তথাগত বুদ্ধ বলেছ্ন যে, আমি ঈশ্বরকে সর্বত্র অনুসন্ধান করেছি, কিন্তু কোথাও তাঁকে খুঁজে পাইনি। যিনি নিজেই উপদেশ দিয়েছেন যে, ঈশ্বর কোথাও নাই, তাঁকে অনুসন্ধান করতে নিজের সময় এবং শক্তি নষ্ট করোনা, তাঁকেই আবার কিছু স্বার্থান্বেষী লোকেরা বিষ্ণুর অবতার বানিয়েছেন। মানবতার শিক্ষক তথাগত বুদ্ধ এবং তাঁরই আদর্শের অনুসারী বাবা সাহেব ড. ভীমরাও আম্বেদকর মানবতাকে যুক্ত করার সত্যিকার মহামানব ছিলেন। বুদ্ধ যেমন কখনও ঈশ্বরের অস্তিত্বের দাবী করেননি, তেমনি বাবা সাহেব বোধিসত্ব ড. আম্বেদকরও ঈশ্বরের অস্তিত্বকে প্রত্যাখ্যান করেছেন এবং বুদ্ধ কখনও নিজেকে ঈশ্বর কিংবা ঈশ্বরের দূত বা পুত্ররূপে দাবী করেননি। যদিও আজ বুদ্ধও সশরীরে নাই এবং বাবা সাহেবও নাই, কিন্তু তাঁদের বিচার দেশ এবং দুনিয়াতে অমর হয়ে রয়েছে।
যদি আপনি সত্যিকারভাবে বুদ্ধের সম্পর্কে জানেন এবং তাঁকে অনুসরণ করেন, তাহলে নিশ্চিতভাবে হয়তো আপনি ঈশ্বরের অস্তিত্বে বিশ্বাস করেননা। আজ আমরা বুদ্ধ এবং বাবা সাহেবের দ্বারা প্রদর্শিত মার্গে চলমান থেকে সমাজের প্রতি নিজেদের দায়িত্ব পালন করা অতীব জরুরী। যদি আপনি অন্ধবিশ্বাস, প্রচারক এবং ভেদ-বৈষম্য হতে বের হতে ইচ্ছা করেন, তাহলে আপনাকে মহামানব বুদ্ধ এবং বোধিসত্ব বাবা সাহেবের আদর্শ অনুসরণ করে চলার প্রয়াস করতে হবে। তথাগত বুদ্ধ এবং তাঁর পদাঙ্ক অনুসারী বাবা সাহেব এমন মহাপুরুষ ছিলেন, যাঁরা দেশ-দুনিয়াকে ভেদ-বৈষম্য, অন্ধবিশ্বাস, প্রতারণা এবং ভণ্ডামি হতে বের করতে নিজেদের সমগ্র জীবন ব্যতীত করেছেন এবং বিপথগামী লোকদেরকে সর্বদা সত্যের মার্গ দেখিয়েছেন।
বুদ্ধ এবং বাবা সাহেবকে পুষ্পার্ঘ্য দিয়ে পূজার চেয়েও অধিক প্রয়োজন হল তাঁদের বিচার ও আদর্শকে জীবিত রাখা এবং তাঁদের প্রদর্শিত মার্গের অনুসরণ করা। যেসকল লোকেরা বুদ্ধের নামে বিভিন্ন উপকরণ দিয়ে পূজা বা নানাবিধ কর্মকাণ্ড করে থাকেন, তাতে এরূপ প্রমাণিত হয় যে, তাঁরা হৃদয় দিয়ে বুদ্ধ তথাগতের আদর্শকে জানতে পারেননি এবং তাঁকে অন্যান্য দেব-দেবীর মতো পূজা করা ও জাগতিক মনস্কামনা পূরণের জন্য তাঁর সম্মুখে প্রার্থনা করা লোকের মধ্যে অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। যে সকল মহামানবেরা জড় মূর্তি পূজার ঘোর বিরোধিতা করেছেন, শেষ পর্যন্ত তাঁদেরই এত মূর্তি বানিয়ে পূজা কেনো? বুদ্ধ তো ইহাও বলেছেন যে-‘ আমার প্রতি অন্ধভক্তি প্রদর্শন করোনা, বরং আমার আদর্শ অনুসরণ করে ধম্ম মিশনকে সম্মুখে অগ্রসর করো। যাঁরা এরূপ মিশন প্রসার কাজে রত থাকেন, তাঁরাই তথাগতের সত্যিকার অনুসারী। আমাকে মূর্তি বানিয়ে পূজার প্রয়োজন নাই। বরং আমাকে জানা এবং গবেষণা করার প্রয়োজন রয়েছে।’ প্রত্যেকের স্মরণ রাখা দরকার যে, দেশ এবং সমাজের উন্নয়ন কখনও অন্ধবিশ্বাস এবং ভণ্ডামির দ্বারা হয়না, বরং সঠিক শিক্ষা, সদুপায়ে অর্থ উপার্জন এবং বিজ্ঞান মনস্ক চেতনা, গবেষণার দ্বারাই হয়ে থাকে। যে সমস্ত দেশ আজ উন্নতির চরম শিখরে পৌঁছতে পেরেছে, তারা ধর্মান্ধ হতে বেরিয়ে আসতে পেরেছে বলেই সম্ভব হয়েছে।
যদি আপনাদের মধ্যে সেরূপ চেতনা ও পরিকল্পনা থাকে, যার মাধ্যমে আপনি নিজের এবং আপনার পরিবারের, দেশ এবং সমাজের বিকাশ করতে পারেন, তাহলে সেরকম পরিকল্পনাকে সে সকল লোকদের নিকট পর্যন্ত পৌঁছানোর প্রচেষ্টা আপনারা অবশ্যই করবেন। যথার্থ শিক্ষা এবং সদুপায়ে অর্থ উপার্জন না থাকলে নিজের তথা সমাজের বিকাশে ভূমিকা রাখা সম্ভব নয়। আমাদেরকে পুরাতন মান্যতা সমূহের উপকারিতা-অপকারিতার দিকে দৃষ্টি রেখে বিচার করতে হবে। ধার্মিক অন্ধবিশ্বাস, সাম্প্রদায়িকতা, নারী শোষণ ইত্যাদি হতে বের হয়ে আসতে হবে। সমাজে বিদ্যমান কুসংস্কার সমূহের নির্মূল করার প্রচেষ্টা করতে হবে। নারী শিক্ষা, নারী উন্নয়ন ব্যতীত কখনও সমাজের প্রগতি হতে পারেনা। নারীকে কখনও পরাধীন ও পরনির্ভরশীল করে রাখা কাম্য নয়। ধার্মিক অন্ধবিশ্বাস, জুয়া, মদ, সাম্প্রদায়িকতা ও নারী বৈষম্য ইত্যাদি হল সমাজ প্রগতির বড় বাঁধা। সে সমস্ত বাঁধা হটানোর জন্য প্রগতিশীল যুবকদেরকে সম্মুখে আসা অতীব আবশ্যক।


0 Comments