রাজবন বিহার প্রতিষ্ঠালগ্ন হতে এ পর্যন্ত শ্রদ্ধেয় বন ভন্তের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে অনেক ভিক্ষু-শ্রমণ বন ভন্তের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেছেন। কেহ কেহ দশ পনর দিন, কেহ কেহ দুই তিন মাস পর্যন্ত প্রব্রজ্যা ধর্ম পালন করে চলে যান। অনেক সময় দেখা যায় তিন চার বৎসর পর্যন্ত স্থায়ীত্বের পর গৃহী ধর্মে ফিরে যান।
শ্রদ্ধেয় বন ভন্তের অনুশাসন হল এই-যে যতটুকু লেখা পড়া করেছে, তা যথেষ্ট। ভবিষ্যতে স্কুল কলেজে পড়বে না। পঞ্চ ইন্দ্রিয় স্বাভাবিক ও স্বাস্থ্য ভাল থাকলে চলবে দিনে একবার মাত্র বা বেলা এগারটায় অল্পাহারে সন্তুষ্ট থাকতে হবে। আমি কি খাব, কোথায় পাব ও আমার বিছানা কোথায় এ রকম বলতে বা চিন্তা করতে পারবেনা। নতুন শ্রমণের ছোট খাট কাজ ও রাত দশটা থেকে রাত তিনটা পর্যন্ত পালাক্রমে বিহার এলাকা পাহাড়া দিতে হবে। টাকা পয়সা স্পর্শ করতে পারবেনা। বিনা অনুমতিতে বিহার এলাকা থেকে অন্যত্র চলে যেতে পারবেনা। শুধু রাত এগারটা হতে রাত তিনটা পর্যন্ত ঘুমাতে হবে। শীল ভঙ্গ অথবা বন বিহারের নিয়ম লংঘন করলে তাৎক্ষণিক ভাবে চলে যেতে হবে। প্রত্যেক শ্রমণ ভিক্ষুদের শমথ-বিদর্শন ভাবনা অনুশীলন করতে হবে।
উল্লেখিত নিয়মগুলি হল শ্রদ্ধেয় বন ভন্তের নির্দেশ নামার অর্ন্তভুক্ত। এখন আসল কথায় আসা যাক। বন বিহারে যেহারে স্রোতের মত ভিক্ষু-শ্রমণ প্রব্রজ্যা-উপসম্পদা লাভ করেন, আবার প্রায় সেহারেই চলে যান। অর্থাৎ যেখান থেকে যাত্রা আবার সেখানে ফিরে যান। প্রত্যেকের একটা জিজ্ঞাসা? কারণ কি? আমার দৃষ্টিতে নিুলিখিত কারণগুলি পরিলক্ষিত হয়ঃ-
১। পর্যাপ্ত পরিমাণ খাদ্য অথবা ভাল ভাল খাদ্যের অভাবে চলে যায়। এদিকে বনভন্তের নির্দেশ হল-তোমার সামনে যা আসে, পেট ভর্তির পরিবর্ত্তে অল্পাহারে সন্তুষ্ট থাকতে হবে।
২। স্কুল কলেজে অধ্যয়ন করার জন্য চলে যায়। এদিকে বন ভন্তের নির্দেশ হল-তোমার লেখাপড়া যা আছে তা নিয়ে উদ্যম সহকারে নির্বাণ সাক্ষাৎ কর।
৩। বদ্ধজীবন সহ্য হয় না। অন্যান্য ভিক্ষু শ্রমণদের মত ঘুরাফেরা করতে পারেনা বলে চলে যায়। এদিকে বন ভন্তের নির্দেশ হল-ভিক্ষু-শ্রমণদের শমথ-বিদর্শন ভাবনায় রত থাকতে হবে।
৪। পর্যাপ্ত পরিমাণ ঘুমের অভাবে চলে যায়। এ বিষয়ে বন ভন্তের নির্দেশ হল-তিন চার ঘন্টার অধিক ঘুমাতে পারবেনা।
৫। গৃহীজীবনের মোহে চলে যায়। এ ব্যাপারে বন ভন্তের নির্দেশ হল-গৃহীজীবন দুঃখজনক। মুক্তির পথ সহজে পায় না।
৬। সদ্ধর্মের আস্বাদ না পেয়ে চলে যায়। ধর্মের আস্বাদ সম্বন্ধে বন ভন্তের নির্দেশ হল-তুমি চেষ্টা কর। যদি তোমার পূর্বজন্মের পারমী থাকে, বুদ্ধের নির্দেশ ও ইহজন্মের প্রচেষ্টার দ্বারা একদিন না একদিন আস্বাদ পাবেই।
৭। অন্যান্য ভিক্ষু শ্রমণ অথবা অভিভাবকের প্ররোচনায় চলে যায়। এ সম্বন্ধে বন ভন্তের নির্দেশ হল-এক পথ, এক মত। এক পথ হল আর্য অষ্টাঙ্গিক পথ ও একমত হল নির্বাণই গন্তব্য স্থল।
৮। হুজুকে এসে হুজুকে চলে যায়। এ বিষয়টির উপর বন ভন্তের নির্দেশ হল-মন চঞ্চল করবেনা।
৯। নিরাপত্তার জন্য কিছুদিন থেকে চলে যায়। এ বিষয়ে বন ভন্তের নির্দেশ হল-নির্বাণই তোমার সম্পূর্ণ নিরাপত্তা।
১০। ভিক্ষু-শ্রমণদের মধ্যে কোন্দল হলে চলে যায়। এ ব্যাপারে বন ভন্তের নির্দেশ হল- মৈত্রী পরায়ণ হও।
আপাততঃ দৃষ্টিতে দেখা যায় উপরোল্লিখিত দশটি কারণে রাজ বন বিহার হতে ভিক্ষু শ্রমণেরা রংবস্ত্র ছেড়ে চলে যায়।
একবার জনৈক বড়–য়া শ্রমণকে আমি জিজ্ঞাসা করেছিলাম-আপনি মহৎ উদ্দেশ্য নিয়ে এসেছেন, চলে যাচ্ছেন কেন? তিনি বললেন-ভিক্ষু শ্রমণদের মধ্যে আমাকে কেহ কেহ বড়–য়া বলে হিংসা করে আবার অন্যদিকে শ্রদ্ধেয় বন ভন্তে আমাকে প্রশংসা করলে তারা হিংসায় জ্বলে যায়।
আমি তাঁকে উপদেশ দিয়ে বল্লাম-যে যা বলুক, যে যা’মনে করুক, আপনি ঠিক থাকুন, বন ভন্তের দিকে চেয়ে থাকুন। বন ভন্তে সব সময় জাতীয়বাদ উচ্ছেদ করার জন্য বারবার জোর দিয়ে থাকেন। ভাবনাকারীদের মধ্যে প্রথমে মৈত্রী ভাবনা নিতান্তই দরকার। আপনি বন ভন্তের নির্দেশেই চলুন। শেষ পর্যন্ত দেখা গেল তাঁর পারমী না থাকাতে চলে যেতে বাধ্য হন।
শ্রমণকে উপমা দিয়ে বললাম-একবার শ্রদ্ধেয় বন ভন্তেকে জনৈক ব্যক্তি জিজ্ঞাসা করেছিলেন-আপনি কি চাক্মা? উত্তরে বল্লেন-না, আবার বল্লেন-তবে কি? বন ভন্তে বল্লেন-আমি বৌদ্ধ ভিক্ষু। আমি চাক্মা হলে চাক্মার আচরণ থাকতো, বড়–য়া হলে বড়–য়ার আচরণ থাকতো। আমি ভগবান বুদ্ধের শিষ্য। বুদ্ধের শিষ্যের আচরণ করি সুতরাং আমি বৌদ্ধ ভিক্ষু।
আর একবার জনৈক চাক্মা শ্রমণ চলে যাওয়ার সময় আমি উপস্থিত ছিলাম। যাওয়ার সময় বল্ল অত গরম জলে মাছ থাকতে পারে না।
বন ভন্তে খুব গরম এবং বন ভন্তের শিষ্যরাও গরম। তা শুনে বন ভন্তের প্রধান শিষ্য শ্রীমৎ নন্দ পাল ভন্তে বললেন-তুমি যা বল তা অতিশয় সত্য। গরম জলে মাছ থাকতে পারে না। ঠাণ্ডা জলে থাকতে পারে। তুমি ঠাণ্ডায় চলে যাও। এই সংলাপগুলি শুনে আমি খুব হাসাহাসি করলাম।
আরো কয়েকজন ভিক্ষু শ্রমণ বন বিহার ত্যাগ করার কারণ আমার স্মৃতিপটে আঁকা আছে। কিন্তু লেখনির কলেবর বৃদ্ধির ভয়ে আপাততঃ স্থগিত করলাম। শ্রদ্ধেয় বন ভন্তে তাঁর শিষ্যদেরকে উপমায় উপদেশ দিয়ে বললেন-আমার উপদেশ হল একটা বড় কোচ গাড়ী সদৃশ। আমি হলাম সুদক্ষ চালক, তোমরা আমার গাড়ীতে বস। আমি তোমাদেরকে চট্টগ্রাম দিয়ে যাব, কিন্তু উপযুক্ত ভাড়া দিতে হবে। ভাড়া হল শ্রদ্ধা, স্মৃতি, একাগ্রতা ও প্রজ্ঞা।
যখন আমি আমার গাড়ী নিয়ে চট্টগ্রাম রওনা হই, তখন দেখা যায় গাড়ীতে তিলধারণ করার স্থান থাকে না তার অর্থ হল, যাত্রীর আধিক্য। কালক্রমে দেখা যায় ভেড্ভেডী পৌঁছলে অর্ধেক নেমে যায়, মানিকছড়িতে গেলে কিছু সংখ্যক নেমে যায়, ঘাঘড়া গেলে আরো কিছু নেমে পড়ে, রাণীর হাট গেলে আরও যাত্রী নেমে প্রায় খালি অবস্থায় থাকে। গুটি কয়েকজন যাত্রী নিয়ে আমার পরিশ্রম সার্থক হয় না এবং উদ্যমও থাকেনা। সত্যের পথ আঁকড়ে থাকার জন্য শিষ্যদেরকে লক্ষ্য করে বন ভন্তে নিজেই গান রচনা করেছেন। এ গান সুর দিয়েছেন বাবু রন্জিত দেওয়ান।
ছি! ছি! ছি!
করিস কি তুই
পাগলা ছেলে,
সাত রাজার ধন হাতে পেয়ে
অতল জলে দিসনে ফেলে।
এই ভুলে তোর দুকুল যাবে
আপন বুঝে চল ॥
কেঁদে কেঁদে তুই কুল পাবিনে
বাইবে চোখের জল।
দুঃখের বোঝা মাথায় নিয়ে
.jpg)

0 Comments