নিম্নে প্রদত্ত শিল্প পেনেলগুলি প্রাপ্ত হয়েছে ভারতের অন্ধ্র প্রদেশ রাজ্যের প্রসিদ্ধ বৌদ্ধ স্থল অমরাবতীতে। সেখানে প্রচুর প্রাচীন বৌদ্ধ স্থাপত্যরে নিদর্শন ও স মমৃদ্ধ শিল্প-কলার স্বাক্ষর রয়েছে, যেগুলি স্বীয় বর্ণনাত্মক (Narrative) মূর্তিকলার জন্য বিশ্ব প্রসিদ্ধি লাভ করেছে। এখানে প্রদত্ত প্রথম পেনেল দু’টি হল চুল পদুম জাতক এবং মহাপদুম জাতকের (Culla Paduma Jataka and Maha Paduma Jataka) সাথে সম্বন্ধিত। পেনেলে প্রদর্শিত নৈতিক সংঘর্ষ এবং বর্ণনাত্মক সঙ্কেত উভয় জাতকদ্বয়ের মূল কাহিনীর সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ দেখা যায়।
জাতকের বর্ণনা হল এরূপ-‘প্রাচীন কালে বারাণসীতে একজন রাজা রাজত্ব করতেন। তাঁর পুত্র রাজকুমার পদুম ছিলেন অত্যন্ত গুণবান, ধম্মনিষ্ঠ এবং রূপবান। বাল্যকালেই তাঁর মাতার মারা গিয়েছিলেন এবং কিছু সময় পরে রাজা দ্বিতীয়বার পাণি গ্রহণ করেছিলেন। সে রাণী হয়েছিলেন রাজকুমার পদুমের বিমাতা (সৎমা)। পরবর্তী সময়ে সে রাণী সতীন পুত্র পদুম কুমারের রূপ-সৌন্দর্যে মোহিত হয়েছিলেন এবং তিনি কুমারকে নিজের দিকে প্রেমাসক্ত করতে প্রয়াস করছিলেন। কিন্তু পদুম কুমার ধম্ম এবং মর্যাদা রক্ষা করতে গিয়ে বিমাতার প্রস্তাব অস্বীকার করেছিলেন। তাতে অপমান এবং অসফলতার প্রতিশোধ নিতে ক্রোধান্বিত হয়ে ইর্ষান্বিত রাণী রাজার কাছে মিথ্যা অপবাদ লাগিয়েছেন যে, রাজকুমার পদুম তাঁর সাথে দুষ্কর্ম করতে চেষ্টা করেছেন।’
ইহাই হল এখানে নির্ণায়ক প্রসঙ্গ। যা কলাকার দ্বারা পেনেলে অতীব সুক্ষ্মতা এবং নিপুণতার সাথে রূপায়িত করেছেন। পেনেলের বাঁয়ের অংশ উল্লিখিত ঘটনার পৃষ্টভূমি প্রস্তুত করা হয়েছে। এখানে একজন পুরুষ শয্যায় শায়িত হয়ে বিশ্রাম করতে দেখা যাচ্ছে। সম্ভবত: তিনি হচ্ছেন পদুম কুমার এবং তাঁর কোলে একজন নারী কামাতুর হয়ে শায়িত আছেন। এ দৃশ্য অবস্থারই সঙ্কেত প্রদান করছে যে, রাণী সুযোগ পেয়ে রাজকুমারের সমীপে গিয়ে তাঁকে আকর্ষিত করার প্রয়াস করেছেন। যখন রাজকুমার জাগ্রত হয়ে চোখ খুললেন তখন তিনি জানতে পারলেন যে, শায়িত রমণী হলেন তাঁর বিমাতা। কালবিলম্ব না করে তখন তিনি শীঘ্রই আলাদা হয়ে গেলেন। সে স্থানের নিকটে একজন নারীকে সামনে যেতে দেখানো হয়েছে, যিনি হয়তো অভিযোগ করতে যাচ্ছিলেন। এরূপ সম্পূর্ণ দৃশ্য রাজ প্রাসাদের ভোগ, আসক্তি এবং তা হতে উৎপন্ন হওয়া নৈতিক স্খলনের ভূমিকাকে স্পষ্ট করে থাকে।
যখনই দৃষ্টি পেনেলের বামদিকে গিয়ে থাকে, কাহিনী স্বীয় চরম লক্ষ্যে পৌঁছতে থাকে। এখানে রাজকুমারকে রাজার নিকট উপস্থিত করা হয়েছে। রাজার সম্মুখে দাঁড়ানো রাজকুমার পদুম শান্ত, সংযমিত এবং স্থির রয়েছেন, যা তাঁর নৈতিক শক্তি এবং সত্যনিষ্ঠাকে প্রকট করে থাকে। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা অন্য পুরুষদেরকে নিজেদের মধ্যে বিচার-বিমর্ষ করতে দেখা যাচ্ছে। ইহা হল দরবারের দৃশ্য, যা রাণীর অভিযোগের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। ইহা হল সে ক্ষণ, যখন রাণীর মিথ্যা আরোপের ভিত্তিতে রাজকুমারকে দোষী সাব্যস্ত করে দণ্ড প্রদান করা হচ্ছে এবং রাজ্য হতে বহিষ্কৃত হওয়ার আদেশ প্রদান করা হয়েছে।
কাহিনী অনুসারে, রাজকুমারকে রাজ্য হতে বের করে দেওয়া হয়েছে এবং তাঁকে মৃত্যুর জন্যও প্রেরণ করা হয়েছে। কিন্তু তিনি আশ্চর্য জনকভাবে বেঁচে গিয়েছেন এবং বনে তপস্বী জীবন-যাপন করেছেন। অনেক পরে এসে ঘটনার সত্য প্রকাশিত হয়েছে এবং রাজা স্বীয় ভূলের উপলব্দি করতে পেরে অনুতপ্ত হয়েছেন। তিনি কুমারকে রাজ্যে ফিরিয়ে আনতে চাইলেন। কিন্তু পদুম কুমার বৈরাগ্যের মার্গকেই বেচে নিয়েছিলেন।
এভাবে এ পেনেলে কেবল একটি ঘটনার বিবরণকে চিত্রায়িত করা হয়নি, বরং নৈতিক সংঘর্ষের কঠিন রূপকেও ফুটিয়ে তুলেছেন। এখানে একদিকে কামের আসক্তি যেমন রয়েছে, অন্যদিকে সংযম, সত্য এবং ধম্মের পরীক্ষাও নিহিত রয়েছে। অন্তত: এ দৃশ্য ইহাই দর্শিয়ে থাকে যে, মিথ্যা আরোপ এবং অন্যায় পূর্বক সিদ্ধান্ত হল ক্ষণিকের জন্য। অপরদিকে সত্য এবং নৈতিকতা হল স্থায়ী এবং বিলম্বে হলেও সত্যেরই জয় হয়ে থাকে।






0 Comments