অশোকাবদান হল একটি সংস্কৃত সাহিত্যের বৌদ্ধ গ্রন্থ, যা হল সংস্কৃত বৌদ্ধ সাহিত্য দিব্যাবদানেরই একটি অংশ। ইহার ফরাসী অনুবাদক Jean Przyluski’র মতে, এ গ্রন্থটি দ্বিতীয় হতে চতুর্থ শতাব্দীতে মথুরা অঞ্চলেরই কোনো এক মহাযানী ভিক্ষু কর্তৃক রচিত।
দ্বিতীয় শতাব্দীতে সংস্কৃত ভাষায় মহাযানী ভিক্ষু কর্তৃক রচিত এ গ্রন্থটি হল দিব্যাবদানেরই একটি ভাগ। এখানে অনেক ভ্রান্ত কাহিনী মনের মাধুরী মিশিয়ে সম্রাট অসোক সম্বন্ধে বর্ণিত হয়েছে। অশোকাবদান গ্রন্থটি প্রথমে চীনা ভাষায় ৩০০ খৃষ্টাব্দে অনুবাদ করেছিলেন An Fakin. তিনি গ্রন্থের শিরোনাম দিয়েছিলেন-‘A-yu wang Chuan’. এরপরে ৫১২ খৃষ্টাব্দে আবার ‘Sanghapala নামে একজন ভিক্ষুর দ্বারা ‘Ayu wang Ching’ শিরোনামে দ্বিতীয়বার অনুবাদ করেছিলেন। অতঃপর চীনা ভাষা হতে ১৯২৩ সালে ফরাসী ভাষায় গ্রন্থটি অনুবাদ করেছেন ফরাসী অনুবাদক Jean Przylusk (১৮৮৫-১৯৪৪) মহোদয়। ‘Sanskrit Buddhist literature of Nepal’ শিরোনামে ইহা ইংলিশে অনুবাদ করেছিলেন রাজেন্দ্রলাল মিত্র (১৮২২-১৮৯১)। মিত্র মহোদয় তাঁর অনুবাদ কর্মে সহায়তা নিয়েছিলেন ঐতিহাসিক M. E. Burnouf এর গ্রন্থ থেকে। অসোকাবদান গ্রন্থের একটি উৎকৃষ্ট ইংলিশ সংস্করণও আমেরিকান ইতিহাস গবেষক ও অধ্যাপক John S. Strong দ্বারা ১৯৮৩ সালে Princeton University Press হতে প্রকাশিত হয়।
অশোকাবদান গ্রন্থে সম্রাট অসোক সম্পর্কে অনেক ভ্রান্ত কথা-কাহিনী জুড়ে দেওয়া হয়েছে। সেজন্য এ গ্রন্থে সম্রাট অসোক সম্বন্ধে লিখিত তথ্য সমূহ কখনো ইতিহাসের মাপকাঠিতে ঐতিহাসিক সত্যের দস্তাবেজ রূপে গণ্য করেননা। বরং এ গ্রন্থে অনেক এমন কিছু কাল্পনিক ও চমৎকারিক বিষয়ের অবতারণা করা হয়েছে, যেগুলি বৌদ্ধ ধম্ম এবং সম্রাট অসোক সম্পর্কে বিরূপ প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
অশোকাবদান গ্রন্থে এরকম তথ্য পাওয়া যায় যে, সম্রাট অসোক অত্যন্ত ক্রোধী ছিলেন। তিনি ক্রোধের বশীভূত হয়ে আজীবক সন্ন্যাসীদেরকে হত্যা করার আদেশ দিয়েছিলেন। তাতে হাজার হাজার আজীবক সন্ন্যাসী মারা গিয়েছিলেন। এরূপ তথ্য বর্ণিত হয়েছে দিব্যাবদান সাহিত্যেরই অংশ অশোকাবদান গ্রন্থে।
অনেক ব্রাহ্মণ্যবাদী ঐতিহাসিক আজীবক সন্ন্যাসী বলতে জৈন সন্ন্যাসী বলে উল্লেখ করেছেন। বাস্তবে আজীবকেরা জৈন ছিলেননা। জৈনরা ছিলেন বুদ্ধ সমকালীন নিগণ্ঠনাথ পুত্রের (মহাবীর) অনুসারী এবং আজীবকেরা ছিলেন মক্ষলী ঘোষাল (মক্খলী ঘোসাল) নামক তীর্থিক (Heretical teacher) গুরুর অনুসারী, যাঁরা কর্ম-কর্মফল, পাপ-পূণ্যে বিশ্বাস করতেননা, তাঁদের ভাষ্য হল মানুষ যা কিছু করে সবকিছু হল পূর্ব নির্ধারিত।
অশোকাবদান গ্রন্থে ইহাও উল্লিখিত হয়েছে যে, তিনি তাঁর নিরান্নব্বই জন ভ্রাতাকে হত্যা করেছেন। তাঁর মুখাবয়ব ছিল কুৎসিৎ কদাকার। এজন্য তাঁকে ‘চণ্ডাশোক’ বলে কুৎসা রটনা করা হয়েছে। অথচ সম্রাট অসোকের শিলালেখনীতে তাঁর নামের পূর্বে ‘দেবানংপিয পিযদস্সী’ (দেবতাদের প্রিয় প্রিয়দর্শী) বলে উল্লেখ পাওয়া যায়।
অশোকাবদান গ্রন্থে উপগুপ্ত স্থবিরের সাথে সম্রাট অসোকের সম্বন্ধ এবং তাঁর সমুদ্র নীচে কল্পকাল অবস্থানের কাহিনীও সত্য নয়। সবই হল কাল্পনিক।
উক্ত গ্রন্থে এরূপও বর্ণিত হয়েছে যে, সম্রাট অসোক ক্রোধচিত্তে মৃত্যু বরণ করায় তাঁর সর্প কুলে অর্থাৎ তির্যক কুলে জন্ম হয়েছিল।
অশোকাবদান গ্রন্থে আমরা ইহাও পেয়ে থাকি যে, ভগবান বুদ্ধের জীবদ্দশায় সম্রাট অসোক এক গ্রাম্য বালকরূপে জন্ম নিয়েছিলেন। তিনি অন্যান্য ছেলেদের সাথে ধুলো নিয়ে ক্রীড়ারত অবস্থায় সশিষ্যে বুদ্ধকে পিণ্ড গ্রহণে চারিকায় যেতে দেখে বুদ্ধের পাত্রে ধুলো দান করেছিলেন। তখন বুদ্ধ নাকি ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলে ভবিষ্যতে তিনি চক্রবর্তী সম্রাট অসোক হবেন। এ সম্পর্কে দ্বিতীয় শতাব্দীর গান্ধার শিল্প-কলার একটি সুন্দর শিল্প নিদর্শনও পাওয়া যায়। নিম্নে তার চিত্র দেওয়া হল।
অশোকাবদান গ্রন্থে সম্রাট অসোক সম্পর্কে বর্ণিত উপরিউক্ত ঘটনা সমূহ সম্পর্কে ইতিহাসকারেরা সম্পূর্ণ একমত হতে পারেননি। তাঁদের মধ্যে বিশ্ববিখ্যাত ইতিহাসকার ড. রোমিলা থাপারের মতো প্রকাণ্ড বিদ্বানেরা অভিমত প্রকাশ করেছেন যে, অশোকাবদান গ্রন্থটি কাল্পনিক অলীক কাহিনীতে ভরপুর রয়েছে। অনেক কিছু রয়েছে যেগুলি নিছক অতিশয়োক্তি ও অসত্য ব্যতীত কিছুই নয়।
এখন প্রশ্ন হল অশোকাবদান গ্রন্থে সম্রাট অসোক সম্বন্ধে এরকম কল্প ও অলীক কাহিনী লেখার কারণ কি? তদুত্তরে বলা যায় যে, সম্রাট অসোকের শিলালেখ পড়ে আমরা জানতে পারি, তিনি স্থবিরবাদী পরম্পরার পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন এবং শৃঙ্খলা বিহীন মহাসাঙ্ঘিকা (মহাযান) পরম্পরার ভিক্ষু এবং দুর্নীতি গ্রস্থ ধর্ম গুরুদের সম্পর্কে খুবই কঠোর ছিলেন। এজন্য তাঁদের পরম্পরা সম্রাট অসোক সম্পর্কে নানা ভ্রান্ত কাহিনীর অবতারণা করেছে।
বাস্তবে সম্রাট অসোক সম্বন্ধে লিখিত থেরবাদ পরম্পরায় কোনো গ্রন্থও পাওয়া যায়না। তাঁর শাসন, চরিত্র এবং কৃতিত্ব সম্পর্কে সঠিক ইতিহাস আমাদের সামনে উদ্ঘাটিত হয়েছে ভারতবর্ষে ইংরেজ আসার পরে। তাঁরা খনন করে মাটির নীচ হতে সম্রাট অসোকের শিলালেখ সমূহ আহরণ করেছিলেন এবং তাঁরাই সেগুলির পাঠোদ্ধার করেছিলেন। তাঁরা যদি সম্রাটের লিখা অভিলেখ সমূহের আবিস্কার না করতেন, তাহলে আমরা এখনও তাঁর সম্পর্কে প্রচারিত নানা মিথ্যা কল্প-কাহিনীকেই সত্য বলে মনে করতাম।
সম্রাট অসোকের শিলালেখনী বিশেষভাবে Rock Edict XII এ বর্ণিত হয়েছে, সম্রাট অসোক নিজেও সমস্ত ধর্মের প্রতি সম্মান এবং সহিষ্ণুতা পোষণ করতেন এবং অন্যদেরকেও সেরূপ অনুসরণ করার আদেশ দিয়েছেন। তাতে স্পষ্ট হয় যে, সম্রাট অসোকের বাস্তবিক শাসন ধার্মিক সহাবস্থানের উপর আধারিত ছিল। হিংস্রতার উপর আধারিত ছিলনা।
সম্রাট অসোক বৌদ্ধ ধম্মের ছায়ায় আসার পর নিজেও প্রাণী হত্যা থেকে বিরত ছিলেন এবং অন্যদেরকেও
প্রাণী হত্যা না করতে নির্দেশ দিয়েছেন। প্রাণীদের প্রতি তাঁর মৈত্রী ও করুণা কত গভীর ছিল, সে সম্বন্ধে তাঁর দ্বারা স্থাপিত অভিলেখ পাঠে জানা যায়। পশুদের চিকিৎসায় ইতিহাসে তিনিই সর্ব প্রথম পশু চিকিৎসালয় স্থাপন করেছিলেন।
আমাদেরকে ইহাও জানতে হবে যে, জৈন ধর্ম এবং আজীবক সম্প্রদায় এক নয়। অনেকে দু’টিকে এক বলে ভ্রম উৎপাদন করে থাকেন। এরা হল পৃথক দু’টি সম্প্রদায়। উভয়ই শ্রমণ সম্প্রদায়ের পরম্পরা হলেও তাঁদের সিদ্ধান্ত হল ভিন্ন।
জৈন ধর্মের প্রবর্তক ছিলেন মহাবীর। পালি সাহিত্যে তাঁকে ‘নিগণ্ঠ নাথপুত্ত’ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। তিনি ঈশ্বরের অস্তিত্বকে না মানতেনা। আত্মা, অহিংসা, কৃচ্ছ্রতা এবং দণ্ডের মতো সিদ্ধান্ত সমূহের তিনি ছিলেন মুখ্য প্রবক্তা। শরীর ও আত্মার কৃচ্ছ্রতা সাধনের মাধ্যমে মোক্ষ লাভের উপায় বর্ণিত হয়েছে তাঁর শিক্ষায়। অপরদিকে আজীবক সম্প্রদায়ের প্রমুখ আচার্য ছিলেন মক্ষলি ঘোষাল। যিনি ছিলেন বুদ্ধের সময়ের ছয়জন তীর্থিক গুরুর অন্যতম। তাঁর সিদ্ধান্তের ভিত্তি ছিল নিয়তিবাদ (Fatalism)। তাতে মান্য করা হয় যে, সবকিছু হল পূর্ব নির্ধারিত। পাপ-পূণ্য এবং কর্ম -কর্মফলের কোনো প্রভাব নাই।
এভাবে সারাংশে উপনীত হওয়া যায় যে, অশোকাবদানের কাহিনী সমূহকে ভিত্তি করেই আমাদের অনেকে সম্রাট অসোকের জীবনী লিখেছেন। অন্যান্য কোনো উৎস হতে সেগুলির নিরপেক্ষতা কিংবা সত্যতা যাচাই করা হয়নি। সেকারণে অনেক ভ্রান্তি প্রসারিত হয়েছে। কিন্তু অশোকাবদানের কাহিনী সমূহকে পূর্ণরূপে ঐতিহাসিক সত্য বলে মান্য করা যায়না। একই সাথে জৈন এবং আজীবক পরম্পরাদ্বয় ছিল পৃথক সম্প্রদায় এবং তাঁদের দর্শনেও ছিল মূলভূত পার্থক্য।



0 Comments