মার বিজয়ী উপগুপ্ত মহাস্থবির বৌদ্ধ ধর্মের ইতিহাসে একজন অত্যন্ত প্রভাবশালী ঋদ্ধিমান অর্হৎ ভিক্ষু ছিলেন। তিনি সম্রাট অশোকের আধ্যাত্মিক গুরু বা দীক্ষাগুরু হিসেবে বিশেষভাবে পরিচিত। গৌতম বুদ্ধের মহাপরিনির্বাণের প্রায় ২৩০ বছর পর তাঁর আবির্ভাব ঘটেছিল। বৌদ্ধ ঐতিহ্যে তাঁকে "মার বিজয়ী" বলা হয় কারণ তিনি বৌদ্ধ পুরাণের বিঘ্ন সৃষ্টিকারী অপশক্তি 'মার'-কে পরাজিত করে ধর্মে দীক্ষিত করেছিলেন।
প্রধান পরিচিতি ও অলৌকিক ক্ষমতা
- সম্রাট অশোকের গুরু: সম্রাট অশোককে চণ্ডাশোক থেকে ধর্মাশোকে পরিণত করতে এবং বৌদ্ধ ধর্ম প্রসারে তিনি প্রধান ভূমিকা পালন করেন।
- ধ্যান ও ঋদ্ধি ক্ষমতা: তিনি অলৌকিক বা ঋদ্ধি ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, তিনি দীর্ঘ সময় পানির নিচে ধ্যানমগ্ন থাকতে পারতেন।
- পানির নিচে ধ্যানকুঠির: বৌদ্ধ লোকগাথা অনুযায়ী, তিনি ক্ষীরোদ সাগরের তলদেশে একটি তাম্র প্রাসাদে ধ্যানমগ্ন থাকেন এবং ভক্তদের আহ্বানে সাড়া দেন।
মার বিজয়ের ঐতিহাসিক ঘটনা
সম্রাট অশোক যখন বুদ্ধের ধাতু বা অস্থি দিয়ে ৮৪ হাজার স্তূপ নির্মাণ শেষ করেন, তখন তিনি একটি বিশাল উৎসবের আয়োজন করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু পাপিষ্ঠ 'মার' (বৌদ্ধ ধর্মে মার হলো লোভ, দ্বেষ ও মোহের প্রতীক তথা বিঘ্ন সৃষ্টিকারী দেবতা) অলৌকিক ক্ষমতার সাহায্যে বারবার সেই উৎসবে নানা উপদ্রব ও বাধা সৃষ্টি করছিল।
তখন সমস্ত সংঘের সিদ্ধান্তে ঋদ্ধিমান উপগুপ্ত মহাস্থবিরকে ডেকে আনা হয়:
- মায়াবী যুদ্ধ: মার নানা রূপ ধারণ করে উৎসব পণ্ড করার চেষ্টা করলে উপগুপ্ত ভান্তে তাঁর অলৌকিক ক্ষমতা দিয়ে মারের সব মায়া নষ্ট করে দেন।
- মৃত কুকুরের মালা: উপগুপ্ত ভান্তে একটি মৃত কুকুরের পচা শরীরকে মালায় রূপান্তরিত করে অলৌকিক মন্ত্রবলে মারের গলায় পরিয়ে দেন, যা মার কোনোভাবেই খুলতে পারছিল না।
- ব্রহ্মার কাছে ব্যর্থতা: মার এই অপদস্থ অবস্থা থেকে মুক্তির জন্য ব্রহ্মা এবং অন্য দেবতাদের কাছে গেলেও কেউ উপগুপ্ত ভান্তের ক্ষমতার বিরুদ্ধে মারকে সাহায্য করতে পারেননি।
- পরাজয় ও ক্ষমা প্রার্থনা: অবশেষে নিরুপায় হয়ে মার উপগুপ্ত মহাস্থবিরের চরণে লুটিয়ে পড়ে ক্ষমা ভিক্ষা করে এবং বৌদ্ধ ধর্মের প্রতি অনুগত হয়।
বুদ্ধের রূপ দর্শন
উপগুপ্ত মহাস্থবির গৌতম বুদ্ধের জীবদ্দশায় জন্ম নেননি, তাই তিনি বুদ্ধকে সশরীরে দেখেননি। মারকে পরাজিত করার পর, তিনি মারের অলৌকিক রূপ পরিবর্তনের ক্ষমতা ব্যবহার করে বুদ্ধের জীবন্ত রূপ ধারণ করতে বলেন। মার যখন বুদ্ধের রূপ ধারণ করে, তখন উপগুপ্ত ভান্তে এতটাই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েছিলেন যে তিনি বুদ্ধরূপী মারের পায়ে বন্দনা করতে যান, যা মারের রূপ পরিবর্তন করার ক্ষমতাকেও স্তব্ধ করে দিয়েছিল।
বর্তমান সমাজে তাঁর পূজার গুরুত্ব
বাংলাদেশ (বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রাম), মিয়ানমার, থাইল্যান্ড এবং ভারতের কিছু অঞ্চলে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের মাঝে উপগুপ্ত বুদ্ধ পূজা বা উপগুপ্ত ভান্তের পূজা অত্যন্ত জনপ্রিয়।
- সাধারণত প্রবারণা পূর্ণিমা বা বিশেষ ধর্মীয় উৎসবে নদী বা পুকুরের মাঝে কৃত্রিম কুঠির বানিয়ে তাঁর উদ্দেশ্যে আলোক উৎসর্গ বা পিণ্ডদান করা হয়।
- বিশ্বাস করা হয়, উপগুপ্ত ভান্তের উপাসনা করলে জীবনের সমস্ত বাধা-বিপত্তি, রোগ-বালাই এবং অপশক্তির হাত থেকে রক্ষা পাওয়া যায়।
মার বিজয়:
- উপগুপ্ত যখন ধর্ম প্রচার করতেন, তখন বহু মানুষ তাঁর উপদেশে আকৃষ্ট হতো।
- মানুষের মনোযোগ নষ্ট করতে পাপের প্রতীক 'মার' বিভিন্ন মায়াবী রূপ ও প্রলোভন সৃষ্টি করে।
- অসীম আধ্যাত্মিক শক্তির (ঋদ্ধিবল) মাধ্যমে উপগুপ্ত মারকে সম্পূর্ণভাবে পরাজিত ও বশ করেন।
বুদ্ধের রূপ ধারণ:
- মারকে বশ করার পর, উপগুপ্তের অনুরোধে মার বুদ্ধের শারীরিক রূপ ধারণ করেন।
- যেহেতু বুদ্ধ তখন মহাপরিনির্বাণ লাভ করেছিলেন, তাই সাধারণ মানুষের ধর্মতৃষ্ণা মেটাতে উপগুপ্ত মারকে বুদ্ধের রূপ ধরতে বলেছিলেন।
বৌদ্ধ ঐতিহ্যে গুরুত্ব:
- দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায়, বিশেষ করে মায়ানমার এবং বাংলাদেশের বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মধ্যে তিনি একজন অতি পূজনীয় এবং জীবন্ত সত্তা হিসেবে বিশ্বাসযোগ্য।
- মায়ানমারে তিনি 'শিন উপাগুত্ত' (Shin Upoguptta) নামে পরিচিত এবং মিয়ানমারের সংস্কৃতিতে তাঁকে জল ও সম্পদের রক্ষক হিসেবেও মানা হয়।
- এছাড়াও, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর বিখ্যাত 'উপগুপ্ত' কবিতায় এই মহান ভিক্ষুর অহিংসা ও করুণার বাণী তুলে ধরেছেন।
0 Comments