বর্ষ পরিক্রমায় আজ মাঙ্গলিক নববর্ষ ১লা বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দের প্রথম দিন। এদিন আমরা বাংলা ভাষাভাষী বাঙ্গালীরা পুরাতন বর্ষ ১৪৩২ বঙ্গাব্দকে বিদায় এবং নব বর্ষ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দকে স্বাগত জানাতে নানা অনুষ্ঠান মালার আয়োজন করে থাকি। বৈশ্বিক যুগে বাঙ্গালীরা এখন কেবল বঙ্গ ভূ-খণ্ডে সীমাবদ্ধ নেই। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। ১লা বৈশাখ উপলক্ষে বাঙ্গালীরা যাঁরা যেখানেই অবস্থান করুন না কেনো, সর্বত্র তাঁরা সাড়ম্বরে বাংলা নববর্ষ উদযাপন করে থাকেন এবং একে অপরের মঙ্গল কামনা করে থাকেন। আমিও সকলকে বাংলা মাঙ্গলিক নববর্ষের সুখ-শান্তি ও সমৃদ্ধি কামনা করছি।
বাংলা নববর্ষ প্রচলন কখন এবং কে করেছেন সে সম্বন্ধে ইতিহাস পাঠে জানা যায় যে, গৌড়রাজ শশাঙ্কই বাংলা সনের প্রবর্তন করেছিলেন। ৫৯৩ খৃষ্টাব্দে তাঁর রাজ্যাভিষেক হয়েছিল। সে বছর হতেই বাংলা সন চালু হয়। রাজা শশাঙ্ককে বলা হয় গৌড়রাজ। কেননা তখন বঙ্গ গৌড় নামেই অধিকতর প্রসিদ্ধি প্রাপ্ত হয়েছিল। ‘গৌড়’ শব্দ এসেছে ‘গুড়’ হতে। বঙ্গে তখন গুড়ের উৎপাদন ও ব্যবহার অধিক হতো। পিঠা, পায়েস সহ যাবতীয় মিষ্টান্ন প্রস্তুতে এবং আপ্যায়নে সর্বত্র হতো গুড়ের ব্যবহার। এজন্য বঙ্গকে গৌড়দেশ বলা হয়েছে এবং এর শাসককে গৌড়রাজ বলে অভিহিত করা হয়েছে।
রাজা শশাঙ্ক যখন বাংলা ক্যালেণ্ডার বা পঞ্জিকা প্রবর্তন করেছিলেন, তখন বাংলা বছরের প্রথম মাস ছিল ‘অগ্রহায়ণ’ মাস। অর্থাৎ অগ্রহায়ণ মাসের মাধ্যমে তখন বছরের প্রারম্ভ হতো।
রাজা শশাঙ্কের পূর্বে বাংলার বিভিন্ন অংশে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজাগণ শাসন করতেন। তাঁদের সবাইকে বিলুপ্ত করে শশাঙ্ক এক শক্তিশালী এবং বৃহৎ বঙ্গের শাসক হয়ে উঠেছিলেন। বর্তমানের উড়িষ্যা হতে আসামের কামরূপ পর্যন্ত তাঁর সম্রাজ্য বিস্তীর্ণ ছিল। কিন্তু তিনি ন্যায় পরায়ণ শাসক ছিলেন না। তিনি ছিলেন কট্টর ব্রাহ্মণ্যবাদী শৈব মতালম্বী শাসক। এজন্য তিনি বৌদ্ধ ধম্ম এবং বৌদ্ধদের উপর চরম আঘাত করতে সর্বশক্তি প্রয়োগ করেছিলেন। অনেক বৌদ্ধ বিহার তিনি নষ্ট করেছিলেন। তথাগত বুদ্ধের জ্ঞান লাভের পীঠস্থান বুদ্ধগয়ার মহাবোধি বৃক্ষকে নষ্ট করতে তিনি কয়েকবার অগ্নি সংযোগ করেছিলেন। ভিক্ষুদেরকে নির্যাতন করেছিলেন। বৌদ্ধদের উপর তাঁর এরূপ দমন-পীড়নের অনেক উদাহরণ পাওয়া যায়। তাঁর শাসনামলে চরম অমানবিক অবস্থা বিরাজ করছিল সমগ্র রাজ্য ব্যাপী। এজন্য অচিরেই তাঁর বিরুদ্ধে প্রজাগণ ক্ষোভে ফেটে পড়েন। জন আন্দোলনে তিনি ৬২৫ খৃষ্টাব্দে ক্ষমতা চ্যুত হলে তাঁর পরিবর্তে প্রজাগণ বাংলায় সুশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে পালবংশকে ক্ষমতার ভার অর্পণ করেছিলেন। পালবংশের শাসকগণ প্রায় সাতশত বছর উড়িষ্যা, বিহার সহ বিশাল বাংলার অধীশ্বর ছিলেন। তাঁরা ছিলেন মহাযান বৌদ্ধ ধম্ম শাখার নিষ্ঠাবান অনুসারী। এজন্য তাঁরা বৌদ্ধ ধম্মের প্রচার-প্রসারে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন। বাংলার আনাচে-কানাচে পর্যন্ত তাঁরা অনেক সঙ্ঘারাম, স্তূপ, বুদ্ধ মূর্তি ও বোধিসত্বগণের মূর্তি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। বিহারের ভাগলপুরে বিক্রমশীলা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহীতে সোমপুর বিশ্ববিদ্যালয় সহ অনেক খ্যাতনামা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জনক ছিলেন পালবংশের শাসকগণ। নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় এবং বুদ্ধগয়া মহাবোধি মহাবিহারের সংরক্ষণ, সংবর্ধন এবং পৃষ্ঠপোষকও ছিলেন পাল রাজাগণ। কেবল তা নয় সে সময়ে তাঁরা বাংলা বছরের প্রথম মাস অগ্রহায়ণকেও পরিবর্তন করেছিলেন। এর পরিবর্তে তাঁরা বৈশাখকে বছরের শুরুতে এনেছিলেন। কেননা এ বৈশাখ মাসের পূর্ণিমা তিথিতেই রাজকুমার সিদ্ধার্থের জন্ম, বুদ্ধত্ব লাভ এবং মহাপরিনির্বাণ প্রাপ্ত হয়েছিলেন। এজন্য বৈশাখকে গুরুত্ব, গৌরব এবং মর্যাদা প্রদানের জন্য বছরের প্রথম মাসরূপে স্থাপন করা হয়েছিল। এ সম্বন্ধে কোলকাতা হতে প্রকাশিত প্রসিদ্ধ খবরের কাগজ দৈনিক ‘আনন্দ বাজার পত্রিকা’য় ১৫ই এপ্রিল ২০১৫ সালে ‘প্রথম বাংলা মাসের নাম ‘বৈশাখ’ হল কিভাবে’ শিরোনামে এক আলেখ্য ছাপানো হয়। নিম্নে তা হুবহু উদ্ধৃত করছি-
‘বর্তমান ক্যালেন্ডার বাংলা বছরের প্রথম মাস বৈশাখ। একসময় প্রথম মাসের নান ছিল ‘অগ্রহায়ণ।’ ‘অগ্র’ আগে ‘হায়ণ’ বছর। বছরের প্রথম মাস। এ সময় নতুন ধান ফলত, নবান্ন হত। বৌদ্ধ ধর্মের প্রভাবে বাংলা বছরের প্রথম মাস ‘অগ্রহায়ণ’ পাল্টে গিয়ে স্থান নেয় ‘বৈশাখ।’ এ মাসের পূর্ণিমায় (৬২৩ খৃ: পূ:) বুদ্ধের জন্ম। বৌদ্ধ প্রভাবিত বাঙ্গালীরা তাই বুদ্ধের জন্মমাসকে অগ্রাধিকার দিতে ‘বৈশাখ’ মাসকে বছরের প্রথম মাসরূপে স্বীকৃতি প্রদান করেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, বাংলা ভাষার (চর্যাপদ) শ্রষ্টারা হলেন বৌদ্ধ।’
আজকের বাংলা ভাষা তার মূল উৎস স্থল হল চর্যাপদ, যা বৌদ্ধ ভিক্ষুরা রচনা করেছেন। এমনকি বাংলা বর্ণমালার আদি উৎসও দেখা যায় সম্রাট অসোকের ধম্মলিপি হতে। সুতরাং বাংলা ভাষা, বাংলা হরফ এবং বাংলা মাসের প্রথম মাসের সাথে সরাসরি সম্বন্ধ রয়েছে বৌদ্ধ আবেগ, বৌদ্ধ ইতিহাস ও ঐতিহ্যের। যা ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত সত্য। জাতিসঙ্ঘের মাধ্যমেও এখন বিশ্বব্যাপী বুদ্ধপূর্ণিমাকে স্মরণ করে ‘বৈশাখ দিবস’ বা Vesak Day পালন করে থাকে।
বৈশাখের নববর্ষ উৎসব এখন বঙ্গীয় বৌদ্ধ বা বাংলার জনগণের মধ্যে আবদ্ধ নেই, বরং তা দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার দেশ গুলোতে যেখানে যেখানে বৌদ্ধ ধম্ম সম্প্রসারিত হয়েছে, সে সমস্ত দেশের অন্যতম আড়ম্বর পূর্ণ অনুষ্ঠানরূপে আত্ম প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে। তাঁরা ইহাকে ‘সংক্রান বা সংক্রান্তি’ উৎসব বলে থাকেন। নববর্ষকে ঘিরে বুদ্ধ স্নান, বিহার পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন, দান-শীলের অনুশীলন এবং পরস্পরের মধ্যে জল চিঞ্চন করা হয়। ছোটরা বড়দের পা ধৌত করে আশীর্বাদ নিয়ে থাকে। ঘরে ঘরে পারম্পরিক বিশেষ আহারের ব্যবস্থা করেও পরস্পরকে আপ্যায়ন করা হয়।
নতুন বছর মানে আনন্দ। মানুষ সবসময় নতুন কিছু পাওয়ার আগ্রহে অধীর থাকে। সুতরাং, নতুন বছরের শুরুতে সমস্ত অকুশল বৃত্তি মন হতে দূরে নিক্ষেপের জন্য আমাদের সকলকে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হওয়ার সঙ্কল্প করা উচিত। যদি খারাপ প্রবৃত্তি সমূহ দূর করতে না পারি তাহলে ‘Happy New Year’ বলার কোনো অর্থবহ হয়না। পুরাতন এবং নতুন একইভাবে গতানুগতিক হয়ে থাকে। তাই বছর পরিবর্তনের সাথে সাথে মানুষের মন-মানসিক স্বভাবেরও পরিবর্তন হওয়া অতীব জরুরী।


0 Comments