আমরা প্রায়ই দেখি যে, অন্যকে উপদেশ দিতে আমরা সবাই পটু। কিন্তু উপদেশ দেওয়া যতো সহজ তা নিজে অনুশীলন করা কিন্তু অনেক কঠিন কাজ। বুদ্ধ আমাদের সবাইকে বলেছেন যে, অন্যকে উপদেশ দেওয়ার পূর্বে তা নিজে অনুশীলন করাই হল উত্তম কাজ। তবে অধিকতর মনুষ্য স্বভাব হল নিজের দোষ নিজেরা দেখার চেষ্টা করেনা। নিজেকে সংশোধন না করে অপরকে শেখাতে তৎপরতা দেখায়। তাতে হিতে বিপরীত হয়ে যায়। সেও তখন আঙ্গুল তুলে দেখিয়ে দেয় আমাকে শেখানোর আগে নিজের দোষ-ত্রুটি দেখো। এরূপই আমরা এখন সর্বত্র দেখতে পাচ্ছি। এরূপ কেবল এখন হচ্ছে তা নয়, অতীতেও এরকম হয়েছে। এ প্রসঙ্গে ধম্মপদ অর্থকথা হতে উপনন্দ স্থবিরের ঘটনা এখানে উল্লেখ করছি।
কোশল জনপদের শ্রাবস্তীর জেতবনারাম। তথায় ভগবান তথাগত ধম্মদান হেতু বিরাজমান ছিলেন। উপনন্দ নামক একজন শাক্যবংশীয় ভিক্ষু, যিনি ছিলেন নিপুণ বক্তা এবং অপরে উপদেশ দানে বেশ পটু। তিনি অন্যদেরকে লোভ-লালচ না করার জন্য শিক্ষা দিতেন এবং ইহাও শিক্ষা দিতেন যে, মানুষের আবশ্যকতা সীমিত হওয়া উচিত। অতিরিক্ত কিছুর লোভ না করে বা অধিক সঞ্চয় না করে যথালাভে সন্তুষ্ট থাকা বাঞ্ছনীয়, তিনি এরূপ দেশনা করতেন। তিনি সন্তোষ এবং মিতব্যয়িতার উপর প্রবচন দিয়ে উপস্থিত সকলকে প্রভাবিত করতেন। কিন্তু তিনি যে শিক্ষা সমূহ দিতেন, সেগুলি নিজের জীবনে আচরণ করতেননা। অন্য ভিক্ষুরা যে সমস্ত চীবর দানের মধ্যে লাভ করতেন, সেগুলিও তিনি নিয়ে নিজের কুক্ষিগত করতেন।
একবার উপনন্দ থেরো গ্রামের একটি বিহারে বর্ষাবাসের ঠিক পূর্বে গিয়েছিলেন। কিছু যুবক ভিক্ষু তাঁর বাক্ পটুতা দ্বারা মুগ্ধ হয়ে তাঁকে সে বিহারে বর্ষাবাসের জন্য অবস্থান করতে অনুরোধ করেছিলেন। তিনি তাঁদের কাছে জিজ্ঞাসা করলেন-‘সাধারণত: বর্ষাবাস কালে দান স্বরূপ প্রত্যেক ভিক্ষু কি পরিমান চীবর পেয়ে থাকেন?’ এর উত্তরে তাঁরা জানিয়েছিলেন যে, সাধারণত: একটি করে চীবর তাঁরা লাভ করে থাকেন। এজন্য তিনি সেখানে অবস্থান করেননি। কিন্তু সেখানে থাকেন মনে করার জন্য তিনি তথায় তাঁর জুতা রেখে গেলেন। পরের বিহারে গিয়ে জিজ্ঞাসা করে জানতে পারলেন যে, তাঁরা দু’টি চীবর লাভ করে থাকেন। সুতরাং সেখানে তিনি তাঁর লাঠি রেখে গেলেন। এরপরের বিহারের ভিক্ষুরা বর্ষাবাসে দান স্বরূপ তিনটি করে চীবর লাভ করে থাকেন। তাই সেখানে তিনি স্বীয় জলপাত্র রেখে দিলেন। সেখান হতে তিনি পরের আরেকটি বিহারে গেলেন। কথায় জিজ্ঞাসা করে জানলেন যে, সেখানকার ভিক্ষুরা চারটি করে চীবর পেয়ে থাকেন। সেজন্য তিনি সেখানে বর্ষাবাস অধিষ্ঠান করে থেকে গেলেন।
বর্ষাবাস শেষে তিনি অন্য বিহারগুলি হতে যেখানে তিনি নিজের ব্যবহার্য বস্তু সামগ্রী রেখে গিয়েছিলেন, সেখানকার ভিক্ষুদের কাছ হতে নিজের অংশের চীবরের ভাগ চেয়ে নিলেন এবং সব চীবর একত্র করে একটি ঘাঁট বেঁধে গাড়ি ভর্তি করে নিজের পুরাতন বিহারে চলে আসলেন। আসার পথে তাঁর সাথে দু’জন যুবা ভিক্ষুর সাক্ষাত হয়েছিল, যাঁরা দানে প্রাপ্ত দু’টি চীবর এবং উলের এক বহুমূল্য কম্বল নিজেদের মধ্যে ভাগ করতে অপারগ ছিলেন। কেননা ভাগ করতে গেলে কিভাবে তা করবে নিজেরা সহমত হতে পারছিলেননা। তাঁরা সেগুলি ভাগ করে দিতে উপনন্দ স্থবিরকে অনুরোধ করলেন।
ভদন্ত উপনন্দ দু’জন ভিক্ষুকে একটি একটি করে চীবর ভাগ করে দিলেন এবং মূল্যবান কম্বলটি বন্টনের পারিশ্রমিকরূপে নিজে রেখে দিলেন।
ভিক্ষু দু’জন তাঁর বন্টনে সন্তুষ্ট হতে পারেননি। কিন্তু তাঁরা তাঁকে সে বিষয়ে কিছুই বলতেও পারেননি। অসন্তুষ্ট এবং নিরাশ হয়ে তাঁরা বুদ্ধের নিকট গিয়েছিলেন এবং তাঁকে সম্পূর্ণ বিষয় জানিয়েছেন। বুদ্ধ তথাগত তখন বুঝিয়েছেন যে-‘যে অন্যদেরকে শিক্ষা দিয়ে থাকে, তা প্রথমে নিজেকেই শিক্ষা দেওয়া উচিত এবং সে শিক্ষাকে প্রথমে নিজের মধ্যে অনুসরণ করা উচিত। ‘
অত:পর বুদ্ধ তথাগত গাথা ভাষণ করে বললেন-
‘অত্তানমেব পঠমং, পতিরূপে নিবেসয়ে,
অথঞ্ঞমনুসাসেয্য, ন কিলিস্সেয্য পণ্ডিতো।’
(ধম্মপদ-১৫৮)
অর্থাৎ বুদ্ধিমান পুরুষের উচিত যে, প্রথমে তিনি স্বয়ংকে উচিত কার্যে নিয়োজিত করবেন এবং এরপরে অন্যকে উপদেশ দেবেন। এরকম করলে সে ব্যক্তি সমালোচিত হবেননা।
আমাদের মধ
্যেও অনেকে অন
্যদেরকে সব সময় নির্লোভ হওয়ার জন্য উপদেশ দিয়ে থাকেন। আরও বলে থাকেন যে, রিক্ত হস্তে এসে রিক্ত হস্তে যেতে হবে। কিছুই সঙ্গে যাবেনা। সবকিছু রেখে যেতে হবে। সুতরাং অতিরিক্ত লোভ-লালচ করা উচিত নয়। মুক্ত হস্তে দান করে পুণ
্য সঞ্চয় করতে জোর দিয়ে থাকেন। অন
্যকে এভাবে উপদেশ দিলেও নিজে কিন্তু গড়ে তোলেন সম্পদের পাহাড়। বসবাসের জন
্য দালান প্রাসাদ, রাত্রি যাপনের জন
্য এসি রুম, যাতায়াতের জন
্য দামী এসি কার এবং আরাম-আয়েসের জন
্য অত
্যাধুনিক ভোগ
্য বস্তু সবই হাতের নাগালে চাই। দানের মহাত
্য বর্ণনা করে করে সবই অন
্যদের কাছ হতে হাতিয়ে নিতে কোনো জুরি নেই। তাঁরা আবার নিজেদেরকে এরকম প্রচার করবে যে, ধূতাঙ্গধারী, শ্মশানচারী, পাত্র পিণ্ডিক, বিদর্শক সাধক, বিদর্শানাচার্য এভাবে আরও কত গালভরা উপাধির বাহার। এরকম ছদ্ম বেশধারীদের দৌরাত
্যই এখন সর্বত্র দৃশ
্যমান হচ্ছে। এগুলিই হচ্ছে বর্তমানে আমাদের অনাসক্ততা ও ত
্যাগের নমুনা!
0 Comments