ইতিহাসের অতীব এক গৌরবশালী এবং গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হল তিব্বত এবং ভারতীয় সিদ্ধাচার্যদের সাথে সম্পর্ক। অষ্টম হতে দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যে ভারতের চৌরাশি মহাসিদ্ধাগণের মধ্যে অনেক মহান সন্ত, তান্ত্রিক এবং বিদ্বান বৌদ্ধ ধম্ম, তন্ত্র শাস্ত্র এবং যোগ বিদ্যার প্রসার করতে তিব্বতে গিয়েছিলেন। তিব্বতি পরম্পরায় এ সকল সিদ্ধাচার্যগণ অনেক উচ্চতর আসন প্রাপ্ত হয়েছিলেন। তাঁরা কেবল সেখানে ভারতীয় জ্ঞানের বীজ রোপন করেননি, বরং তিব্বতি ভাষা, লিপি এবং সংস্কৃতিতেও এক নতুন ভিত প্রদান করেছিলেন। ভারত হতে তিব্বতে যাওয়া অনেক সিদ্ধা এবং বিদ্বান আচার্যগণের মধ্যে প্রমুখ কয়েকজনের নাম এখানে উল্লেখ করছি।
১) গুরু পদ্মসম্ভব (গুরু রিম্পোচে)
———————————-
তিব্বতে বৌদ্ধ ধম্ম এবং তন্ত্রের বাস্তবিক প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন গুরু পদ্মসম্ভবই। তিনি বিশ্ব বিশ্রুত নালন্দা মহাবিহারের (বিশ্ববিদ্যালয়) প্রসিদ্ধ বিদ্বান ছিলেন এবং তাঁকে একজন পরম সিদ্ধ তান্ত্রিক মান্য করা হতো।
অষ্টম শতাব্দীতে তিব্বতের রাজা ঠিসোঙ্গ দেৎসেন কর্তৃক তাঁকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। মান্য করা হয় যে, তিনি স্বীয় তান্ত্রিক শক্তি দ্বারা তিব্বতের স্থানীয় বাঁধা-বিপত্তি সমূহ এবং নকারাত্মক শক্তি সমূহের উচ্ছেদ করেছিলেন। তিব্বতি লোকেরা তাঁকে ‘দ্বিতীয় বুদ্ধ’ রূপে গৌরব করে থাকেন। মনে করা হয় যে, তাঁর জন্ম হয়েছে উড়িষ্যায়।
২) আচার্য শান্তরক্ষিত (৭২৫-৭৮৮)
——————————
আচার্য শান্তরক্ষিত নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের অতীব প্রতিষ্ঠিত বিদ্বান এবং উচ্চ পদাসীন আচার্য ছিলেন।
গুরু পদ্মসম্ভবের পূর্বে রাজা ঠিসোঙ্গ দেৎসেনের আহ্বানে আচার্য শান্তরক্ষিত তিব্বতে গিয়েছিলেন। তিনি তিব্বতে ‘সাম্যে’ প্রথম বৌদ্ধ বিহার স্থাপন করেছিলেন এবং স্থানীয় অনেক লোকদেরকে ভিক্ষুরূপে দীক্ষিত করেছিলেন। পরে যখন বৈচারিক বিরোধ হয়েছিল, তখন তিনি রাজাকে পরামর্শ দিয়েছিলেন যে, গুরু পদ্মসম্ভবকে আহ্বান করার জন্য।
৩) দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান (অতীশ দীপঙ্কর, ৯৮২-১০৫৪)
—————————
অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান একাদশ শতাব্দীর মহানতম সিদ্ধা এবং আচার্যদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন, যিনি বিক্রমশীলা বিশ্ববিদ্যালয় বা মহাবিহারের প্রমুখ আচার্য ছিলেন।
১০৪২ খৃষ্টাব্দে তিনি তিব্বতের রাজার বিশেষ আমন্ত্রণে সেখানে গিয়েছিলেন। তখন তাঁর বয়স অধিক হলেও তিনি সাহসিকতার সাথে দুর্গম রাস্তা পদব্রজে অতিক্রম করে তিব্বতে পৌঁছেছিলেন।
তিনি তিব্বতে বিকৃত হওয়া বৌদ্ধ ধম্ম এবং তন্ত্রকে পুণ:রায় শুদ্ধ এবং সুব্যবস্থিত করেছিলেন। তিনি সেখানে ‘কাদম’ সম্প্রদায়ের ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন, যা পরবর্তী সময়ে ‘গেলুগ’ (বর্তমান দালাই লামার সম্প্রদায়) নিকায়ের প্রতিষ্ঠাতা হয়েছিলেন। তাঁর শিক্ষা সমূহ তিব্বতে তন্ত্র এবং নৈতিকতার মধ্যে সন্তুলন বা ভারসাম্য স্থাপন করেছিল। বর্তমান বাংলাদেশের বজ্রযোগীনি গ্রামে বা মুন্সীগঞ্জে তিনি জন্ম গ্রহণ করেছিলেন।
৪) আচার্য কমলশীল (৭৪০-৭৯৫)
—————————-
আচার্য শান্তরক্ষিতের প্রমুখ শিষ্য ছিলেন আচার্য কমলশীল।
তিব্বতে যখন চৈনিক বৌদ্ধ ভিক্ষুগণ (যাঁরা কেবল ধ্যান এবং শূণ্যতার উপর দোর দিতেন) এবং ভারতীয় বৌদ্ধ বিদ্বানদের (যাঁরা ক্রমিক মার্গ এবং আচার-বিচারের উপর জোর দিতেন) মধ্যে বৈচারিক মতভেদ বৃদ্ধি করেছিলেন, তখন সাম্যে বিহারে একটি প্রসিদ্ধ শাস্ত্রার্থ বা যৌক্তিক তর্কের সভা হয়েছিল।
আচার্য কমলশীল স্বীয় যৌক্তিক প্রতিভা দ্বারা চৈনিক ভিক্ষু হুশাঙ্গকে পরাজিত করে তিব্বতে ভারতীয় বৌদ্ধ দর্শনের (মাধ্যমিক দর্শন) স্থাপন করেছিলেন।
চুরাশি মহাসিদ্ধার প্রভাব এবং তিব্বতি অনুবাদ
—————————-
ভারতীয় সিদ্ধাগণের মধ্যে যেমন-সরহপা, শবরপা, লুইপা, ডোমরীপা, তিলোপা, নরোপার মতো প্রমুখ আচার্যগণ সরাসরি তিব্বতে যাননি, কিন্তু তাঁদের শিষ্য এবং গ্রন্থ তিব্বতে ‘কাগ্যু’ সম্প্রদায়কে জন্ম দিয়েছেন।
তিলোপা এবং নরোপা:
——————————
ভারতের এ দু’ মহান সিদ্ধাচার্যকে যোগ পদ্ধতি সমূহকে (নরোপার ছয় যোগ) তিব্বতের মহান অনুবাদক মার্পা ভারতে এসে শিক্ষা করেছিলেন। মার্পা কর্তৃক এ সমস্ত শিক্ষাকে স্বীয় শিষ্য মিলারেপাকে (তিব্বতের সবচেয়ে প্রসিদ্ধ যোগী-কবি) দিয়েছিলেন।
যখন দ্বাদশ-ত্রয়োদশ শতাব্দীতে ভারতে নালন্দা এবং বিক্রমশীলার মতো বিশ্ববিদ্যালয় বিনষ্ট করা হয়েছিল, তখন ভারতীয় সিদ্ধাগণের লিখিত ‘চর্যাপদ’, ‘দোহাকোষ’ এবং গুপ্ত তান্ত্রিক গ্রন্থ সমূহের কেবল তিব্বতি অনুবাদ (কাঞ্জুর এবং তাঞ্জুর) রূপেই সুরক্ষিত হয়ে বেঁচে গিয়েছিল।
ভারতীয় সিদ্ধাচার্য এবং বিদ্বান আচার্যদের দেখাশুনায় সংস্কৃত গ্রন্থ সমূহের বড় সংখ্যায় তিব্বতি ভাষায় অনুবাদ হয়েছিল। এর জন্য তিব্বতি লিপিকেও সংস্কৃত ব্যাকরণের ভিত্তিতে প্রস্তুত করা হয়েছে।
ভারতীয় সিদ্ধাগণের তিব্বত যাওয়ার সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক লাভ ইহাই হয়েছে যে, জ্ঞান পরম্পরা যা ভারতে বিলুপ্ত হয়েছিল, সে জ্ঞান পরম্পরাই তিব্বতের হিমালয়ের বিহার অর্থাৎ গুম্পা সমূহে শতাব্দীর পর শতাব্দী পর্যন্ত সুরক্ষিত রয়েছে এবং আজও জীবিত আছে।
.jpg)
0 Comments