স্বাধীনতাত্তোর ভারতে যে কয়জন বাঙালি বৌদ্ধ ভিক্ষুব্যক্তিত্ব বুদ্ধশিক্ষার প্রচার-প্রসার মানসে ভারতে গিয়ে অনলস পরিশ্রম করেছেন তন্মধ্যে বিদর্শনাচার্য ড. রাষ্ট্রপাল মহাথেরর নাম প্রথম সারিতে। তিনি ছিলেন একাধারে লেখক ও গবেষক, বিদর্শনাচার্য ও ধর্মবেত্তা।
এই মহান ভিক্ষুকুল গৌরব ১৯৩০ খ্রিস্ট্রীয় সনের ২৫ শে এপ্রিল চট্টগ্রাম জেলার রাউজান থানার অন্তর্গত ফতেনগর নামক গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম অর্জুন চন্দ্র বড়ুয়া ও মাতার নাম কৌশল্যাময়ী বড়ুয়া। পিতা-মাতার পাঁচজন সন্তান-সন্ততির মধ্যে তিনি হলেন চতুর্থ জন। জন্মের পর তাঁর পুণ্য নামকরণ করা হয় ‘সাতকড়ি বড়ুয়া’। তাঁর অন্যান্য ভাইবোন হলেন- হেমেন্দ্র লাল বড়ুয়া (বাংলাদেশ বৌদ্ধ সমিতির প্রাক্তন সভাপতি), শ্রীমতি চারুবালা বড়ুয়া, রাজবিহারী বড়ুয়া ও নীহার বালা বড়ুয়া।
বালক বয়সেই তিনি পিতৃহারা হয়েছিলেন। ঠাকুমা চিন্তামণি বড়ুয়ার সাথে বিহারে নিত্য আসা যাওয়া করতে করতে স্ব-গ্রাম ফতেনগর গ্রামের বিহারের তদানীন্তন অধ্যক্ষ বিনয়শীল জ্ঞানতপস্বী জিনবংশ মহাস্থবির তাঁর জীবনে আদর্শিক ছাপ ফেলতে সক্ষম হন।
তিনি ১৯৪৭ সালে জে.এম. সেন স্কুলে ভর্তি হয়ে, পরে পটিয়াস্থ হাবিলাসদ্বীপ উচ্চ বিদ্যালয় মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ১৯৫৩ সালের ১৯ মে তিনি পটিয়ার তেকোটা ও মুকুটনাইট গ্রামের মধ্যবর্তী ‘বৌদ্ধ সেবা সদন’-এ পণ্ডিত প্রজ্ঞানন্দ মহাস্থবিরের সান্নিধ্যে থেকে অগ্রমহাপণ্ডিত প্রজ্ঞালোক মহাস্থবিরের নিকট প্রব্রজ্যা ধর্মে দীক্ষা গ্রহণ করেন। ১৯৫৩ সালেই ২৫ মে প্রব্রজ্যা গ্রহণের পরপরই তিনি বর্তমান বোয়ালখালী থানার অধীন বৈদ্যপাড়া শাক্যমুনি বিহারে গুরু পণ্ডিত প্রজ্ঞানন্দ মহাস্থবিরের নিকট পবিত্র উপসম্পদা গ্রহণ করেন। তখন তাঁর বয়স ছিল তেইশ বছর। উল্লেখ্য, সেবাসদনটি ছিল তৎকালীন সময়ে একমাত্র সাঙ্ঘিক প্রতিষ্ঠান। এটি ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষের সময় দুর্ভিক্ষ পীড়িতের সাহায্যার্থে স্থানীয় দায়কদের দানকৃত ছয় বিঘা জমিতে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছিল। সেবাসদন নামক সংস্থাটির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন অগ্রমহাপণ্ডিত প্রজ্ঞালোক মহাস্থবির ও সাধারণ সম্পাদক ছিলেন পণ্ডিত ধর্মাধার মহাস্থবির মহোদয় (পরবর্তীতে ভারতীয় সঙ্ঘরাজ)।
উপসম্পদার পর উচ্চ শিক্ষার্থে তেকোটা সদ্ধর্ম বিকাশ বিহারের দায়িত্ব নিয়ে এসে বিখ্যাত জ্ঞানপীঠ কানুনগো পাড়া স্যার আশুতোষ কলেজে ভর্তি হয়ে কৃতিত্বের সাথে প্রথম বিভাগে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করেন। ১৯৫৮ সালে গুরুদেব প্রজ্ঞানন্দ মহাথেরর সাথে ভারতে তীর্থ ভ্রমণে গমন করলে সেখানে নব-নালন্দা মহাবিহারের (বিশ্ববিদ্যালয়) অধ্যাপক মুকুটনাইট গ্রামজাত ড. বি. জিনানন্দ ভিক্ষুর সাথে সাক্ষাৎ হলে তাঁর উৎসাহে ও গুরুর সম্মতিতে ১৯৬০ সালে ভারতে চলে এসে সেই নব-নালন্দা মহাবিহার হতে বি.এ. ও এম.এ. পাশ করেন বৌদ্ধ বিদ্যা বিষয়ে। ইতোমধ্যে তিনি পণ্ডিত সুভূতিরঞ্জন বড়ুয়ার তত্ত্বাবধানে পালি টোল থেকে সূত্র, বিনয়,ও অভিধর্মের পরীক্ষায় সসম্মানে উত্তীর্ণ হয়েছিলেন। উল্লেখ্য, ড. জিনানন্দ ভিক্ষু মহোদয় পরবর্তীতে গৃহি হন ও দিল্লী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক পদে বৃত হন। তাঁর কন্যা ড.শুভ্রা বড়ুয়া পভাগাদি মহাশয়াও দিল্লী বিশ্ববিদ্যালয়ে বৌদ্ধবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক।
রাষ্ট্রপাল মহাথের পরবর্তীতে মগধ বিশ্ববিদ্যালয় হতে প্রখ্যাত বৌদ্ধবিদ্যা বিশারদ অধ্যাপক ড. মহেশ তিওয়ারী মহাশয়ের প্রত্যক্ষ নির্দেশনায় ‘দ্য কনসেপশন অব গড ইন পালি তিপিটক’ বিষয়ে অভিসন্দর্ভ রচনা করে পি.এইচ.ডি. ডিগ্রি লাভ করেন। উল্লেখ্য, তিনি হলেন বাঙালি বৌদ্ধ ভিক্ষুদের মধ্যে প্রথম পি.এইচ.ডি. ডিগ্রী লাভকারী ভিক্ষু।
ধ্যানাচার্য ড. রাষ্ট্রপাল মহাথের পবিত্র ভিক্ষু জীবনের সূচনা লগ্নতেই এমনকি বাল্যকাল হতেই ধ্যানচর্চায় আত্মনিয়োজিত ছিলেন। বাল্যকালে ঠাকুমা চিন্তামণি বড়ুয়া ও স্ব-গ্রাম ফতেনগরের তৎকালীন অধ্যক্ষ বিনয়াচার্য জিনবংশ মহাথেরর সান্নিধ্যে, ভিক্ষুত্বে দীক্ষা নেবার পর বিনয়াচার্য সুভূতিরত্ন মহাথের ও অষ্টম সঙ্ঘরাজ সাহিত্যরত্ন শীলালঙ্কার মহাস্থবির, বিনয়াচার্য বংশদীপ মহাস্থবির, আর্যশ্রাবক জ্ঞানীশ্বর মহাস্থবির, অগ্রমহাপণ্ডিত প্রজ্ঞালোক মহাস্থবির প্রমুখগণের প্রভাবে ধ্যানাভ্যাস করেন। ভিক্ষুজীবনের প্রারম্ভে তিনি করলডেঙ্গার অরণ্যে ধ্যানচর্চা করতেন। আর্যশ্রাবক জ্ঞানীশ্বর মহাস্থবির, বিনয়াচার্য সুমনাচার মহাস্থবির, ধ্যানাচার্য ধর্মবিহারী ভিক্ষু প্রমুখদের কাছে তিনি প্রত্যক্ষভাবে ধ্যানাভ্যাস শিক্ষা করেন। ভারতে চলে যাবার পর, অনাগারিক মুনীন্দ্রজী, ধ্যানাচার্য ননীবালা বড়ুয়া (দীপা মা), মহাসী শোভন সেয়াড, উ. পাণ্ডিতা সেয়াড, উ. সুন্দরা সেয়াড প্রমুখদের কাছ হতে তিনি ধ্যান শিক্ষা করেন। ধ্যানে তিনি এত বেশি অভিরমিত হয়ে পড়েছিলেন যে তিনি ‘সাইকোলজিক্যাল অ্যাপ্রোচ টু দ্য বুদ্ধিস্ট মেডিটেশন’ বিষয়ে ডি.লিট. করা চিরতরে বাদ দিয়েছিলেন। নইলে তিনিই হতেন বাঙালি ভিক্ষুসঙ্ঘের মধ্যে প্রথম ডি. লিট. উপাধিধারী অন্তত ২০২৪ সাল পর্যন্ত একমাত্র ভিক্ষু। অদ্যাবধি, বাঙালি ভিক্ষুসঙ্ঘের মধ্যে কেউ ডি.লিট. উপাধি লাভ করেছেন বলে জানা নেই।
ডি. লিটের জন্য মনস্তত্ত্ব নিয়ে গবেষণা কালে ধ্যানের প্রতি আকৃষ্ট হন। এ প্রসঙ্গে বোধিপাল শ্রমণ প্রণীত ‘বিদর্শনঃ পূর্ণশান্তিও সমাধান সূত্র’ গ্রন্থের প্রাকভাষণে বা ভূমিকায় স্বয়ং রাষ্ট্রপাল ভন্তে নিজের সম্পর্কে যে বর্ণনা দিয়েছেন তা প্রণিধানযোগ্য, “নব নালন্দা মহাবিহার পোষ্ট গ্রাজুয়েট শিক্ষাকেন্দ্র অধ্যয়নকালে হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন শাস্ত্রে দেবদেবীর প্রভাব বিষয়ে গবেষণা করে ডক্টরেট উপাধিতে ভূষিত হলে উচ্চতর ডিলিট করতে গিয়ে‘ ধ্যানসাধনায় মনস্তাত্ত্বিক ভূমিকা’ বিষয়ক পাঠ্যসূচী গ্রহণ করি। গবেষণায় নিরত থাকাকালীন বিদর্শন সাধনা ভাবনা সম্যকভাবে প্রশিক্ষণ নেয়ার জন্য এক তীব্র আকাক্সক্ষা জেগে ওঠে। আমার এ ইচ্ছাকে চরিতার্থ করার উদ্দেশ্যে দেশ-দেশান্তর পরিভ্রমণ করে, ছয়জন বিদর্শনাচার্যের নিকট সাধনা করে প্রভূত শান্তির অধিকারী হই। এ সময় বড়ুয়া বৌদ্ধ ভিক্ষুদের মধ্যে প্রথম ডক্টরেট উপাধিতে বিভূষিত হওয়ায়, আমাকে অভিনন্দিত করার এক নজিরবিহীন হিড়িক পড়ে যায়। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশে গেলে এজন্য বহু সভাসমিতিতে অংশগ্রহণ করতে বাধ্য হই। ভাষণ দিতে গিয়ে, আমি সচরাচর বিদর্শন ধ্যান বিষয়ে বক্তব্য পরিবেশন করে জাতি ধর্ম নির্বিশেষে, হাজার হাজার লোককে অনুপ্রাণিত করার প্রয়াসী হই।”
১৯৭০ সালে ভারতের বুদ্ধগয়ায় আন্তর্জাতিক ভাবনা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার আগে হতেই তিনি বিদর্শন ভাবনার প্রচার ও প্রসারে প্রচেষ্টা করে গেছেন। এবং পরবর্তীতে বুদ্ধগয়াস্থ বিড়লা মন্দিরে, তিব্বতী মন্দির, চীনা মন্দির, সরকারী বাংলো, আমেরিকা, বাংলাদেশ ও ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে বিদর্শন শিক্ষার প্রচার করে গেছেন আজীবন।
তাঁর ঐকান্তিক উদ্যোগে ১৯৭০ সালের ২৯ জানুয়ারী বুদ্ধগয়ায় আন্তর্জাতিক বৌদ্ধ সাধনাকেন্দ্রের রেজিষ্ট্রেশন কার্য সম্পন্ন করেন এবং ১৯৭৫ সালে সাধনাকেন্দ্র নির্মাণের জন্য ৫.১০ একর জমি ক্রয় করেন। পরবর্তীতে, ১৯৯০ সালে বর্তমান সাধনাকেন্দ্রটি নতুন জমি ক্রয় করে নির্মিত হয়। পূর্ববর্তী সাধনাকেন্দ্র এখানে স্থানান্তরিত করা হয়। সেই সাধনাকেন্দ্রে নিজে যেমন আমৃত্যু সাধনা করে গেছেন তদ্রূপ দেশ-বিদেশের বহু ব্যক্তি ও ব্যক্তিত্বকে বিদর্শন শিক্ষা দেয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন ভবন নির্মাণ করে তীর্থযাত্রীদের সুলভ থাকার ব্যবস্থা, সভা-সেমিনার আয়োজন ইত্যাদির দ্বারা তথাগতের শিক্ষার প্রসার ও প্রচার করে গেছেন।
বর্তমান যুগ ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যের যুগ। মানুষ ‘আমি’ ‘আমার’ এই দুটি শব্দের সঙ্গে যে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে আর কোন কিছুর সঙ্গে নয়। আমরা ব্যক্তিগত উন্নতি বলতে বুঝি পার্থিব ভোগ সম্পদের বৃদ্ধি। মেধা সম্পদ প্রয়োগে অর্থ আহরণ বা ভোগের উপকরণ আহরণ, কিন্তু আমরা জানি এই নদীমাতৃক উপমহাদেশীয় সভ্যতা বা সংস্কৃতিতে ভোগের থেকে ত্যাগের মূল্য বেশী। আগুনে যতই ঘি দেওয়া হোক আগুনের তৃপ্তি নেই। সেইরকম কাম্য বস্তুপরিভোগে তৃপ্তি আসে না। ভগবান বুদ্ধ স্বেচ্ছায় রাজৈশ্বর্য ত্যাগ করে সন্ন্যাস বরণ করেছিলেন এবং সংগঠিত ভাবে ত্যাগের আদর্শ প্রচারের জন্য গড়ে তুলেছিলেন ‘সংঘ’। রাষ্ট্রপাল ভন্তেযে সংঘকে বলেছেন ঐক্য ও সংহতির প্রতীক। সংঘ সংগঠিতভাবে দেখিয়েছে ত্যাগের মহিমা সমাজবিজ্ঞানের ভাষায় ‘কালচার অব পভারটি’। সংঘ দেখিয়েছে দানের অর্থে দান বা সমবিভাজন করে অন্ন-বস্ত্রের আশু প্রয়োজন নিবারণ সম্ভব। শুধু মানুষ নুয় মনুষত্যের প্রাণী ও অশরীরী প্রত্যেকের জন্যে সংঘে নির্দিষ্ট থাকতো পানাহারের ব্যবস্থা। এই যে সর্বব্যাপী করুণা। কামনা-বাসনা রূপী স্কন্ধমারকে বিতাড়িত করে মৈত্রী, করুণা, মুদিতাকে হৃদয়ে জাগিয়ে রাখার সাধনা তার জন্য প্রয়োজন ‘পঞ্চশীল’ পালন যা কায়িক, বাচিক ও মানসিক শুদ্ধিকরণ ঘটাবে। এরপর আধ্যাত্মিক আয়তন অর্থাৎ ইন্দ্রিয়দ্বার গুলো অর্থাৎ চক্ষু, কর্ণ, নাসিক, জিহ্বা, কায়, মনকে শুদ্ধ করতে হলে চিত্তকে স্থির করতে হবে। চিত্তকে স্থির করতে হলে চিত্তকে জাগিয়ে তুলতে হবে। আমাদের চিত্ত ঘুমিয়ে থাকে। সারাদিন কী কী করি রাতে মনে পর্যন্তকরতে পারি না। কিন্তু জাগ্রত চিত্ত এরকম নয়। শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া অবধারণ করতে পারে যে চিত্ত সেই চিত্ত উজাগর চিত্ত। এমনকি প্রতিটি সাধারণ কাজ হাত নাড়া, পা নাড়া, ওঠা-বসা-খাওয়া-শোওয়া-শ্বাস-প্রশ্বাসের তীব্রতা-মৃদুতা-কম্পন উপলব্ধির প্রচেষ্টা উজাগর চিত্তের কাজ। বৌদ্ধ পরিভাষায় ‘সতিপট্ঠান’ বা ‘স্মৃত্যুপস্থান’। ভগবান বুদ্ধ তৎকালীন সমাজ ও সামাজিক একক ‘পুদ্গল’ পর্যবেক্ষণান্তেএই অভিনব ধ্যান পদ্ধতি প্রদর্শন করেছিলেন। আজ আড়াই হাজার বছর পরেও যা সমান প্রাসঙ্গিক। এই ধ্যান পদ্ধতি শেখাতে হলে প্রয়োজন সুশিক্ষিত সুদক্ষ শাস্তা সদৃশ প্রশিক্ষক ও আদর্শ সামাজিক কাঠামো পাতিমোক্ষ সংবর সংবুতো ভিক্ষুযদি সেই প্রশিক্ষক হন, তাহলে সংঘ হল সেই আদর্শ সামাজিক পরিবেশ। যে পরিবেশে চিত্ত একাগ্রতা আনয়ন সম্ভব। তাই ধ্যানকেন্দ্র প্রয়োজন। সঙ্ঘকে ঘিরে থাকে উপাসক উপাসিকা সংঘএবং তাঁদের ঘিরে বৌদ্ধতর সমাজ ও রাষ্ট্র। বিদ্যুৎগতিতে যে বিদর্শন ভাবনার জনপ্রিয়তা ছড়িয়ে পড়েছে তা কিন্তু এই পথ ধরেই। সুতরাং মূল শক্তির ভরকেন্দ্র আছে সংঘ ও সংঘনায়কগণ। সংঘ তো কোন অপার্থিব সত্ত্বা নয় রক্ত-মাংসের মানুষেরই সংগঠন। যাঁরা বৌদ্ধ পরিভাষায় পঞ্চস্কন্ধের সমষ্টি। তাঁরা হয়তো অর্জন করেছেন চৈতসিক শান্তি। যে শান্তির সন্ধানে সারা বিশ্ব ছুটে আসে এই বুদ্ধগয়ায় চৈতসিক শান্তির গৌরবগাথাকে হৃদয় মনে প্রত্যক্ষ করার লক্ষ্যে রাষ্ট্রপাল ভন্তের এই ধ্যানকেন্দ্র এক অভিনব প্রতিষ্ঠান ভাবনা ও সময়ের থেকে অনেক এগিয়ে থাকা ভাবনার প্রতিফলন।
১৯৭৪ সালে ভারতীয় সঙ্ঘরাজ ভিক্ষু মহাসভা গঠনে তাঁর ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য। পরবর্তীতে, তিনি ভারতীয় সঙ্ঘরাজ ভিক্ষু মহাসভার সাধারণ সম্পাদক ও ৩১ অগাস্ট ২০০৭ সালে সর্বোচ্চ পদ ‘সঙ্ঘরাজ’ অভিধায় অভিষিক্ত হয়েছিলেন। তিনি ছিলেন ভারতীয় সঙ্ঘরাজ ভিক্ষু মহাসভার মহামান্য তৃতীয় সঙ্ঘরাজ। বিভিন্ন কর্মকুশলতা ও সাংগঠনিক দক্ষতার ফলসরূপ তিনি বুদ্ধগয়া টেম্পল ম্যানেজমেন্ট কমিটির সম্মানিত সদস্য, ই-িয়ান বুদ্ধিস্ট কাউন্সিল (নাগপুর) তথা ভারতীয় বৌদ্ধ মহাসভার সাধারণ সম্পাদক, মহাবোধি সোসাইটির সহ-সভাপতি ও সভাপতির গুরুদায়িত্ব পালন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। ২০০৪ সালে তিনি তাঁর বহুমুখী সদ্ধর্ম প্রতিভার স্বীকৃতি সরূপ লাভ করেন ‘অগ্গমহাসদ্ধম্মজ্যোতিকাধ্বজ’ উপাধি।
পশ্চিমবঙ্গের শিলিগুড়ির বুদ্ধভারতী বিহারে বুদ্ধভারতী স্কুল, পশ্চিমবঙ্গের বার্ণপুর বৌদ্ধ বিহার, দূর্গাপুর বৌদ্ধ বিহার, মোহনপুর কুঞ্জবন বিহারের ধ্যানকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা তাঁর কর্মকুশলতার অনুপম দৃষ্টান্ত। এছাড়া তৎনির্মিত পুরাতন আন্তর্জাতিক সাধনাকেন্দ্র আরো সাত কাঠা ভূমি ক্রয় করে প্রতিষ্ঠা করেছেন তংপুলু স্বাস্থ্য কেন্দ্র, প্রজ্ঞানন্দ ফ্রি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও একটি ডাকঘর তিনি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
তাঁর বিভিন্ন কর্মগুণের মধ্যে অতি গুরুত্বপূর্ণ ও দীর্ঘস্থায়ী একটি প্রতিভা হলো গবেষণা ও লিখনীগুণ। তাঁর রচিত পি.এইচ.ডি. অভিসন্দর্ভ ‘দ্য কনসেপশন অব গড ইন পালি তিপিটক’ ছাড়াও আছে ‘অ্যান এক্সপোজিশন অব কম্ম এ- রিবার্থ’, ‘দ্য গ্লোরি অব বুদ্ধগয়া’, ‘নালন্দা এ- রাজগীর’, ‘খুদ্দক সিক্খা (পালি)’, ‘দ্য ফাইভ ভিশনস্ এ- বেকনিং অব দ্য ফিউচার লাইফ’, ‘পিচ থ্রু বিপস্স্যনা মেডিটেশন’, ‘পালি স্টাডিজ ইন বেঙ্গল’, ‘অ্যা গাইড টু দ্য মাই- পিউরিফিকেশন’, ‘বুদ্ধিজম স্ট্যা-স্ অন রিবার্থ’, ‘ড. বি.আর. আম্বেদকর’স দ্য বুদ্ধ এ- হিজ ধম্ম- অ্যা রিজয়ে-ার’, ‘দ্য ভিশন এ- রাইটিংস অব ভেনারেবল ড. রাষ্ট্রপাল মহাথের’, ‘দ্য বুদ্ধ ওয়াজ নাইদার অ্যা গড নর অ্যান অ্যান ইনকারনেশন (অবতার)’। উপরোক্ত সবগুলো গ্রন্থ হলো ইংরেজীতে লেখা। তাঁর বাংলায় লিখিত বইগুলো হলো- ‘বিদর্শনাচার্য ননী বালা বড়–য়া (দীপা মা)’, ‘পরহিতব্রতী মিলন কান্তি চৌধুরী’, ‘শ্রী মঙ্গল সুব্বার সংক্ষিপ্ত জীবনালেখ্য’, ‘বারো বেশী না তেরো বেশী’, ‘পঞ্চনিমিত্ত ও পরবর্তী জীবনের আহ্বান- ‘দ্য ফাইভ ভিশনস্ এ- বেকনিং অব দ্য ফিউচার লাইফ’ বইটির অনুবাদ- অনুবাদক, সলিল বিহারী চৌধুরী ’, ‘মাতা পিতার প্রতি ছেলেমেয়েদের কর্তব্য ও ছেলেমেয়েদের প্রতি মাতাপিতার প্রতি কর্তব্য’ ইত্যাদি। তিনি ইংরেজী ভাষায় ১০৬ টি, বাংলা ভাষায় ১৩ টি ও হিন্দি ভাষায় ১০ টি প্রবন্ধ লিখেন।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সেমিনার ও বিদর্শন শিক্ষা প্রচারের জন্য তিনি নানাদেশ ঘুুরে বুদ্ধ নির্দেশিত ‘চারিকা’ বা ধম্মপ্রচারার্থে পরিব্রাজন কর্মও সম্পাদনেও বিরাট ভূমিকা রেখেছেন। তাঁর পরিব্রাজন করা দেশগুলোর মধ্যে স্বীয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ ছাড়াও আছে ভারতের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য এবং সিঙ্গাপুর, থাইল্যা-, আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, মায়েশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, মায়ানমার, নেপাল, ভূটান, তাইওয়ান, ওমান, আবুধাবি, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা প্রভৃতি দেশ।


0 Comments