Hot Posts

6/recent/ticker-posts

Ad Code

বিদর্শনাচার্য ড. রাষ্ট্রপাল মহাথেরো কর্তৃক আন্তর্জাতিক সাধনা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার পঠভূমি

 

ড. বরসম্বোধি ভিক্ষু
আজ স্মরণীয় ২৫শে এপ্রিল। ১৯৩০ সালের এ দিনে রাউজান উপজেলাধীন ফতেনগর নামক ছোট এক গ্রামে সম্ভ্রান্ত বৌদ্ধ পরিবারে বিশিষ্ট সওদাগর ও সমাজপতি শ্রী অর্জুন চন্দ্র বড়ুয়া এবং ধম্মপ্রাণা উপাসিকা কৌশল্যাময়ী বডুয়ার কোল আলোকিত করে সাতকড়ি নামে পূণ্যময় যে সন্তানের আবির্ভাব হয়েছিল, তিনিই পরবর্তীতে বিশ্ব নন্দিত বিদর্শনাচার্য ভারতীয় মহামান্য তৃতীয় সঙ্ঘরাজ, বহু মাত্রিক প্রতিভার অধিকারী ড. রাষ্ট্রপাল মহাথেরো (১৯৩০-২০০৮) রূপে জগদ্বিখ্যাত হয়েছিলেন।
ক্ষণজন্মা মনীষী ড. রাষ্ট্রপাল মহাথেরো ১৯৬০ সালে ভারতের নব নালন্দা মহাবিহারে স্নাতকোত্তর বিভাগে মহাবিহারের ছাত্রাবাসে অবস্থান করে অধ্যয়ন করছিলেন। সেসময় বুদ্ধগয়ায় তেমন কোনো যাত্রী অবস্থানের সুবিধা যেমন ছিলনা, তেমনি যাতায়াতের ব্যবস্থাও ছিল দুর্গম। বর্তমানের মতো কোনো হোটেল কিংবা বিহারাদি তখনও তেমন গড়ে উঠেনি। যে কয়টি বিদেশী বিহার ছিল, তাতে ভারতীয় কিংবা বাংলার বৌদ্ধদের থাকার স্থান হতোনা। শ্রীলঙ্কার মহাবোধি সোসাইটি পরিচালিত একটি ধম্মশালা ছিল, তা খালি থাকলে সাময়িক থাকতে দিলেও তাঁদের দেশের তীর্থযাত্রী আসলে তৎক্ষণাৎ ধম্মশালা খালি করতে হতো।
আমি দীর্ঘকাল সঙ্গে অবস্থান করার সুবাদে ভদন্ত ড. রাষ্ট্রপাল মহাথেরোর কাছ হতে শুনেছি যে, আমাদের চট্টগ্রামের সরোয়াতলী বৈদ্যপাড়া হতে এক বৃদ্ধ দম্পতি বুদ্ধগয়ায় তীর্থ দর্শন করতে বুদ্ধগয়া গিয়েছিলেন। তাঁরা দু’য়েক রাত্রি অবস্থানের জন্য মহাবোধি ধম্মশালায় আশ্রয় পেয়েছিলেন। একদিন রাত্রিতে তাঁদেরকে ঘুম হতে জাগিয়ে নির্দেশ দেওয়া হল যে, এখনই ধম্মশালা খালি করে দিতে হবে। শ্রীলঙ্কা হতে তীর্থ যাত্রীর দল এসেছে। বৈদ্যপাড়ার বৃদ্ধ দম্পতি অনেক আকুতি-মিনতি করে জানালেন যে, এখন কনকনে শীতের রাত্রিতে আমরা কোথায় যাবো? কোনোভাবে আমাদেরকে কোথাও জায়গা করে দিন। কিন্তু কর্তৃপক্ষ কেনো কথাই শুনতে চাননি। তাঁদেরকে বের করে দেওয়া হল। শীতের রাত্রিতে তাঁরা বাহিরে বারান্দায় রাত কাটিয়ে পরদিন নালন্দা-রাজগীর দর্শনে গিয়েছিলেন। সেখানে তাঁদের সাথে শ্রদ্ধেয় রাষ্ট্রপাল ভন্তের সাথে দেখা ও পরিচয় হয়। তাঁরা ভন্তেকে কেঁদে কেঁদে বুদ্ধগয়ায় বারান্দায় শীতের প্রকোপে রাত কাটানোর নির্মম অবস্থার বর্ণনা করেছিলেন এবং শ্রদ্ধেয় ভন্তেকে করজোড়ে প্রার্থনা করেছিলেন যে-‘ভন্তে! যদি সম্ভব হয় বুদ্ধগয়ায় আমাদের বাঙ্গালী তীর্থযাত্রীদের জন্য একটা মাথা গুজার ঠাঁই করতে পারলে জাতি আপনার নিকট চির কৃতজ্ঞ থাকবে।’ সেদিন তাঁদের কাছ হতে করুণ দুর্দশার বর্ণনা শুনে শ্রদ্ধেয় ড. রাষ্ট্রপাল ভন্তে বড়ুয়া বৌদ্ধ তথা ভারতীয় তীর্থযাত্রী বৌদ্ধদের দুঃখ ঘুচাবার লক্ষ্যে ধম্মশালা নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।
সেসময় ভারতে কোথাও বিদর্শন ভাবনার কেন্দ্রও ছিলনা। এমনকি বিদর্শন ভাবনা চর্চা তো দূরের কথা , বিদর্শন শব্দটাও বহু সংখ্যক লোকের কাছে অপরিচিত ছিল। শ্রদ্ধেয় মহাথেরো নিজেই প্রতিজ্ঞা করেছিলেন বিশ্ববৌদ্ধদের শ্রেষ্ঠ মহাপূণ্য তীর্থ বুদ্ধগয়ায় আধুনিক মান সম্মত তীর্থ যাত্রীদের জন্য একটি ধম্মশালা করবেন এবং দুঃখমুক্তিকামী বিদর্শন অনুশীলনকারীদের জন্য একটি বিদর্শন ভাবনার কেন্দ্র স্থাপন করবেন। সুমহান এ দু’লক্ষ্যকে সামনে রেখে সঙ্কল্প বাস্তবায়নের দিকে তিনি অগ্রসর হচ্ছিলেন। তাঁর পড়া লেখার ফাঁকে ফাঁকে একদিকে বুদ্ধগয়ায় যেমন সাধনা কেন্দ্র ও ধম্মশালা প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা করছিলেন, একই সময়ে তিনি পশ্চিম বঙ্গের শিলিগুড়ি শহরে বুদ্ধভারতী বিহার ও বুদ্ধভারতী বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কাজেও নিয়োজিত ছিলেন।
তখন ভারত-বাংলার বড়ুয়া বৌদ্ধদের আর্থিক অবস্থাও তেমন স্বচ্ছল ছিলনা। বিভিন্ন স্থানে শ্রদ্ধেয় ড. রাষ্ট্রপাল ভন্তে শ্রদ্ধাদান সংগ্রহ করতে দ্বারে দ্বারে উপস্থিত হয়ে আর্থিক সহায়তা নিয়েছিলেন। দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর ১৯৭০ সালে তিনি বুদ্ধগয়ায় আন্তর্জাতিক সাধনা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তখন যে কয়জন তাঁকে সহায়তা করেছিলেন তাঁদের মধ্যে বিখ্যাত বিদর্শনাচার্য অনাগারিক মুনীন্দ্রজী (১৯১৫-২০০৩), রোটারিয়ান অর্জুন দাশগুপ্ত, প্রিয়ব্রত বড়ুয়া (কোলকাতা) প্রমুখের নাম বিশেষভাবে স্মরণীয়।
ইতিমধ্যে রাষ্ট্রপাল মহাথেরো মগধ বিশ্ববিদ্যালয় হতে ১৯৬৯ সালে ডক্টরেট ডিগ্রী সম্পন্ন করেছিলেন। উল্লেখ্য যে, বঙ্গীয় বৌদ্ধ ভিক্ষুদের মধ্যে শ্রদ্ধেয় রাষ্ট্রপাল মহাথের ছিলেন প্রথম ডক্টরেট ডিগ্রীধারী। পাঠ্যাবস্থা হতে তিনি অধিকতর সময় ধ্যান-ভাবনায় নিয়োজিত থাকতেন। বার্মা এবং ভারতে মোট ছয়জন বিদর্শনাচার্যের অধীনে তিনি ধ্যান অনুশীলন করেছিলেন। তাঁরা হলেন পূজ্য মহাসী ছেয়াড ওরফে উ. শোভনা মহাথেরো (১৯০৪-১৯৮২), দীপা-মা ওরফে ননীবালা বড়ুয়া (১৯১১-১৯৮৯), অনাগারিক মুনীন্দ্রজী (১৯১৫-২০০৩), শ্রী এস. এন. গোয়েঙ্কা (১৯২৪-২০১৩), বিদর্শনাচার্য উ পণ্ডিতাভিবংস সয়াডো (১৯২১-২০১৬) এবং কম্মট্ঠানাচারিয় উ সুন্দরা সয়াডো ছিলেন অন্যতম।
১৯৭০ সালে বিহার সরকার ড. মহাথেরোকে বুদ্ধগয়া মহাবিহারের পাশে বর্তমান যে কালচক্র ময়দান রয়েছে তা বিদর্শন ভাবনার কেন্দ্র স্থাপনের জন্য বরাদ্ধ করেছিল। কিন্তু কতিপয় কর্মকর্তা উৎকোচ চাইলে ভন্তে তা দিতে রাজী না হওয়ায় ইহা হাতছাড়া হয়ে যায়। অবশেষে তাঁকে প্রায় চার কিলোমিটার দূরে গিয়ে জায়গা খরিদ করতে হয়। সেখানে প্রায় বিশ বছর তিনি দেশ-বিদেশ হতে আসা তীর্থযাত্রী ও ভাবনাকারীদেরকে ধম্ম সেবা দিয়েছিলেন। কিন্তু সেস্থান মহাবোধি মহাবিহার হতে যাতায়াতের দূরত্বের কারণে তিনি ১৯৯০ সালে পুণরায় মহাবোধি মহাবিহারের সন্নিকটে বর্তমান স্থানটি ক্রয় করে অধিক সুযোগ-সুবিধা সম্পন্ন নতুন আন্তর্জাতিক ভাবনা কেন্দ্র স্থাপন করেন।
পুরাতন কেন্দ্রে তিনি তাঁর গুরু পণ্ডিত প্রজ্ঞানন্দ মহাথেরোর (১৮৯২-১৯৬২) নামে প্রজ্ঞানন্দ অবৈতনিক প্রাথমিক বিদ্যালয়, পোষ্ট অফিস ও তংপুলু কাবায়ে স্বাস্থ্য কেন্দ্র (Taungpulu Health Unit) পরিচালনা করেছেন।

Post a Comment

0 Comments

Ad Code

Responsive Advertisement