সংসারে বুদ্ধের অনুসারী উপাসক-উপাসিকাগণের অনেকে বর্ষাবাস তিন মাস সহ অন্যান্য বিশেষ বিশেষ পর্ব সমূহেও অষ্টশীল গ্রহণ করে উপোসথ রক্ষা করে থাকেন। এরকম উপোসথ কেনো এবং কিসের জন্য পালন করে থাকেন?
এরূপ জিজ্ঞাসা অনেকের কাছে সরল এবং সহজ বলে মনে হতে পারে। কিন্তু ভগবান তথাগতের বচনে ইহার গম্ভীরতার মাধ্যমে যদি আমরা বুঝতে চেষ্টা করি, তাহলে ইহার উপকারিতা এবং আধ্যাত্মিকতাও জীবনে সহজভাব দ্বারা অনুসরণ হতে পারে।
ভগবান তথাগত বলেছেন যে-‘উপাসক-উপাসিকানং সদ্ধায চিত্তেন অট্ঠসীলানি রক্খিত্বা চ উপোসথানং ধারযন্তি। তে জীবিতেসুং বহু পুঞ্ঞকম্মানি করিত্বা চ অন্তমসো সুগতিং গচ্ছন্তি।’
অর্থাৎ উপোসথ দিবসে উপাসক-উপাসিকাগণ অষ্টশীল গ্রহণ করে সেগুলি সচেতনতা ও নিষ্ঠা সহকারে পালন করতে হয়। উপোসথ শীল গ্রহণ করে সেগুলি নিজেদের জীবনে অনুসরণ করে অনেক পূণ্য সঞ্চয় করে থাকেন এবং অন্তিমে সে পূণ্য কর্মের হেতুতে তাঁরা সুগতিরও অধিকারী হয়ে থাকেন।
গৃহস্থ জীবনে উপাসক-উপাসিকাদের জন্য উপোসথ পালন করা হল এরকম একটি সরল মার্গ, যে মার্গের মাধ্যমে উপাসক-উপাসিকাগণ নিজেদের জীবনে অপ্রমাণ পূণ্যের সঞ্চয় করে থাকেন। কেননা উপাসক-উপাসিকাগণ নিজেদের জীবনের পারিবারিক, সামাজিক, ধাম্মিক ইত্যাদি যে সমস্ত কর্তব্য রয়েছে, সেগুলি নৈতিকতার দ্বারা সম্পাদন করতে যেভাবে আমরা ভাবতে থাকি সেভাবে করা ততো সহজ কাজ নয়। অনেক প্রকার তাঁদের জীবনে এরকম অবস্থা উৎপন্ন হয়ে থাকে যে, যেগুলিকে সম্পাদন করা তাঁদের জন্য এবং তাঁদের পরিবারের জন্য এক প্রকার কাঁটার উপর চলার মতো কষ্টকর হয়ে পড়ে। অর্থ উপার্জন করা, পরিবার-পরিজনের পালন-পোষণ করা, সন্তানাদির শিক্ষা, বিয়ে-শাদী ইত্যাদি করণীয় কর্তব্য সম্পাদন করতে করতে উপাসক-উপাসিকাদেরকে কখনও কখনও জীবনে শান্তিতে শ্বাস নেওয়ারও অবসর হয়না এবং দেখতে দেখতে জীবনে মৃত্যুর অন্তিম অবস্থা তাঁদের জীবনে কখন যে এসে দাঁড়ায়, তা তাঁরা কখনও কখনও ভাবতেও পারেননা।
সংসারের এসব স্থিতি জেনেই সর্বজ্ঞ তথাগত বুদ্ধ ‘সংসারোগা মহাব্ভযা’ বলেছেন। অর্থাৎ সংসার হল এমন এক ভয়ানক রোগ, যা তাঁদেরকে গ্রাস করে থাকে তাঁদের মৃত্যু পর্যন্ত এবং না জানি আরও কত অনন্তকাল পর্যন্ত তাঁর সঙ্ক্রমণ হয়ে থাকে, যার কারণে সংসারের সত্বগণ জরা, ব্যাধি, মৃত্যু ইত্যাদি দুঃখ পীড়ায় পিছতে থাকে।
কিন্তু উপাসক-উপাসিকাগণের জন্য নিজেদের আধ্যাত্মিক যাত্রা সুগম করার করতে এবং নিজেদের সুগতিকে লাভ করার জন্য উপোসথ ব্রত হল অতীব সরল মার্গ।
কেননা, উপাসক-উপাসিকাগণ যদিও এ সংসারে অবস্থান করে থাকেন, কিন্তু যদি নিষ্ঠা ও সচেতনতা সহকারে অষ্টশীল পালন করলে তাঁরা শারীরিক এবং মানসিক রূপেও এক অনাসক্ত জীবন অতিবাহিত করার প্রয়াস করে থাকেন। যে কারণে ধীরে ধীরে হলেও তাঁরা অবশেষে নিজেদের মুক্তির লক্ষ্য নির্বাণ যাত্রা দিকে অগ্রসর হয়ে থাকেন। এ কারণে সংসারে বুদ্ধানুসারী অধিকতর উপাসক-উপাসিকাদেরকে উপোসথ পালনে ব্রতী হওয়া প্রয়োজন, যাতে এ সংসারের যাবতীয় দুঃখ হতে কখনও না কখনও মুক্তি অবশ্যই অর্জিত হয়।

0 Comments