Hot Posts

6/recent/ticker-posts

Ad Code

কর্মের ফল এবং চেতনার গুরুত্ব ড. বরসম্বোধি ভিক্ষু

                  


ড. বরসম্বোধি ভিক্ষু ...........

প্রত্যেক কর্মের ফল তার বাহ্যিক রূপ এবং আড়ম্বর হতে নির্ণয় করা যায়না, বরং এর পেছনে লুকিয়ে থাকা উদ্দেশ্য এবং মানসিক চেতনা হতেই নির্ধারিত হয়ে থাকে। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, যদি কতিপয় লোক একই সময়ে একশত টাকা করে দান দিয়েছে। এখানে বাহ্যিকভাবে দেখতে গেলে প্রত্যেকের দান সমান বলে মনে হচ্ছে। কিন্তু তাদের অন্তরের উদ্দেশ্য তথা ভাবনা পৃথক-পৃথক হয়ে থাকলে এর ফলও পৃথক পৃথক হবে সন্দেহ নাই।
যেমন, কেহ এরূপ ভেবে দান করেন যে, যখন আমি তাঁর নিকট যাবো, তখন তিনি আমাকে খুব খাতির-যত্ন করবেন।
কেহ আবার এরূপ ভেবে দান করেন যে, এ দানের ফল আমার নিকট আগামীতে দ্বিগুণ হয়ে ফেরত আসবে।
অন্য কেহ আবার এরূপ ভেবে দান করেন যে, এ দানের ফল আমি আগামী জন্মে লাভ করবো।
কেহ এরূপও ভেবে দান করে যে, এ দানের ফলে আমার ব্রহ্মলোক প্রাপ্তি হবে।
কেহ আবার এরূপ কামনা করে দান করে যে, এ দানের ফলে আমার নির্বাণ লাভের হেতু হোক।
যদিও এখানে সকলে একই সমান অর্থ দান করেছে, কিন্তু তাদের দানের উদ্দেশ্য বা চেতনা ছিল ভিন্ন ভিন্ন। এজন্য বলা হয় যে, উদ্দেশ্য বা চেতনা অনুসারে ফলও ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে। এখানে অর্থের পরিমাণের চেয়ে চেতনাই মহান হয়ে থাকে। তাই বুদ্ধ ব্যক্ত করেছেন-‘চেতনাহং ভিক্খবে কম্মং বদামি।’ অর্থাৎ ভিক্ষুগণ! আমি চেতনাকেই কর্ম বলে থাকি।
দানের পাত্রের গুরুত্ব
—————————
দানের ফল এ বিষয়ের উপরও নির্ভর করে থাকে যে, আমরা কাকে দান দিচ্ছি। যদি কেহ একজন ক্ষুধার্ত ভিক্ষুককে দান দেন, তখন তার সাময়িক ক্ষুধার নিবৃত্তি হয়। যদি সে দান ধ্যানে মগ্ন থাকা কোনো তপস্বী বা ধ্যানরত সাধক-সাধিকাকে দেওয়া হয়, তখন তিনি ক্ষুধা নিবৃত্তি করে আরও উচ্চতর ধ্যান-সাধনার অনুশীলন করবেন।
উভয় দানে পূণ্য থাকলেও স্তর ভেদে কিন্তু পূণ্যের তারতম্য হয়ে থাকে। একজন ভিখারীকে প্রদত্ত দানের চেয়ে একজন ধ্যান-সাধনায় নিমগ্ন যোগীকে দানের ফল অনেকাংশে অধিক হয়ে থাকে।
প্রদত্ত দানের শুদ্ধিতার মহত্ব
————————————
প্রদত্ত দানের রাশি কিভাবে উপার্জিত হয়েছে, তার উপরও ফলের কম-বেশী হয়ে থাকে। যেমন, কেহ সৎভাবে ব্যবসা-বাণিজ্য করে, চাকরী করে অথবা শারীরিক পরিশ্রম করে দান দিয়ে থাকেন। আবার কেহ অসৎভাবে অর্থ উপার্জন অর্থাৎ প্রাণী হত্যা করে, চুরি-ডাকাতি-প্রতারণা-ছলনা করে, ব্যভিচার করে, মিথ্যা কথা বলে এবং মাদকাদি বাণিজ্য করে দান দিয়ে থাকেন। এ দু’ প্রকার দানের মধ্যে যিনি সৎভাবে উপার্জন করে দান দিয়ে থাকেন, তাঁর দানের গুরুত্ব ও ফল অধিক হয়ে থাকে।
প্রেরণা অর্থাৎ চিত্ত স্বভাবের স্থানই সর্বোচ্চে
———————————-
দানের চতুর্থ এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল আমরা কোন ধরণের প্রেরণায় দান দিচ্ছি।
তথাগত বুদ্ধের জীবন কালের এক ঘটনা এখানে উল্লেখ করছি। এক সময় রাজা প্রসেনজিৎ শ্রাবস্তীতে এক পূর্ণিমা দিবসে ভব্য আয়োজন করে মহান সঙ্ঘকে আহার এবং দীপাদি দান করেছিলেন। অত্যন্ত বৈভবের সাথে দানের সবকিছু সম্পন্ন হয়েছিল। সেসময় একজন দরিদ্র বৃদ্ধা মহিলা যাঁর কাছে দানীয় বস্তু বলতে কেবল সামান্য তেলই ছিল, তিনিও সেখানে দানোৎসবে পৌঁছলেন। তিনি অতীব শ্রদ্ধায় এবং শুদ্ধ চেতনায় তাঁর সামান্য তেলটুকু দান করে দীপ প্রজ্জ্বলন করেছিলেন। দরিদ্র বৃদ্ধা মহিলাটি পূণ্য কাজে অংশ গ্রহণ করতে পেরে আনন্দিত হয়ে পূণ্যানুমোদন করতে তথাগত বুদ্ধের সম্মুখে গিয়ে পাদ বন্দনা করলেন।
তখন রাজার কাছ হতে তথাগত জিজ্ঞাসা করলেন-‘মহারাজ! আজকের কৃত দানের অনুমোদন আপনাকে এবং এ বৃদ্ধা গরিব মহিলা উভয়ের মধ্যে কাকে অধিক করা যায়?’
এরূপ প্রশ্নে রাজা প্রসেনজিৎ খুবই আশ্চর্যান্বিত হয়েছিলেন। তিনি চিন্তা করছিলেন-‘আমি এত অধিক পরিমাণে ভব্য দান করেছি, তারপরেও এরূপ প্রশ্ন কেনো আসছে?’
তখন তথাগত বুদ্ধ স্পষ্ট করতে গিয়ে বললেন-‘মহারাজ! আপনার এ দান স্বীয় বৈভব এবং অহঙ্কারে আচ্ছন্ন হয়ে করা হয়েছে। অপরদিকে এ বৃদ্ধা গরীব মহিলা নিজের নিকট ন্যুনতম সাধন যা আছে, তাই পরিপূর্ণ শ্রদ্ধায় এবং নির্মল চিত্তে দানের জন্য সমর্পণ করেছে এবং এর সাথে সে আনন্দিত হয়ে পূণ্যের অনুমোদন করতে উপস্থিত হয়েছে। তাই বৃদ্ধার পূণ্য সম্পদ আপনার চেয়েও অনেকগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে। তার এ দান সামান্য নয়, মহাদান।’
সারাংশ
————
দানের মহানতা বস্তুর মাত্রা কম বা অধিক-এর উপর নির্ভর করেনা। বরং অন্তরের ভাবনা বা চেতনার পবিত্রতা ও শুদ্ধিতার উপরই নির্ভর করে থাকে। সত্যিকার বিপুল পূণ্য তাঁরাই লাভ করতে পারেন, যাঁরা নির্মল চিত্তে, নিঃস্বার্থ ভাবনায়, নিরহঙ্কার হয়ে এবং পরিপূর্ণ শ্রদ্ধায় স্বহস্তে দান করে থাকেন।

বাহ্যিক বৈভবের চেয়ে অন্তরের নির্মলতাই হল মুখ্য বিষয়। এজন্য কর্ম করার সময় প্রত্যেকের উদ্দেশ্য শুদ্ধ, মহান এবং কল্যাণকারী হোক এরূপ স্মরণ রাখা উচিত। প্রত্যেক কর্মের ফল তার বাহ্যিক রূপ এবং আড়ম্বর হতে নির্ণয় করা যায়না, বরং এর পেছনে লুকিয়ে থাকা উদ্দেশ্য এবং মানসিক চেতনা হতেই নির্ধারিত হয়ে থাকে। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, যদি কতিপয় লোক একই সময়ে একশত টাকা করে দান দিয়েছে। এখানে বাহ্যিকভাবে দেখতে গেলে প্রত্যেকের দান সমান বলে মনে হচ্ছে। কিন্তু তাদের অন্তরের উদ্দেশ্য তথা ভাবনা পৃথক-পৃথক হয়ে থাকলে এর ফলও পৃথক পৃথক হবে সন্দেহ নাই।

যেমন, কেহ এরূপ ভেবে দান করেন যে, যখন আমি তাঁর নিকট যাবো, তখন তিনি আমাকে খুব খাতির-যত্ন করবেন।
কেহ আবার এরূপ ভেবে দান করেন যে, এ দানের ফল আমার নিকট আগামীতে দ্বিগুণ হয়ে ফেরত আসবে।
অন্য কেহ আবার এরূপ ভেবে দান করেন যে, এ দানের ফল আমি আগামী জন্মে লাভ করবো।
কেহ এরূপও ভেবে দান করে যে, এ দানের ফলে আমার ব্রহ্মলোক প্রাপ্তি হবে।
কেহ আবার এরূপ কামনা করে দান করে যে, এ দানের ফলে আমার নির্বাণ লাভের হেতু হোক।
যদিও এখানে সকলে একই সমান অর্থ দান করেছে, কিন্তু তাদের দানের উদ্দেশ্য বা চেতনা ছিল ভিন্ন ভিন্ন। এজন্য বলা হয় যে, উদ্দেশ্য বা চেতনা অনুসারে ফলও ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে। এখানে অর্থের পরিমাণের চেয়ে চেতনাই মহান হয়ে থাকে। তাই বুদ্ধ ব্যক্ত করেছেন-‘চেতনাহং ভিক্খবে কম্মং বদামি।’ অর্থাৎ ভিক্ষুগণ! আমি চেতনাকেই কর্ম বলে থাকি।
দানের পাত্রের গুরুত্ব
—————————
দানের ফল এ বিষয়ের উপরও নির্ভর করে থাকে যে, আমরা কাকে দান দিচ্ছি। যদি কেহ একজন ক্ষুধার্ত ভিক্ষুককে দান দেন, তখন তার সাময়িক ক্ষুধার নিবৃত্তি হয়। যদি সে দান ধ্যানে মগ্ন থাকা কোনো তপস্বী বা ধ্যানরত সাধক-সাধিকাকে দেওয়া হয়, তখন তিনি ক্ষুধা নিবৃত্তি করে আরও উচ্চতর ধ্যান-সাধনার অনুশীলন করবেন।
উভয় দানে পূণ্য থাকলেও স্তর ভেদে কিন্তু পূণ্যের তারতম্য হয়ে থাকে। একজন ভিখারীকে প্রদত্ত দানের চেয়ে একজন ধ্যান-সাধনায় নিমগ্ন যোগীকে দানের ফল অনেকাংশে অধিক হয়ে থাকে।
প্রদত্ত দানের শুদ্ধিতার মহত্ব
————————————
প্রদত্ত দানের রাশি কিভাবে উপার্জিত হয়েছে, তার উপরও ফলের কম-বেশী হয়ে থাকে। যেমন, কেহ সৎভাবে ব্যবসা-বাণিজ্য করে, চাকরী করে অথবা শারীরিক পরিশ্রম করে দান দিয়ে থাকেন। আবার কেহ অসৎভাবে অর্থ উপার্জন অর্থাৎ প্রাণী হত্যা করে, চুরি-ডাকাতি-প্রতারণা-ছলনা করে, ব্যভিচার করে, মিথ্যা কথা বলে এবং মাদকাদি বাণিজ্য করে দান দিয়ে থাকেন। এ দু’ প্রকার দানের মধ্যে যিনি সৎভাবে উপার্জন করে দান দিয়ে থাকেন, তাঁর দানের গুরুত্ব ও ফল অধিক হয়ে থাকে।
প্রেরণা অর্থাৎ চিত্ত স্বভাবের স্থানই সর্বোচ্চে
———————————-
দানের চতুর্থ এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল আমরা কোন ধরণের প্রেরণায় দান দিচ্ছি।
তথাগত বুদ্ধের জীবন কালের এক ঘটনা এখানে উল্লেখ করছি। এক সময় রাজা প্রসেনজিৎ শ্রাবস্তীতে এক পূর্ণিমা দিবসে ভব্য আয়োজন করে মহান সঙ্ঘকে আহার এবং দীপাদি দান করেছিলেন। অত্যন্ত বৈভবের সাথে দানের সবকিছু সম্পন্ন হয়েছিল। সেসময় একজন দরিদ্র বৃদ্ধা মহিলা যাঁর কাছে দানীয় বস্তু বলতে কেবল সামান্য তেলই ছিল, তিনিও সেখানে দানোৎসবে পৌঁছলেন। তিনি অতীব শ্রদ্ধায় এবং শুদ্ধ চেতনায় তাঁর সামান্য তেলটুকু দান করে দীপ প্রজ্জ্বলন করেছিলেন। দরিদ্র বৃদ্ধা মহিলাটি পূণ্য কাজে অংশ গ্রহণ করতে পেরে আনন্দিত হয়ে পূণ্যানুমোদন করতে তথাগত বুদ্ধের সম্মুখে গিয়ে পাদ বন্দনা করলেন।
তখন রাজার কাছ হতে তথাগত জিজ্ঞাসা করলেন-‘মহারাজ! আজকের কৃত দানের অনুমোদন আপনাকে এবং এ বৃদ্ধা গরিব মহিলা উভয়ের মধ্যে কাকে অধিক করা যায়?’
এরূপ প্রশ্নে রাজা প্রসেনজিৎ খুবই আশ্চর্যান্বিত হয়েছিলেন। তিনি চিন্তা করছিলেন-‘আমি এত অধিক পরিমাণে ভব্য দান করেছি, তারপরেও এরূপ প্রশ্ন কেনো আসছে?’
তখন তথাগত বুদ্ধ স্পষ্ট করতে গিয়ে বললেন-‘মহারাজ! আপনার এ দান স্বীয় বৈভব এবং অহঙ্কারে আচ্ছন্ন হয়ে করা হয়েছে। অপরদিকে এ বৃদ্ধা গরীব মহিলা নিজের নিকট ন্যুনতম সাধন যা আছে, তাই পরিপূর্ণ শ্রদ্ধায় এবং নির্মল চিত্তে দানের জন্য সমর্পণ করেছে এবং এর সাথে সে আনন্দিত হয়ে পূণ্যের অনুমোদন করতে উপস্থিত হয়েছে। তাই বৃদ্ধার পূণ্য সম্পদ আপনার চেয়েও অনেকগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে। তার এ দান সামান্য নয়, মহাদান।’
সারাংশ
————
দানের মহানতা বস্তুর মাত্রা কম বা অধিক-এর উপর নির্ভর করেনা। বরং অন্তরের ভাবনা বা চেতনার পবিত্রতা ও শুদ্ধিতার উপরই নির্ভর করে থাকে। সত্যিকার বিপুল পূণ্য তাঁরাই লাভ করতে পারেন, যাঁরা নির্মল চিত্তে, নিঃস্বার্থ ভাবনায়, নিরহঙ্কার হয়ে এবং পরিপূর্ণ শ্রদ্ধায় স্বহস্তে দান করে থাকেন।
বাহ্যিক বৈভবের চেয়ে অন্তরের নির্মলতাই হল মুখ্য বিষয়। এজন্য কর্ম করার সময় প্রত্যেকের উদ্দেশ্য শুদ্ধ, মহান এবং কল্যাণকারী হোক এরূপ স্মরণ রাখা উচিত।

Post a Comment

0 Comments

Ad Code

Responsive Advertisement