Hot Posts

6/recent/ticker-posts

Ad Code

ক্ষেমা কে ছিলেন

 


আজ থেকে লক্ষকল্প আগে পৃথিবীতে সর্ববিধ ধর্মে চক্ষুষ্মান, নায়ক, পদুমুত্তর জিন উৎপন্ন হয়েছিলেন।

তখন আমি হংসবতী নগরে এক শ্রেষ্ঠী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলাম। আমি নানাবিধ রত্ন-পরিবেষ্টিত হয়ে মহাসুখে দিনাতিপাত করছিলাম।

একদিন আমি সেই মহাবীর বুদ্ধের কাছে গিয়ে ধর্মদেশনা শুনেছিলাম। তাতে আমার শ্রদ্ধা উৎপন্ন হয়েছিল এবং আমি বুদ্ধের শরণ গ্রহণ করেছিলাম।

মাতাপিতার অনুমতি নিয়ে আমি সশ্রাবক বিনায়ক বুদ্ধকে নিমন্ত্রণ করে সাত দিন পর্যন্ত ভোজন করিয়েছিলাম।

সাত দিন পর নরসারথি বুদ্ধ এক ভিক্ষুণীকে ভিক্ষুণীদের মধ্যে অগ্রশ্রাবিকাপদে প্রতিষ্ঠিত করলেন।

তা শুনে আমি ভীষণ খুশি হলাম। পুনরায় আমি মহর্ষি বুদ্ধকে মহাদান দিয়ে সেই শ্রেষ্ঠপদ প্রার্থনা করলাম।

তখন জিনশ্রেষ্ঠ আমাকে বললেন, তোমার প্রার্থনা পূর্ণ হবে। আমাকে ও সংঘকে যে তুমি দান দিয়েছ, তার অপ্রমেয় ফল তুমি লাভ করবে।

আজ থেকে লক্ষকল্প পরে ওক্কাকুকুলে গৌতম নামক শাস্তা পৃথিবীতে উৎপন্ন হবেন।

তাঁর ধর্মে ধর্মৌরসজাত উত্তরাধিকারিণী ক্ষেমা নাম্নী অগ্রশ্রাবিকা হবে।

সেই সুকৃত কর্মের ফলে ও প্রার্থনাবলে মনুষ্যদেহ ত্যাগ করে আমি তাবতিংস দেবলোকে জন্মেছিলাম।

সেখান থেকে চ্যুত হয়ে আমি যাম স্বর্গে, সেখান থেকে চ্যুত হয়ে তুষিত স্বর্গে, সেখান থেকে চ্যুত হয়ে নির্মাণরতি স্বর্গে এবং সবশেষে সেখান থেকে চ্যুত হয়ে পরনির্মিত-বশবর্তী স্বর্গে জন্মেছিলাম।

পূর্বকৃত কর্মের ফলে আমি যেখানে যেখানে জন্মেছিলাম, সর্বত্রই রাজমহিষী হয়েছিলাম।

সেখান থেকে চ্যুত হয়ে মানুষ হয়ে জন্মগ্রহণ করেও আমি চক্রবর্তী রাজার মহিষী ও প্রাদেসিক রাজার মহিষী হয়েছিলাম।

আমি দেবতা ও মানুষ হয়ে জন্ম নিয়ে উভয় সম্পত্তি ভোগ করে সর্বত্রই সুখী হয়ে বহুকল্প বিচরণ করেছিলাম।

আজ থেকে একানব্বই কল্প আগে চারুদর্শন, সর্ববিধ ধর্মে বিদর্শক, লোকনায়ক বিপস্সী বুদ্ধ উৎপন্ন হয়েছিলেন।

আমি সেই লোকনায়ক, নরসারথি বুদ্ধের কাছে গিয়ে ধর্মকথা শুনে অনাগারিক প্রব্রজ্যা গ্রহণ করেছিলাম।

আমি সেই বীর বুদ্ধের শাসনে যোগযুক্তা, বহুশ্রুতা হয়ে দশ হাজার বৎসর ব্রহ্মচর্যা পালন করেছিলাম।

তখন আমি ছিলাম প্রত্যয়াকারে দক্ষ, চতুর্সত্য বিশারদ, নিপুণ ধর্মকথিকা ও শাস্তার উপদেশ পালনকারিণী।

সেখান থেকে চ্যুত হয়ে আমি তুষিত স্বর্গে উৎপন্ন হয়েছিলাম। অতীতে ব্রহ্মচর্যা পালনের ফলে আমি সেখানে যশস্বিনী হয়ে অন্য দেবীদের ছাড়িয়ে গিয়েছিলাম।

পূর্বে বুদ্ধের শাসনে ব্রহ্মচর্যা আচরণের ফলে আমি যেখানেই জন্মগ্রহণ করি না কেন, সর্বত্রই মহাধনী, মহাভোগ-সম্পত্তিশালিনী, মেধাবিনী, শীলবতী, বিনীত পরিষদ হয়েছিলাম। আমি সর্ববিধ সম্পত্তি লাভ করেছিলাম। আমি সকলের প্রিয় ও মনোজ্ঞ হয়েছিলাম।

আমার প্রতিপত্তিবলের প্রভাবে যে আমার স্বামী ছিল-আমি যেখানেই যাই না কেন - সে আমাকে অসম্মান করত না।

এই ভদ্রকল্পে ব্রহ্মবন্ধু, মহাযশস্বী কোণাগমন বুদ্ধ উৎপন্ন হয়েছিলেন।

তখন বারাণসীতে ধনাঞ্জনী, সুমেধা ও আমি এই তিনজন এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলাম।

আমরা তিনজন পরস্পর দানসহায়িকা ছিলাম। আমরা তিনজনে মিলে সংঘের উদ্দেশে সংঘারাম ও বিহার তৈরি করে দান করেছিলাম।

সেখান থেকে চ্যুত হয়ে আমরা সবাই তাবতিংস স্বর্গে জন্মেছিলাম, পরে অনুরূপভাবে মানুষ হয়ে জন্মগ্রহণ করেছিলাম।

এই ভদ্রকল্পে ব্রহ্মবন্ধু, মহাযশস্বী কস্সপ বুদ্ধ উৎপন্ন হয়েছিলেন।

তখন বারাণসী নগরের কাশিরাজ কিকী নামক নরাধিপতি মহর্ষি বুদ্ধের উপস্থায়ক তথা সেবক ছিলেন।

আমি ছিলাম সেই রাজার জ্যেষ্ঠ কন্যা। আমাকে সবাই ‘সমণী’ হিসেবে জানত। আমি জিনশ্রেষ্ঠ বুদ্ধের ধর্মকথা শুনে প্রব্রজ্যা আকাঙক্ষা করেছিলাম।

কিন্তু পিতার অনুমতি মেলেনি। তাই আমরা গৃহে থেকে অতন্দ্রভাবে বিশ হাজার বৎসর কৌমার ব্রহ্মচর্যা অনুশীলন করেছিলাম। আমরা সাতজন রাজকন্যা ছিলাম। অত্যন্ত সুখিনী, বুদ্ধসেবায় নিরতা। তাতে আমরা বেশ খুশি ছিলাম।

সেই সাতজন রাজকন্যা হলো সমণী, সমণগুত্তা, ভিক্ষুণী, ভিক্ষুদায়িকা, ধর্মা, সুধর্মা ও সংঘদায়িকা।

বর্তমানে সেই সাতজন রাজকন্যা হচ্ছি যথাক্রমে আমি, উৎপলবর্ণা, পটাচারা, কুন্তলা, কৃশাগৌতমী, ধর্মদিন্না ও বিশাখা।

একদিন সেই নরাদিত্য বুদ্ধ মহানিদান সুত্তন্ত দেশনা করেছিলেন। আমি তা শুনে শুনেই শিক্ষা করেছিলাম।

সেই সুকৃত কর্মের ফলে ও প্রার্থনাবলে মনুষ্যদেহ ত্যাগ করে আমি তাবতিংস দেবলোকে জন্মেছিলাম।

তারপর এই শেষ জন্মে আমি সাকল নগরে মদ্দরাজার অতি প্রিয়, মনোজ্ঞ কন্যা হয়ে জন্মগ্রহণ করলাম।

আমার জন্মের পর পরই সেই নগরে ক্ষেম তথা কল্যাণ উৎপন্ন হলো। তাই আমার নাম রাখা হলো ‘ক্ষেমা’।

আমি যখন রূপলাবণ্যময় যুবতী হলাম তখন পিতা আমাকে বিম্বিসার রাজার সঙ্গে বিয়ে দেন।

তখন আমি রাজার অতি প্রিয় পত্নী ছিলাম। আমি ভীষণ রূপচর্যা করতাম। ভগবান বুদ্ধ আমার রূপের দোষ বর্ণনা করবেন এই ভেবে আমি তাঁর কাছে যেতাম না।

তখন বিম্বিসার রাজার আদেশে রাজপুরীস্থ সকলে আমার প্রতি অনুগ্রহ করে নানা উপমা যোগে বেণুবনের সৌন্দর্যের বর্ণনা করলেন এভাবে :

আমাদের মনে হয়, যে সুগতালয় বেণুবন বিহারটি দেখেনি, সে এখানো সৌন্দর্য কী দেখেনি। যে অনিন্দ্য সুন্দর বেণুবন বিহারটি দেখেছে, সে প্রকৃত সৌন্দর্যের দেখা পেয়েছে। তাই দেবতারা দেবসৌন্দর্য ফেলে এই পৃথিবীতে এসে দৃষ্টিনন্দন বেণুবন বিহারটি দেখে থাকেন। তারা অনিমেষ দৃষ্টিতে দেখতেই থাকেন, কিছুতেই তৃপ্ত হন না। বেণুবন বিহারটি রাজপুণ্যে উৎপন্ন এবং বুদ্ধপুণ্যে ভুষিত। তাই এমন বেণুবনের গুণের কথা কে বলে শেষ করতে পারবে?

বেণুবন বিহারের এমন শ্রুতিমধুর গুণকীর্তন শুনে আমি বুদ্ধকে দর্শনেচ্ছু হলাম এবং আমার ইচ্ছার কথাটি রাজাকে জানালাম।

তারপর রাজা আমাকে বিশাল পরিষদ-পরিবেষ্টিত করে বুদ্ধকে দর্শনের জন্যে পাঠালেন।

যাও, দেখো, সুগত বুদ্ধরশ্মিতে উজ্জ্বল সেই দৃষ্টিনন্দন বেণুবন বিহারটিকে, যা থেকে নিয়ত সৌন্দর্য নিংড়ে পড়ছে।

রাজগৃহ নগরে বুদ্ধ যখন পিণ্ডের জন্যে বিচরণ করতে বের হলেন, ঠিক তখনি আমি দৃষ্টিনন্দন বেণুবন বিহারটিকে দেখতে প্রবেশ করলাম।

তখন আমি সেই ফুলে ফুলে সাজানো, নয়নাভিরাম, ভ্রমর, কোকিলসহ নানা পাকপাখালির কূজনে মুখরিত, ময়ূরের নাচে শোভিত, নির্জন, নিরিবিলি, কুটি-মণ্ডপ সমাকীর্ণ, যোগীবরের বাসস্থান বেণুবন বিহারটির চারপাশে ঘুরে ঘুরে মুগ্ধ দৃষ্টিতে দেখছিলাম। তখন আমি যোগযুক্ত তরুণ এক ভিক্ষুকে দেখে ভাবলাম :

এই নব যৌবনপ্রাপ্ত, সুদর্শন, মনোজ্ঞ কান্তি ভিক্ষু ঈদৃশ রমণীয় বনে বসবাস করছেন।

অহো, এই মুণ্ডিত-মস্তক ভিক্ষু যৌবনের আনন্দ-ফূর্তি ত্যাগ করে সংঘাটি পরিধান করে বৃক্ষমূলে বসে ধ্যান করছেন।

এই ভিক্ষুর পক্ষে গৃহস্থ হয়ে কামসুখ ভোগ করে পরে বৃদ্ধ বয়সে শ্রমণ্যধর্ম অনুশীলন করা উচিত নয় কি?

তারপর ক্রমে জিনালয় গন্ধকূটিতে গিয়ে আমি উদীয়মান সূর্যের ন্যায় ভাস্বর জিন বুদ্ধকে দেখলাম।

তিনি একাকী সুখাসনে বসে আছেন আর তাঁকে বাতাস করে দিচ্ছে এক অনিন্দ্য সুন্দরী নারী। এমন দৃশ্য দেখে আমি ভাবলাম, ‘এই নরশ্রেষ্ঠ বুদ্ধ তো দেখছি বিশ্রী নন।’

সেই নারীটিও সোনারঙা, পদ্মলোচনা, রক্তললাট, মালতী ফুলের ন্যায় মনোহরিনী, হেমদোলা-ভূষণা, উন্নত বক্ষা, সুঢৌল নিতম্ব, পরিপাটি ও বিচিত্র বস্ত্রধারিনী, সদা হাস্যময়ী, যার রূপ-লাবণ্য দেখে তৃপ্ত হওয়া যায় না।

মেয়েটিকে দেখে আমি ভাবলাম, অহো, কী অনিন্দ্য সুন্দরী! আমি তো এমন অনিন্দ্য সুন্দরী মেয়ে আগে কখনো দেখিনি!

তারপর আস্তে আস্তে সেই মেয়েটি জরাগ্রস্ত, বিবর্ণ, বিশ্রী, হলো। মেয়েটির গালে ভাঁজ পড়ল, দাঁতগুলো ভেঙে পড়ল, চুলগুলো পেকে সাদা হয়ে গেল, মুখ থেকে লালা ঝড়ে পড়ছিল। কানগুলো ও সুঢৌল স্তনগুলো নিচের দিকে ঝুলে পড়ল। তার গায়ে শিরাগুলো ভেসে উঠল। তার শরীর নুঁয়ে পড়ে যেতে লাগল। তাকে লাঠি ধরতে হলো। তার শরীর এতই কৃশ হয়ে গেল যে তাকে দেখতে ভীষণ বিশ্রী দেখাচ্ছিল। তার শরীর কাঁপতে লাগল, আর সে বেশ বড় বড় করে শ্বাস নিচ্ছিল।

তা দেখে আমার মনে ভীষণ সংবেগ উৎপন্ন হলো। শরীরে অদ্ভুত রকমের লোমহর্ষণ হলো। ধিক্‌! ধিক্‌! এই অশুচি রূপকে ধিক্‌! মূর্খরাই এই রূপে রমিত হয়।

তখন সুগত মহাকারুণিক বুদ্ধ সংবিগ্ন অবস্থায় আমাকে দেখে এই গাথাগুলো ভাষণ করলেন :

হে ক্ষেমা, দেখো, মূর্খা-অভিনন্দিত এই পূতিময়, অশুচিতে পূর্ণ দেহকে দেখো।

একাগ্র ও সুসমাহিত চিত্তে অশুভ-ভাবনা কর, কায়গতানুস্মৃতি ভাবনা কর, আর তাতে দেহের প্রতি বিরাগবহুল হও।

এটি যেমন উহাও তেমন, উহা যেমন ইহাও তেমন। নিজ ও পরদেহের প্রতি যে তৃষ্ণা তা ত্যাগ কর।

অনিমিত্ত ভাবনা কর। মানানুশয় ত্যাগ কর। মানানুশয় ত্যাগ করলে পরে সম্পূর্ণ উপশান্ত হয়ে থাকতে পারবে।

যারা রাগমদে মত্ত হয়ে বাস করে তারা নিজকৃত জালে আবদ্ধ মাকড়সার মতো আবদ্ধ হয়। যারা এই সত্য উপলব্ধি করেছে তারা এই সমস্ত অসার কামসুখ ত্যাগ করে, পরিবর্জন করে।

তারপর নরসারথি বুদ্ধ আমার চিত্ত স্বচ্ছ, নির্মল, জ্ঞান লাভের উপযুক্ত হয়েছে জেনে আমাকে বিনীত করার জন্যে মহানিদান সুত্তন্ত দেশনা করলেন।

সেই সুত্তন্ত শোনার পর পরই আমি আমার পূর্বলব্ধ সংজ্ঞা স্মরণ করেছি। সেখানে দাঁড়িয়েই আমি ধর্মচক্ষু লাভ করেছি।

তৎক্ষণাৎ আমি মহর্ষি বুদ্ধের পদমূলে নিপতিত হয়ে এই অশুচি দেহের দোষ সম্বন্ধে দেশনা করার জন্যে এই কথা নিবেদন করেছি :

হে সর্বদর্শী, আপনাকে নমস্কার। হে করুণাঘন, আপনাকে নমস্কার। হে তীর্ণসংসার, আপনাকে নমস্কার। হে অমৃতদায়ক, আপনাকে নমস্কার।

এখন আমি মিথ্যাদৃষ্টি সম্পূর্ণ বর্জন করেছি। কামরাগে বিমোহিতা আমাকে আপনি বেশ সুকৌশলে যথার্থ উপায়ে বিনীত করেছেন।

আপনার ন্যায় মহর্ষি বুদ্ধের সাক্ষাৎ না পেয়ে বহু রাগমদে মত্ত সত্ত্ব সংসারসাগরে মহাদুঃখ ভোগ করছে।

লোকশরণ, অরণ, অরণবিদ বুদ্ধকে আমি কাছাকাছি জায়গায় অবস্থান করা সত্ত্বেও দেখতে আসিনি। আমি অকপটে সেই দোষ স্বীকার করছি।

মহাহিতৈষী, শ্রেষ্ঠ দাতা বুদ্ধকে আমি অহিতৈষী জ্ঞান করেছি। আমি আমার রূপাভিমানে মত্ত হয়ে তাঁর কাছে যাইনি। আমি অকপটে আমার সেই দোষ স্বীকার করছি।

ঠিক তখনি মহাকারুণিক জিন মধুর স্বরে আমাকে ‘ক্ষেমা, এবার ক্ষান্ত হও’ এই বলে আমার ওপর অমৃতবারি ঢেলে দিলেন।

তারপর আমি নতশিরে প্রণাম নিবেদন করে প্রদক্ষিণ করে চলে গেলাম। চলে যাবার পর নৃপতি বিম্বিসারকে দেখে আমি এই কথা নিবেদন করেছিলাম :

অহো, নৃপতি, আপনার চিন্তা যথার্থই ছিল! আপনি আমাকে বেণুবন দর্শনের জন্যে পাঠিয়েছেন! আর মহামুনি বুদ্ধ আমায় নির্বাণ দর্শন করিয়েছেন।

হে মহারাজ, এখন আমি মহামুনির উপদেশে রূপের প্রতি বীতরাগ। আপনার অনুমতি পেলে আমি বুদ্ধের শাসনে প্রব্রজ্যা গ্রহণ করব।

[দ্বিতীয় ভাণবার সমাপ্ত]

হাত জোড় করে নৃপতি তখন বললেন, হে ভদ্রে, আমি তোমায় প্রব্রজ্যা গ্রহণের অনুমতি প্রদান করছি। তোমার আশা পূর্ণ হোক!

প্রব্রজিত হওয়ার পনেরো দিন পরে আমি জ্বলন্ত প্রদীপের নিভে যাওয়ার দৃশ্য দেখে ভীষণভাবে সংবিগ্ন হলাম। তারপর আমি সর্ববিধ সংস্কারের প্রতি নির্বেদপ্রাপ্ত ও প্রত্যয়াকারে বিশারদ হয়ে কামোঘ, ভবোঘ, দৃষ্টি-ওঘ, অবিদ্যা-ওঘ এই চার ওঘ (স্রোত) অতিক্রম করে অর্হত্ত্ব লাভ করেছি।

আমি বিবিধ ঋদ্ধি, দিব্যকান, পরচিত্ত-বিজানন-জ্ঞান ও পূর্বনিবাসানুস্মৃতি-জ্ঞান লাভ করেছি। আমার দিব্যচোখ অত্যন্ত বিশুদ্ধ। আমার সর্বাসব পরিক্ষীণ হয়েছে। আমার আর কোনো পুনর্জন্ম নেই। অর্থ, ধর্ম, নিরুক্তি, প্রতিভাণ এই চার প্রতিসম্ভিদায় আমার বিশুদ্ধ জ্ঞান উৎপন্ন হয়েছে।

আমি সপ্ত বিশুদ্ধিতে অভিজ্ঞ, কথাবত্থু বিশারদ, অভিধর্ম নয়বিশারদ ও বুদ্ধশাসনে বশীপ্রাপ্ত।

তারপর একদিন রাজদরবারের প্রবেশদ্বারে কোশলরাজ প্রসেনজিৎ আমাকে নিপুণ কিছু প্রশ্ন করলে আমি তার যথার্থ উত্তর দিয়েছি।

তখন সেই রাজা সুগত বুদ্ধের কাছে গিয়ে সেই একই প্রশ্ন করলে বুদ্ধও সেই একই উত্তর দিলেন, ঠিক যেভাবে আমি দিয়েছি।

তারপর নরোত্তম জিন আমার গুণে তুষ্ট হয়ে আমাকে ভিক্ষুণীদের মধ্যে মহাপ্রজ্ঞায় শ্রেষ্ঠ অগ্রশ্রাবিকা পদে বসালেন।

আমার সমস্ত ক্লেশ দগ্ধ হয়েছে, আমার সমস্ত জন্ম বিধ্বংস হয়েছে এবং নাগের ন্যায় সমস্ত বন্ধন ছিন্ন করে এখন আমি সম্পূর্ণ অনাসক্ত হয়ে অবস্থান করছি।

বুদ্ধের কাছে আসাটা আমার অতীব শুভপ্রদ হয়েছে। ত্রিবিদ্যা লাভ করে আমি বুদ্ধের শাসনে কৃতকার্য হয়েছি।

চার প্রতিসম্ভিদা, অষ্ট বিমোক্ষ ও ষড়ভিজ্ঞা সাক্ষাৎ করে আমি বুদ্ধের শাসনে কৃতকার্য হয়েছি।

ঠিক এভাবেই ক্ষেমা ভিক্ষুণী এই গাথাগুলো ভাষণ করেছিলেন।


Post a Comment

0 Comments

Ad Code

Responsive Advertisement