বাংলার রেনেসাঁসের তথা নবজাগরণের উন্মেষ ঘটেছিল ঊনবিংশ শতাব্দীতে। জ্ঞানে-বিজ্ঞানে নতুন নতুন সৃষ্টিতে বাংলায় তখন এক নবচৈতন্যের দ্বার উন্মোচিত হয়েছিল। মনন-সৃজনশীল প্রগতিশীল ও যুক্তিবাদী এই নবচিন্তায় উজ্জীবিত রেনেসাঁসের কৃতী সন্তানেরা বিজ্ঞান-দর্শন, ভূগোল-গণিত, সাহিত্য-শিল্পকলাচর্চার পাশাপাশি প্রাচীন বাংলার শিকড় সন্ধানেও আত্মনিবেদিত ছিলেন, আবিষ্কারের তাগিদে অতীত অনুসন্ধানে প্রবৃত্ত হলেন। গৌরবোজ্জ্বল অতীতের পুনরাবৃত্তি নয়, গর্বিত উত্তরাধিকারী হিসেবে অতীতের ভিত্তি ভূমিতে দাঁড়িয়ে ব্যক্তিজীবনে সমাজজীবনের ইহলোককে সব ধরনের মানবিক চেতনায় ঋদ্ধ করা, সমৃদ্ধ করা, বিকশিত করাই ছিল রেনেসাঁসের সন্তানদের নিরন্তর সাধনা প্রচেষ্টার মূল লক্ষ্য।
#ডক্টর_বেণীমাধব বড়ুয়া জন্মঃ ৩১শে ডিসেম্বর ১৮৮৮ মৃত্যু ২৩শে মার্চ ১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দ। একজন ব্রিটিশ ভারতীয় ভারততত্ত্ববিদ, পালি ও বৌদ্ধশাস্ত্রে পণ্ডিত। তিনিই প্রথম গবেষক যিনি প্রাচ্যীয় পদ্ধতিতে বৌদ্ধ দর্শন ও প্রাচীন লিপি নিয়ে গবেষণা করেন। ভারতীয় দর্শন ও বৌদ্ধ দর্শন অভিসন্দর্ভের জন্য ১৯১৭ সালে ইউনিভার্সিটি অব লন্ডন থেকে তাকে ডি. লিট উপাধি প্রদান করা হয়। বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে যে কয়েকজন এশীয় সর্বপ্রথম ইউনিভার্সিটি অব লন্ডন থেকে ডি-লিট ডিগ্রি লাভ করেন বেণীমাধব বড়ুয়া তাদের অন্যতম।
বেণীমাধব বড়ুয়া ১৮৮৮ সালের ৩১শে ডিসেম্বর চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার মহামুনি পাহাড়তলী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম রাজচন্দ্র তালুকদার এবং মাতা ধনেশ্বরী দেবী। রাজচন্দ্র তালুকদারের ছিলেন পেশায় কবিরাজ। তাদের এগারো সন্তানের মধ্যে ছয়জন কন্যা যাদের নাম ছিল অশ্রুমতী, চারুমতী, শুভঙ্করী, ক্ষেমঙ্করী, শুভদা ও নর্মদানলিনী এবং পাঁচজন পুত্র যাদের নাম বেণীমাধব, কানাইলাল, সুধীরচন্দ্র, বিশ্বামিত্র ও যদুগোপাল। ড. বেণীমাধব বড়ুয়া ছিলেন পিতা মাতার চতুর্থ সন্তান এবং পুত্রদের মধ্যে জোষ্ঠ।
১৮৯৪ সালে ছয় বছর বয়সে গ্রামের মডেল স্কুলে তিনি পড়ালেখা শুরু করেন। স্কুলে ভর্তির সময় পারিবারিক পদবী “তালুকদার” এর পরিবর্তে “বেণীমাধব বড়ুয়া” রাখা হয়। ঐ স্কুল হতে ১৯০২ সালে মিডল ইংলিশ (এম ই) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে পড়ালেখায় উৎসাহী পিতা রাজচন্দ্র তালুকদার এবং পিতৃতুল্য ধনঞ্জয় তালুকদারের প্রেরণায় তিনি ১৯০২ সালে চট্টগ্রাম শহরের কলেজিয়েট স্কুলে সপ্তম শ্রেণীতে ভর্তি হন। ১৯০৬ সালে তিনি ঐ স্কুল থেকে দ্বিতীয় বিভাগে এন্ট্রান্স পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ঐ বছর তিনি চট্টগ্রাম কলেজে এফ. এ. পড়ার জন্য ভর্তি হন। তিনি ১৯০৮ সালে দ্বিতীয় বিভাগে এফ. এ. পাশ করেন। তখন পর্যন্ত তার লেখাপড়ার সম্পূর্ণ খরচ চালাতেন ধনঞ্জয় তালুকদার এবং তদীয় পত্নী শশীকুমারী। ড. বেণীমাধব বড়ুয়া তার মধ্যমনিকায় গ্রন্থের উৎসর্গপত্রে লিখেছেন “যিনি আমার বাল্যে ও কৈশোরে পুত্রবৎ পালন করিয়া তাঁহার সর্বস্ব দিয়া আমার জীবনধারা নিয়ন্ত্রিত করিয়াছিলেন সেই পিতৃতুল্য পরমারাধ্য খুল্লতাত ধনঞ্জয় তালুকদার এবং...সেই জননীস্বরুপা পরমারাধ্যা স্বর্গতা খুল্লমাতা শশীকুমারী দেবীর চরণোদ্দেশে এই অনুবাদ গ্রন্থখানি সশ্রদ্ধে উৎসর্গীকৃত হইল”। এফ. এ. পাশ করার পর ধনঞ্জয় তালুকদারের আকস্মিক মৃত্যুতে বেণীমাধবের উচ্চশিক্ষার ভবিষ্যৎ সংকটাপন্ন হয়ে পড়ে। তখন তার পিতা দ্বিতীয় পুত্র কানাইলালকে রেঙ্গুনে পাঠান। রেঙ্গুনে সাঙ্গুভেলী টী কোম্পানীতে চাকরি নিয়ে কানাইলাল অগ্রজ বেণীমাধবের উচ্চশিক্ষার খরচপত্র চালিয়ে যান। এফ. এ. পাশ করে বেণীমাধব কলকাতায় এসে স্কটিশ চার্চ কলেজে বি. এ. ক্লাসে ভর্তি হন। এ সময় স্কটিশে পালি পড়বার ব্যবস্থা না থাকায় তাকে পালি ভাষায় অনার্স পড়বার জন্য প্রেসিডেন্সি কলেজে আসতে হতো। তিনি ১৯১১ সালে বহরমপুর কৃষ্ণনাথ কলেজ হতে পালি ভাষায় অনার্স সহ দ্বিতীয় শ্রেনীতে বি. এ. পরীক্ষায় পাশ করেন। তারপর তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পালি ভাষায় এম. এ. শুরু করেন। ১৯১৩ সালে তিনি এম. এ. তে প্রথম শ্রেনীতে প্রথম হয়ে স্বর্ণপদক লাভ করেন। এম. এ.তে কৃতিত্বপূর্ণ ফলাফল ভবিষ্যৎ কর্মজীবন সম্পর্কে তাকে আশাবাদী করে তোলে।
এম. এ. পাশ করার এক বছর পরে বৌদ্ধ ধর্মাঙ্কুর বিহারের প্রতিষ্ঠাতা কৃপাশরণ মহাস্থবির এবং স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের উদ্যোগে ভারত সরকার তাকে অ্যান অ্যানুয়াল ষ্টেট স্কলারশিপ ফর দ্য সায়েন্টিফিক স্টাডি অফ পালি ইন ইউরোপ নামক রাষ্ট্রীয় বৃত্তি মঞ্জুর করলে তিনি উচ্চশিক্ষার জন্য ইংল্যান্ড যাত্রা করে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষক ছাত্র হিসাবে যোগ দেন। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে তাকে ইন্ডিয়ান ফিলোসফি - ইটস অরিজিন অ্যান্ড গ্রোথ ফ্রম বেদাস টু দ্য বুদ্ধ নামক বেদোত্তর সংস্কৃত ভাষা ভিত্তিক একটি গ্রন্থ রচনার ভার দেওয়া হয়। এই গবেষণাসমাপ্ত হলে তিনি লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম এশীয় বংশোদ্ভূত ব্যক্তি যিনি ডি. লিট উপাধি লাভ করেন।
ড. বেণীমাধব বড়ুয়া লন্ডন থেকে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে তিনি পালি বিভাগে লেকচারার পদে নিযুক্ত হন এবং প্রাচীন ভারতীয় ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের দায়িত্ব নেন। ১৯২১ খ্রিষ্টাব্দে স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের তরফে বেণীমাধবের গবেষণাপত্রটিকে আ হিষ্ট্রি অফ প্রি-বুদ্ধিস্টিক ইন্ডিয়ান ফিলোসফি নামে প্রকাশের ব্যবস্থা করেন। এই গ্রন্থে অমোঘবর্মণ ও মহিদাস ঐতরেয় সম্পর্কে তিনি মৌলিক মূল্যায়ন করেন। কয়েক বছর পর তাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের তরফে সংস্কৃত বিভাগেও অধ্যাপনার দায়িত্ব দেওয়া হয়। পালি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান সতীশচন্দ্র বিদ্যাভূষণের মৃত্যু ঘটলে তিনি ঐ পদ গ্রহণ করেন। কয়েক বছর পরে তাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকের পদে উন্নীত করা হয়। পালি ভাষার বি. এ. এবং এম. এ. কোর্সের সিলেবাসের সংস্কার তার অন্যতম কীর্তি।
তিনি সংস্কৃত ও পালি ভাষার সঙ্গে ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাস, ভূগোল, বহির্ভারতে বৌদ্ধশাস্ত্র, বৌদ্ধধর্ম, দর্শন, শিল্পকলা, মূর্তিতত্ত্ব ও সংস্কৃতির সমন্বয় সাধন করে এক নতুন যুগোপযোগী সিলেবাস তৈরী করেন।
বেণীমাধব বহু গ্রন্থ ও গবেষণা নিবন্ধ রচনা করেন। তাঁর প্রথম গ্রন্থ মূল পালিসহ লোকনীতির বঙ্গানুবাদ বৌদ্ধ ধর্মাঙ্কুর সভার বার্ষিক কার্যবিবরণীতে (১৯১২) প্রকাশিত হয়। তাঁর ডিলিট থিসিস A History of Pre-Buddhistic Indian Philosophy (১৯২১) কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত হয়। তাঁর অন্যান্য উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ হচ্ছে: A Prolegomena to a History of Buddhist Philosophy (১৯১৮), The Ajivikas (১৯২১), Prakrit Dharmapad (শৈলেন্দ্রনাথ মিত্রের সঙ্গে যৌথভাবে), Old Brahmi Inscrptions in the Udayagiri and Khandgiri (১৯২৬), Barhut Inscription (গঙ্গানন্দ সিংহের সঙ্গে যৌথভাবে), Gaya & Buddha Gaya (১ম খন্ড ১৯৩১, ২য় খন্ড ১৯৩৪), Asoka and His Inscriptions (১৯৪৬), Brahmachari Kuladananda and His Guru Bijaya Krishna Goswami (১৯৩৮), Ceylon Lecture (১৯৪৫), Studies in Budhisim (১৯৪৭), Philosophy of Progress (১৯৪৮) ইত্যাদি। বাংলায় তাঁর মৌলিক ও অনূদিত গ্রন্থের মধ্যে মধ্যম নিকায় (১ম খন্ড, ১৯৪০), বৌদ্ধ গ্রন্থকোষ (১ম খন্ড, ১৯৩৬), বিশুদ্ধিমার্গ (অপ্রকাশিত) ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। এছাড়া তাঁর শতাধিক প্রবন্ধ ও বক্তৃতা বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে।
বাংলা ভাষায় প্রথম বৌদ্ধশাস্ত্র চর্চার পত্রিকা জগজ্জ্যোতি প্রকাশিত হয় ১৯০৮ খ্রিষ্টাব্দে-এ। এর উদ্যোক্তা ছিলেন কৃপাশরণ মহাস্থবির। এর সম্পাদনার দায়িত্বে ছিলেন বৌদ্ধশাস্ত্রবিদ গুণালঙ্কার মহাস্থবির ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পালিভাষার অধ্যাপক সমণ পুণ্ণানন্দ। পরবর্তীতে এ পত্রিকাটির সম্পাদনার দায়িত্ব পালন করেছেন ড. বেণীমাধব বড়ুয়া।
শ্রীলঙ্কার বিদ্যালঙ্কার বিশ্ববিদ্যালয় তাকে ত্রিপিটকাচার্য উপাধিতে ভূষিত করেন। এছাড়াও ব্রহ্মদেশের বৌদ্ধসমাজ তাকে নানা ভাবে সম্মানিত করেছেন।
আচার্য ড. বেণীমাধব বড়ুয়ার বর্ণাঢ্য ও সফল কর্মজীবন, উঁচু জীবনাদর্শ জীবনদর্শন, তাঁর আদি ভারতীয় দর্শন-প্রত্নতত্ত্ব-ভারততত্ত্ব-বৌদ্ধতত্ত্ববিষয়ক গবেষণামূলক রচনাবলি, আর্থসামাজিক-সাংস্কৃতিক উন্নয়নমূলক বক্তব্য-ভাষণ ও সমাজকর্মে তাঁর সরাসরি সম্পৃক্ততা বর্তমান ও আগামী প্রজন্মের জন্য প্রোজ্জ্বল উত্তরাধিকার। সংকটে-দুর্দিনে ভেঙে পড়ার মুহূর্তে জাতি-গোষ্ঠী-সম্প্রদায়-সমাজ এখান থেকে খুঁজে পাবে উঠে দাঁড়ানোর শক্তি, অনুপ্রেরণা, দিকনির্দেশনা।
0 Comments