সংঘ দানের ফল --
বর্তমান যুগে শীলবিশুদ্ধির দিকে প্রায় লোকের নজর নেই বললেও হয়। এমতাবস্থায় পুদ্গলিক দানের চেয়ে সংঘদান করাই সর্বোত্তম উপায়।
যে কোনো বস্তু পরিমাণে সামান্য হলেও চারিজন ভিক্ষুকে সংঘ উদ্দেশ্যে দান করা যায়। তথাপি সংঘদানের ফল অখণ্ডনীয় বলে বর্ণিত হয়েছে।
মহাপৃথিবী অনন্ত মৃত্তিকারাশি, চুরাশি হাজার যোজন গভীর মহাসমুদ্র ও চুরাশি হাজার যোজন উচ্চ সুমেরুপর্বত যুগান্তরে ধ্বংস হয়ে যাবে; কিন্তু লক্ষকল্পেও সংঘদানের ফল নষ্ট হয় না। এই কারণে ভগবান বলেছেন—
যেমন সংঘ ক্ষেত্রে দান দিলে মহাফল হয়, তেমন সংঘ ক্ষেত্রে বিশেষরূপে নির্বাচন করে দান দিবে। এভাবে সুনির্বাচিত দানেই দায়কগণ স্বর্গলাভ করতে সমর্থ হয়।
সংঘদান সাত প্রকার। যথা :
১. বুদ্ধ প্রমুখ উভয়সংঘকে।
২. বুদ্ধের পরিনির্বাণের পরও বুদ্ধ প্রমুখ উভয় সংঘ।
৩. অনির্দিষ্ট ভিক্ষুসংঘ।
৪. অনির্দিষ্ট ভিক্ষুণীসংঘ।
৫. সংঘ হতে এতজন ভিক্ষু আর এতজন ভিক্ষুণী চাই, এইরূপে নির্দিষ্ট ভিক্ষু-ভিক্ষুণীসংঘ।
৬. সেভাবে নির্দ্ধারিত কেবল ভিক্ষুসংঘ।
৭. সেভাবে নির্দিষ্ট কেবল ভিক্ষুণীসংঘ।
এই সাত প্রকার সংঘকে প্রদত্ত দানই সংঘগত দক্ষিণা নামে অভিহিত। তথায় একদিকে ভিক্ষুসংঘ ও অপরদিকে ভিক্ষুণীসংঘ, মধ্যভাগে ভগবান বুদ্ধকে উপবেশন করায়ে যেই দান দেওয়া হয়, তাকে বুদ্ধ প্রমুখ উভয়সংঘে দান দেওয়া। বুদ্ধের পরিনির্বাণের পর কী উপায়ে বুদ্ধ প্রমুখ উভয়সংঘে দান দেওয়া যেতে পারে? ভিক্ষু-ভিক্ষুণী উভয়সংঘের সম্মুখে সধাতুক বুদ্ধ প্রতিমা স্থাপন করে সেখানে স্বতন্ত্র একখানি পূজার বেদী সজ্জিত করতে হবে। অতঃপর প্রথমে বুদ্ধপূজা করে উভয়সংঘকে দান দিতে হয়। এরূপে বুদ্ধের নির্বাণের পর বুদ্ধ প্রমুখ উভয় সংঘকে দান দেওয়া হয়। তথায় যেই সকল বস্তু দিয়ে বুদ্ধপূজা করা হয়েছে, তা কি করা যাবে? যেই ভিক্ষু নিয়মিত বুদ্ধের সেবা পূজাদি করে, তাকে দেওয়া উচিত। ‘পিতৃসম্পত্তিতে পুত্রের অধিকার থাকে’ বলে অন্যান্য ভিক্ষুকেও দেওয়া যেতে পারে, কিন্তু বুদ্ধপূজাতে ঘৃত বা তৈল থাকলে তদ্ধারা বুদ্ধ উদ্দেশ্যে প্রদীপপূজা করবে, কাপড় থাকলে ধ্বজা প্রস্তুত করে দিবে।
সংঘের প্রতি যাঁর অচলা শ্রদ্ধা আছে, তাঁর দানই বিশেষভাবে সফল হয়ে থাকে। কারণ সংঘের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস ও অচলা ভক্তি রাখা সহজ নয়। কোনো দায়ক যদি সংঘদান দিবার উদ্দেশ্যে বিহারে একজন ভিক্ষু নির্বাচন করে দেন। তখন সংঘ হতে যদি একজন শ্রামণের পাঠিয়ে দেয়, আমি চেয়েছিলাম ভিক্ষু, আমার জন্য শ্রামণের পাঠান হল কেন?’ বলে মনে যদি উৎকণ্ঠা আনে, সেরূপ উৎকণ্ঠিত চিত্তে দান করলে তা সংঘদান বলে গণ্য হবে না। আবার বয়োবৃদ্ধ মহাস্থবির পাঠিয়ে দিলে ‘বেশ তো আমি সাধারণ ভিক্ষু চেয়েছিলাম, অথচ আমার জন্য মহাস্থবির পাঠান হয়েছে’ বলে অতিশয় আনন্দিত হলে তাও সংঘদান হবে না। যেই দায়ক শ্রামণের যুবক ভিক্ষু, বৃদ্ধ ভিক্ষু, মূর্খ ভিক্ষু অথবা পণ্ডিত ভিক্ষুর মধ্যে যে কোনো একজনকে পেয়ে সমচিত্তে ও সগৌরবে সংঘ উদ্দেশ্যে দান করেন, তার সংঘদানই সফল হয়ে থাকে।
এ প্রসঙ্গে দায়ক আখ্যানের অবতারণা করা হচ্ছে, জনৈক শ্রদ্ধাবান দায়ক সংঘদানের উদ্দেশ্যে বিহারে গিয়ে বলেন— ‘ভন্তে, সংঘ হতে আমাকে একজন ভিক্ষু দেন।’ তখন তাঁর জন্য একজন দুঃশীল ভিক্ষু পাঠান হল। এতে তিনি অসন্তুষ্ট না হয়ে পরমানন্দে ঘরে এসে যেখানে ভিক্ষু বসাবেন, তা লেপন করালেন এবং বিছানা পেতে তদুপরি বিতান (চাঁদোয়া) বেঁধে দিলেন। ভিক্ষু আসলে পদ ধৌত করায়ে পায়ে তৈল মেখে সুগন্ধ ধূপ ও পুষ্পপূজা করলেন। অতঃপর পরিতোষ সহকারে ভোজন করালেন। এই প্রকারে বুদ্ধকে পূজা করার ন্যায় সংঘের প্রতি গৌরব করে দান দিয়েছিলেন। অথচ সেই ভিক্ষু আবার অপরাহ্নকালে বিহারের কাজের জন্য একখানা কুদাল খুঁজতে সেই বাড়িতে আসল। কোদাল চাহিলে গৃহকর্ত্রী উপাসিকা ‘এই নাও নষ্ট বলে কোদালখানি পায়ে ঠেলে দিল। তখন তাদের প্রতিবেশীরা বলাবলি করতে লাগল ‘আপনারা পূর্বাহ্নে বর্ণনাতীতভাবে পূজা করলেন। কিন্তু এখন দেখতেছি তার সম্পূর্ণ বিপরীত। এমনকি শতাংশের একাংশও নয়। এর যথার্থ কারণ কি? তদুত্তরে উপাসিকা বলল ‘আমরা পূর্বাহ্নে যা করেছি তা সংঘের পূজা, এই ভিক্ষুর নয়।’ সুতরাং সংঘের প্রতি যাঁরা যথাযথ গৌরব চিত্ত রাখতে পারেন, তাঁদের পক্ষে অর্হৎকে দান দেওয়ার চেয়ে সংঘ হতে প্রেরিত দুঃশীল ভিক্ষুকে দান দেওয়াই মহাফলদায়ক।
সেজন্য ভগবান আনন্দ স্থবিরকে বলেছিলেন ‘আনন্দ, সুদূর ভবিষ্যতে কণ্ঠে কাষায়বসনধারী পাপী ভিক্ষু উৎপন্ন হবে। সেই দুঃশীল পাপী ভিক্ষুদিগকে দায়কেরা সংঘ উদ্দেশ্যে দান দিবে। আনন্দ, আমি তখনো সংঘদানের অনন্ত অপ্রমেয় ফল হবে বলে বলতেছি। কোনো কারণেই আমি সংঘদান হতে পুদ্গলিক দানের ফল অধিক বলে বলব না।
অতীতকালেও এভাবে দান দেওয়া হত। ভগবান বুদ্ধ মধ্যভাগে বসতেন। ডানপার্শ্বে ভিক্ষুসংঘ, বামপার্শ্বে ভিক্ষুণীসংঘ, ভগবান থাকতেন উভয়সংঘের নায়ক। তখন ভগবান স্বীয় লব্ধ দানীয়বস্তু নিজেও পরিভোগ করতেন, ভিক্ষুসংঘকেও দিতেন। বর্তমানেও বিশেষজ্ঞ মানুষেরা ধাতু সাথে নির্মিত প্রতিমা কিংবা ধাতুচৈত্য (অষ্টধাতু ইত্যাদির নির্মিত ধাতুকর-) স্থাপন করে বুদ্ধ প্রমুখ সংঘকে দান দিয়ে থাকেন। প্রতিমার সামনে পূজার বেদী করে তথায় ‘বুদ্ধানং দেমা’ বলে খাদ্য ভোজ্যাদি পূজা দেওয়া হয়। অথবা বিহারে নিয়ে ‘ইহা চৈত্য উদ্দেশ্যে পূজা করতেছি’ বলে পিণ্ড, পুষ্পমাল্য ও সুগন্ধি ইত্যাদি পূজা করে থাকেন। জিজ্ঞাস্য চৈত্য বেদীতে পূজিত দ্রব্য কী করা দরকার? পুষ্পমালা ও সুগন্ধি পূজার আসনে উঠিয়ে দিবে। বস্ত্রের দ্বারা পতাকা দিবে আর ঘৃত ও তৈলের দ্বারা প্রদীপ পূজা করবে। আর যা কিছু ভোজ্যদ্রব্য থাকবে, তা প্রব্রজিত হোক বা গৃহী হোক, যে নিত্য নৈমিত্তিক চৈত্যের সেবা করে, তাকে দিতে হবে। নিত্য সেবাকারী কেহ নির্দিষ্ট না থাকলে, যে ব্যক্তি চৈত্য পূজা নিয়ে যাবে, প্রথমে পূজার পাত্রটি নামিয়ে চৈত্যের সম্মার্জনাদি ব্রত সম্পাদন করত পরে সেও খেতে পারে। ভিক্ষু-শ্রামণদের পক্ষে খাওয়ার সময় একান্ত নিকটবর্তী হলে আগে খেয়ে পরেও ব্রত করা যেতে পারে।
অঙ্গুত্তর নিকায়ের বেলাম সূত্র বর্ণনায় দানাদি পুণ্যকর্ম সম্বন্ধে একটি উপমা বর্ণিত হয়েছে এই জম্বুদ্বীপ ভেরিতলের ন্যায় সমতল করত একপ্রান্ত হতে অপর প্রান্ত পর্যন্ত যদি আর্য পুদ্গলদিগকে সারি বসান হয়, তথায় থাকবেন স্রোতাপন্ন দশ পঙক্তি, সকৃদাগামী পাঁচ পঙক্তি, অনাগামী সাড়ে তিন পঙক্তি, অর্হৎ আড়াই পঙক্তি, পচ্চেকবুদ্ধ এক পঙক্তি এবং সম্যকসম্বুদ্ধ একাকী। একজন আর্য শ্রাবককে দান দেওয়ার চেয়ে সম্যকসম্বুদ্ধকে প্রদত্ত দানে মহাফল। এর চেয়ে বুদ্ধকে সংঘনায়ক রেখে বুদ্ধ প্রমুখ ভিক্ষুসংঘকে দানের ফল অধিক। তদপেক্ষা ধাতুচৈত্য নির্মাণ ধর্মশ্রবণ ও আগত অনাগত চতুর্দিকস্থ সংঘের উদ্দেশ্যে অন্তত চারি হাত পরিমিত পর্ণশালা দানের পুণ্যফল অত্যধিক।
তা হতেও আবার প্রসন্নচিত্তে গৃহীত পঞ্চশীল পালনের ফল অধিক। শীল গ্রহণ করার পর মুহূর্তমাত্র মৈত্রী ভাবনা করলে তদপেক্ষা অধিক পুণ্য লাভ হয়। এর চেয়েও তুরী প্রহার সময়কাল অনিত্য ভাবনা করলে মহাফল হয়ে থাকে।
দীর্ঘ নিকায়ের কূটদন্ত সূত্র বর্ণনায় একটা হতে অপরটা মহাফলপ্রসূ বলে ব্যাখ্যাত হয়েছে। যেহেতু সূত্র পর্যায়ক্রমে ‘যাবদেব সীতল পটিঘাতায’ প্রভৃতি বিহারে দানের নয়টি ও খন্ধক পর্যায়ে ‘সীতং উণ্হং পটিহন্তি’ প্রভৃতি সতরটি পুণ্যফল বর্ণিত হয়েছে। সেজন্য পূর্বোক্ত নিয়মে প্রদত্ত দান হতে বিহার দানই মহাফলদায়ক। ত্রিরত্নের শরণ গ্রহণ করলে, ত্রিরত্নকে জীবন সমর্পণজনিত পুণ্যসম্পদ লাভ হয়। কাজেই বিহার দান হতেও শরণ গ্রহণের ফল বেশি। কেবল শরণ গ্রহণের দ্বারা সহজে দৃষ্টি ঋজু করা যায় না, পঞ্চশীল পালনেরও প্রয়োজন হয়ে থাকে। যা তা করে শীল গ্রহণকারীর চেয়ে শ্রদ্ধাভক্তি সহকারে শীল গ্রহণকারীর অধিক পুণ্য লাভ হয়। শরণ এবং শীলের মধ্যে শরণই উত্তম এবং মহৎ। কারণ শরণ প্রতিষ্ঠিত হয়েই শীল পালন করতে হয়, সেজন্য শীল হতে শরণ গ্রহণই শ্রেষ্ঠ।


0 Comments