুমার মাতৃগর্ভে যে লৌহ কুম্ভী নরকের যন্ত্রণা সদৃশ যন্ত্রণা ভোগ করিয়াছেন তাহা স্মরণ করিয়া শিহরিত হইলেন। তখন তিনি বুদ্ধের নিকট প্রব্রজ্যা প্রার্থনা করিলেন। তাঁহার প্রব্রজ্যা লাভের আকাঙক্ষা পিতা-মাতা মহালী কুমার ও সুপ্রবাসাকে অবহিত করিলে তাঁহারা সানন্দে অনুমোদন করিলেন। বুদ্ধ, সারিপুত্রকে প্রব্রজ্যা প্রদানের জন্য নির্দেশ প্রদান করিলেন। সারিপুত্র স্থবির বুদ্ধের আদেশে সাত বৎসর বয়স্ক সীবলী কুমারের কেশ মন্ডন করিবার সময় গর্ভযাতনার কথা স্মরণ করাইয়া দিলেন। সীবলী কুমার সেই গর্ভযাতনার কথা স্মরণ করিতে করিতে কেশ মন্ডন অর্ধেক হইলেই সীবলী অরহত্ত্ব লাভ করিলেন। সঙ্গে সঙ্গে অষ্টপরিষ্কার আসিয়া শরীরে সংযোজিত হইল এবং তিনি প্রবীণ স্থবিরের মর্যাদা প্রাপ্ত হইলেন। সীবলী অরহত্ত্ব লাভ করিবার সঙ্গে সঙ্গে তাঁহার পাত্র দিব্য খাদ্য-ভোজ্যে দেবতাগণ পরিপূর্ণ করিয়া দিলেন। সীবলী স্থবির বুদ্ধ ও ভিক্ষুসংঘকে সেই খাদ্য ভোজ্যে পূজা করিলেন। সেই হইতে ভিক্ষুসংঘের মধ্যে প্রচুর খাদ্য ভোজ্য লাভ হইতে আরম্ভ হইল।
তথাগত বুদ্ধ সীবলী স্থবিরকে জেতবনে নিয়া আসিলে ভিক্ষুসংঘকে আহ্বান করিয়া বুদ্ধ সীবলীর গুণাবলী প্রশংসা করিলেন। পূর্বকৃত পুণ্য ফলে ইহজন্মে সীবলী মহালাভী হইয়াছেন। তাঁহার পাত্র সবসময় উপাদেয় খাদ্যবস্তুতে পরিপূর্ণ থাকে।
সীবলী তাঁহার পুণ্য পরীক্ষার অভিপ্রায়ে হিমালয়ের জন-মানবহীন অঞ্চলে যাইবার মনস্থ করিলেন এবং তথাগত বুদ্ধের নিকট পাঁচশত ভিক্ষু সঙ্গে নিতে অনুমোদন প্রার্থনা করিলেন। তথাগত বুদ্ধ তাঁহার প্রার্থনায় তাঁহার সঙ্গে পাঁচশত ভিক্ষু গমন করিতে অনুমতি দিলেন। সীবলী স্থবির এই পাঁচশত ভিক্ষু সমবিভ্যাহারে হিমালয়ের জন মানবহীন অঞ্চলে পৌঁছিয়া এক বটবৃক্ষ মূলে অবস্থান নিলেন। তখন সেখানে বৃক্ষ দেবতা, গন্ধর্ব সকলেই অতীব আনন্দিত হইয়া, সীবলীর গুণাবলী কীর্তন করিতে করিতে তাঁহাদিগকে উপাদেয় খাদ্য-ভোজ্য দ্বারা পূজা করিতে মনস্থ করিলেন। এইভাবে সপ্তদিন পর্যন্ত সেই দেব গন্ধর্বগণ পূজা করিলেন। সেখান হইতে সীবলী স্থবির পাঁচশত ভিক্ষুসংঘসহ যথাক্রমে পান্ডব পর্বতে, অচিরবতী নদী তীরে, বরসাগর তীরে, হিমালয়ের চূড়ায়, গন্ধমাদন পর্বতে এবং অনবতপ্ত হ্রদে উপনীত হইলে দেব-যক্ষ-নাগ গন্ধর্বগণ আনন্দে উৎফুল্ল্ল হইয়া সীবলীর গুণ কীর্তন করিতে করিতে প্রত্যেক স্থানে সপ্তদিবসব্যাপী উপাদেয় দিব্য খাদ্য-ভোজ্য দিয়া পূজা করিলেন। সীবলী পঞ্চশত ভিক্ষুসহ হিমালয়ের জন-মানবহীন অঞ্চলে সাত সপ্তাহ অর্থাৎ সর্বমোট ঊনপঞ্চাশ দিবস পূজা লাভ করিয়া শ্রাবস্তীর জেতবনে প্রত্যাবর্তন করিলেন। ভিক্ষুসংঘ পুণ্যালোয় বিকশিত সীবলী স্থবির মহোদয়ের পুণ্যালোকময় সাহচর্য লাভে কৃতার্থ হইলেন এবং নিজেদেরকে মনে করিলেন পরম সৌভাগ্যবান। একসময় ভিক্ষুসংঘ সম্মিলিত হইয়া মহালাভী সীবলী স্থবিরকে জিজ্ঞাসা করিলেন- “আয়ুষ্মান সীবলী, আমরা ভিক্ষুসংঘ আপনার সঙ্গে হিমালয় পরিভ্রমণে গমন করিয়া যে পূজা-সৎকার সম্মান লাভ করিয়াছি, তা’ অতি আশ্চর্যের বিষয় আর কখনও দেখিনি এমন বিষ্ময়কর লাভ-সৎকার।”
অতঃপর ভিক্ষুসংঘ মহাপুণ্যবান সীবলীর লাভের বিষয় ভাবিয়া চমৎকৃত ও আনন্দিত হইলেন এবং জিজ্ঞাসা করিলেন- “আপনি কোন পুণ্যফলে এরূপ সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য ও মহালাভবান হইয়াছেন? আমরা মনে করি আপনি ষড়াভিজ্ঞ ও প্রতিভাশালী মহাপুরুষ। জাতিস্মর জ্ঞান আপনার নখ দর্পনে। বুদ্ধ শাসনে আপনার পুণ্য-প্রতিভা অত্যুজ্জ্বল। তখন ভিক্ষুসংঘ তাঁহার পুণ্যবলের প্রতি বিস্ময়াপন্ন হইয়া সীবলীর পূর্র্ #BMW
0 Comments