Hot Posts

6/recent/ticker-posts

Ad Code

বৌদ্ধ ধম্ম প্রচারে সম্রাট কনিষ্কের অবদান

কুষাণ রাজবংশের মহানতম সম্রাট কনিষ্ক (৭৮ -১৪৪) ভারতীয় এবং বৈশ্বিক ইতিহাসে এক বিশিষ্ট স্থান অধিকার করে রয়েছে। তিনি কেবল একজন বিজেতা এবং কুশল প্রশাসক ছিলেননা, বরং কলা, সাহিত্য এবং ধম্মের মহান সংরক্ষকও ছিলেন। বৌদ্ধ ধম্মের ইতিহাসে তাঁর স্থান মৌর্য সম্রাট প্রিয়দর্শী অসোকের ঠিক পরেই রয়েছে। যেভাবে সম্রাট অসোক বৌদ্ধ ধম্মকে ভারতীয় উপমহাদেশ সহ অনেক দেশের প্রমুখ ধম্ম বানিয়েছিলেন, ঠিক অনুরূপভাবে সম্রাট কনিষ্কও ইহাকে আন্তর্জাতিক পরিচয় দিয়ে একটি বৈশ্বিক মহাধম্ম (Global Religion) রূপে স্থাপন করেছেন। এজন্য ইতিহাসবিদেরা তাঁকে ‘দ্বিতীয় অসোক’ নামে সম্বোধন করে থাকেন। বৌদ্ধ ধম্মের উত্থান, সংরক্ষণ, বৈচারিক বিকাশ এবং বৈশ্বিক প্রসারে সম্রাট কনিষ্কের ভূমিকা অতীব প্রশংসনীয়।

চতুর্থ সঙ্গীতির ঐতিহাসিক আয়োজন
———————————
সম্রাট কনিষ্কের বৌদ্ধ ধম্মের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ভূমিকা হল মহাযান শাখার চতুর্থ বৌদ্ধ ধম্ম সঙ্গীতির (Fourth Buddhist Council) আয়োজন।
আয়োজন স্থল-
——————
চতুর্থ ধম্ম সঙ্গীতির (মহাযান) ঐতিহাসিক সভা সম্রাট কনিষ্কের শাসনামলে কাশ্মীরের কুণ্ডলবনে (কিছু বিদ্বানদের মতে জলন্ধরে) আয়োজন করা হয়েছিল। সেসময় তিনি বৌদ্ধ ধম্মের মধ্যে বিভিন্ন দার্শনিক সম্প্রদায়ের বৈচারিক মতভেদ দূরীভূত করে সিদ্ধান্তের একরূপতা নিয়ে আসতে ঐকান্তিক প্রয়াস করেছিলেন।
নেতৃত্ব:
————
এ সঙ্গীতির অধ্যক্ষতা করেছিলেন প্রসিদ্ধ বৌদ্ধ ভিক্ষু এবং দার্শনিক আচার্য বসুমিত্র এবং উপাধ্যক্ষের পদালঙ্কৃত করেছিলেন মহাকবি এবং নাট্যকার অশ্বঘোষ। তাতে প্রায় ৫০০ উচ্চতর পদাভিষিক্ত বৌদ্ধ বিদ্বান এবং ভিক্ষু অংশ গ্রহণ করেছিলেন। এ সঙ্গীতিতে বৌদ্ধ ধম্মকে একটি নতুন দিশা এবং সুদৃঢ় ভিত্তি প্রদান করা হয়েছে।
মহাযান বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের উদয় এবং রাজকীয় সংরক্ষণ
——————————
চতুর্থ বৌদ্ধ সংগীতির কারণেই বৌদ্ধ ধম্ম বৈচারিক এবং ব্যবহারিক রূপে দু’ মুখ্য সম্প্রদায়ে বিভাজিত হয়েছে। সেগুলি হল হীনযান (পরবর্তীতে থেরবাদ) ও মহাযান।
মহাযান মতাদর্শ গ্রহণ
————————
সম্রাট কনিষ্ক বৌদ্ধ ধম্মের মহাযান শাখাকে স্বীয় ব্যক্তিগত ও রাজকীয় সমর্থন দিয়েছিলেন।
বৈচারিক পরিবর্তন
————————-
হীনযান সম্প্রদায় যেখানে বুদ্ধকে একজন মহাপুরুষ রূপে মান্য করেছিলেন এবং তাঁর প্রতীক সমূহকেই পূজা করেছিলেন, সেখানে সম্রাট কনিষ্কের পৃষ্টপোষকতা ও সংরক্ষণে মহাযান সম্প্রদায় বুদ্ধকে সাক্ষাৎ ঈশ্বরের স্থানে সমাসীন করেছেন।
ধম্মের সরলীকরণ
———————
মহাযান বৌদ্ধ ধম্মে বোধিসত্বের (অন্যের কল্যাণে কর্ম সম্পাদনকারী) অবধারণাকেই অধিকতর প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। সম্রাট কনিষ্কের এরূপ পদক্ষেপে বৌদ্ধ ধম্ম সাধারণ জনগণের জন্য অধিক সরল, ব্যবহারিক, করুণাময়ী এবং ভক্তি প্রধান হয়েছিল। তাতে ইহার জনপ্রিয়তা তীব্র গতিতে বৃদ্ধি পেয়েছিল।
বৌদ্ধ সাহিত্যের সঙ্কলন এবং মহাবিভাষা শাস্ত্রের রচনা
————————
সম্রাট কনিষ্কের কালে বৌদ্ধ ধম্ম গ্রন্থ সমূহের গভীর অধ্যয়ন হয়েছিল এবং ইহার দার্শনিক দিক লিপিবদ্ধ হয়েছিল।
বিশ্বকোষের নির্মাণ
————————
চতুর্থ বৌদ্ধ সঙ্গীতিতে বৌদ্ধ ত্রিপিটকের উপর বিস্তৃত টীকা (Commentaries) লিখা হয়েছিল। এ সঙ্গীতিতে টীকা সমূহেরও ‘মহাবিভাষা শাস্ত্র’ (Sub-Commentary) নামক একটি গ্রন্থ বিশালাকারে সঙ্কলিত হয়েছিল। এ গ্রন্থকেও আজ (Encyclopaedia of Buddhism) বলা হয়ে থাকে।
তাম্রপত্রে সংরক্ষণ
————————-
সম্রাট কনিষ্ক এ পবিত্র এবং প্রামাণিক সিদ্ধান্ত সমূহকে নষ্ট হওয়ার হাত হতে বাঁচানোর জন্য সেগুলিকে তাম্রপাত্রে উৎকীর্ণ করেছিলেন এবং সেগুলি পাথরের মঞ্জুষায় (পেটিকা) বন্দ করে বড় বড় স্তুপের নীচে সুরক্ষিত করে রেখে দিয়েছিলেন।
মূর্তিকলার সুবর্ণকাল: গান্ধার এবং মথুরা শৈলীদ্বয়ের বিকাশ
——————————————
সম্রাট কনিষ্কের পূর্বে বৌদ্ধ পরম্পরায় বুদ্ধের মানবরূপে মূর্তি বানিয়ে পূজার প্রচলন ছিলনা। সম্রাট কনিষ্কের কালে কলার ক্ষেত্রে এক মহাক্রান্তি হয়েছিল। যার কারণে প্রথমবারের মতো বুদ্ধকে মানবীয়াকারে মূর্তির রূপ প্রদান করা হয়েছে।
গান্ধার শিল্পকলা শৈলী:
————————
সম্রাট কনিষ্কের সম্রাজ্যের বিস্তার উত্তর-পশ্চিম আধুনিক পাকিস্তান এবং আফগানিস্তান পর্যন্ত ছিল, যেখানে গ্রীক এবং ভারতীয় সংস্কৃতিদ্বয়ের মিলন হয়েছে। এর পরিণাম স্বরূপ ‘গান্ধার শৈলীর জন্ম হয়েছে। তাতে বুদ্ধকে গ্রীক দেবতা এপেলোর মতো কোঁকড়ানো কেশরাশি, সুগঠিত শরীর এবং খোলামেলা রোমান বস্ত্রে দেখানো হয়েছে।
মথুরা কলা শৈলী:
————————
ইহা ছিল বিশুদ্ধ ভারতীয় কলা শৈলী। এর বিকাশ হয়েছে মথুরায়। এতে বুদ্ধের মূর্তি সমূহে আধ্যাত্মিক, শান্ত মুদ্রা এবং ভারতীয় সংস্কৃতির প্রতীক যুক্ত করে রূপ দেওয়া হয়েছে। এ সমস্ত মূর্তি সমূহের নির্মাণে বৌদ্ধ ধম্মে মূর্তিপূজা এবং ‘ভক্তি আন্দোলন’ এর মার্গকে প্রশস্ত করা হয়েছে।
বৌদ্ধ ধম্মের আন্তর্জাতিক এবং বৈশ্বিক প্রসার
————————————
সম্রাট কনিষ্কের সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক উপলব্দি ইহাই ছিল যে, তিনি বৌদ্ধ ধম্মকে ভারতের ভৌগোলিক সীমা হতে বাহিরে বের করে এশিয়ার এক বৃহৎ অংশে প্রসারিত করতে সক্ষম হয়েছেন।
রেশম মার্গের (Silk Route) উপর নিয়ন্ত্রণ
———————————
সম্রাট কনিষ্কের সম্রাজ্য মধ্য এশিয়ার সে বাণিজ্য মার্গে স্থিত ছিল, যাকে ‘সিল্ক রুট’ বলে জানা যেতো। সে মার্গ সুরক্ষিত হওয়ায় বৌদ্ধ ভিক্ষু, ভিক্ষুণী এবং বণিক অর্থাৎ ব্যবসায়ীগণের গতিশীলতা বৃদ্ধি পেয়েছিল।
বিদেশী মিশন
——————-
সম্রাট কনিষ্ক রাজকীয় খরচে বৌদ্ধ ধম্মদূত এবং ধম্ম গ্রন্থ সমূহকে মধ্য এশিয়া (খোটান, য়ারখন্দ), তিব্বত, চীন, মঙ্গোলিয়া, কোরিয়া এবং জাপানে প্রেরণ করেছিলেন। সম্রাট কনিষ্ক দ্বারা বপন করা বীজের কারণেই আজ এ সমস্ত দেশ সমূহ বৌদ্ধ বহুল বা বৌদ্ধ সংস্কৃতির দ্বারা গভীর প্রভাবিত হয়েছে।
মহান বৌদ্ধ বিদ্বান এবং দার্শনিকদের রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতা
—————————
সম্রাট কনিষ্ক কেবল একজন শাসক ছিলেন তা নয়, বরং তিনি ছিলেন একজন বিদ্বানদের পৃষ্টপোষক ও সম্মান দাতা। তাঁর রাজসভায় তৎকালীন ভারতের সবচেয়ে মেধাবী বৌদ্ধ বিদ্বানেরা অবস্থান করতেন। যাঁদেরকে সম্রাট কনিষ্ক সম্পূর্ণ রাজকীয় সংরক্ষণ এবং সম্মান প্রদান করেছেন।
মহাকবি অশ্বঘোষ
———————-
সম্রাট কনিষ্ক তাঁকে পাটলীপুত্র হতে নিজের সাথে নিয়ে এসেছিলেন। তিনি সংস্কৃত ভাষায় বুদ্ধ জীবনের উপর ভিত্তি করে কালজয়ী মহাকাব্য ‘বুদ্ধচরিত’ এবং ‘সৌন্দরানন্দ’ রচনা করেছিলেন।
আচার্য নাগার্জুন
———————-
আচার্য নাগার্জুনকে ‘ভারতের আইনস্টাইন’ বলা হয়। তিনি বৌদ্ধ দর্শনের ‘মাধ্যমিক কারিকা’ লিখেছেন এবং শূণ্যবাদ’কে (সাপেক্ষবাদের সিদ্ধান্ত) স্থাপন করেছেন, যা বৌদ্ধ দর্শনকে পৃথিবীর সবচেয়ে যৌক্তিক দর্শনে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
আচার্য বসুমিত্র
———————-
মহান দার্শনিক এবং বিচারক বসুমিত্র, যিনি চতুর্থ ধম্ম সঙ্গীতির কুশল পরিচালক ছিলেন। তাঁকে সম্রাট কনিষ্ক চতুর্থ সঙ্গীতিতে সম্মানের আসনে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন।
স্তূপ, চৈত্য এবং বিশাল বৌদ্ধ বিহার সমূহের নির্মাণ
——————————
বৌদ্ধ ভিক্ষুদের আবাস, প্রার্থনা এবং ধাম্মিক অধ্যয়নের জন্য সম্রাট কনিষ্ক স্বীয় সম্রাজ্যে হাজার হাজার স্থাপত্য সংরচনা সমূহের নির্মাণ করেছিলেন।
কনিষ্কের বিশাল স্তূপ
——————————
সম্রাট কনিষ্ক স্বীয় রাজধানী পুরুষপুরে (আধুনিক পেশোয়ার, পাকিস্তান) একটি অতীব ভব্য এবং বিশাল স্তূপ নির্মাণ করেছিলেন। ঐতিহাসিক বিবরণে (যেমন চৈনিক পরিব্রাজক ফা-হিয়েন এবং হিউয়েন সাংয়ের লেখনী) স্তূপ প্রায় ৪০০ ফুট উচ্চতা সম্পন্ন এবং ১৩ তলা বিশিষ্ট ছিল। যার শীর্ষে লোহার একটি বিশাল ছত্র ছিল। ইহা ছিল সেসময়ের সবচেয়ে উঁচু এবং আশ্চর্যজনকভাবে নির্মিত।
তক্ষশীলা এবং মথুরার বিকাশ
—————————
সম্রাট কনিষ্ক তক্ষশীলা বিশ্ববিদ্যালয়কে বৌদ্ধ শিক্ষার একটি মহান কেন্দ্র রূপে পুনরুজ্জীবিত করেছিলেন। সাথে সাথে মথুরা, সারনাথ এবং কাশীতেও বৌদ্ধ বিহার সমূহের জীর্ণোদ্বার এবং নির্মাণ করিয়েছিলেন।
লোক কল্যাণকারী কার্য এবং অহিংসাত্মক নীতি
————————-
যদিও সম্রাট কনিষ্ক ছিলেন মহান বৌদ্ধ এবং তিনি স্বীয় সম্রাজ্যের বিস্তারের জন্য অনেকবার যুদ্ধে লড়েছেন, কিন্তু বৌদ্ধ ধম্ম গ্রহণের পরে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিতে ভারী পরিবর্তন এসেছিল। অহিংস মার্গই তিনি গ্রহণ করেছিলেন।
তিনি প্রজার কল্যাণের জন্য চিকিৎসালয়, ধম্মশালা এবং কূপ খনন করিয়েছিলেন। তাঁর রাজকীয় চিকিৎসক চরক (চরক সংহিতার রচয়িতা) চিকিৎসা ক্ষেত্রে অভূতপূর্ব কার্য করেছেন।
সম্রাট কনিষ্ক কর্তৃক স্বীয় শাসন কালে প্রশাসন এবং উত্তরার্ধে ন্যায় প্রিয়তা, ধাম্মিক সহিষ্ণুতা এবং লোক কল্যাণকে শাসনের মুখ্য আধার হিসাবে করেছিলেন। তাতে বৌদ্ধ ধম্মের বার্তা সাধারণ জনগণের মধ্যে কল্যাণকারী ধম্মরূপে স্থাপিত হয়েছে। বিশেষ করে
আচার্য অশ্বঘোষ এবং নাগার্জুনের মাধ্যমে তিনি চীন এবং মধ্য এশিয়ায় প্রচারক প্রেরণ করে ধম্মকে বৈশ্বিক বিস্তার দিয়েছিলেন। এ সকল মহান এবং দূরগামী প্রয়াসের কারণে সম্রাট কনিষ্কের নাম বৌদ্ধ ধম্ম এবং বিশ্ব ইতিহাসে সর্বদা স্বর্ণাক্ষরে লিখিত থাকবে।

Post a Comment

0 Comments

Ad Code

Responsive Advertisement