Hot Posts

6/recent/ticker-posts

Ad Code

শান্তির পদযাত্রায় বৌদ্ধ ভিক্ষু

 




আজ হতে প্রায় ছাব্বিশ শ’ বছর পূর্বে বিশ্বশান্তির অগ্রদূত তথাগত বুদ্ধ নিজেও প্রতিদিন মাইলের পর মাইল পায়ে হেঁটে গ্রাম হতে গ্রামান্তরে, নগর হতে নগরান্তরে পঁয়তাল্লিশ বছর পর্যন্ত অবিরাম ধম্ম অর্থাৎ শান্তির বাণী প্রচার করার জন্য Peace Walk করেছেন এবং তিনি তাঁর অনুগামী ভিক্ষুদেরকেও Walk for Peace করতে নির্দেশ প্রদান করেছেন। ভিক্ষুরা দিকে দিকে হেঁটে বিচরণ করে করে বহুজনের কল্যাণের জন্য এবং বহুজনের সুখের বিশ্ব শান্তির বাণী প্রচার করতে দুর্গম গিরি-পর্বত হতে মরু-কান্তার পর্যন্ত গমণ করেছেন। তিনি ইহাকে ‘চারিকং’ নামকরণ করেছিলেন। বুদ্ধের আজ্ঞাকে শিরোধার্য করে তখন হতে পরবর্তী সময়ে ভিক্ষুগণ দেশ-দেশান্তরে পদব্রজে গিয়ে বুদ্ধের অহিংস ও মৈত্রী-করুণাপূর্ণ শান্তির বাণী প্রসারিত করেছেন।
খৃষ্টপূর্ব তৃতীয় অব্দে সম্রাট অসোক বিশ্বে শান্তির বাণী প্রচারের জন্য ধম্মদূত রূপে যে নয়টি দলে বিভক্ত করে ভিক্ষুদেরকে প্রেরণ করেছিলেন তাঁরাও ভারতীয় উপমহাদেশ ছাড়াও এশিয়া-ইউরোপের বিভিন্ন প্রান্তে হাজার হাজার মাইল পদব্রজে যাত্রা করে বুদ্ধের অমেয় শান্তির বার্তা প্রচার করেছিলেন।
১৯৯২ সালের স্প্রীং সংখ্যা আমেরিকান প্রসিদ্ধ ‘Tricycle’ সাময়িকীতে স্বনামধন্য লেখক ও সাংবাদিক Rick Fields কর্তৃক লিখিত এক নিবন্ধে দাবী করা হয়েছে যে, খৃষ্টীয় পঞ্চম শতাব্দীতে আফগানিস্তান হতে একদল বৌদ্ধ ভিক্ষু চীনের হুইসেন ফুসাং (Hui Shen Fusang নামক ভিক্ষুর নেতৃত্বে আমেরিকা গিয়েছিলেন পায়ে হেঁটে। ক্রীষ্টোফার কলম্বাসের (১৪৫১-১৫০৬) ১০০০ বছর পূর্বে তাঁরাই ছিলেন আমেরিকা আবিস্কারক। তাঁরা আমেরিকায় তখন বুদ্ধের শান্তির বাণী ছড়িয়েছিলেন। পরে তিনি ‘How the swans came to the lake’ (A Narrative History of Buddhism in America) নামে বিখ্যাত পুস্তক রচনা করে বিস্তৃত বর্ণনা করেছেন।
তৃতীয় হতে সপ্তম শতাব্দী পর্যন্ত চীন হতে বৌদ্ধ ভিক্ষু ফা-হিয়েন (৩৩৭-৪২২), হিউয়েন সাং (৬০২-৬৬৪) এবং ইৎ সিং (৬৩৫-৭১৩) প্রমুখ পরিব্রাজকেরা মাসের পর মাস দুর্গম মরু-কান্তার, নদ-নদী, গিরি-পর্বত অতিক্রম করে পায়ে হেঁটে বুদ্ধ ভূমি ভারতে এসে বুদ্ধের বাণী শিক্ষা করেছেন এবং তাঁরা বুদ্ধের সাম্য, মৈত্রী, করুণা ও অহিংসার বাণী চীনে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন।
বৌদ্ধ ভিক্ষুগণ হলেন ধম্ম বা শান্তির দূত, যাঁরা পদব্রজে চলে পৃথিবীকে পরিমাপ করার জন্য বিশ্ব বিখ্যাত। সেকারণেই বৌদ্ধ ধম্ম বিশ্বের প্রথম বিশ্বধম্মে পরিণত হয়েছিল।
আমেরিকা যুক্ত রাজ্যে টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের ফোর্ট ওয়ার্থ (Fort Worth) স্থিত Huong Dao Vipassana Bhavana Center হতে ভিয়েতনামী থেরবাদী ধূতাঙ্গ পরম্পরার ১৯ জন বৌদ্ধ ভিক্ষুর একটি দল ভদন্ত পঞ্ঞাকারা থেরোর নেতৃত্বে বিগত ২৬শে অক্টোবর, ২০২৫ তারিখ থেকে শান্তি যাত্রা বা Walk for Peace প্রারম্ভ করেছেন। তাঁরা মহাকারুণিক বুদ্ধের ‘চরথ ভিক্খবে চারিকং ….. শিক্ষায় প্রেরণা লাভ করে শান্তির বার্তা দিতে পদযাত্রার উদ্দেশ্যে ২৩০০ মাইলের এ যাত্রা শুরু করেছেন। বর্তমানে বিশ্বব্যাপী অশান্তি, হিংসা, যুদ্ধের দাবানল দাউ দাউ করে জ্বলছে। দিকে দিকে চলছে মারণ অস্ত্রের ঝনঝনানি, রণ হুঙ্কার। পারমানবিক বোমাতঙ্কে মানব সমাজ সন্ত্রস্থ। বিশ্বে চলমান রয়েছে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, ফিলিস্তিন-ইজরাইল সংঘাত, ভারত-বাংলাদেশ যুদ্ধের টন টান উত্তেজনা, হিংসার অগ্নি গর্ভে জ্বলছে ইরান। পাকিস্তান, আফগানিস্তান, ভেনেজুয়েলা সর্বত্রই রক্তক্ষয়ী হানাহানি চলমান রয়েছে। আমেরিকা প্রভূত্ব বিস্তারে অস্ত্র ও সামরিক শক্তি প্রদর্শনে করে যাচ্ছে। সর্বত্র হিংসা, খুন, জাতি, ধর্ম বিদ্বেষ ব্যতীত কোথাও শান্তির বার্তা পাওয়া যাচ্ছেনা। বিশ্বময় এরকম হিংস্র নারকীয় পরিবেশে অহিংসবাদী শান্তির বার্তা বহনকারী বৌদ্ধ ভিক্ষুদের শান্তির পদযাত্রা বিশ্ব বাসীর জন্য অতীব তাৎপর্যপূর্ণ সন্দেহ নাই। আমেরিকা এবং সমগ্র বিশ্বে শান্তি, প্রেম, মৈত্রী, করুণা এবং ভ্রাতৃত্বের বার্তা দিতেই শান্তিকামী বৌদ্ধ ভিক্ষুদের আড়াই হাজার বছরের পারম্পরিক এ উদ্যোগ। মহান এ উদ্যোগ বিশ্বের শান্তিকামী কোটি কোটি মানুষের হৃদয় স্পর্শ করেছে।
হিংসায় উন্মত্ত বিশ্বে অনেকে তাঁদের অনুসৃত ধর্মকে শান্তির ধর্ম বলে প্রচার করলেও তাঁদের ধর্ম প্রতিষ্ঠায়, প্রচারণায় এবং আচরণে শান্তির লেশমাত্র দেখা যায়না। কেবল হত্যা, যুদ্ধ, লুণ্ঠন, ধর্ষণ ও ভয়-ভীতি প্রদর্শন ছাড়া বিশ্ব মানবতার কোনো বার্তা পাওয়া যায়না। তথাকথিত সে শান্তির ধর্ম সমূহই পৃথিবীতে ধর্মের নামে মানুষকে জাতি, গোত্র, সম্প্রদায়ে বিভক্ত করে যত কলহ-সংঘাত ও অশান্তি সৃষ্টি করে যাচ্ছে। এদিক থেকে বুদ্ধ এবং তাঁর অনুগামী ভিক্ষুরা বিনা অস্ত্রে, বিনা, যুদ্ধে, বিনা ক্রোধে, বিনা রক্তপাতে এমনকি বিনা বাক্য ব্যয়ে কেবল পায়ে হেঁটে অশান্ত পৃথিবী বাসীর মধ্যে শান্তির সমাচার ছড়াচ্ছেন। এজন্য বলা হয় Example is better than precepts অর্থাৎ প্রবচনের চেয়ে কর্মাদর্শই অধিকতর কার্যকরী।
বুদ্ধের আদর্শ অনুসরণ করে খৃষ্টপূর্ব তৃতীয় অব্দে সম্রাট অসোক প্রতিজ্ঞা করেছিলেন অস্ত্রে নয়, প্রেম-মৈত্রী দ্বারা বিশ্বজয় করবেন। তিনি তা করতে সফল হয়েছিলেন। বিশ্বে বর্তমানে সম্রাট অসোকের মতো অহিংসবাদী শাসকের প্রয়োজন। আমাদের সকলের মনে রাখা উচিত যে, শত্রুতার দ্বারা কখনও শত্রুতার অবসান হয় না। প্রেম-মৈত্রী ও ভ্রাতৃত্ব স্থাপনের মাধ্যমেই শত্রুতার অবসান হয়। ইহাই হল বুদ্ধের শিক্ষা। যতদিন বিশ্ব নেতৃবৃন্দ এবং ধর্মীয় নেতা-নেত্রীরা এ সত্য উপলব্দি করতে পারবেননা, ততদিন শান্তি স্থাপনের প্রয়াস সুদূর পরাহত। অন্য কোনো প্রচেষ্টা দ্বারা বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠা কখনো সফল হবেনা। বল প্রয়োগ, অস্ত্র শক্তি বা হিংসা-বিদ্বেষের মাধ্যমে কখনও শান্তি স্থাপন সম্ভব নয়। তাতে সাময়িক সফলতা আসলেও কখনও তা স্থায়ী সমাধান নয়। বৌদ্ধ ভিক্ষুদের ২৩০০ মাইলের এ শান্তি যাত্রা বিশ্বের শান্তিকামী মানুষের মনে ব্যাপক সাড়া জাগিয়েছে। তাঁদের যাত্রা আগামী ফেব্রুয়ারি মাসে ওয়াশিংটন ডিসিতে সমাপ্ত হওয়ার লক্ষ্য রয়েছে। প্রতিদিন তাঁরা ৩০ মাইল পথ খালি পায়ে হেঁটে চলেছেন।
পৃথিবীবাসী মানুষদের আরও অবাক করেছে বৌদ্ধ ভিক্ষুদের সাথে ভারতীয় ভূ-খণ্ডের এক নির্বাক পথকুকুরও এ শান্তি পদযাত্রায় সামিল হওয়ায়। বৌদ্ধ ভিক্ষুদেরকে সঙ্গ দিয়ে কোলকাতা হতে এ কুকুরটি চলতে চলতে আজ আমেরিকার রাস্তায় বিশ্বের মানুষদের হৃদয় জয় করে গৌরবের শীর্ষে আরোহন করেছে। শান্তির ধ্বজা বাহক এ কুকুরের নাম হল ‘আলোকা।’ আলোকা কোনো সাধারণ কুকুর নয়। সমগ্র বিশ্বে সে ‘Peace Dog’ বা শান্তি বাহক কুকুর রূপে চিহ্নিত হয়েছে। আলোকা নামে এ কুকুরটি ভারত হতে বৌদ্ধ ভিক্ষুদের সাথে রাশিয়া এবং এখন আমেরিকা পর্যন্ত সঙ্গে সঙ্গে হেঁটে বিশ্ব শান্তির অনন্য প্রতীক হয়ে উঠেছে।
অবহেলিত ও তিরস্কৃত পথ কুকুরটি কলকাতার গলি-রাস্তা ত্যাগ করে শান্তিকামী বৌদ্ধ ভিক্ষুদের সাথী হয়ে শান্তিদূত আলোকা রূপে পরিচিতি লাভ করেছে। মৈত্রীর এরকমই প্রভাব যে, হিংস্র প্রাণীও মৈত্রী ও মৈত্রীকামীদের সংস্পর্শে এসে সম্পূর্ণ অহিংস হয়ে যায়। আলোকা আজ পৃথিবীর দৃষ্টিতে বিশ্ব একটি কুকুর নয়, যথার্থই শান্তির দূত। ইহা হল বৌদ্ধ ভিক্ষুদের মৈত্রীর প্রভাব। অহিংসাপূর্ণ মৈত্রীর প্রভাবে ক্রোধী ক্রোধ ত্যাগ করে অক্রোধী হয়, হিংসা ত্যাগ করে অহিংস হয় এবং পশুর পশুত্ব ত্যাগ করে দৈবিক গুণে আলোকিত হয়। ইহাই হল বুদ্ধের শিক্ষা। যেমন দুর্দশ হত্যাকারী ও ভয়ানক হিংস্র অঙ্গুলিমালকে মহাকারুণিক বুদ্ধ মৈত্রীর বলে বিনা অস্ত্রে জয় করেছিলেন। যা অন্য কোনো মহাপুরুষের জীবনে দেখা যায়না।
আজকাল অধিকাংশ ভিক্ষুরা বুদ্ধের এরকম পায়ে হাঁটার চারিকা ভুলে গিয়েছেন। তাঁরা আজকাল সমর্থ থাকা সত্ত্বেও মানুষের কাঁধে চড়ে পর্যন্ত যাতায়াতে দ্বিধাবোধ করছেনা। এখন লোকের মধ্যে প্রকৃত শ্রদ্ধার চেয়ে অন্ধভক্তিই বৃদ্ধি পেয়েছে। বুদ্ধ কখনও কাঁধে চড়ে, রথে চড়ে বা অন্য কোনো বাহনে চড়ে ধম্ম প্রচার করেননি। তৎকালীন রাজা-মহারাজা বা ধনাঢ্য লোকদের মধ্যে বুদ্ধ এবং তাঁর শ্রাবক সঙ্ঘের প্রতি শ্রদ্ধা এতই প্রবল ছিল যে, ইচ্ছা করলে তাঁরা বুদ্ধকে রথারোহন বা অন্য কোনো সুলব্দ বাহনে যাতায়াতের ব্যবস্থায় করতে পারতেন। কিন্তু বুদ্ধ সেরকম নিজে কখনও করেননি এবং অন্যদের করতেও প্রেরণা দেননি। ধম্ম প্রচারে চারিকা অর্থাৎ হাঁটাকেই উত্তম মাধ্যম বিবেচনা করেছেন। সেজন্য পরিস্থিতি অনুকুল না হলেও তিনি হেঁটেছেন। এজন্য তাঁর সাথে জনসংযোগ হয়েছে বেশী এবং ধম্মেরও দ্রুত প্রসারণ হয়েছে। বুদ্ধের সময়ে কেবল দেবদত্ত স্থবিরকেই দেখা যায় লোকের কাঁধে চড়েছেন।

Post a Comment

0 Comments

Ad Code

Responsive Advertisement