Hot Posts

6/recent/ticker-posts

Ad Code

*প্রজ্ঞা কি? **


কুশলচিত্ত সম্প্রযুক্ত বির্দশন জ্ঞানই প্রজ্ঞা। প্রজ্ঞা হল জগতের তত্ত্ববিষয়ক বিষয়ে যথাভূত দর্শন। বিষয় বা আলম্বনের স্বভাব জানাই প্রজ্ঞা। প্রজ্ঞা মোহকে পরাভূত করে। প্রজ্ঞাই সর্বশ্রেষ্ঠ ইন্দ্রিয়। এটা নির্বান প্রর্দশী। বৌদ্ধধর্মে সাধনার মূল উদ্দেশ্য প্রজ্ঞার পূর্ণতা লাভ। আর প্রজ্ঞার পরিপূর্ণতা হয় সপ্তবিশুদ্ধির মাধ্যমে।
**প্রজ্ঞা কত প্রকার ও কি কি?
বিদর্শন জ্ঞান যত প্রকার প্রজ্ঞাও তত প্রকার। বির্দশন জ্ঞান দশ প্রকার। যথা- সংমর্শন, উদয়-ব্যয়, ভঙ্গ, ভয়, আদীনব, নির্বেদ, মুমুক্সা, প্রতিসঙ্খ্যা, সংস্কারোপেক্ষা এবং অনুলোম জ্ঞান।
এ সপ্তবিশুদ্ধি হল।
1। শীল বিশুদ্ধি
2। চিত্ত বিশুদ্ধি
3। দৃষ্টি বিশুদ্ধি
4। কঙ্খা উত্তরণ বিশুদ্ধি
5। মার্গমার্গ জ্ঞানদর্শন বিশুদ্ধি
6। প্রতিপদা জ্ঞানদর্শন বিশুদ্ধি
7। জ্ঞানদর্শন বিশুদ্ধি
নিম্নে আলোচনা করা গেল:
1। শীল বিশুদ্ধি কি?
===============
সাধনমার্গের প্রথম সোপান হল শীল বিশুদ্ধি। এ শীল-পালন করার অর্থ কায় ও বাক্যেকে সংযম রক্ষা করা। প্রথম জীবনে যাঁরা এ শীল পালন অভ্যাস করেন, তাঁরা ভাবনার উপযোগী। বলে গণ্য হয়। প্রথমে জীবনকে নিয়ন্ত্রণ ও পরিশুদ্ধ করে চরিত্র সুন্দর ও নির্মল না করলে আধ্যাত্নিক জীবনের বিকাশ সম্ভব নয়। গৃহীদের পঞ্চশীল, অষ্টশীল ও দশসুচরিতশীল পালন করতে হয়। আর ভাবনাকালে আধ্যাত্নশীল অবশ্যই পালন করতে হবে। ইন্দ্রিয়সংবরণ শীল ( চুক্ষ আদি ইন্দ্রিয় সংযম), আজীবপরিশুদ্ধশীল ( সৎভাবে জীবিকা অর্জন), প্রত্যয়সন্নিশ্রিত শীল ও পাতিমোক্ষ সংবরণশীল।
2। চিত্ত বিশুদ্ধি
===================
উপচার সমাধি ও অর্পণা সমাধির প্রভাবে চিত্তের নিবরণহীন প্রীতিময় অবস্থার নাম চিত্ত বিশুদ্ধি। নিরন্তর সাধনায় চিত্তের একাগ্রতা বৃদ্ধির ফলে সমাধি কমেশঃ গভীর হয়। এর ফলে পঞ্চনীবরণ, পঞ্চধ্যানাঙ্গের বলে আস্তে আস্তে চিত্তের আস্বাদন সরে যায়। তখন চিত্ত প্রভাস্বর বা নির্মল হয়। পরিশুদ্ধ চিত্ত অর্পণাবহ, তাই চিত্ত বিশুদ্ধি অপরিহার্য।
অষ্টসমাপত্তি পূর্ণ করে চিত্ত বিশুদ্ধি সম্পাদিত হয়।
3। দৃষ্টি বিশুদ্ধি
===================
এখানে দৃষ্টি অর্থ মিথ্যাদৃষ্টি বা ভ্রান্তধারণার কথা বলা হয়েছে। পঞ্চস্কন্ধে আমি বা আমার আত্না ধারণাই মিথ্যাদৃষ্টি। নামরুপের প্রবাহকে আমি বরা হয়। কোনটা একক বা সমবায়ে আমি নই বা আমার আত্না নহে। এরুপ বিচার করে নামরুপে অনাত্নভাব উপলদ্ধিই সম্যক বা দৃষ্টি বিশুদ্ধি । দৃষ্টি বিশুদ্ধির ফলে অহংবাব বা ৬২প্রকার মিথ্যাদৃষ্টি বা সংশয় দুর হয়ে যায়।
4। কঙ্খা উত্তরণ বিশুদ্ধি
===================
কঙ্খা উত্তরণ বিশুদ্ধিঃ কঙ্খা অর্থ সংশয়। অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যত জীবন সম্পর্কে মানুষের ১৬ প্রকার সংশয় উৎপন্ন হয়। যেমন- অতীতে আমি কি ছিলাম? না ছিলাম না? কি ছিলাম? কিরুপ ছিলাম? কিরুপ অবস্থা হতে কিরুপ অবস্থায় পরিবর্তন হলাম ? ইত্যাদি বর্তমান ও ভবিষ্যতে একই প্রশ্ন। এরুপ সংশয় হতে মুক্ত হওয়াই কঙ্খা-উত্তরণ বিশুদ্ধি জ্ঞান। সাধক তখন বুঝতে পারেন জগতের সব কিছুই এবং তিনি নিজেও কারণ-সম্ভূত। এভাবে প্রতীত্য সমুৎপাদনীতি বা কার্যকারণতত্ত্ব সম্পর্কে তিনি সম্যক ভাবে জ্ঞাত হন। প্রতীত্য সমুৎপাদ সম্পর্কে জ্ঞানই পূর্ব প্রকাশের পর কঙ্খা উত্তরণ বিশুদ্ধি।
5। মার্গমার্গ জ্ঞানদর্শন বিশুদ্ধি
===================
মার্গমার্গ জ্ঞানদর্শন বিশুদ্ধিঃ নাম-রুপ সম্পর্কে সংশয়-বিমুক্তি জনিত বিসুদ্ধি জ্ঞান লাভের পর অনিত্য-দুঃখ-অনাত্ম এই তিন প্রধান লক্ষণ ভাবনা করতে করতে যে জ্ঞান জম্মে তাকে সংমর্শন জ্ঞান বলে। এ ত্রিলক্ষণ জ্ঞাত হলে দেখা যায়- নাম-রুপ একটি উৎপত্তি ও বিলয়শীল প্রবাহ। হেতুর উৎপত্তিতে এর উৎপত্তি, হেতুর নিরোধে এর নিরোধ। এটা উদয়-বিলয় জ্ঞান। সংমর্শন জ্ঞানের সাথে উদয়-বিলয় ভাবনা করতে করতে এমন এক সময় উপস্থিত হয়- যখন বিভিন্ন প্রকার প্রীতিতে তাঁর দেহ-মন প্লাবিত হতে থাকে। এভাবে জ্যোতি, প্রীতি, আনন্দ, প্রশান্তি, শ্রদ্ধা, বীর্য, স্মৃতি, অন্তর্দৃষ্টি ও উপেক্ষা উৎপন্ন হয়। সাধক এ অভূতপূর্ব অবস্থাকে বিশেষতঃ দৈহিক জ্যোতিকে অর্হত্বের অবস্থা বলে ভূল করেন এবং এ অবস্থা আকাঙ্খা করেন। পরে নিজের বিচার শক্তিতে কিংবা গুরুর উপদেশে লদ্ধ ধ্যানের প্রতি এ সুক্ষ্ণ অনুরাগ জনিত তৃষ্ণা বিদর্শনের বাধা বলে উপলদ্ধি করতে পারেন। এরুপে তিনি মার্গ বা অমার্গ সম্পর্কে সম্যকরুপে জ্ঞাত হন। এটাই মার্গমার্গ জ্ঞানদর্শন বিশুদ্ধি।
6। প্রতিপদা জ্ঞান দর্শন বিশুদ্ধি
===================
প্রতিপদা জ্ঞান দর্শন বিশুদ্ধিঃ প্রতিপদা অর্থ প্রকৃত পথ বা মার্গ । আট প্রকার জ্ঞানের দ্বারা সুনিয়ন্ত্রিত বির্দশন এবং অনুলোম-জ্ঞান এই নববিধ জ্ঞানই প্রতিপদা জ্ঞান দর্শন বিশুদ্ধি বলে। আট প্রকার জ্ঞান, যথা : উপক্লেশ-বিমুক্তি উদয়-বিলয়-জ্ঞান, ভঙ্গ-জ্ঞান, ভয়-জ্ঞান, আদীনব-জ্ঞান, নির্বেদ-জ্ঞান, মুমূক্ষা-জ্ঞান, প্রতিসংখ্যা-জ্ঞান, ও সংস্কারোপেক্ষা -জ্ঞান, এবং নবমজ্হান অনুলোম-জ্ঞান। সুতরাং প্রতিপদা জ্ঞান দর্শন বিসুদ্ধি সাধন করতে হলে উপক্লেশ-বিমুক্ত উদয়-বিলয়-জ্ঞান হতে আরম্ভ করে ক্রমে ভঙ্গ-জ্ঞানাদি প্রতি মনোযোগ করা কর্তব্য।
7। জ্ঞান দর্শন বিশুদ্ধি
===================
জ্ঞান দর্শন বিশুদ্ধিঃ স্রোতাপত্তি, সকৃদাগামী, অনাগামী ও অর্হত্ব - এ চার মার্গের সমষ্টিগত নাম জ্ঞান দর্শন বিশুদ্ধি। অনুলোম-জ্ঞানের পরেই গোত্রভূ-জ্ঞান নির্বাণকে আলম্বন স্বরুপ করে উৎপন্ন হয়। উৎপত্তি-ক্ষণে গোত্রভূ-জ্ঞান যেমন একদিকে নিম্ন সাধন-স্তরকে অতিক্রম করে, তেমনি অন্য দিকে আর্য্য বা উন্নততর সাধন স্তর উৎপাদন করে। গোত্রভূ-জ্ঞানের উৎপত্তির পরেই স্রোতাপত্তি-মার্গজ্ঞান উৎপন্ন হয়। এর উৎপত্তি ক্ষণে দুঃখের সম্যক অবগতি, দুঃখোৎপত্তির হেতু পরিত্যাগ, নিরোধ সাক্ষাৎকার এবং ভাবনাবশে সমাধি-বীথিতে আর্য্য মার্গে অবতরন, এ চারিপ্রকার আর্য্যসত্যের কার্য্য এক সঙ্গে উৎপন্ন হয়। স্রোতাপত্তি-মার্গজ্ঞানের উৎপত্তির পরেই স্রোতাপত্তি-ফল-জ্ঞান উৎপন্ন হয়, তারপরে ভবাঙ্গপাত হয়। পুন ভবাঙ্গ অবচ্চিন্ন করে পর্যবেক্ষণ-জ্ঞান উৎপন্ন হয়। যোগী পর্যবেক্ষণ-জ্ঞানে তাঁর রাগ,দ্বেষ,মোহাদি দশবিধ ক্লেশের মধ্যে কতটা ক্লেশ মুলত উচ্ছিন্ন হল, কতটা অবশিষ্ট রইল ইত্যাদি দর্শন করে। অনুলোম-জ্ঞান আর্যসত্য প্রতিচ্ছাদক ক্লেশ-অন্ধকার অপনোদন করতে সমর্থ, কিন্তু নির্বাণকে অবলম্বনস্বরুপ গ্রহন করতে অসমর্থ। গোত্রভূ-জ্ঞান নির্বানকে অবলম্বনস্বরুপ গ্রহন করতে মাত্র সমর্থ।
পরিশেষে বলা যায় য়ে, একজন সাধক তাঁর সাধনার পরিপূর্ণতা স্বরুপ নির্বাণ বা প্রজ্ঞাকে আয়ত্ত করতে এ সপ্তবিসুদ্ধি মধ্যে যেতে হবে। তবেই সাধক তাঁর চরম লক্ষ্যে পৌঁছতে সক্ষম হবেন। কারণ আমরা জানি বৌদ্ধ ধর্মের মুল লক্ষ্যে হল নির্বাণ।

Post a Comment

0 Comments

Ad Code

Responsive Advertisement