Hot Posts

6/recent/ticker-posts

Ad Code

আমার তৃষ্ণার আগুন চিরতরে নিভে গিয়েছে-----



উপরোক্ত বাক্যটি করেছিলেন বুদ্ধ শাসনের বিখ্যাত ভিক্ষুণী, যিনি ভগবান বুদ্ধ কর্তৃক ‘বিনয়ধারিনী’ বা বিনয় পারগূ বলে অভিষিক্তা হয়েছিলেন, সে মহান থেরী পটাচারার। তাঁর সম্পর্কে বর্ণিত হয়েছে ‘থেরীগাথা’ নামে পালি ত্রিপিটকের সুত্রপিটকান্তর্গত খুদ্দক নিকায়ে।
তথাগত ভগবান বুদ্ধ শ্রাবস্তীতে বর্ষাবাস করেছিলেন পঁচিশ বছর। তৎকালীন সময়ে শ্রাবস্তী ছিল সমৃদ্ধ, বিশাল এবং প্রমুখ মহানগর। প্রসেনজিত নামে যিনি কোশলের রাজা ছিলেন তাঁর রাজধানী ছিল এ মহানগরী। তিনি ভগবান বুদ্ধের খুবই অনুগত মহোপাসক ও পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। সে শ্রাবস্তীতেই মহোপাসক সুদত্ত অর্থাৎ যিনি অনাথপিণ্ডিক অভিধা পেয়ে পরিচিত ছিলেন, মহোপাসিকা বিশাখা, যিনি মিগারমাতা নামেই বেশী পরিচিতা ছিলেন তাঁরাও বাস করতেন। অনাথপিণ্ডিক তথাগতের মহান উপাসক ও বিশাখা মহোপাসিকা ছিলেন।তাঁরা উভয়ে ছিলেন বুদ্ধ, ধর্ম ও সঙ্ঘের জন্য সর্বদা সমর্পিত।
শ্রাবস্তীতে তাঁদের মত ধনী, মহাধনীর সংখ্যা অনেক ছিল। সেরকম পটাচারা ছিলেন শ্রাবস্তীর এক মহাধনী শ্রেষ্ঠীর একমাত্র কন্যা। তিনি নিজের ঘরের এক গৃহকর্মী বা চাকরের প্রেমে আসক্তা ছিলেন। মাতা-পিতা বা পরিবারের অন্যান্যদের অমতে একদিন পটাচারা চাকরকে নিয়ে পালিয়ে গিয়েছিলেন এবং বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হলেন। একে অপরকে বিয়ে করে তাঁরা দূরবর্তী স্থানে গিয়ে বসবাস করছিলেন।
উভয়ের সংসারে সেখানে তাঁদের দু’ জন বাচ্চা হল। অবশেষে পতির মৃত্যু হল এবং বাচ্চাদ্বয়েরও মৃত্যু হল। সে এক করুণ কাহিনী। এমন অবস্থায় তিনি যারপরনাই দু:খিত হয়ে মাতা-পিতার কথা মনে করলেন এবং মাতা-পিতার সান্নিধ্য পেতে শ্রাবস্তীতে ফিরে আসলেন। সেখানে যখন আসলেন, তখনই জানতে পারলেন তাঁর মাতা-পিতা সহ পরিবারের সবাই বন্যায় বাড়ীর দেওয়াল ধ্বসে মারা গিয়েছে। এসব বিষয় শুনে পটাচারা প্রিয়জন বিরহের শোকে জ্ঞান হারিয়ে মুর্ছান্বিতা হলেন। উন্মত্তা পাগলিনী হয়ে গিয়েছিলেন। তাঁর অঙ্গ বস্ত্রও ছিন্ন হয়ে গেল। তিনি এখন নির্বস্ত্র হয়ে এদিক-ওদিক ঘুরতে লাগলেন।
সে সময় ভগবান মহাকারুণিক তথাগত সম্যক সম্বুদ্ধ শ্রাবস্তীতে মহাশ্রেষ্ঠী অনাথপিণ্ডিক নির্মিত জেতবনারামে বিরাজমান ছিলেন। ঘুরতে ঘুরতে সংযোগ ও সৌভাগ্য বশত: পটাচারা জেতবন বিহারে গিয়ে পৌঁছলেন। নির্বস্ত্র অবস্থায় তিনি যখন জেতবনে পৌঁছলেন, তখন বুদ্ধ তথাগত জনসমাবেশে ধর্মোপদেশ প্রদান করছিলেন। উপস্থিত সমাবেশ পটাচারাকে পাগল মনে করে তথাগতের নিকটে আসতে বাঁধা দিচ্ছিলেন। মহাকরুণা সাগর ভগবান বুদ্ধ বললেন-‘ তাকে আসতে বাঁধা দিওনা। তথাগতের নিকট তাঁকে আসতে দাও।’ তথাগতের করুণাভরা আহ্বান শুনতেই পটাচারার সম্বিত ফিরে আসল। হারিয়ে যাওয়া চেতনা, নিভিয়ে যাওয়া হোঁস আবার ফিরে পেল। তিনি জানতে পারছেন যে, তিনি নির্বস্ত্র। তাই এখন লজ্জা অনুভব করছেন।
এ অবস্থায় কেউ তাঁকে বস্ত্র পড়িয়ে দিল। তিনি ভগবানকে সভক্তি বন্দনা জানিয়ে নিজের জীবন ও পরিবারের হৃদয় বিদারক অবস্থার কথা বর্ণনা করলেন। তাঁর কথা শুনে ভগবান সর্বজ্ঞ বুদ্ধ তাঁকে মৃত্যু সম্পর্কিত উপদেশ দিয়ে নির্বাণ মার্গ অনুসরণের জন্য প্রেরণা দিলেন। তথাগতের করুণাভরা ধর্মোপদেশ শুনে পটাচারার অশান্ত মন শান্ত হয়ে গেল এবং তিনি বুদ্ধ, ধর্ম এবং সঙ্ঘের অর্থাৎ ত্রিরত্নের শরণাপন্না হলেন। পটাচারা গৃহস্থ জীবনের আসক্তি ত্যাগ করে ভিক্ষুণী সঙ্ঘে যোগদান করলেন এবং ‘পটাচারা থেরী’ নামে প্রসিদ্ধা হলেন।
পটাচারা ভিক্ষুণী বিনয় নিষ্ঠার সাথে পালন করে শীল-সমাধি এবং প্রজ্ঞায় পরিপক্কা হলেন। তিনি ভগবান তথাগত কর্তৃক ভিক্ষুণী সঙ্ঘে বুদ্ধ শাসনে সর্বশ্রেষ্ঠা ‘বিনয়ধারিণী’ বা বিনয় পারদর্শিনী পণ্ডিত বলে উপাধি লাভ করেছিলেন।
একদিন পটাচারা থেরী নিজে হাত মুখ ধৌত করছিলেন। তিনি নিজের পায়ে জল ঢালছিলেন। পা ধৌত করা জল কিছুদূর গিয়ে থেমে গেল। তিনি দ্বিতীয় বার পায়ে জল ঢাললেন। সেগুলি আরো কিছুদূর গড়িয়ে গিয়ে বন্ধ হয়ে গেল। তৃতীয়বারও তিনি পায়ে জল ঢাললেন। সে জলগুলি দ্বিতীয় বারে ঢালা জল হতেও আরও দূরে গড়িয়ে গিয়ে বন্ধ হল। পটাচারা এ দৃশ্য দেখে গম্ভীরভাবে ভাবতে লাগলেন। অবশেষে এ অবস্থা হতে তাঁর গৃহস্থ জীবনের পূর্ণ উপলব্দি তিনি স্পষ্ট করতে পারলেন। তাঁর কাছে পুত্রদ্বয়, পতি, মাতা-পিতা সহ পরিবারের মৃত্যুর রহস্য উদ্ঘাটন হয়ে গেল। তিনি বুঝতে পারলেন যে-
‘প্রথমবার পা ধৌত জল যেমন অল্প কিছুদূর গিয়ে থেমে গিয়েছিল, সেরূপ সংসারে কিছু কিছু লোকের জীবন প্রবাহ বাল্য অবস্থাতেই শেষ হয়ে যায়।অর্থাৎ মরে যায়। দ্বিতীয়বার ঢালা জল আরও কিছুদূর দিয়ে থেমে যাওয়ার মত সংসারে কিছু কিছু লোক যৌবন অবস্থা পর্যন্ত এসে মরে যায়। তৃতীয় বারে ঢালা জল আরও অনেক দূরে গিয়ে থামার মত সংসারে কিছু কিছু লোক অন্তিম অবস্থা অর্থাৎ বৃদ্ধাবস্থা পর্যন্ত এসে মৃত্যু বরণ করে থাকে। এ সবই হল অনিত্য। এ দৃশ্য দেখে তাঁর মধ্যে তীব্রভাবে অনিত্যবোধ জাগ্রত হল। এ অনিত্যতার মধ্যে স্মৃতি করতে করতে তিনি ক্রমান্বয়ে আর্যমার্গের সর্বশেষ স্তর অর্থাৎ অরহত্ব ফল লাভ করলেন। অরহত্ব ফল প্রাপ্ত হয়ে তিনি নিজের ধ্যান-সাধনা সম্পন্ন জীবনের মন্থন করতে গিয়ে উদান বা আনন্দগীতি করছিলেন এভাবে-
‘ নঙ্গলেহি কসং খেত্তং,
বীজানি পবপং ছমা।
পুত্তদারানি পোসেন্তা,
ধনং বন্দন্তি মাণবা।’
অর্থাৎ কৃষক জমিতে হাল দ্বারা কর্ষণ করে তাতে বীজ বপন পূর্বক ধন উপার্জন করে থাকে এবং তাতে স্বীয় স্ত্রী -পুত্রের ভরণ-পোষণ করে থাকে।
‘কিমহং সীলসম্পন্না,
সত্থুসাসনকারিকা।
নিব্বান নাধি গচ্ছামি,
অকুসীতা অনুদ্ধতা।’
অর্থাৎ, তাহলে আমার মত যোগী নির্বাণ কেন লাভ করতে পারবে না? আমি তো অটুট শীলে প্রতিষ্ঠিত আছি, শাস্তার শাসনে নিবেদিত রয়েছি, অপ্রমাদী হয়ে বিচরণ করছি, অচঞ্চল ও বিনীত রয়েছি।
‘ততো চিত্তং সমাধেসিং,
অস্সং ভদ্রং ব জানিযং।
ততো দীপং গহেত্বান,
বিহারং পাবিসিং অহং।
সেয্যং ওলোকযিত্বান,
মঞ্চকম্হি উপাবিসং।
ততো সুচিং গহেত্বান,
বট্টিং ওকস্সযামহং।
পদীপস্সেব নিব্বানং,
বিমোক্খো অহু চেতসো’তি।
এবার আমি জ্বলন্ত দীপক নিয়ে ভিতরে প্রবেশ করেছি। সেখানে গিয়ে দীপকের আলোতে চারপায়া চৌকির উপর বসে পড়লাম এবং দীপকের সলতের মধ্যে দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখলাম। আবার আমি একটি সূঁচ নিয়ে দীপকের সলতে যেভাবেই নীচে করলাম অর্থাৎ তেলের ভিতর ডুবিয়ে দিলাম, অমনি দীপ নিভে গেল। সে দীপক নিভে যাওয়ার সাথে সাথেই আমার চিত্তেরও নির্বাণ হয়ে গিয়েছে। আমার চিত্তের তৃষ্ণারূপী আগুন চিরতরে নিভে গিয়েছে 👏👏👏।

Post a Comment

0 Comments

Ad Code

Responsive Advertisement