তথাগত বুদ্ধ তাঁর মহাপরিনির্বাণের পূর্বে স্পষ্টভাবে ব্যক্ত করেছেন যে, ত্রিলক্ষণ এবং আর্য সত্যকে সম্যক দর্শন ব্যতীত কারো আর্যত্ব অর্থাৎ শ্রমণত্ব লাভ হয়না। এখানে শ্রমণত্ব বলতে যিনি রাগ, দ্বেষ ও মোহ জনিত ক্ষুদ্র-বৃহৎ সর্ব প্রকার পাপকে শান্ত বা নির্মূল করে অরহত হয়েছেন তাঁকেই বুঝানো হয়েছে। তাই বুদ্ধ ধম্মপদের মলবর্গে ২৫৪-২৫৫ সংখ্যক গাথায় ভাষণ করেছেন-
‘আকাসে চ পদং নত্থি সমণো নত্থি বাহিরে,
পপঞ্চভিরতা পজা নিপ্পপঞ্চ তথাগতা।
‘আকাসে চ পদং নত্থি সমণো নত্থি বাহিরে,
সঙ্খারা সস্সতা নত্থি নত্থি বুদ্ধানমিঞ্জিতং।
অর্থাৎ আকাশে যেমন কদাপি পদচিহ্ন হতে পারেনা, তেমনি বুদ্ধ শাসনের বাহিরে অর্থাৎ আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গের বাহিরেও শ্রমণ হতে পারেনা। সংসারে প্রায় লোক প্রপঞ্চেই নিমজ্জিত থাকে এবং তথাগত বুদ্ধই হলেন একমাত্র প্রপঞ্চ রহিত মহামানব। আকাশে কখনও পদচিহ্নের অস্তিত্ব হয়না। অনুরূপভাবে আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গের বাহিরেও শ্রমণ নাই। সংস্কার শাশ্বত হয়না, বুদ্ধের মধ্যে সঞ্চলতা নাই।
ভগবান তথাগত তাঁর অন্তিম শিষ্য পরিব্রাজক সুভদ্রকে উপলক্ষ করে কুশীনগরে এরূপ দেশনা করেছিলেন। যে সময় সুভদ্র নামক পরিভ্রাজক তথাগত বুদ্ধের নিকট এসেছিলেন, তখন তিনি মহাপরিনির্বাণ মঞ্চে শায়িত ছিলেন। তিনি বুদ্ধের নিকট হতে তিনটি প্রশ্ন করতে চেয়েছিলেন। বুদ্ধের প্রধান সেবক ভদন্ত আনন্দ স্থবির তাঁকে বুদ্ধের মহাপরিনির্বাণ আসন্ন সময়ে প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করে বিরক্ত না করতে বাঁধা প্রদান করছিলেন। ভদন্ত আনন্দ স্থবিরের সাথে পরিভ্রাজক সুভদ্রের কথোপকথনের শব্দ শুনে সুভদ্রকে বুদ্ধের সাথে সাক্ষাৎ করতে অনুমতি দিতে বললেন। সুভদ্র গিয়ে তথাগতকে যথাযথ শ্রদ্ধা নিবেদন করে প্রশ্ন করলেন-‘হে শ্রমণ! আকাশে কি পদচিহ্ন রয়েছে? মার্গ রয়েছে? আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গের বাহিরে কি শ্রমণ রয়েছে? সংস্কার কি শাশ্বত? এ সমস্ত প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে তথাগত বুদ্ধ উক্ত দু’টি গাথা ভাষণ করে শুনিয়েছিলেন। এরপর তিনি তথাগতের নিকট অন্তিম শিষ্যত্ব গ্রহণ করেছেন।
যখন কোন লোককে আমরা নামের মাধ্যমে জেনে বা পরিচয় করে থাকি, তা কিন্তু প্রজ্ঞা দৃষ্টিতে যথার্থ পরিচয় নয়। সে লোকের স্বরূপ যদি প্রজ্ঞা দ্বারা দর্শন করি বা বিশ্লেষণ করে থাকি, সেখানে কারো স্বভাব সত্বা পাওয়া যায়না। যেমন-মিলিন্দ প্রশ্ন গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে, রাজা মিলিন্দ ভদন্ত নাগসেনকে জিজ্ঞাসা করলেন-ভন্তে, নাগসেন! আপনার নাম যে নাগসেন বা লোকে আপনাকে যে নাগসেন বলে ডাকে, সে নাগসেনের অস্তিত্ব কোথায়? আপনার চোখ, কান, নাসিকা, জিহ্বা, ত্বক, হাত, পা, রক্ত, মাংস ইত্যাদির মধ্যে কোথায় নাগসেন রয়েছে? আপনার শরীরের অভ্যন্তরে এবং বাহিরে কোথায় নাগসেন রয়েছে? রূপ, বেদনা, সংজ্ঞা, সংস্কার ও বিজ্ঞান-এ পঞ্চ স্কন্ধের মধ্যে নাগসেনের কোথায় রয়েছে? শরীরের কোন্ অঙ্গকে আমি নাগসেনরূপে আখ্যায়িত করতে পারি? দেহের ভিতরে-বাহিরে যত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ রয়েছে, সেগুলির প্রত্যেকটির আলাদা-আলাদা নাম রয়েছে। সেখানে কোথাও নাগসেন নামে কিছু খুঁজে পাওয়া যায়না। সুতরাং, নাগসেন কি? উত্তরে ভদন্ত নাগসেন বললেন- মহারাজ! দেহের আকার-আকৃতি, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের আভ্যন্তরিক এবং বাহ্যিক কোথাও নাগসেনের অস্তিত্ব পাওয়া যায়না। স্বতন্ত্র নাগসেন নামে কোনো বস্তুর অস্তিত্ব শরীরে নাই। সবকিছু মিলিয়ে সেগুলির সমষ্টিতে আমরা লৌকিক পরিচিতির জন্য কেবল কারো নাম দিয়ে থাকি। বাস্তবে নাগসেন সেখানে শূণ্য। অর্থাৎ নাই।
এভাবে কোনো বস্তুকেও সুক্ষ্মতর অণু স্তরে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করলেও সেখানে কোনো সত্বার হাত পাওয়া যায়না। বস্তু শূণ্যই হয়ে যায়। সমস্ত বিষয় শূণ্য হয়ে যাবে। যখন সমস্ত লৌকিক বিষয় শূণ্য হয়ে যায়, তখন প্রজ্ঞার স্বরূপ যে লৌকিকের বিপরীত তা প্রকট হতে থাকে। যা আমরা শব্দের মাধ্যমে সে অবস্থার বর্ণনা করতে পারিনা।
যেভাবে আকাশে পাখীরা উড়ে, কিন্তু তারা সেখানে কোনো পায়ের চাপ বা চিহ্ন রাখতে পারেনা। এখানে শূণ্যতার স্বরূপও হল সেরকমই। ইহাকে প্রপঞ্চ রহিত অবস্থার সাথে তুলনা করা যেতে পারে। যাঁরা সম্যক দৃষ্টি, সম্যক সঙ্কল্প প্রভৃতি যুক্ত আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গের সাক্ষাৎ করে নিয়েছেন, তাঁরা অন্যকোনো মার্গ অনুসরণ করতে পারেননা। আর যাঁরা আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গের সাক্ষাৎকার করেননি, তাঁরা কদাপি প্রপঞ্চ মুক্ত নন। কেননা প্রপঞ্চে থাকা ব্যক্তিগণ সর্বদা প্রপঞ্চের কাজই করতে থাকে। বুদ্ধাদি অরহতেরা মধ্যম মার্গরূপী আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গকেই সাক্ষাৎ করে প্রপঞ্চ রহিত হয়েছেন। যেহেতু বুদ্ধ শাসনের বাহিরে অনিত্য, দুঃখ ও অনাত্ম-এ ত্রিলক্ষণ দর্শনের কোনো সুযোগ নাই, চার আর্য সত্য দর্শনেরও সুযোগ নাই, সেহেতু পদচিহ্ন বিহীন আকাশের মতো বুদ্ধ শাসনের বাহিরেও কোনো শ্রমণ বা অরহত নাই। এ সত্য। সকলেরই উপলব্ধি করা উচিত।


0 Comments