Hot Posts

6/recent/ticker-posts

Ad Code

অর্থহীন সাধনায় লাভ কিসের?

 


গৃহস্থ জীবন ত্যাগ করে সন্ন্যাস
অর্থাৎ ভিক্ষুত্ব জীবন-যাপন করা সহজ কাজ নয়। সন্ন্যাস গ্রহণ করে অনেকে উপরের আবরণ পরিবর্তন করলেও ভিতরের স্বভাব বা আসক্তি ত্যাগ করতে পারেনা। তা খুবই কঠিন কাজ। সুতরাং ভিক্ষুত্ব আবরণ নির্ভর নয়, বরং মন পরিবর্তনের উপরই নির্ভরশীল। এ প্রসঙ্গে বুদ্ধ কালীন বহুভাণ্ডক স্থবিরের জীবন কথা আমরা এখানে আলোকপাত করতে পারি।
শ্রাবস্তীতে অন্যতম একজন ধনী ব্যক্তি বাস করতেন। তিনি স্বীয় পত্নীর মৃত্যুর পর গৃহত্যাগ করে প্রব্রজ্যা গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু প্রব্রজ্যা ও উপসম্পদা গ্রহণ করলেও তাঁর পুরাতন জীবন-যাপনের রীতি-নীতি কিছুর পরিবর্তন করেননি। নিজের জন্য তিনি একটি বিহার নির্মাণ করেছিলেন। তাতে রান্নাঘর, ষ্টোর রুম প্রভৃতিও ছিল। তিনি নিজের সাথে চাকর-ভৃত্যও রেখেছিলেন। তাঁদের দ্বারা তিনি পছন্দ মতো খাবার তৈরী করিয়ে মনানন্দে আহারাদি করতেন। অনেক বার পরিবর্তন করে করে চীবর পরিধান করতেন। চাকরদের দ্বারা নানাভাবে বিভিন্ন সেবা গ্রহণ করতেন। এভাবে কামভোগী গৃহস্থের মতো আরাম-আয়েস করে দিন যাপন করতেন। অনেক প্রকারের বস্তু বা ভাণ্ড একত্র করে রাখার কারণে লোকেরা তাঁকে ‘বহুভাণ্ডক ভিক্ষু’ বলে অভিহিত করেছিলেন।
একদিন ভিক্ষুগণ তাঁকে বুদ্ধের নিকট নিয়ে গিয়েছিলেন এবং বুদ্ধকে বলেছিলেন যে, তিনি কিভাবে অনেক প্রকার সামগ্রী একত্র করে জীবন-যাপন করছিলেন। বুদ্ধের দ্বারাও জিজ্ঞাসিত হয়ে তিনি স্বীকারোক্তি করেছিলেন যে, তিনি অনেক ভাণ্ড রেখেছেন এবং পুরাতন অভ্যাসের কিছুই ত্যাগ করেননি। তখন বুদ্ধ তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন যে-শাস্ত্র তো সহজ-সরল জীবন যাপনের উপরই জোর দিয়ে থাকে। কিন্তু আপনি এত বেশী সাংসারিক সামগ্রী একত্র করে কেনো রেখেছেন? তাতে তিনি লজ্জিত ও নিজের ভুল স্বীকারের পরিবর্তে ক্রোধান্বিত হয়ে অগ্নিশর্মা হলেন এবং বুদ্ধকে বললেন-‘এখন হতে আমি তাহলে কিছুই রাখবোনা, আপনার কথানুসারে সবকিছুই ত্যাগ করবো।’ এরূপ বলে উত্তেজিত হয়ে তিনি স্বীয় চীবর (উত্তরাসঙ্গ) খুলে দূরের জমিনে ফেলে দিলেন।
তা দেখে বুদ্ধ তাঁকে বুঝাতে গিয়ে বললেন-‘আপনি অতীতে একজন দুষ্ট-দূরাচারী থাকলেও মনে কিছুটা হলেও লজ্জাবোধ ছিল। কিন্তু এখন ভিক্ষুত্ব গ্রহণ করার পর দেখছি আপনি অবশিষ্ট লজ্জা-শরমও কেনো হারিয়ে ফেললেন? আপনার ভিতর হতে লোক লজ্জার ভয়ও কিভাবে চলে গেলো?’ যখন তিনি সে কথা শুনেছেন তখন তিনি স্বীয় ভুল অনুভব করতে লাগলেন। তিনি লজ্জিত হয়েছিলেন এবং লোক লজ্জার ভয়ে বুদ্ধের চরণে ভূ-লুণ্ঠিত হয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করলেন।
তথাগত বুদ্ধ তাঁকে বুঝাতে গিয়ে বলেছিলেন-‘ভিক্ষুর জীবনে চীবর বিহীন থাকা কখনও উচিত নয়। চীবর খুলে মাটিতে ফেলে দেওয়া শোভনীয় নয়। ভিক্ষুর স্বীয় অভ্যন্তর হতে শঙ্কা-সন্দেহ এবং ক্রোধ-আসক্তি ত্যাগ করা উচিত।’
যদি কেহ মনে করে যে, বাহ্যিক কর্ম সমূহ করে চিত্ত শুদ্ধ করে নেবে, তাহলে তা হবে তার ভুল ধারণা। কেবল বাহ্যিক কর্মের দ্বারা মনের শুদ্ধতা আসেনা। আসলেও তা হয় ক্ষণিকের্য। মনের ময়লা কদাপি বাহ্য কর্ম দ্বারা পরিস্কৃত হয়না এবং যথোচিত উপাদান পাওয়া না গেলে মন আরও দুঃখী হয়ে যাবে। এরকম বাক্য প্রচলিত আছে যে-‘মন না রাঙ্গিয়ে যোগী বস্ত্র রাঙ্গায়।’ অর্থাৎ বস্ত্র মাত্র রঙ্গিয়ে যদি হৃদয় এবং মনের রূপান্তর না কবয়, তাহলে তাতে কি লাভ হবে? মনের ময়লা ধৌতকরণ ব্যতীত যা কিছু করা হয় সবই তো ব্যর্থ হবে।
এ প্রসঙ্গে বুদ্ধ তথাগত গাথা ভাষণ করে বলেছেন-
‘ন নগ্গচরিযা ন জটা ন পঙ্কা, নানাসকা ধণ্ডিলসারিকা বা,
রজোমলং উক্কুটিকপ্পধানং, সোধেসি মচ্চং অবিতিণ্ণকঙ্খং।’
(ধম্মপদ-১৪১ গাথা)
অর্থাৎ যে মনুষ্যের মধ্যে আভ্যন্তরীণ বাসনা সমূহ তপ্ত বা ভস্মীভূত হয়নি, তার নগ্ন ব্রত ধারণ, জটা ধারণ, শরীরে মাটি বা ছাই লেপন, উপবাস ব্রত পালন, শক্ত ও কঠিন বিছানায় শয়ন, গোবর লেপন, উৎকুটিক হয়ে উপবেশন ইত্যাদি কোনো বাহ্যিক কর্মই তাকে শুদ্ধ ও পরিস্কৃত করতে পারবেনা। মনের কামনা-বাসনা, লোভ-তৃষ্ণার পরিত্যাগ ব্যতীত কখনোই শুদ্ধিতা আসতে পারেনা।
অনেকে চীবর পরিধান করে লোকের শ্রদ্ধা আকর্ষণের জন্য বাহ্যিক অনেক আচার-ব্যবহার দেখিয়ে থাকেন। কিন্তু ভিতরে লোভ, দ্বেষ, মোহে আসক্ত। হিংসা-বিদ্বেষে পরিপূর্ণ। সুন্দর বচনে অন্যদের আকৃষ্ট করলেও সেগুলি নিজের জীবনে অনুশীলন কম। সেরকম ভিক্ষু বা যোগীকে বলা হয় ভিতরে না রাঙ্গিয়ে বাহিরে রাঙ্গানো।

Post a Comment

0 Comments

Ad Code

Responsive Advertisement