Hot Posts

6/recent/ticker-posts

Ad Code

বিনয় বুদ্ধ শাসনের আয়ু






আচার্য দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান (৯৮২-১০৫৪) তিব্বতে প্রবাস করছিলেন। তিনি তিব্বতে অতীশ নামেই অধিক সুবিখ্যাত ছিলেন। বর্তমান ভারতের বিহার প্রদেশের বিক্রমশীলা বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনি ছিলেন প্রধান আচার্য। তিব্বতের সম্রাট ল্হ লামা যেশে হোদ কর্তৃক ১০৪২ খৃষ্টাব্দে তাঁকে শ্রদ্ধাপুর্বক তিব্বতে আমন্ত্রণ করা হয়েছিল।
আচার্য দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান একটি বিহারে অবস্থান করছিলেন। সেখানে তিনি দেখেছেন যে, একজন তিব্বতি ভিক্ষু প্রতিদিন আসতেন এবং স্তূপকে পরিক্রমা করতেন। একদিন তিনি সে ভিক্ষুকে ডেকে বললেন-‘ স্তূপ পরিক্রমা করা হল ভাল। ধম্ম করলে আরও ভাল হত।’
ভিক্ষুটি ভাবলেন হয়তো আচার্য আমাকে সুত্র পাঠ করতেই প্রেরণা দিচ্ছেন। পরদিন হতে সে ভিক্ষু স্তূপের সামনে আসন পেতে বসে পুস্তক খুলে ধম্মের সুত্র সমূহ পাঠ করতেন। আচার্য অতীশ তাঁকে আহ্বান করে ডাকলেন এবং বললেন যে-‘ সুত্র সমূহের পাঠ করা হল মঙ্গলকাজ। কিন্তু তার চেয়ে ভাল হত যদি ধর্ম অনুশীলন করতেন।’
ভিক্ষুটি মনে করলেন যে, হয়তো ভারত হতে আসা এ আচার্য প্রবর আমাকে ধ্যান করার জন্য প্রেরণা দিচ্ছেন।’ পরেরদিন হতে তিনি স্তূপের সামনে আসন লাগিয়ে বসে ধ্যান সাধনায় নিবিষ্ট থাকতেন।
ধ্যান করে যখন তিনি ফিরে যাচ্ছিলেন তখন আচার্য দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান তাঁকে আবার ডাকলেন এবং বললেন-‘ ধ্যান অনুশীলন হল শ্রেষ্ঠ কাজ। কিন্তু ধম্ম পালন হল সর্বশ্রেষ্ঠ কর্ম।’
ভিক্ষুটি এবার অতীশ দীপঙ্করের সামনে শির ঝুঁকিয়ে প্রণাম করলেন এবং অত্যন্ত বিনম্রতা সহকারে জিজ্ঞাসা করলেন-‘ হে আচার্য প্রবর! আপনিই বলুন ধম্ম কি?’ স্তূপের পরিক্রমা করা, সুত্র পাঠ করা এবং ধ্যান করা যদি ধম্ম পালন না হয়, তাহলে ধম্ম পালন কি তা আপনিই বলুন?’
আচার্য দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান তখন বললেন-‘মনের বিকার সমূহের পরিত্যাগ করাই হল ধম্মের অনুশীলন। আসক্তি এবং তৃষ্ণা সমূহ হতে মনকে মুক্ত রাখার প্রচেষ্টা করাই হল ধম্ম পালন।’
ভিক্ষুটি এবার বুঝতে পারলেন যে, ধম্ম করা মানে হল মনকে বিকার মুক্ত করার প্রয়াস করা।
এ প্রসঙ্গে আরও একটি সমাচার উল্লেখ করা বাঞ্ছনীয়। তা হল ভারতের মহান আচার্য বোধিধম্ম এবং চীনের সম্রাট বু এর মধ্যেকার সংলাপ।
চীনের লিয়াং সম্রাজ্যের সম্রাট বু’য়ের সময় কালে পঞ্চম শতকের বৌদ্ধ আচার্য বোধিধম্ম চীনে গিয়েছিলেন। সম্রাট বুও ছিলেন ধম্মনুরাগী। তিনি অনেক স্তূপ, বিহার এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নির্মাণ করিয়েছিলেন। ধম্ম শাস্ত্রেরও তিনি ছিলেন বিশেষ জ্ঞাতা। তিনি ধম্ম সমূহ জেনে সেগুলি চর্চা-পরিচর্চা করতে বাকযুদ্ধও করতেন।
সম্রাট বু (৪৬৪-৫৪৯) আচার্য বোধিধম্মকে স্বীয় রাজমহলে সাদরে আমন্ত্রণ করেছিলেন। তিনি আচার্য মহোদয়কে উচ্চতর আসন দিয়ে বসালেন। তাঁকে বন্দনা করলেন। আশী বছরের বয়োবৃদ্ধ সম্রাট কর্তৃক ভারতীয় এক যুবক আচার্যেক অবনত মস্তকে বন্দনা করা হল। বাস্তবে ইহা ছিল বুদ্ধ ধম্মের প্রতিই তাঁর গৌরব প্রদর্শন করা।
যে সময়ে ভারতের বিশ্বগুরুর মর্যাদা লাভ হয়েছিল, সেসময় ছিল বৌদ্ধ কাল। তখন বিশ্বের নানা প্রান্ত হতে জ্ঞান পিপাসু বিদ্যার্থীগণ নালন্দা, তক্ষশীলা, বিক্রমশীলা মহাবিহার সমূহে অধ্যয়নের জন্য আগমণ করতেন। দক্ষিণ এশিয়ার বৌদ্ধ দেশ সমূহ এখনও ভারতের দিকে হয়ে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে থাকেন। ভারতকে এ গৌরব বুদ্ধ, বুদ্ধের ধম্ম এবং বৌদ্ধ আচার্যেরা প্রদান করেছেন।
চীনের সম্রাট বু অতীব বিনয়ের সাথে আচার্য বোধিধর্মকে জিজ্ঞাসা করলেন যে, বুদ্ধের ধম্ম কি?
আচার্য বোধিধম্ম তখন ধম্মপদের এক গাথা ভাষণ (সঙ্গায়ন) করলেন-
সব্ব পাপস্স অকরণং
কুসলস্স উপসম্পদা।
সচিত্ত পরিযোদপনং
এতং বুদ্ধান সাসনং।’
অর্থাৎ সর্ব প্রকার পাপ কর্ম হতে বিরত থাকা, কুশল কর্ম সমূহের সম্পাদন করা এবং চিত্তের নিরন্তর বিশোধন করাই হল বুদ্ধগণের অনুশাসন বা বুদ্ধের ধম্ম।
সম্রাট বু আরও অধিক বিস্তার ব্যাখ্যা আশা করেছিলেন। এত সংক্ষেপে বুদ্ধ ধম্ম শুনে তিনি অনেকটা হতাশ হয়ে বললেন-‘ বুদ্ধের ধম্ম কি এতই সরল? ইহা তো পাঁচ বছরের বাচ্চাও বুঝতে পারবে।’
আচার্য বোধিধম্ম বললেন-‘ বুদ্ধের ধম্ম এতই সরল যে, পাঁচ বছরের বাচ্চাও বুঝতে পারে। কিন্তু আশী বছরের বৃদ্ধও ইহা দাবী করতে পারেননা যে, তিনি ধম্মময় জীবন-যাপন করছেন।
আচার্য বোধিধম্মের কথন দ্বারা আশী বছর বয়স্ক সম্রাটের মধ্যে ধম্মের প্রতি অন্তর্দৃষ্টি জাগ্রত হল।
তিব্বতের আচার্য মিলারেপা (১০৫২-১১৩৫) ধম্মকে এক পংক্তি দ্বারা প্রকাশ করেছেন-‘অনুতাপ বিহীন হয়ে জীবন-যাপন করা এবং অনুতাপ বিহীন হয়ে মৃত্যু বরণ করা।’
নির্দোষ জীবনই অনুতাপ বিহীন জীবন-যাপন করা এবং নির্দোষ জীবন বসবাস করাই হল অনুতাপ বিহীন মৃত্যু হওয়া।
আচার্য বোধিধম্ম নয় বছর চীনে স্বীয় প্রবাস জীবনে মাত্র পাঁচ জন শিষ্য এবং এক শিষ্যাকে দীক্ষা দিয়েছিলেন। ভারতে প্রত্যাবর্তন করার সময় তিনি স্বীয় সকল শিষ্যদেরকে এক প্রশ্ন করেছিলেন-‘ তোমরা ধম্মের অর্থ কি বুঝেছ?’
তাঁর প্রথম শিষ্য তাও ফু বললেন-‘ ধম্ম হল ভাষা এবং শব্দে সমূহের উর্ধে। তারপরেও তা ভাষা এবং শব্দ হতে পৃথক নয়।’
আচার্য বোধিধম্ম বললেন-‘ তুমি ধম্মের আবরণই স্পর্শ করেছ।’
অত:পর শিষ্য ত্সঙ্গ-চীহ বললেন-‘অক্ষোভ্য বুদ্ধভূমি দর্শনই হল ধম্ম। তাঁর দর্শনের পুনরাবৃত্তি হয়না।’
আচার্য বোধিধম্ম বললেন-‘ তুমি ধম্মের হৃদয় স্পর্শ করেছে।’
তৃতীয় শিষ্য তাও-য়ু বললেন-‘ মৌলিকরূপে চার তত্ব হল শূণ্য এবং পঞ্চম তত্বের কোন অস্তিত্বই নাই। ধম্ম হল এ পাঁচ তত্ত্বেরও উপরে।’
আচার্য বোধিধম্ম অনুমোদন করে বললেন-‘ তুমি ধম্মের অস্থি পর্যন্ত স্পর্শ করতে পেরেছ।’
এরপর শিষ্য হুই-কো দু’ পদক্ষেপ সামনে অগ্রসর হয়ে আচার্য বোধিধম্মের চরণ স্পর্শ করলেন এবং আবার দু’ পদক্ষেপ পেছনে গিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকলেন। কিছু বলেননা।
আচার্য বোধিধম্ম বললেন-‘ তুমি ধম্ম মর্ম পেয়ে গিয়েছ।’
শিষ্য হুই-কো কে তিনি স্বীয় উত্তরাধিকার নির্বাচন করে আচার্য বোধিধম্ম ভারতে প্রত্যাবর্তন করলেন এবং হিমালয়ের কোথাও বিলীন হয়ে গিয়েছিলেন।
এ সমস্ত ভিন্ন ভিন্ন প্রসঙ্গ বুদ্ধ ধম্মের কেন্দ্রীভূত তত্বের দিকে সঙ্কেত দিচ্ছে যে-চিত্তের পরিশোধন, অকুশল কর্ম হতে বিরতি এবং কুশল কর্ম সমূহের সম্পাদনা।
এক ভিক্ষু ভগবান বুদ্ধের নিকট এসে হতাশ স্বরে বলছিলেন-‘ভগবান! আমি এত সব শীল স্মরণ করতে পারব না। অন্য কোন সরল মার্গ থাকলে আমাকে নির্দেশ করুন।’
ভগবান তাঁকে বললেন-‘ মাত্র তিন শীলই স্মরণ রাখতে পারবে কি?’
উৎসুক্য কণ্ঠে ভিক্ষু বললেন-‘ মাত্র তিন শীল তো স্মরণ রাখতে অসুবিধা নাই।’
ভগবান জানালেন-‘ কায়ের দ্বারা, বাক্যের দ্বারা এবং মনের দ্বারা সংযত থাকতে হবে। কায়ের দ্বারা অকুশল না করা, বাক্যের দ্বারা অকুশল না বলা এবং মনের দ্বারাও অকুশল উৎপন্ন না করা। কেবল এ তিন শীলই স্মরণ রাখতে হবে। তাহলেই তুমি নির্বাণ সাক্ষাত করতে পারবে।
আধুনিক ভারতের রূপকার বোধিসত্ব ড. বাবা সাহেব আম্বেদকর (১৮৯১-১৯৫৬) তাঁর ‘Buddha and His Dhamma’ গ্রন্থে লিখেছেন যে, অন্যান্য ধর্মে যে স্থান ঈশ্বরের বা সৃষ্টিকর্তার রয়েছে, বৌদ্ধধম্মে সে স্থানে রয়েছে শীলে।
ইহা বলার তাৎপর্য ইহাই যে, অন্যান্য ধম্মের কেন্দ্রীয় সত্বা হল ঈশ্বর। তাঁর সাথেই রয়েছে ধর্মের সম্বন্ধ। কিন্তু বৌদ্ধ ধম্মের কেন্দ্রীয় সত্বা হল শীল।
বুদ্ধ ধনবান, বিদ্বান, প্রতিভাবানকে যত গুরুত্ব দেননি, তার থেকে শ্রেষ্ঠ গুরুত্ব দিয়েছেন শীলবানকে। তিনি জাতি, জন্ম, বর্ণ আধারিত শ্রেষ্ঠত্বকেও প্রাধান্য দেননি, কিন্তু শীলকে সর্বোপরি স্থান দিয়েছেন।
সূত্র পিটকান্তর্গত মধ্যম নিকায়ের অশ্বলায়ন সুত্রে প্রসঙ্গ রয়েছে যে, একবার সকল ব্রাহ্মণেরা একত্র হয়ে অশ্বলায়নের নেতৃত্বে ভগবান বুদ্ধের সম্মুখে ব্রাহ্মণের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতে চেষ্টা করছিলেন।
তাঁদের প্রতিনিধি অশ্বলায়ন বললেন-‘হে শ্রমণ গৌতম! ব্রাহ্মণেরা বলছেন যে, ব্রাহ্মণই হলেন উঁচু বর্গ। অন্যরা সবাই হলেন তাঁদের নীচে। ব্রাহ্মণই হলেন শুক্ল বর্ণের, অন্যরা সবাই কৃষ্ণ বর্ণের। পবিত্রতা এবং শুচিতা কেবল ব্রাহ্মণদের মধ্যেই রয়েছে, অন্যদের নাই।’
ভগবান বুদ্ধ কেবল ব্রাহ্মণদের শ্রেষ্ঠতার মনোগ্রন্থিকেই এখানে ধ্বস্ত করেননি, বরং বর্ণীয় অথবা জাতীয় বা জন্মন্য শ্রেষ্ঠতাকে প্রত্যাখ্যান করতে গিয়ে শীলের শ্রেষ্ঠতাকেই সর্বোপরি স্থাপন করে বলেছেন-‘ অশ্বলায়ন! ব্রাহ্মণই কি কেবল রাগ, দ্বেষ ও মোহ হতে মুক্ত করতে পারে? ক্ষত্রিয়, বৈশ্য অথবা শুদ্রেরা কি পারেনা?’
অশ্বলায়ন বলেছেন-‘না, ভগবান! চারবর্ণের সব লোকেরাই রাগ, দ্বেষ ও মোহ মুক্ত হতে পারে।’
ভগবান বললেন-‘ যারা রাগ, দ্বেষ ও মোহ মুক্ত হয়, শীলবান হয়, তথাগত তাদেরকে শ্রেষ্ঠ বলে থাকেন।’
কেবল তা নয়, ভগবান বুদ্ধ ব্রাহ্মণ শব্দকেই এখানে পুনর্ভাষিত করে দিয়েছেন।
ধম্মপদের পণ্ডিত বর্গ এবং ব্রাহ্মণ বর্গ এখানে সবিশেষ উল্লেখযোগ্য। উদাহরণের জন্য ধম্মপদ অর্থকথার এক সংক্ষিপ্ত প্রসঙ্গ এখানে উল্লেখ করছি।
তথাগত যখন শ্রাবস্তীতে জেতবন বিহারে অবস্থান করছিলেন, তখন এক জটাধারী ব্রাহ্মণ ভগবানের সম্মুখে এসে বললেন-‘ হে গৌতম! আপনি নিজের শ্রাবকদের ব্রাহ্মণ বলে থাকেন। আমিও ব্রাহ্মণ মাতা-পিতা হতে সুজাত ব্রাহ্মণ কুলে উৎপন্ন হয়েছি। আপনি কি আমাকেও ব্রাহ্মণ বলবেন?’
ভগবান বললেন-
‘ন জটাহি ন গোত্তেহি
ন জচ্চা হোতি ব্রাহ্মণো।
যম্হি সচ্চঞ্চ ধম্মো চ,
সো সুচি সো চ ব্রাহ্মণো।
জটা দ্বারা, গোত্র দ্বারা, জন্ম দ্বারা কোন ব্যক্তি ব্রাহ্মণ হয়না। যার কাছে সত্য রয়েছে, ধম্ম রয়েছে, সেই হল পবিত্র, সেই হল ব্রাহ্মণ।’
ইহা বলার সম্পূর্ণ সারাংশ ইহাই যে, বুদ্ধের আধার হল শীল। শীলই রয়েছে কেন্দ্রে। শীলাচারী জীবনের যে আচার সংহিতা রয়েছে, তাহাই হল বিনয় এবং বিনয়ের গ্রন্থ হল বিনয় পিটক।
ভগবান বুদ্ধের মহাপরিনির্বাণের পরে সপ্তপর্ণী গুহায় আচার্য মহাকাশ্যপ স্থবিরের অধ্যক্ষতায় যখন প্রথম ধম্ম সঙ্গীতি অনুষ্ঠিত হয়েছিল, যেখানে পাঁচ শত অরহত সম্মিলিত হয়েছিলেন, সেখানে প্রশ্ন উঠেছিল যে, প্রথমে সুত্র সঙ্গায়ন হবে, না বিনয় সঙ্গায়ন হবে?’
অরহতগণ সিদ্ধান্ত দিয়েছিলেন যে-‘ বিনযনাম বুদ্ধ সাসনস্স আযু’। অর্থাৎ বিনয় হল বুদ্ধ শাসনের আয়ু। এজন্য প্রথমে বিনয় সঙ্গায়ন হওয়া উতিত।
বিনয় হল বুদ্ধ শাসনের আয়ু। অর্থাৎ যতদিন পর্যন্ত বিনয় পালন হবে, বিনয়াচরণ জীবন্ত থাকবে, ততদিন বুদ্ধ শাসন বা বুদ্ধ ধম্ম থাকবে।
বিনয় হল শীলের আচার সংহিতা বা অনুশাসনের নিয়মাবলী।
বিনয় পিটককে বুদ্ধ ধম্মের সংবিধান বলা হয়। যার প্রণেতা হলেন স্বয়ং ভগবান বুদ্ধ।
পৃথিবীর দেশ সমূহের সংবিধান নিজের নিজের দেশের হিতের জন্য কথা বলে থাকে। কিন্তু বুদ্ধের সংবিধান মানব মাত্রেরই বা প্রাণীমাত্রেরই হিতের জন্য রচিত হয়েছে। সেজন্য বুদ্ধ শাসন দেশের সীমার মধ্যে আবদ্ধ নয়।
সংবিধান হওয়াই কেবল পর্যাপ্ত নয়। বরং সেগুলির অনুশীলন হল অত্যাবশ্যক। অনুপালনেই শাসনের আয়ু টিকে থাকে।
বিনয় পিটক তো এমনিতেই ভিক্ষু-ভিক্ষুণীদের আচার সংহিতার জন্য রচিত হয়েছে, কিন্তু ভগবান বুদ্ধের দ্বারা নির্মিত ভিক্ষু সঙ্ঘ ছিল এক আদর্শ সমাজ, ইহা বলা যায় যে, তাঁরা ছিল সমাজের আদর্শ বা মডেল, যা সমতা, স্বতন্ত্রতা, বন্ধুতা ও ন্যায়ের উপর ছিল আধারিত। যে সমাজে সমতা, স্বতন্ত্রতা, বন্ধুতা ও ন্যায় এ চার বিষয় থাকবে, তাকে আদর্শ সমাজ বলা যায়।
এ দৃষ্টিকোণ হতে ভিক্ষু সঙ্ঘের জন্য নির্মিত আচার-সংহিতা সম্বলিত বিনয়-পিটককে অবশিষ্ট সমাজের জন্যও এক আদর্শ আচরণীয় নিয়মাবলী বলা যায়।
ভারতের সংবিধান শিল্পী আধুনিক বোধিসত্ব ড. বি. আর. আম্বেদকর ভারতের সংবিধানের নীতি নির্দেশক তত্ব সমূহে ভিক্ষু সঙ্ঘের তত্ব সমূহকেও সন্নিবেশিত করেছেন-সমতা, স্বতন্ত্রতা, বন্ধুতা ও ন্যায়। এগুলিকে তিনি সংবিধানের প্রাণ বলেছেন।
প্রথম বৌদ্ধ সঙ্গীতিতে সিদ্ধান্ত হয়েছিল যে, প্রথমে বিনয় সঙ্গায়ন হবে, যার নেতৃত্ব করবেন ভদন্ত উপালী স্থবির এবং সত্যায়ন করবেন ভদন্ত আনন্দ স্থবির।
ভগবান বুদ্ধ দ্বারা দীক্ষা লাভ করার পূর্বে অর্থাৎ ভিক্ষুত্ব গ্রহণের পূর্বে ভদন্ত উপালি স্থবির ছিলেন নাপিত সমাজের অন্তর্গত। ভদন্ত আনন্দ স্থবির ছিলেন শাক্য বংশোদ্ভূত এবং সঙ্গীতির অধ্যক্ষ ভদন্ত মহাকাশ্যপ ছিলেন ব্রাহ্মণ কুলজাত। ইহা ছিল সমতা আধারিত ভিক্ষু সঙ্ঘ, যেখানে বিনয় সঙ্গায়নের গৌরব উপালী স্থবিরের লাভ হয়েছিল এবং বুদ্ধ বচন সমূহের প্রথম সঙ্কলন বিনয় পিটক অস্তিত্বে এসেছিল।
বিনয় পিটক কেবল তো ভিক্ষু সঙ্ঘের আচরণের নিয়মাবলী। কিন্তু এরকম নয় যে, ইহা গৃহস্থ কিংবা উপাসক-উপাসিকাদের জন্য উপযোগী নয়। কিছু বিনয় বিশেষ, যা কেবল ব্রহ্মচারী ভিক্ষু-ভিক্ষুণীদের জন্য তো বটেই, কিছু নিয়ম রয়েছে উপাসক-উপাসিকাদের জন্যও অনুপালনীয় ও অনুকরণীয়।


Post a Comment

0 Comments

Ad Code

Responsive Advertisement