বুদ্ধকে সহ সঙ্ঘদান করবেন যেভাবে..!(২য় পর্ব )
*********************************
এখন তো আর বুদ্ধ জীবিত নেই, ভিক্ষুণীসঙ্ঘও নেই। তাই উভয় সঙ্ঘকে দান করতে পারার প্রশ্নই আসে না। তবে অর্থকথামতে, বুদ্ধ সহ ভিক্ষুসঙ্ঘকে দান করা যেতে পারে। তার জন্য ভিক্ষুসঙ্ঘের সামনের আসনে বুদ্ধধাতু নিহিত আছে এমন বুদ্ধমূর্তি বসিয়ে, তার সামনে পাত্র, হাত ধোয়ার পানি ইত্যাদি রেখে দিতে হবে। এরপর দেয়ার সময় প্রথমে বুদ্ধকে দান দিয়ে এরপর ভিক্ষুসঙ্ঘকে দান দিতে হবে। সোজা কথায় প্রথমে বুদ্ধকে সিয়ং দিয়ে পরে ভিক্ষুসঙ্ঘকে দিতে হবে। এভাবে দান দিলে বুদ্ধকে সহ দান করা হয়।
কিন্তু বুদ্ধকে দেয়া সিয়ং বা খাদ্যদ্রব্য, ফুল, সুগন্ধি, চীবর ইত্যাদি নিয়ে কী করা উচিত? সেগুলো কি ফেলে দিতে হয়? নাকি কাউকে দেয়া যায়? অর্থকথা বলছে সেগুলো ভিক্ষুসঙ্ঘকে দেয়া উচিত। কারণ পিতার সম্পত্তিতে পুত্রেরই অধিকার আছে। তবে তেল, ঘি থাকলে সেগুলো দিয়ে প্রদীপ জ্বালানো যায়। কাপড় থাকলে পতাকা বানানো যায়। সোজা কথায় সেগুলো গৃহী লোকজনের ব্যবহারযোগ্য নয়। বুদ্ধকে দেয়া জিনিস কীভাবে একজন গৃহী ভোগ করতে পারে সেটা আমার মাথায় আসে না।
বুদ্ধ সিয়ং কি ফেলে দেয়া উচিত?
******************************
তাহলে লোকজন প্রায়ই তাদের ঘরে যে বুদ্ধকে সিয়ং তুলে রেখে দেয়, সেগুলো কী করা যায়? সেগুলো দুপুরের মধ্যেই ফেলে দেয়া উচিত। নিজেরা খাওয়া উচিত নয়।
কোনো ভিক্ষু যদি নিজেদের খাওয়ার পরে উচ্ছিষ্ট থাকে, তাহলে সেগুলো সে শ্রামণ অথবা গৃহীকে দিতে পারে। তবে সঙ্ঘকে বা বিহারের দেয়া অন্য কোনো জিনিসই গৃহীদের ভোগ করার অধিকার নেই। সেগুলো সাঙ্ঘিক সম্পত্তি। বিহারের মাটি পর্যন্ত কোনো গৃহীকে দেয়া যায় না। দিলেও সেটা সাঙ্ঘিক সম্পত্তি হিসেবেই রয়ে যায়। সেই সাঙ্ঘিক সম্পত্তি কোনো গৃহী যদি ব্যবহার করে থাকে, তাহলে তার খুব পাপ হয়। বিম্বিসার রাজার জ্ঞাতিরা সঙ্ঘের জন্য রাখা খাদ্য খেয়ে কত বুদ্ধান্তর কল্প প্রেতকুলে জন্মে দুঃখ ভোগ করেছে চিন্তা করুন।
কেন ব্যক্তিকে দানের চেয়ে সাঙ্ঘিক দান শ্রেষ্ঠ?
*****************************************
ব্যক্তিকে দানের চেয়ে সঙ্ঘের উদ্দেশ্যে দান যে শ্রেষ্ঠ তা একটু ব্যাখ্যা করা দরকার। মধ্যম নিকায়ের দক্ষিণাবিভঙ্গ সুত্রে বুদ্ধ বলেছেন, হে আনন্দ, ব্যক্তিকে দেয়া দান কোনোভাবেই সঙ্ঘদানের চেয়ে মহাফলদায়ক হয় না। ভবিষ্যতে ভিক্ষুরা হবে নামে মাত্র ভিক্ষু। তারা কেবল গলায় অথবা হাতে এক টুকরো চীবর পেঁচিয়ে ভিক্ষু হিসেবে বিচরণ করবে। অথচ তাদের ঘরে থাকবে স্ত্রী ও পুত্রকন্যার দল। তারা কৃষিকাজ করবে, বাণিজ্য করবে, ক্ষেতখামার করবে, আরো কত কী করবে! ( আমার মনে হয় বর্তমানেও আমরা দেখতে পাচ্ছি এরকম ভিক্ষু! ) এমন দুঃশীল ভিক্ষুদেরও যদি লোকজন ভিক্ষুসঙ্ঘকে উদ্দেশ্য করে দান দেয় সেই দানের ফলও হয় অপরিমেয়। তবে সেখানে শর্ত হচ্ছে একটাই। সঙ্ঘের প্রতি থাকতে হবে অগাধ শ্রদ্ধা। বর্তমানের দুঃশীল ভিক্ষুদেরকে দেখে নয়, বরং মনে রাখতে হবে যে ভিক্ষুসঙ্ঘের মধ্যে সারিপুত্র, মোগ্গলায়ন ইত্যাদি আর্যব্যক্তিগণও আছেন। এভাবে সঙ্ঘ সবসময়ই বিশুদ্ধ। সেই বিশুদ্ধ সঙ্ঘের প্রতি অগাধ শ্রদ্ধা রেখে যদি বর্তমানের নামেমাত্র ভিক্ষুদেরকেও দান করা হয় সেই দানের ফল হয় অগাধ, অপরিমেয়।
সঙ্ঘের প্রতি এমন অগাধ শ্রদ্ধা প্রকাশ পায় কীভাবে? কেউ যদি সঙ্ঘদানের উদ্দেশ্যে বিহারে গিয়ে বলে, ভান্তে, সঙ্ঘ থেকে একজন স্থবির দিন আমাকে। কিন্তু তার কাছে পাঠানো হয় একজন শ্রামণ। তখন যদি সে আফসোস করে, চেয়েছিলাম স্থবির, পেলাম একজন শ্রামণ। তার সেই দান আর পরিপূর্ণ সাঙ্ঘিক দান হয় না। আবার মহাথেরো পেলে যদি খুব খুশি হয় তাতেও সেই দান পরিপূর্ণ সাঙ্ঘিক দান হয় না।
কিন্তু সে যদি সঙ্ঘ থেকে কোনো শ্রামণ বা ভিক্ষু পায়, সে তরুণ হোক, বুড়ো হোক, মুর্খ হোক, পণ্ডিত হোক, যেকোনো একজনকে পেয়েই মনেপ্রাণে সঙ্ঘের উদ্দেশ্যে দান করবে বলে স্মরণ রাখে, তার সেই দান হয় পরিপূর্ণ সাঙ্ঘিক দান। ঐ একজনকে দান করলেও সেটা সাঙ্ঘিক দান হয়ে যায়। এমন দানই হয় শ্রেষ্ঠ দান।
কিন্তু এমন দুঃশীল ভিক্ষুদেরকে দেয়া দান বিশুদ্ধ হয় কাদের দ্বারা? অর্থকথা বলছে, সারিপুত্র, মোগ্গল্লায়ন ইত্যাদি আশিজন মহাথেরো থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত যেসব অর্হৎ উৎপন্ন হয়েছেন তারা এমন সাঙ্ঘিকদানকে বিশুদ্ধ করে দেন। তাই অর্থকথা বলছে, সঙ্ঘে চিত্তীকারং কাতুং সক্কোন্তস্স হি খীণাসৰে দিন্নদানতো উদ্দিসিত্বা গহিতে দুস্সীলেপি দিন্নং মহপ্ফলতরমেৰ। অর্থাৎ, সঙ্ঘের প্রতি অগাধ শ্রদ্ধা নিয়ে সঙ্ঘকে উদ্দেশ্য করে কোনো দুঃশীল ভিক্ষুকে দান দিলেও সেটা একজন অর্হৎকে দানের চেয়ে শ্রেষ্ঠ দান বলে গণ্য হয়।
*******************************
সঙ্ঘকে দানের সুযোগ না পেলে ব্যক্তিকেও দান করা যায়। এক্ষেত্রে এমনকি স্রোতাপত্তি ফল লাভের চেষ্টাকারী ব্যক্তিকে দান দিলেও অসংখ্য অপরিমেয় জন্ম ধরে তার ফল লাভ হয়। অর্থকথামতে, কমপক্ষে ত্রিশরণধারী হলেও সে স্রোতাপত্তি ফল লাভের চেষ্টাকারী ব্যক্তি হিসেবে গণ্য হয়। সেই ত্রিশরণধারীকে দানের ফল পর্যন্ত অসংখ্য, অপরিমেয় জন্ম ধরে লাভ হয়। পঞ্চশীল পালনকারীকে দিলে তো আরো বেশি। তার উপর দশশীল পালনকারীকে দিলে আরো বেশি। তার চেয়েও বেশি ফল লাভ হয় প্রব্রজিত শ্রামণকে দান করলে। ভিক্ষুকে দান করলে আরো বেশি ফল লাভ হয়। শীল ও ব্রত পরিপূর্ণকারী ভিক্ষুকে দিলে তো আরো বেশি ফল। বিদর্শন ভাবনাকারীকে দিলে আরো বেশি। আর যে সবসময় বিদর্শনে রত, কঠোর ভাবনায় রত থাকে সবসময়, এমন ভাবনাকারীকে দিলে আরো বেশি ফল লাভ হয়। তার চেয়েও ভালো হয় স্রোতাপত্তি মার্গস্থ ব্যক্তিকে দিতে পারলে।
মার্গস্থ ব্যক্তিকে দান দেবেন যেভাবে
********************************
কেউ যদি স্রোতাপত্তি মার্গ অথবা অন্য কোনো মার্গ লাভ করে থাকে তাহলে সে হয় মার্গস্থ ব্যক্তি। এখানে মার্গস্থ ব্যক্তি মানে হচ্ছে তার মার্গচিত্ত উৎপন্ন হয়েছে। কিন্তু তার সেই মার্গচিত্ত উৎপন্ন হয়ে নিমেষেই বিলীন হয়ে যায়। এরপরে উৎপন্ন হয় ফলচিত্ত। অর্থাৎ সে মার্গস্থ ব্যক্তি হয়ে অবস্থান করে থাকে মাত্র এক চিত্তক্ষণের জন্য। এরপরেই সে স্রোতাপত্তি ফলস্থ ব্যক্তি বা স্রোতাপন্ন হয়ে যায় চোখের পলকে। তাহলে এত ক্ষণিক মুহুর্তের মাঝে কীভাবে কোনো মার্গস্থ ব্যক্তিকে দান করা সম্ভব? অর্থকথা বলছে, সম্ভব।
ধরা যাক, দিনরাত সবসময় বিদর্শন ভাবনায় রত ভিক্ষু পিণ্ডচারণের জন্য গ্রামে আসল। সে এসে দাঁড়াল কোনো এক বাড়ির সামনে। বাড়ির লোকজন তখন তার হাত থেকে ভিক্ষাপাত্র নিয়ে সেখানে ভাত ও তরকারী দিতে লাগল। ঠিক সেই সময়েই তার মার্গলাভ হলো। সেই লোকজনের ঠিক সেই সময়ে দানটা হলো একজন মার্গস্থ ব্যক্তিকে দান।
অথবা ভিক্ষুটি ভোজনশালায় বসে আছে। লোকজন গিয়ে তার ভিক্ষাপাত্রে ভাত তরকারি দিয়ে দিচ্ছে। সেই সময়ে তার মার্গলাভ হলো। সেই দানটাও তখন হয় মার্গস্থ ব্যক্তিকে দান।
অথবা ভিক্ষুটি বিহারে অথবা ভোজনশালায় বসে আছে। লোকজন তার ভিক্ষাপাত্রটি নিয়ে গেল তাদের বাড়িতে। সেখানে তারা পাত্রের মধ্যে ভাত তরকারি দিতে লাগল। এদিকে সেই সময়েই বিহারে বা ভোজনশালায় বসে থাকা ভিক্ষুুটির মার্গলাভ হলো। সেই দানও হয় মার্গস্থ ব্যক্তিকে দান। এমন দানের ফল হয় অনন্ত, অপরিমেয়।
অন্য ধর্মের লোকজনকে দান দেওয়া যায় না?
*****************************************
পারতপক্ষে দান দেয়ার ক্ষেত্রে কমপক্ষে ত্রিশরণধারী বৌদ্ধকে দান দিতে পারলে ভাল। সেরকম দানের ফলে অসংখ্য জন্ম ধরে দানের ফল লাভ করা যায়। কিন্তু তাও যদি না পাওয়া যায় তাহলে যেসব সাধু সন্ন্যাসীরা ভিন্ন ধর্মাবলম্বী হলেও কর্ম ও কর্মফলে বিশ্বাসী, যারা ধ্যান ও অভিজ্ঞা বা অলৌকিক শক্তি লাভী, তাদেরকে দান দিলেও লক্ষকোটি জন্ম ধরে সেই দানের ফল পাওয়া যায়।
আবার ভিন্ন ধর্মাবলম্বী বহু গৃহী লোকজন আছে যারা শীলবান, যারা কৃষিকাজ, অথবা ব্যবসার মাধ্যমে সহজ সরল জীবন যাপন করে। তাদেরকে দান দিলেও লক্ষ জন্ম ধরে তার ফল পাওয়া যায়।
আবার ভিন্ন ধর্মাবলম্বী বহু লোকজন আছে যারা দুঃশীল। তারা মাছ ও পশুপাখি শিকার করে, অন্যান্য নিষ্ঠুর পেশার মাধ্যমে জীবন ধারণ করে। তাদেরকে দান দিলে হাজার জন্ম ধরে ফল পাওয়া যায়।
সেরকম ব্যক্তি না পেলে পশুপাখি অথবা কীটপতঙ্গকে দান করতে পারেন। পশুপাখিকে দানের ফল পাওয়া একশ জন্ম ধরে।
পোষা প্রাণিকে খাওয়ালেই সেটা দান হয় না..!
***************************************
বলা ভালো, পোষা প্রাণিকে আদর করে, ভালোবেসে, অথবা বাঁচানোর উদ্দেশ্যে, ভরণপোষণের উদ্দেশ্যে যে খাবার দেয়া হয়, যেসব জিনিস দেয়া হয় সেগুলো এখানে গণ্য হয় নি। বরং দানের ফলের আকাঙ্খা করে যদি কোনো কুকুর, শুয়োর, কাক, ইত্যাদি যেকোনো প্রাণিকে উদ্দেশ্য করে কোনোকিছু দেয়া হয়, তাহলেই সেটা পশুপাখিকে দান বলে গণ্য হয়। তাই যেকোনো দান দেয়ার সময় সবসময় পুণ্যের ফলের আকাঙ্খা করা দরকার।
উদাহরণস্বরূপ কোনো কুকুরকে খাবার দেয়ার সময় মনে এই চেতনা থাকা দরকার, “এই দানময় পুণ্য আমার ভবিষ্যতের সুখের কারণ হোক।” এভাবে কর্মফলকে মনে রেখে উচ্ছিষ্ট খাদ্যও যদি কোনো ইতর প্রাণিকে দান করা হয় সেটা শক্তিশালী পুণ্যকর্ম হয়, যা একশ জন্ম ধরে পাওয়া যায়। অন্যান্য দানের ক্ষেত্রেও এরকম চেতনা থাকতে হয়। এমন চেতনাই হচ্ছে ত্রিহেতুক চেতনা, যেখানে অলোভ এবং অদ্বেষ তো থাকেই, কর্মফলের প্রতি বিশ্বাস রেখে দান করার কারণে সেখানে তখন অমোহও থাকে। সেই ত্রিহেতুক চেতনা নিয়ে মানুষ হিসেবে জন্ম নিলে সে চেষ্টা করলেই মার্গফল লাভ করতে পারে।
তাই মানবতাবাদীরা হয়তো দুর্গত মানুষদের সেবায় নিজেদের সর্বস্ব বিলিয়ে দিতে পারে। কিন্তু তারা যদি দানের ফলের আকাঙ্খা না করে দান করে, তাহলে সেটা খুব একটা ফলদায়ক হয় না। বেস্সন্তর রাজা পর্যন্ত তার পুত্রকন্যাকে দান দেয়ার সময়ে বুদ্ধত্ব লাভের আকাঙ্খা করে দান দিয়েছিলেন।
দান নিয়ে লেখা আপাতত এই পর্যন্তই। শেষ কথা হিসেবে বলা যায়, সুযোগ পেলেই দান দেয়া উচিত। রাস্তায় ভিক্ষুককে দেখলে দান দেয়া উচিত। ক্ষুধার্তকে খাবার দেয়া উচিত। দুর্গতকে সাহায্য করা উচিত। এবং সময়ে সময়ে অতি অবশ্যই সঙ্ঘদান করা উচিত। তবে যেকোনো দানের ক্ষেত্রে মনে এই চেতনা রাখা উচিত, এই দানের ফল আমার ভবিষ্যতের সুখের হেতু হোক। এভাবে দান করলেই হয় উত্তম দান।



0 Comments