Hot Posts

6/recent/ticker-posts

Ad Code

সুর এবং অসুর।

 


সুর এবং অসুর

মধ্যকাল সময়টা ছিল বৌদ্ধ ধম্মের বিকৃতির কাল এবং এ সময়ে বৌদ্ধ পরম্পরার যে সমস্ত শ্রেষ্ঠ ও সম্মান সূচক শব্দাবলীর প্রয়োগ হতো, সেসমস্ত শব্দাবলী ব্রাহ্মণেরা আত্মসাৎ করে নিজেদেরকেই শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের শুরু করে দিয়েছে এবং তারা সেগুলির অর্থেরও বিকৃতি ঘটিয়েছে। প্রাচীন বৌদ্ধ পরম্পরায় ব্যবহৃত শ্রেষ্ঠ শব্দ সমূহের মধ্যে অন্যতম এক শব্দ ছিল সুর।
কিন্তু একশ্রেণীর যুক্তিবাদীরা সুর শব্দকে সুরাপানের সাথে জুড়ে সুর অর্থাৎ সুরাপায়ী লোক এরকম অর্থ করে প্রচার করেছে, যা হল সম্পূর্ণরূপে অনর্থ বা ভুল। সুর হল একটি আলাদা শব্দ, যার অর্থ হল উত্তম, শ্রেষ্ঠ। সুরাপানের সুরা হল পৃথক শব্দ, যার অর্থ হল নেশা জাতীয় পানীয় এবং সুরা শব্দের আরেকটি পৃথক অর্থ রয়েছে, যা হল কোরানের অধ্যায় বা খণ্ড।
প্রকৃতপক্ষে সুর মানে কাদেরকে বুঝায়? এবং সুর কাদেরকে বলা হতো? এ সম্পর্কে ধারণা নিতে আমরা ভগবদ্গীতার দিকেও দেখতে পারি এবং আসল কথা ইহাই যে, ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যায় ভগবদ্গীতা এ গ্রন্থটি প্রথম খৃষ্টপূর্বাব্দের মহাকবি অশ্বঘোষ কর্তৃক বিরচিত বৌদ্ধ গ্রন্থ ‘সৌন্দরানন্দ’ কাব্যেরই অনুকরণ।
ভগবদ্গীতার ষোড়শ অধ্যায় অনুসারে সুর অর্থ জ্ঞানী এবং বিনম্র হওয়ার সাথে সাথে তারা সদাচারও পালন করে থাকেন। সুর শুদ্ধ এবং সত্য বলার লোক থকেন, সুর ত্যাগী হন এবং তাঁরা শান্তিতে জীবন-যাপন করেন এবং অন্যদের প্রতি প্রেম-ভালবাসার সাথে সাথে তাঁরা স্পষ্টভাষীও হন এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ইহাই যে, সুরকে দেব-দেবীও বলা হয়।
ভগবদ্গীতা, যা হল বৌদ্ধ গ্রন্থ সৌন্দরানন্দ কাব্যের অনুকরণ। সে গ্রন্থ অনুসারে যাঁদেরকে সুর বলা হতো, তাঁরা আসলে শ্রেষ্ঠ এবং সদাচারী লোক ছিলেন। শ্রেষ্ঠত্বের বিপরীত হতো অধম, অর্থাৎ প্রাচীন ভারতবর্ষে শ্রেষ্ঠ তাঁদেরকেই বলা হতো, যাঁরা ধম্ম অনুসরণ করতেন এবং ধম্মের অনুসরণকারী তো ছিলেন বুদ্ধের শরণাগত বৌদ্ধরাই। অর্থাৎ সুর বৌদ্ধদেরকেই বলা হতো। এ বিষয় সুরকে দেব বলার মধ্যেও প্রমাণ হয়ে যায়। কেননা বৌদ্ধ ভারতে দেব শব্দের প্রয়োগ অরহত এবং বৌদ্ধ শ্রাবক-শ্রাবিকাদের জন্যই করা হতো, পালি সাহিত্যে তাঁরা বিশুদ্ধি দেব নামে অভিহিত এবং সম্রাট অসোক যেহেতু ব্যাপকভাবে বুদ্ধ, বুদ্ধের ধম্ম এবং সঙ্ঘকে রাজাশ্রয় দিয়েছিলেন, সেজন্য তাঁকেই ‘দেবানং পিযা পিযদস্সী অসোকরাজস’ বলা হতো, এখানে দেবানাম প্রিয়ের অর্থ হল বৌদ্ধ শ্রাবক-শ্রাবিকাদের প্রিয়ই তিনি প্রিয় অর্থাৎ ভালবাসার ব্যক্তি।
প্রাচীন ভারতে দেব এবং দেবী অরহত বৌদ্ধ শ্রাবক-শ্রাবিকাদেরকেই বলা হতো, কেননা এ সকল দেব এবং দেবগণের শাস্তা ছিলেন বুদ্ধ। এজন্যই বুদ্ধকেই দেবাতিদেব মহাদেবও বলা হতো। (দেবাতিদেব নরদম্ম সারথি)। বুদ্ধই দেব এবং মনুষ্যগণের শাস্তা ছিলেন এ বিষয় তো বুদ্ধগুণ মধ্যেও স্পষ্ট দেখা যায়।
সৌন্দরানন্দ কাব্যের অনুকরণ করে লিখিত ভগবদ্গীতাতে উল্লিখিত সুর প্রবৃত্তি হতে এবং বৌদ্ধ ইতিহাসের সাথেই বুদ্ধগুণ হতেও এ বিষয়টি পরিস্কার হয় যে, প্রাচীন ভারতে অরহত বৌদ্ধ শ্রাবক-শ্রাবিকাদেরকেই দেব-দেবী বলা হতো এবং পৌরাণিক কথায় এ সকল দেব-দেবীদেরকেই সুর বলা হতো, অর্থাৎ সুর হলেন দেবতা অর্থাৎ তাঁরা বৌদ্ধই ছিলেন।
সুর প্রবৃত্তির সাথেই সৌন্দরানন্দ কাব্যের অনুকরণ করে লিখিত ভগবদ্গীতায় অসুর প্রবৃত্তি সম্বন্ধেও বলা হয়েছে, যা হল এরকম যে, অসুর মদ্যাদি অসংস্কার হতে যুক্ত থাকে এবং অজ্ঞানতা হতে মিথ্যা সিদ্ধান্তকে গ্রহণ করার সাথেই ভ্রষ্ট, ভ্রান্ত আচরণকে ধারণ করে সংসারে বিচরণকারী হয়। অসুর অশুদ্ধ এবং অসত্য ভাষণকারী হয়ে থাকে। অসুর ভোগ এবং মন্দ চিন্তায় লিপ্ত থাকে এবং অন্যদের সাথে দ্বেষভাব পোষণ করার সাথে সাথে প্রতারকও হয়ে থাকে।
সৌন্দরানন্দ কাব্যের অনুকরণ করে লিখিত ভগবদ্গীতা অনুসারে যাঁদেরকে অসুর বলা হতো, তারা ধম্ম আচরণকারী লোক ছিলনা, কারণ ধম্ম তো শুদ্ধাচারই শিক্ষা দিয়ে থাকে।
তাহলে আবার প্রশ্ন ইহাই আসে যে, অসুর কারা? সুর কারা? এবং অসুর কাদেরকে বলা হতো? এ বিষয় আমরা পঞ্চম শতাব্দীর প্রারম্ভে ভারতে আসা চৈনিক ভিক্ষু পর্যটক ফা-হিয়েন দ্বারা লিখিত ইতিহাস হতে জেনে নিতে পারি। ফা-হিয়েন যখন পাটলিপুত্র (পাটনা) এসেছিলেন তখন তিনি সম্রাট অসোকের রাজভবনকে দেখে এরূপ লিখেছিলেন যে, নগরে সম্রাট অসোকের প্রাসাদ (মহল) এবং সন্থাগার (সভা ভবন) রয়েছে, যাতে পাষাণ নির্বাচন করে দেওয়াল এবং দ্বার সমূহ নির্মিত হয়েছে। সেগুলির উপর সুন্দর কারুকার্য উৎকীর্ণ এবং শিল্পকর্ম করা হয়েছে। সেরকম কাজ ইহলোকের (ভারত) লোকের দ্বারা বানানো সম্ভব হবেনা, এ সমস্ত অসুর দ্বারাই বানানো হয়েছে এবং ইতিহাস এরকম যে, সম্রাট অসোক স্বীয় রাজ প্রাসাদের ভবন সমূহকে নির্মাণ করার জন্য দূর-দুরান্তের দেশ হতে কারিগরদেরকে আহ্বান পূর্বক কাজ করিয়েছেন। তাতে ইরান এবং গ্রীক হতে পর্যন্ত কারিগর এনে কাজ করিয়েছেন এবং এ সকল কারিগর ইরান এবং গ্রীক অর্থাৎ বাহিরের দেশ হতে ভারতে এসেছিলেন। এজন্যই ফা-হিয়েন ভবন সমূহকে অসুর দ্বারা নির্মিত বলেছেন।
চীনা বৌদ্ধ পর্যটক ফা-হিয়েন দ্বারা লিখিত ইতিহাস এ বিষয়কে প্রমাণ করে যে, মধ্যকালের পূর্বে অসুর শব্দের প্রয়োগ অজ্ঞানী এবং ভারতবর্ষের বাহিরের লোকদের জন্যই প্রয়োগ করা হতো। সে ব্যক্তি সংঘের বাহিরে হোক বা দেশের বাহিরে হোক সকলেই ছিলেন অসুর।
প্রাচীন ভারতে সুর বৌদ্ধদেরকেই বলা হতো এবং অসুর অজ্ঞানী এবং বাহিরের লোকদেরকে বুঝাতো। কিন্তু মধ্য কালে অর্থাৎ মুগল-ব্রাহ্মণ যুক্ত হওয়ার কালে ব্রাহ্মণ দ্বারা বৌদ্ধ ইতিহাসকে উল্টাপাল্টা এবং বিকৃত করে ব্রাহ্মণ্য গ্রন্থ সমূহ লিখার কাজ করা হয়েছে এবং তারা নিজেদেরকে সুর বলতে শুরু করেছে। ব্রাহ্মণ দ্বারা কৃত এরূপ ভ্রম প্রচারের কারণে প্রাচীন ভারতে যাঁরা বৌদ্ধ সুর ছিলেন, তাঁরা কালান্তরে ব্রাহ্মণ্য অপপ্রচারে নিজেদেরকেই অসুর বলে জানতে লাগলেন এবং যাঁরা বাহিরের অর্থাৎ অসুর ছিলেন, তাঁরা নিজেদেরকে সুর বলে প্রচার করে স্থাপন করে নিলেন। মধ্যকালে কৃত ব্রাহ্মণী প্রচারের ফল এরূপ হয়েছে যে, আজও মূল ভারতীয়রা স্বয়ংকে অসুর বলে সম্বোধন করে থাকে।
এ পর্যন্ত প্রদত্ত সমস্ত ঐতিহাসিক এবং পৌরাণিক উদাহরণ হতে এ বিষয় সম্পূর্ণরূপে স্পষ্ট হয় যে, প্রাচীন ভারতে সুর বলা হতো বৌদ্ধদেরকেই এবং অসুর বা অ-বৌদ্ধ বা বাহিরের লোকদেরকেই বলা হতো।



Post a Comment

0 Comments

Ad Code

Responsive Advertisement