Hot Posts

6/recent/ticker-posts

Ad Code

বৌদ্ধ ধম্মে উপোসথের গুরুত্ব

ভগবান বুদ্ধের প্রচারিত ধম্মে উপোসথ কেবল একটি তিথি, ব্রত বা ধাম্মিক পরম্পরা নয়, বরং ইহা হল স্বীয় চিত্তের নিরীক্ষণ করার, বিকার সমূহের পরিচয় করার এবং আর্য জীবনের অনুশীলন করার দিন। ইহার উদ্দেশ্য হল নিজের কর্ম, নিজের চিত্ত এবং নিজের জীবনকে ধম্মানুরূপ তৈরী করার প্রয়াস।

উপোসথের আধ্যাত্মিক স্বরূপ
————————————-
বুদ্ধের ধম্ম অনুসারে সমস্ত কর্মের মূল হল চিত্ত। যদি চিত্ত অশুদ্ধ হয়, তাহলে কর্মও হবে অশুদ্ধ। চিত্ত যদি শুদ্ধ হয়, তাহলে জীবনও নির্মল হবে। এজন্য উপোসথের কেন্দ্র বাহ্যিক কর্মকাণ্ড নয়, বরং তা হল চিত্তের শুদ্ধিতা রক্ষা করার অন্যতম পন্থা।
উপোসথের দিন সাধক-সাধিকা নিজের নিকট এভাবে প্রশ্ন করতে পারেন-
আমার ভিতরের লোভ কি হ্রাস পেয়েছে?
আমার ক্রোধ কি হ্রাস পেয়েছে?
আমার অহঙ্কার কি হ্রাস পেয়েছে?
আমার মৈত্রী এবং করুণা কি বৃদ্ধি পেয়েছে?
আমি কি পূর্বের চেয়ে অধিক স্মৃতিমান হয়েছি?
আত্মপরীক্ষণের ইহাই হল উপোসথের বাস্তবিক সাধনা। যখন ব্যক্তি স্বীয় দোষ সমূহকে দেখতে শিখে থাকেন, তখনই তাঁদের দোষ ত্যাগ করা সম্ভব হয়ে থাকে। ইহাই হল বুদ্ধ ধম্মের বৈজ্ঞানিক এবং অনুভব আধারিত সাধনা।
অষ্টশীল গ্রহণের উদ্দেশ্য
———————————
উপোসথের দিন অষ্টশীল পালন কেবল নিয়ম নয়, বরং মনকে স্বতন্ত্র করারও এক সাধন। অহিংসা বা প্রাণী হত্যা বিরতি ক্রুরতাকে সমাপ্ত করে থাকে। চৌর্য বৃত্তি বিরতিতে চিত্তের লোভ সংবরণ হয়ে থাকে। ব্রহ্মচর্য রক্ষায় ইন্দ্রিয় সংযম বিকশিত করে থাকে। সত্য বচনে বলার অনুশীলনে মনকে নির্ভয় করে থাকে। মদ্যপান ও নেশা দ্রব্য সেবন বিরতিতে মন-মস্তিষ্কের বিকৃতি লোপ পায় এবং রোগ-ব্যাধি বৃদ্ধি পায়না। বিকাল ভোজন ত্যাগে তৃষ্ণার নিয়ন্ত্রণ শিক্ষা দিয়ে থাকে। মনোরঞ্জন এবং অলঙ্কারাদি ত্যাগে বাহ্যিক আকর্ষণ হতে মনকে হটিয়ে আভ্যন্তরমুখী করে থাকে। সাধারণ জীবন-যাপনে অহঙ্কার এবং বিলাসিতাকে কম করে থাকে।
এভাবে অষ্টশীল কেবল শরীরকে নয়, বরং চিত্তকেও অনুশাসিত করে থাকে।
উপোসথের মনোবৈজ্ঞানিক প্রভাব
————————-
মানুষের অধিকাংশ দুঃখ বাহ্যিক পরিস্থিতির দ্বারা আসেনা, বরং মানসিক প্রতিক্রিয়া সমূহের দ্বারা উৎপন্ন হয়ে থাকে। উপোসথ ব্যক্তিকে প্রতিক্রিয়া হতে সজাগ উত্তরের দিকে নিয়ে যায়।
্যান-সাধনা, ধম্ম চিন্তন এবং মৌনতার অনুশীলন দ্বারা মন শান্ত হয়। যখন মন শান্ত হয়, তখন মানুষ বস্তু, ব্যক্তি এবং পরিস্থিতি সমূহকে যথার্থরূপে দেখতে পারে। তাতে ক্রোধ, ভয়, ঈর্ষা এবং হতাশা-অস্থিরতা স্বাভাবিকভাবে কম হতে থাকে।
উপোসথের ব্যবহারিক স্বরূপ
————————————
উপোসথ কেবল বিহার পর্যন্ত সীমিত থাকা নয়, বরং দৈনিক জীবন-যাপনেও এর প্রভাব থাকতে হবে। যে ব্যক্তি নিয়মিত উপোসথ পালন করে থাকে, তাঁর ব্যবহার অধিক বিনম্র হয়। তাঁর সিদ্ধান্ত বিবেকপূর্ণ হয়ে থাকে, তিনি অন্যদের প্রতি সম্মান এবং করুণা রাখেন, তিনি উপভোগের চেয়ে সন্তোষকে গুরুত্ব প্রদান করে থাকেন এবং তিনি সমাজে বিশ্বাস এবং নৈতিকতার উদাহরণ তৈরী করে থাকেন।
এভাবে উপোসথ হল মনুষ্যের জীবনে ধম্মকে ধারণ করার ব্যবহারিক উত্তম প্রশিক্ষণ।
উপোসথ এবং প্রজ্ঞার সম্বন্ধ
———————————-
বুদ্ধ তথাগত কেবল শীল পালনই পর্যাপ্ত বলেন নাই। শীলের উদ্দেশ্য হল সমাধি এবং সমাধির উদ্দেশ্য হল প্রজ্ঞা। উপোসথের দিন যখন সাধক-সাধিকা শীল পালন করে থাকেন, ধ্যান-সাধনা করে থাকেন এবং ধম্মের চিন্তন করে থাকেন তখন তাঁরা ধীরে ধীরে অনিত্য, দুঃখ এবং অনাত্তের সত্যকে বুঝতে সক্ষম হন। ইহা বুঝতে পেরে তৃষ্ণাকে হ্রাস করে থাকেন এবং দুঃখ হতে মুক্তির দিকে অগ্রসর হতে থাকেন।
সুতরাং, উপোসথের অন্তিম লক্ষ্য কেবল ‘ভাল মানুষ’ হওয়া পর্যন্তই নয়, বরং আর্য মার্গে অগ্রসর হয়ে নির্বাণের দিশায় প্রগতি করা।
ভগবান তথাগতের ধম্মে উপোসথ হল আত্মনিরীক্ষণ, আত্মসংযম এবং আত্ম বিকাশের দিবস। ইহা কোনো বাহ্যিক আড়ম্বর নয়, বরং ভিতরের মনুষ্যকে পরিবর্তনের অনুশীলন। যখন উপাসক-উপাসিকা শ্রদ্ধার সাথে অষ্টশীল, ধ্যান-ভাবনা, ধম্ম শ্রবণ এবং আত্মপরীক্ষণের অনুশীলন করে থাকেন, তখন তাঁদের জীবন কেবল নৈতিক নয়, বরং প্রজ্ঞাময় হয়ে থাকে।
উপোসথের মাধ্যমে মনুষ্যের জন্য বাস্তবিক বার্তা ইহাই যে-‘নিজের মনকে দেখো, নিজের দোষের সাথে পরিচিত হয়ে তাকে ত্যাগ করো এবং ধম্মের প্রকাশে স্বয়ংকে রূপান্তরিত করো।

Post a Comment

0 Comments

Ad Code

Responsive Advertisement