প্রাচীন ভারতের মহান চিকিৎসক এবং সার্জারীর জনক সুশ্রূতকে বৃটেনে প্রতিষ্ঠিত ‘রয়েল কলেজ অফ সার্জন্স অফ এডিনবার্গ কর্তৃক সম্মানিত করা হয়েছে।
বিগত ১৯শে জুন ২০২৬ তারিখে তাঁর কাংস্য প্রতিমার আবরণ উন্মোচন করা হয়েছে, যা হল চিকিৎসা বিজ্ঞানে ভারতের প্রায় আড়াই হাজার বছরের পুরাতন যোগদানের বৈশ্বিক মান্যতার প্রতীক।
আচার্য সুশ্রূত স্বীয় কৃতি ‘সুশ্রূত সংহিতা’ গ্রন্থের মাধ্যমে শল্য চিকিৎসা, চিকিৎসা নৈতিকতা এবং সার্জিক্যাল উপকরণের বিস্তৃত জ্ঞান পৃথিবীকে প্রদান করেছিলেন।
উপলব্দ ঐতিহাসিক এবং বৈদিক সাহিত্যের ভিত্তিতে সুশ্রূতের নাম সরাসরি কোনো ঋগ্বেদ, সামবেদ, যজুর্বেদ বা অথর্ববেদে পাওয়া যায়না। অনুরূপভাবে বৈদিক সংহিতা সমূহে শল্য চিকিৎসার (সার্জারী) ব্যবস্থিত এবং বিস্তৃত বর্ণনাও দেখা যায়না। তথ্য হল নিম্ন প্রকার-
১) চতুর্বেদে সুশ্রূতার উল্লেখ ঋগ্বেদে নাই, যজুর্বেদে নাই, সামবেদে নাই এবং অথর্ববেদে নাই। অথর্ববেদে ঔষধ, রোগ এবং মন্ত্রোপচারের উল্লেখ অবশ্যই রয়েছে, কিন্তু সুশ্রূত বা শল্যতন্ত্রের ব্যবস্থিত বিবরণ উপলব্দ হয়না।
২) সুশ্রূতের তথ্য কোন গ্রন্থে উপলব্দ হয়?
—————————
সুশ্রূতের সবচেয়ে প্রাচীন উপলব্দ স্রোত হল সুশ্রূত সংহিতা। তাতে সুশ্রূতকে কাশীর রাজা দিবোদাস ধন্বন্তরির শিষ্য উল্লেখ করা হয়েছে।
৩) বৈদিক সাহিত্যে চিকিৎসার স্বরূপ
————————
অথর্ববেদে ঔষধি এবং রোগ সমূহের উল্লেখ দেখা যায়। শতপথ ব্রাহ্মণ, কৌশিকসূত্র ইত্যাদি গ্রন্থে চিকিৎসা সম্বন্ধিত কিছু সঙ্কেত পাওয়া যায়। কিন্তু শল্য চিকিৎসা, অঙ্গ বিচ্ছেদন, প্লাস্টিক সার্জারি, মোতিয়াবিন্দ অপারেশনাদির ব্যবস্থিত বর্ণনা সুশ্রূত সংহিতায় দেখা যায়। বেদ সমূহে দৃশ্যমান হয়না।
৪) বোবর বৌদ্ধ পাণ্ডুলিপির গুরুত্ব
————————-
পঞ্চম-ষষ্ট শতাব্দীর বোবর বৌদ্ধ পাণ্ডুলিপি, যা এক বৌদ্ধ স্তূপ হতে উপলব্দ হয়েছিল। তাতে সুশ্রূতের নাম এক প্রাচীন চিকিৎসা পদ্ধতির আচার্য রূপে উদ্ধৃত করা হয়েছে। তা হতে জানা যায় যে, সেসময় পর্যন্ত সুশ্রূতের পরম্পরা প্রতিষ্ঠিত ছিল।
A. F. Rudolf Hoernle দ্বারা সম্পাদিত ‘The Bower Buddhist Manuscript’ এর ভিত্তিতে ইহা স্পষ্ট হয়েছে যে, বোবর বৌদ্ধ পাণ্ডুলিপির প্রথম ভাগে সুশ্রূতের উল্লেখ এক প্রাচীন চিকিৎসা আচার্য রূপে করা হয়েছে।
মূল সংস্কৃতে (পুননির্মিত পাঠ) ঋষিদের সূচী দেওয়া হয়েছে নিম্নোক্তভাবে- ‘আত্রেয় হারিত: পারাশরো ভেলো গর্গ: শাম্ভব্য: সুশ্রূত বসিষ্ঠ: করাল: কাপ্যশ্চ।’
অর্থাৎ আত্রেয়, হারিত, ভেল, গর্গ, সাম্ভব্য, সুশ্রূত, বৈসিষ্ঠ, করাল এবং কাপ্য। এরা সকলে ঔষধি, বনস্পতি সমূহের গুণ, স্বাদ, শক্তি এবং নাম সমূহ জানার ইচ্ছায় একত্র হয়েছিল।
এরপর বর্ণনা এসেছে যে-
সুশ্রূত একটি বিশেষ উদ্ভিদকে দেখে কাশীরাজ কর্তৃক মুনির কাছে জিজ্ঞাসা করেছেন যে, এ উদ্ভিদের পরিচয় কি? তখন সুশ্রূত কাশীরাজের নিকট ইহার নাম এবং গুণের বর্ণনা করেছিলেন।
এ উদ্ভিদ ছিল রসুনের গাছ। এজন্য এ অধ্যায়কে রসুনকল্প বলা হয়েছে।
গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক তথ্য
—————————-
বোবর পাণ্ডুলিপি পাওয়া গিয়েছিল একটি বৌদ্ধ স্তূপ হতে এবং ইহার কিছু অংশ তথাগত বুদ্ধকে বন্দনা দ্বারা প্রারম্ভ হয়েছে।
এতে সুশ্রূতের নাম পাওয়া যায়, তা হতে প্রমাণিত হয় যে, পঞ্চম শতাব্দী পর্যন্ত সুশ্রূতকে একজন বৌদ্ধ জগতে প্রতিষ্ঠিত চিকিৎসা পরম্পরার আচার্য মান্য করা হতো।
ইহাও সত্য যে, মধ্য এশিয়া এবং বৌদ্ধ বিহার সমূহ চিকিৎসা জ্ঞানের সংরক্ষণ এবং প্রসারের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল এবং বোবর বৌদ্ধ পাণ্ডুলিপি সম্ভবত: বৌদ্ধ ভিক্ষুদের দ্বারা সংরক্ষিত এবং প্রতিলিপিত করা হয়েছিল।
মূল বোবর বৌদ্ধ পাণ্ডুলিপি আজ ইংল্যান্ডস্থ Oxford এর বোডলিয়ন লাইব্রেরীতে সুরক্ষিত আছে।
সুতরাং, উপলব্দ ঐতিহাসিক প্রমাণের ভিত্তিতে এরূপ বলা সঠিক যে, বৌদ্ধ পরিবেশে সংরক্ষিত বোবর পাণ্ডুলিপিতে সুশ্রূতের উল্লেখ দেখা যায়।
বৌদ্ধ কালে শল্য চিকিৎসার (সার্জারী) তথ্য উপলব্দ ছিল এবং তক্ষশীলা ছিল এ বিদ্যা শিক্ষার প্রমুখ কেন্দ্র। যেখানে তথাগত বুদ্ধের সমকালীন প্রসিদ্ধ চিকিৎসক জীবক, যিনি ছিলেন মগধের রাজকীয় চিকিৎক এবং তথাগত বুদ্ধেরও চিকিৎসক। বৌদ্ধ সাহিত্যে শল্য চিকিৎসকরূপে তাঁর উদাহরণ পাওয়া যায়।
বর্তমানে উপলব্দ প্রমাণ সমূহের অনুসারে, কোনো বৈদিক গ্রন্থে সুশ্রূতের নাম পাওয়া যায়না। শল্য চিকিৎসার বিস্তৃত জ্ঞান বেদ সমূহে নাই, বরং সুশ্রূত সংহিতাতেই দেখা যায়।
সুশ্রূতের অস্তিত্বের সবচেয়ে প্রাচীন বাহ্যিক প্রমাণ হল বোবর বৌদ্ধ পাণ্ডুলিপি, যা বৌদ্ধ পরিবেশে সংরক্ষিত পাওয়া গিয়েছে।
পরবর্তী পরম্পরায় আয়ুর্বেদকে ‘উপবেদ’ বর্ণনা করে অথর্ববেদের সাথে যুক্ত করা হয়েছে। কিন্তু এরূপ বর্গীকরণ হল উত্তরবর্তী অর্থাৎ পরের সংযোজন কথা; স্বয়ং বেদ সমূহে স্পষ্ট উল্লেখ পাওয়া যায়না।


0 Comments