---------কাকে দান দিবেন
কিছুদিন আগে অভিধর্মের ক্লাসে সেয়াদ কথা প্রসঙ্গে সঙ্ঘের নয়টি গুণের কথা বলেছিলেন। আমি সেগুলো আগেও জানতাম। কিন্তু তা সত্ত্বেও উনার ব্যাখ্যাটা বেশ অসাধারণ বলে মনে হলো আমার কাছে। তিনি নাকি সেটা শুনেছেন ত্রিপিটকধর মিনগুন সেয়াদের দেশনায়।
ব্যাপারটা হচ্ছে এরকম। আমরা সবসময়ই বলি, সঙ্ঘ হচ্ছে সর্বশ্রেষ্ঠ পুণ্যক্ষেত্র। আমরা বলি, কোনো কিছু দান দিলে সঙ্ঘের উদ্দেশ্যেই দান করুন। বিহার করবেন? সঙ্ঘকে দান করুন। তাহলেই সেটা উত্তম দান হবে। ভোজন দান করবেন? তাহলে এক সঙ্ঘ ভিক্ষু এনে খাওয়ান। কোনো মঙ্গল অনুষ্ঠান করবেন? সঙ্ঘকে আমন্ত্রণ করুন। তাহলেই সেটা ইহকাল ও পরকালে মঙ্গলময় হবে। এভাবে সঙ্ঘে দান দিলে সর্বশ্রেষ্ঠ পুণ্যক্ষেত্রে পুণ্যের বীজ বপন করা হয়ে যায়। তাই আমরা ভিক্ষুরা সবসময়ই সঙ্ঘে দান দিতে উৎসাহ দিই। কিন্তু কেন সঙ্ঘকে সর্বশ্রেষ্ঠ পুণ্যক্ষেত্র বলা হয়ে থাকে?
সঙ্ঘ কেন সর্বশ্রেষ্ঠ পুণ্যক্ষেত্র?
***************************
সহজ ভাষায় ব্যাপারটা হচ্ছে এরকম। ভিক্ষুসঙ্ঘ হচ্ছে সুপথের পথিক। এখন এই সুপথের পথিক মানে কী? সুপথ মানে হচ্ছে ভালো পথ, সুন্দর পথ। যারা প্রাণিদের প্রতি নিষ্ঠুর, চুরিডাকাতি-ছিনতাই করে বেড়ায়, মিথ্যা বলতে বাঁধে না, অবৈধ প্রণয়ে লিপ্ত হয়, মদ বা নেশায় মাতাল হয়ে থাকে তাদেরকে আপনি নিশ্চয়ই ভালো বলবেন না। একমাত্র ভালো বলবেন তাদেরকে, যারা প্রাণিদের প্রতি দয়াশীল হয়, চুরিছিনতাই থেকে দূরে থাকে, মিথ্যা বলাকে এড়িয়ে চলে সযতনে, অবৈধ প্রণয় থেকে দূরে থাকে, মদ নেশা থেকে দূরে থাকে। শুধু এই পাঁচটি বিষয়ই নয়, ভিক্ষুদের এমন ২২৭টি নিয়ম পালন করতে হয় খারাপ থেকে দূরে থাকার জন্য। সেটা হচ্ছে শীলের শিক্ষা। এই শীলের শিক্ষার কারণেই ভিক্ষুসঙ্ঘকে সুপথের পথিক বলা হয়ে থাকে।
এছাড়াও আপনি আরেকটা বিষয় খেয়াল করুন। একজন খুব চঞ্চলমনা। তার কথাবার্তা, কাজকর্ম ও চলাফেরা সবকিছুই যেন চঞ্চল বানরের মতো। আরেকজন হচ্ছে শান্তশিষ্ট। তার কথাবার্তা, কাজকর্ম ও চলাফেরা সবকিছুই শান্ত। এদের মধ্যে কাকে আপনার ভালো মনে হয়? চঞ্চল ব্যক্তিকে, নাকি শান্ত ব্যক্তিকে? নিশ্চয়ই শান্ত ব্যক্তিকে। এই শান্ত ব্যক্তি মনটাকে শান্ত করতে শিক্ষা করেছে। তাই যেকোনোকিছুতে সে থাকে ধীরস্থির, অচঞ্চল। সেটা হচ্ছে সমাধি বা ধ্যানের শিক্ষা। এই ধ্যানের শিক্ষার কারণেও ভিক্ষুসঙ্ঘকে সুপথের পথিক বলা হয়ে থাকে।
সর্বশেষ বিষয়টি হচ্ছে জ্ঞান লাভের শিক্ষা। এটা হচ্ছে বিশেষ শিক্ষা যে শিক্ষায় শিক্ষিত হলে বাস্তবতাকে বুঝতে পারা যায়। সংসারে কারোর প্রতি মায়ায় অন্ধ হয়ে থাকাকে তখন অসার বলে উপলদ্ধি হয়। অনিত্যের জ্ঞান জাগে। সেই জ্ঞান থেকে আসে বিরাগ, আসে মোহমুক্তি, সাক্ষাৎ হয় চিরশান্তির নির্বাণের। এটাই হচ্ছে প্রজ্ঞার শিক্ষা। এই প্রজ্ঞা শিক্ষা বৌদ্ধধর্মের বাইরে অন্যকেউ করে না। একমাত্র ভিক্ষুসঙ্ঘই এই প্রজ্ঞা শিক্ষা করে থাকে। একারণেও ভিক্ষুসঙ্ঘকে সুপথের পথিক বলা হয়ে থাকে।
যারা এভাবে শীলের পথে আছে, ধ্যানের পথে আছে, প্রজ্ঞার পথে আছে তাদের পথটা হচ্ছে নির্বাণের সোজা পথ, শান্তির পথ, সম্মানের পথ। সেই পথে যারা দিনরাত পথ চলতে থাকে, তারাই হচ্ছে সেবার যোগ্য, আতিথেয়তার যোগ্য, উৎকৃষ্ট জিনিস দেয়ার যোগ্য, হাত জোড় করে সম্মান জানানোর যোগ্য।
সাহারা মরুভূমির কথা ধরা যাক। সেরকম মরুভূমিতে শুধু আছে বালি আর বালি। সেরকম বালিতে হাজার একর জুড়ে একজন রোপণ করল আলু বা শসা। অন্যদিকে আরেকজন আলু বা শসা রোপণ করল নদীর পাড়ে মাত্র এক একর আয়তনের এক উর্বর শস্যক্ষেত্রে। কার ফসল ভালো হবে বলে আপনার মনে হয়? মরুভূমিতে, নাকি নদীর পাড়ের শস্যক্ষেত্রে? নিশ্চয়ই নদীর পাড়ের পলিমাটিতে শস্য ভালো হবে। মরুভূমিতে হাজার একর জুড়ে শস্য রোপণ করলেও সেটা থেকে আশানুরূপ ফলন আশা করাটা হবে বোকামি।
ঠিক একইভাবে শীলহীন, ধ্যানহীন ও প্রজ্ঞাহীন অন্যান্য যেকাউকে সেবা করলে, আপ্যায়ন করলে, দান করলে, সম্মান প্রদর্শন করলে সেটা অপাত্রে দানের মতো হয়। মরুভূমিতে আলু বা শসা রোপণের মতো হয়। কষ্ট করলেও খুব একটা ফসল ফলে না। অন্যদিকে শীল, ধ্যান ও প্রজ্ঞার শিক্ষায় শিক্ষিত ভিক্ষুসঙ্ঘ হচ্ছে সুপথের পথিক, সোজা পথের পথিক, শান্তির পথের পথিক, সম্মানের পথের পথিক। সেকারণে ভিক্ষুসঙ্ঘকে সেবা করলে, আপ্যায়ন করলে, দান করলে, সম্মান প্রদর্শন করলে তা যেন হয় নদীর পাড়ের উর্বর জমিতে শস্য রোপণের মতো। সেই পুণ্যের কাজগুলো তখন আশাতীত ফসল দিয়ে থাকে। একারণেই ভিক্ষুসঙ্ঘ হচ্ছে পুণ্য অর্জনের জন্য শ্রেষ্ঠ পুণ্যক্ষেত্র।
কাকে দান দেবেন? গরীবকে? নাকি ভিক্ষুসঙ্ঘকে?
*********************************************
অতএব কোনো গরীব পরিবার এবং কোনো ভিক্ষুসঙ্ঘ এই দুইয়ের মধ্যে কাকে আগে দান দেয়া উচিত? সাধারণ যুক্তিতে মানবতাবাদীরা বলে উঠবে, গরীব লোকদেরকেই আগে দান করা উচিত। কিন্তু একজন পুণ্যার্থী সবার আগে বিবেচনা করবে কোথায় দিলে বেশি পুণ্য হয়।
এব্যাপারে একটা ঘটনার কথা মনে পড়ছে। ড. নন্দমালাভিবংশ সেয়াদকে একজন বিদেশি জিজ্ঞেস করেছিল, বার্মার লোকজন পাড়ায় পাড়ায় বড় বড় জাদী বানায় জাঁকজমক করে। কত টাকাপয়সা খরচ করে। অথচ সেই টাকা দিয়ে স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল করতে পারত। কত লোকের কর্মসংস্থান হতো। কত লোকের উপকার হতো। করে না কেন তারা? আপনারা কেন এব্যাপারে কিছু বলেন না?
সেয়াদ বলেছিলেন সেটা যার যার ইচ্ছা বা দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাপার। তাদের কাছে জাদী বানানোটাই গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে, তাই তারা জাদী বানিয়েছে। পর্বতারোহীরা লাখ লাখ টাকা খরচ করে এভারেস্টের চুড়ায় ওঠার জন্য। ঐ পাহাড় পর্বতে উঠে কী লাভ হয়? তার চেয়ে ওদেরকে বলুন ঐ টাকা দিয়ে স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল করুক। অনেকের উপকার হবে। হবে না?
এভাবে মানবতাবাদীরা দেখে কেবল এই জন্মটাকে। কিন্তু পুণ্যার্থীরা গুরুত্ব দেয় ইহকাল ও পরকাল উভয়কে। তাই ভিক্ষুসঙ্ঘের দেখা পেলে তারা চোখ বন্ধ করে নিশ্চিন্তমনে দান করে থাকে। কারণ অর্হৎ থেকে শুরু করে আট প্রকার আর্য ব্যক্তি কেবল এই বুদ্ধশাসনেই বিদ্যমান। এর বাইরে কোথাও নেই। মহাপরিনির্বাণ সুত্রে বুদ্ধ সুভদ্র পরিব্রাজককে বলেছিলেন, যে ধর্মে আর্যঅষ্টাঙ্গিক মার্গ নেই সেখানে আর্যব্যক্তি নেই। তাই অন্য ধর্মগুলো শুন্য, অসার। একারণে ভিক্ষুসঙ্ঘ লাভ হলে ভিক্ষুসঙ্ঘকেই খুশিমনে দান করা উচিত। সেই দান অসংখ্য জন্ম ধরে তার ফল দেয়। এমনই শক্তিশালী সেই পুণ্যফল।
একারণেই দক্ষিণাবিভঙ্গ সুত্রে (ম.নি.৩.৩৭৬) গৌতমী যখন বুদ্ধকে চীবর দান করতে চেয়েছিলেন তখন বুদ্ধ বলেছিলেন, সঙ্ঘকে দাও। সঙ্ঘকে দিলে আমিও পূজিত হব, সঙ্ঘও পূজিত হবে। আবার সঙ্ঘদানের ক্ষেত্রেও ভাগ আছে। বুদ্ধ সহ ভিক্ষু ও ভিক্ষুণীসঙ্ঘকে দিলে সেটা হয় সর্বশ্রেষ্ঠ দান। এর চেয়ে শ্রেষ্ঠ সঙ্ঘদান আর নেই।
তা না হলে আরেকভাবে সঙ্ঘদান করা যায়। “সঙ্ঘ থেকে আমাকে এতজন ভিক্ষু দিন” এভাবে একজন বা দুজন বা তারো বেশি ভিক্ষুকে নিমন্ত্রণ করে দান দিলে সেটাও সঙ্ঘদান হয়।
অথবা সেটা না বলে কোনো গ্রামের মধ্যে যতজন ভিক্ষু আছে, অথবা কোনো জেলার মধ্যে যতজন ভিক্ষু আছে তাদের সবাইকে নিমন্ত্রণ করে দান দিলে সেটাও হয় মহাসঙ্ঘদান।
বুদ্ধকে সহ সঙ্ঘদান করবেন যেভাবে..2য় পর্ব


0 Comments