একবার বুদ্ধ বেণুবনে অবস্থান করছিলেন। সেই সময় রাজা বিম্বিসারের প্রধান মহিষী ক্ষেমাকে লক্ষ্য করে তিনি একটি ধর্মোপদেশ দিয়েছিলেন।

ক্ষেমা পূর্বজন্মে পদুমুত্তর বুদ্ধের কাছে প্রার্থনা করেছিলেন, যার ফলে তিনি অত্যন্ত সুন্দরী ও রূপবতী হয়েছিলেন। তিনি শুনেছিলেন যে বুদ্ধ রূপের দোষের কথা বলেন, তাই তিনি বুদ্ধের কাছে যেতে চাইতেন না। রাজা তাঁর রূপের অহংকার জানতেন। তাই তিনি বেণুবনের প্রশংসা করে গান রচনা করিয়েছিলেন এবং নর্তকদের দিয়ে তা গাওয়ালেন। যখন ক্ষেমা সেই গান শুনলেন, তাঁর মনে হলো বেণুবন যেন তাঁর কাছে নতুন ও অজানা। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, "এরা কোন বাগানের কথা গাইছে?"
নর্তকরা উত্তর দিল, "দেবী, এরা আপনাদের বেণুবন উদ্যানের প্রশংসা করছে।" এই কথা শুনে ক্ষেমা বেণুবনে যেতে চাইলেন। বুদ্ধ তাঁর আগমনের কথা জানতে পেরে পরিষদবর্গের মাঝে বসে ধর্মোপদেশ দেওয়ার সময় একটি তালপাখা হাতে নিয়ে এক সুন্দরী নারীর রূপ নির্মাণ করলেন, যা দেখে মনে হচ্ছিল সেই নারী তাঁকে বাতাস করছে। ক্ষেমা যখন বেণুবনে প্রবেশ করলেন, তখন সেই নারীরূপ দেখে মনে মনে ভাবলেন, "লোকে বলে সম্যকসম্বুদ্ধ রূপের নিন্দা করেন। কিন্তু যে নারী তাঁকে বাতাস করছে, তার রূপের ষোল ভাগের এক ভাগও আমার রূপ নয়। এর আগে আমি এমন সুন্দরী নারী কখনো দেখিনি। মনে হয় লোকেরা বুদ্ধ সম্পর্কে মিথ্যা কথা বলে।" এই ভেবে তিনি তথাগতের ধর্মকথা না শুনে সেই নারীরূপের দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন। বুদ্ধ দেখলেন যে ক্ষেমা সেই নির্মিত রূপের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছেন। তখন তিনি সেই রূপের প্রথম, মধ্যম ও শেষ বয়স পর পর দেখালেন এবং পরিশেষে শুধু হাড়ের কঙ্কাল দেখালেন। ক্ষেমা এটা দেখে ভাবলেন, "এমন রূপও মুহূর্তের মধ্যে ক্ষয়প্রাপ্ত হলো। তাহলে এই রূপে কোনো সারবস্তু নেই।" বুদ্ধ তাঁর মনের কথা বুঝতে পেরে বললেন, "ক্ষেমা, তুমি এই রূপে সার আছে বলে জানতে, এখন এর অসারতা প্রত্যক্ষ করো।" এই বলে তিনি এই গাথাটি বললেন:
"ক্ষেমা, অসুস্থ, অশুচি, পূতিময় এই দেহকে দেখো। এর নয়টি দ্বার দিয়ে অনবরত অশুচি জিনিস বের হচ্ছে। মূর্খরাই এমন দেহ কামনা করে।" (থেরী অপদান, ২/২/৩৫৪)
এই গাথা শেষ হওয়ার পর ক্ষেমা স্রোতাপত্তি ফল লাভ করলেন। তখন বুদ্ধ তাঁকে বললেন, "ক্ষেমা, এই জগতে প্রাণীরা রাগাসক্ত, দ্বেষপ্রদুষ্ট এবং মোহগ্রস্ত হয়ে নিজেদের তৃষ্ণার স্রোত অতিক্রম করতে পারে না। তারা এতেই আটকে থাকে।" এই কথা বলে তিনি ধর্মোপদেশ ছলে বললেন:
"যারা রাগাসক্তির কারণে (তৃষ্ণার) স্রোতের অনুগামী হয়, তারা মাকড়সার মতো নিজেদের তৈরি জালে আটকে পড়ে। জ্ঞানী ব্যক্তিরা এটিও ছিন্ন করেন এবং সমস্ত দুঃখ থেকে মুক্ত হয়ে অনাসক্তভাবে বিচরণ করেন।" (ধর্মপদ, শ্লোক-৩৪৭)
ব্যাখ্যা: 'মাকড়সার মতো জালে'—যেমন মাকড়সা সুতার জাল তৈরি করে মাঝখানে বসে থাকে, আর জালে কোনো পোকা বা মাছি ধরা পড়লে দ্রুত গিয়ে তাকে বিদ্ধ করে রস পান করে, তারপর আবার জালের মাঝখানেই ফিরে আসে। ঠিক তেমনি, যেসব প্রাণী রাগাসক্ত, দ্বেষপ্রদুষ্ট এবং মোহগ্রস্ত, তারা নিজেদের তৈরি তৃষ্ণার স্রোতে পড়ে যায়। তারা সেই স্রোত অতিক্রম করতে পারে না, তাই একে 'দূরতিক্রম্য' বলা হয়েছে। 'জ্ঞানী ব্যক্তিরা এটিও ছিন্ন করেন এবং সমস্ত দুঃখ থেকে মুক্ত হয়ে বিচরণ করেন'—পণ্ডিত ব্যক্তিরা এই বন্ধনও ছিন্ন করে অনাসক্ত হয়ে অর্হত্ত্ব মার্গজ্ঞানের মাধ্যমে সমস্ত দুঃখের অবসান ঘটিয়ে চলে যান।
এই ধর্মোপদেশের শেষে ক্ষেমা অর্হত্ত্ব লাভ করলেন। এই ধর্মোপদেশ জনগণের কাছেও সার্থক হয়েছিল। বুদ্ধ রাজাকে বললেন, "মহারাজ, ক্ষেমাকে হয় প্রব্রজিত হতে হবে, অথবা পরিনির্বাণ লাভ করতে হবে।" রাজা বললেন, "ভন্তে, ক্ষেমাকে প্রব্রজিত করুন। এখন পরিনির্বাণের প্রয়োজন নেই।" তিনি প্রব্রজিত হয়ে অগ্রশ্রাবিকা হয়েছিলেন।