শরীর ধম্ম হল নশ্বরতা। ইহা ক্ষণে ক্ষণে পরিবর্তন হচ্ছে। রূপ, যৌবন কোনদিন কারো চিরস্থায়ী থাকেনা। একদিন সবই জরা-জীর্ণ হবে, বিলীন হবে, নিস্তেজ হবে, পঁচে-গলে যাবে, ধ্বংস হবে। ইহাই হল ধম্ম। শাশ্বত নিয়ম। চিরন্তন রীতি। এ প্রসঙ্গে এখানে পালি সাহিত্য হতে রাজগৃহের শ্রীমা’র কথা উল্লেখ করা যায়।
মগধের রাজধানী রাজগৃহে শ্রীমা (সিরিমা) নামে অতি সুন্দরী একজন গণিকা থাকতেন। তিনি মুক্ত হস্তে পিণ্ডদান করতেন। একবার ভিক্ষুগণ তাঁর সৌন্দর্যতা এবং তাঁর কাছ হতে সুস্বাদু খাবার লাভ সম্বন্ধে চর্চা করার সময় একজন তরুণ ভিক্ষু তাঁকে না দেখেই তাঁর প্রতি আসক্ত হয়ে পড়েছিলেন। তিনি পরের দিন অন্য ভিক্ষুদের সাথে শ্রীমার গৃহে পিণ্ডাহরণের জন্য গিয়েছিলেন। সেদিন তিনি ছিলেন অসুস্থ। এরপরেও তিনি পিণ্ডদান দেওয়ার জন্য ঘর হতে বাহিরে এসেছিলেন। ভিক্ষুটি তাঁর সৌন্দর্য দর্শন করে মোহিত হয়ে গেলেন।
সংযোগ বশত: সে রাতেই শ্রীমার প্রয়ান হয়েছিল। মগধেশ্বর বিম্বিসার এর সূচনা দিয়েছিলেন বুদ্ধ তথাগতকে। শাস্তা বুদ্ধ রাজাকে পরামর্শ দিয়েছিলেন যে, শ্রীমার মৃতদেহ যেন সৎকার করা না হয় এবং পশু-পক্ষী দ্বারা নষ্ট হওয়া থেকে যেন মৃতদেহকে রক্ষা করা হয়। মৃত্যুর চতুর্থ দিনে শাস্তা বুদ্ধের পরামর্শ মতে নগরবাসী এবং ভিক্ষুগণ শ্রীমাকে শ্মশানে দেখার জন্য যাত্রা করলেন। সাথে সে আসক্ত হওয়া তরুণ ভিক্ষুও শ্মশানে গিয়েছিলেন।
সেদিন ছিল শ্রীমার মৃত্যুর চতুর্থ দিন। তখন শরীরের সৌন্দর্যতা ম্লান হয়ে যাচ্ছিল। শরীর বেলুনের মতো ফুলে উঠেছিল। মৃতদেহের নব দ্বার দিয়ে পঁচা গলিত দ্রবণ বের হচ্ছিল। বিকৃত শরীর হতে পঁচা দুর্গন্ধ প্রসারিত হচ্ছিল, এরকম অবস্থায় সেখানে দাঁড়ানোই কঠিন হয়েছিল।
বুদ্ধের নির্দেশ অনুসারে মগধেশ্বর বিম্বিসার ভেরী বাদ্য করে ঘোষণা করেছিলেন যে, তিনি হলেন রাজগৃহের সর্বাধিক সুন্দরী গণিকা। যদি কেহ চায় তাঁকে এক হাজার কার্ষপণ (টাকা) দিয়ে ক্রয় করতে পারেন। এরূপ ঘোষণায় কেহ নিতে এগিয়ে আসেননি। এতে কারো কোনো হেল-দুলও নেই। অত:পর অর্থ কমিয়ে পাঁচ শ’ করা হলো, তিন শ’ করা হলো, দু’ শ’ করা হল, এক শ’ করা হল এবং কমাতে কমাতে অন্তিমে এক কড়ি করা হল। এরপরেও কোনো গ্রাহক পাওয়া গেলোনা। এবার বিনামূল্যে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তাব করার পরও কেহ নিয়ে যেতে পুঁচ ভর্তি দেহটি রাজী হয়নি।
উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি হওয়ার পর বুদ্ধ উপস্থিত সবাইকে বুঝিয়েছেন যে-‘শরীরের ধম্ম দেখো, যখন পর্যন্ত শ্রীমার শরীর চলমান ছিল, তাঁর একদিনের জন্য হাজার কার্ষাপণ দেওয়ার জন্য সবাই সহর্ষে প্রস্তুত থাকতো। কিন্তু আজ বিনামূল্যে নেওয়ার আহ্বান জানালেও কেহ তাঁর শরীরের পাশে যেতেও তৈরী নয়। এরকমই হল এ ক্ষণভঙ্গুর, নশ্বর শরীর। এরকম শরীরের প্রতি কেনো এতো আসক্তি? এ রকম শরীরের প্রতি কেনো এতো তৃষ্ণা? এবং এ শরীরে ভিতরেই রয়েছে নোংরা ভর্তি আবর্জনা এবং শরীর নানা ব্যাধিতে পূর্ণ রয়েছে। কেবল বাহিরে চামড়া দ্বারা দেহখানি আবৃত রয়েছে।’
অত:পর বুদ্ধ গাথা ভাষণ করে বলেছেন-
‘পরস্স চিত্ত কতং বিম্বং, অরূকাযং সমুস্সিতং,
আতুরং বহুসঙ্কপ্পং, যস্স নত্থি ধুবং ঠিতি।’
(ধম্মপদ-১৪৭)
অর্থাৎ ব্রণযুক্ত ফুলে উঠা, রোগের দ্বারা পীড়িত বিচিত্র শরীরকে দেখো, যা সঙ্কল্প-বিকল্প দ্বারা পূর্ণ থাকে, যা কখনও স্থায়ী (অবিনাশী) নয়।

0 Comments