Hot Posts

6/recent/ticker-posts

Ad Code

মহাকবি অশ্বঘোষের মহান কৃতি


পৃথিবীর প্রাচীনতম মহাকবিদের চর্চা যখনই করা হয়, তখন আচার্য অশ্বঘোষের নাম অতীব সম্মানের সাথে নেওয়া হয়। তিনি কেবল একজন কবি ছিলেন তা নয়, বরং তিনি বৌদ্ধ দর্শন, সঙ্গীত, নাটক এবং সংস্কৃত কাব্য পরম্পরার মহান আচার্যও ছিলেন। অনেক ইতিহাসবিদ তাঁকে সংস্কৃতের প্রথম ব্যবস্থিত মহাকবি বলে মান্যতা প্রদান করে থাকেন। কেননা তাঁর দ্বারা রচিত কাব্য এখনও আমাদের নিকট উপলব্দ হয় এবং ঐতিহাসিক রূপেও সেগুলি প্রমাণিত সত্য।

মহাকবি অশ্বঘোষের পূর্বে কালিদাস, বাল্মিকী এবং ব্যাস প্রমুখ যাঁদের নাম মহাকবিরূপে উল্লেখ করা হয়, তাঁদের সম্পর্কে ঐতিহাসিক তিথি, বাস্তবিক জীবনকাল এবং মূল রচনাবলীর প্রমাণ আজও বিবাদের বিষয় হয়ে রয়েছে। অপরদিকে আচার্য অশ্বঘোষের কাল, তাঁর ব্যক্তিত্ব এবং তাঁর রচনাবলী অভিলেখ তথা বিদেশী যাত্রীদের বিবরণ দ্বারা স্পষ্টরূপে অস্তিত্বে পাওয়া যায়।
ভারতবর্ষে বিদ্যার্থী জীবনের প্রারম্ভ হতেই লোকেরা সংস্কৃত কাব্য এবং ছন্দ সমূহের অধ্যয়ন করে আসছিলেন। ভারতবর্ষে বিদ্যার্থী কোনো প্রসিদ্ধ শ্লোক বা কাব্যংশকে যেমন স্মরণ করে থাকেন, অনুরূপভাবে প্রাচীন চীনেও বৌদ্ধ ভিক্ষু এবং বিদ্যার্থীগণ মহাযান বৌদ্ধ গ্রন্থের অধ্যয়ন করতেন। বিশেষভাবে Lotus Sutra ( সদ্ধম্ম পুণ্ডরিক সূত্র) এবং Mahaparinirbana Surra ( মহাপরিনির্বাণ সূত্র) এর অধ্যয়ন ছিল অতীব লোকপ্রিয়।
এ সমস্ত গ্রন্থের চীনা অনুবাদ প্রায় ৪০৪ খৃষ্টাব্দ সময়ের মধ্যে চীনে পৌঁছেছিল। এতে এ বিষয়ের প্রমাণ করে যে, ভারতের বৌদ্ধ সাহিত্য এবং কাব্য পরম্পরা সে সময় সমগ্র এশিয়া ব্যাপী প্রসারিত হয়েছিল। চীন, জাপান, কোরিয়া এবং মধ্য এশিয়া পর্যন্ত ভারতীয় বৌদ্ধ কবি এবং আচার্যদের প্রভাব দেখা গিয়েছে।
সম্রাট হর্ষবর্ধন (৫৯০-৬৪৭), যাঁকে শিলাদিত্য নামেও জানা যায়, তিনি নিজে বৌদ্ধ সাহিত্য এবং নাট্য পরম্পরার সংরক্ষক ছিলেন। তাঁর সময়ে জাতক কাহিনীর ব্যাপক প্রচার হয়েছিল। বিশেষভাবে বোধিসত্ব জীবুতবাহনের কথা অত্যন্ত প্রসিদ্ধ হয়েছিল। তিনি ছিলেন সে বোধিসত্ব যিনি একটি নাগকে বাঁচানোর জন্য নিজেকে বলিদান করেছিলেন। এ কাহিনী পরবর্তীতে নাটক, সঙ্গীত এবং কাব্যে স্থান পেয়ে সমগ্র ভারত তথা পূর্ব এশিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছিল।
পূর্ব ভারত এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াতেও বৌদ্ধ কাহিনী সমূহের গভীর প্রভাব দেখা গিয়েছে। রাজা বিশ্বন্তর (বেস্সন্তর জাতক) জাতকের কাহিনী, যা আজকের সুদান ক্ষেত্রের সাথেও যুক্ত করা যায়, সঙ্গীত, নাটক এবং লোক পরম্পরা সমূহে জীবিত রয়েছে।
আচার্য অশ্বঘোষের মহান কৃতি সমূহের মধ্যে ‘বুদ্ধচরিত’ এবং ‘সূত্রালঙ্কার’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ‘বুদ্ধচরিত’ মহাকাব্যটি হল তথাগত বুদ্ধের জীবনের উপর আধারিত সংস্কৃত সাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। যা কেবল ভারতেই নয়, বরং এশিয়ার অনেক দেশে পঠন-পাঠন করা হতো। তাঁর কাব্য সমূহে দর্শন, করুণা, সঙ্গীত এবং সাহিত্যের অদ্ভুত সমন্বয় দেখা যায়।
চীনা বৌদ্ধ ভিক্ষু ও পর্যটক ইৎ-সিং (৬৩৫-৭১৩), যিনি ৬৭১ খৃষ্টাব্দ হতে ৬৯৫ খৃষ্টাব্দ পর্যন্ত ভারত এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় অবস্থান করেছিলেন, তিনিও ভারতীয় বৌদ্ধ সাহিত্য, শিক্ষা এবং সংস্কৃত কাব্যের ব্যাপক পরম্পরার উল্লেখ করেছেন। তাঁর বিবরণ হতে জানা যায় যে, সে সময় ভারতের বৌদ্ধ বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিহার সমূহে কাব্য, নাটক, সঙ্গীত এবং দর্শনের উচ্চ স্তরের অধ্যয়ন হতো।
এভাবে আচার্য অশ্বঘোষ কেবল একজন কবি ছিলেন তা নয়, বরং তিনি ভারতের সে প্রাচীন বৌদ্ধ জ্ঞান পরম্পরার একজন প্রতিনিধিও ছিলেন, যিনি সম্পূর্ণ এশিয়ার সংস্কৃতি, সাহিত্য এবং দর্শনকে প্রভাবিত করেছিলেন।

Post a Comment

0 Comments

Ad Code

Responsive Advertisement